শ্রেয়সী মজুমদার, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : ভারতের সামরিক ইতিহাসে অনেক গল্পই আছে সাহস, ত্যাগ ও শৃঙ্খলার। কিন্তু ২৩ বছর বয়সী প্রীতি রজক (Preeti Rajak) -এর কাহিনি একেবারে নতুন কিছু বলে। মধ্যপ্রদেশের (Madhya Pradesh) নর্মদাপুরম জেলার ছোট্ট শহর ইটার্সি (Itarsi) থেকে উঠে এসে প্রীতি রজক আজ ভারতীয় সেনার প্রথম মহিলা সুবেদার। এ এক রেকর্ড, যা শুধু ব্যক্তিগত নয় একটি প্রজন্মের মেয়েদের সামনে নতুন স্বপ্নের দরজা খুলে দিয়েছে। খেলাধুলা আর সেনাবাহিনীর সংমিশ্রণে গড়া তাঁর সাফল্যের কাহিনি আজ দেশজুড়ে আলোচিত।

প্রীতির বেড়ে ওঠা একটি সাধারণ পরিবারে। ওঁর বাবা ছিলেন পেশায় ধোপা, মা জ্যোৎস্না রজক (Jyotsna Rajak) সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত। সীমিত আয়ের সংসারে স্বপ্ন দেখাটাই ছিল চ্যালেঞ্জ। কিন্তু প্রীতির মা-বাবা মেয়েদের সবসময় সাহস দিয়েছেন নিজের পথ খুঁজে নিতে। ছোটবেলা থেকেই শুটিংয়ে আগ্রহ তৈরি হয় প্রীতির। ২০১৫ সালে যখন মা তাঁকে ও তাঁর দিদিকে মধ্যপ্রদেশ শুটিং আকাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেন, তখনই জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে। তারপর, ২০১৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশিক্ষণ শুরু হয় তাঁর। বয়স তখন মাত্র ১৫। রাজ্যস্তরে ছোট ছোট পদক জেতা শুরু করেন, আর সেই পদকই তাঁকে আরও দৃঢ় করে। নিশানা ধরার সময় শ্বাসের তাল মেলানো, মানসিক চাপ সামলানো আর ক্লে টার্গেটকে নির্ভুলভাবে চালনা করার দক্ষতা প্রীতি খুব দ্রুত আয়ত্ত করে ফেলেন। অনেকেই তখন বুঝে গিয়েছিলেন, এই মেয়ে একদিন বড় মঞ্চে জায়গা করে নেবেই।
শুধু জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দ্রুত ছাপ ফেলেন প্রীতি। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে হাংঝৌ এশিয়ান গেমসে (Hangzhou Asian Games) মহিলাদের ট্র্যাপ টিম ইভেন্টে প্রীতি রজত পদক জেতেন। সঙ্গী ছিলেন রাজেশ্বরী কুমারী (Rajeshwari Kumari) ও মনীষা কের (Manisha Keer)। সেই পদক শুধু দেশের জন্য গৌরব তা-ই নয়, প্রীতির জীবনেরও সবচেয়ে বড় মোড়। তিনি নিজেই বলেছিলেন, “সে মুহূর্তে সব কষ্ট, সন্দেহ আর রাতজাগা অনুশীলন যেন একসঙ্গে মিলিয়ে গেল।”

এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে শিমকেন্ট, কাজাখস্তানে (Shymkent, Kazakhstan) অনুষ্ঠিত এশিয়ান শুটিং চ্যাম্পিয়নশিপে মহিলা ট্র্যাপ টিমকে নেতৃত্ব দিয়ে প্রীতি সোনা জয় করেন। ওঁর একেবারে স্বপ্নের মতো উত্থান, যা ভারতীয় মহিলা শুটিংকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। কিন্তু শুধু শুটিং নয়, সেনা কেরিয়ারেও তিনি লিখেছেন অনন্য ইতিহাস। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে কর্পস অফ মিলিটারি পুলিশ (Corps of Military Police) -এ হাভিলদার হিসেবে তিনি যোগ দেন। খেলোয়াড় হিসেবে দক্ষতার জন্য বিশেষ কোটায় তাঁর এই সুযোগ মেলে। ২০২৪ সালের প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে এশিয়ান গেমসের রূপার জন্য তিনি সরাসরি পদোন্নতি পেয়ে সুবেদার হন। সেই সম্মান তুলে দেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল গজেন্দ্র যোশী (Lt Gen Gajendra Joshi)। প্রীতি বলেছিলেন, “এই পদমর্যাদা শুধু আমার নয়, প্রতিটি মেয়ের জন্য, যারা স্বপ্ন দেখে সাধারণ জীবনের বাইরে গিয়ে কিছু করার।” অন্যদিকে, প্রীতি বর্তমানে সেনার দায়িত্বের পাশাপাশি আর্মি মার্কসম্যানশিপ ইউনিটে (Army Marksmanship Unit, Mhow) কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যাচ্ছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ১০ ঘণ্টার শুটিং প্র্যাকটিস, ফিটনেস ট্রেনিং, মানসিক কন্ডিশনিং, সব মিলিয়ে জীবন যেন একেবারে সৈনিক-অ্যাথলিটের। পড়াশোনার দিকেও তিনি নজর দিয়েছেন, ইগনুতে (IGNOU) পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রীতির সাফল্যের এই পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। সমাজের অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, এক সাধারণ পরিবারের মেয়ে কি না শুটিং বা সেনায় টিকতে পারবে? কখনও অর্থকষ্ট, কখনও মানসিক চাপ, আবার কখনও শারীরিক ক্লান্তি সব কিছুই ছিল তাঁর যাত্রার অংশ। কিন্তু প্রীতি বারবার প্রমাণ করেছেন, লক্ষ্য ঠিক থাকলে বাধা কখনও আসলেই অদম্য নয়।
ভারতীয় সেনায় বর্তমানে মহিলা সদস্য সংখ্যা মাত্র ৩-৪ শতাংশ। সেখানে প্রীতির মতো একজন তরুণীর সুবেদার পদে উন্নীত হওয়া নিঃসন্দেহে অন্য মেয়েদের অনুপ্রেরণা দেবে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদোন্নতি শুধু প্রতীকী নয়, বরং সেনাবাহিনীতে নারীর অন্তর্ভুক্তির নতুন যুগের সূচনা। একই সঙ্গে খেলাধুলায় মহিলাদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতিও ভারতের আন্তর্জাতিক সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।
প্রীতি রজকের গল্প তাই একাধারে সংগ্রামের, সাফল্যের এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির। ইটার্সির ধুলোবালি থেকে শুরু করে এশিয়ার মঞ্চ, আর আজ ভারতীয় সেনার সুবেদারের পদ—সবই যেন প্রমাণ করে দেয়, বড় হতে চাইলে কোনও সীমান্ত নেই। তাঁর লক্ষ্য এখন আরও উঁচু, লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকস ২০২৮-এ পদক জয় আর সেনাবাহিনীতে আরও নেতৃত্বের দায়িত্ব নেওয়া। প্রীতির ভাষায়, “সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা আমার নিশানাকে ধারালো করে, আর শুটিং রেঞ্জ আমাকে শেখায় নেতৃত্ব কীভাবে দিতে হয়।”
সব ছবি : সংগৃহীত



