তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : পঞ্চম বর্ষে ব্রাসেলসের দুর্গাপুজো শরতের হিমেল হাওয়া আর সাদা মেঘের ফাঁকে উৎসবের ডাক এবার পৌঁছে গেল সুদূর ইউরোপেও। কলকাতা থেকে হাজার মাইল দূরে বেলজিয়ামের (Belgium) রাজধানী ব্রাসেলসে (Brussels) প্রবাসী বাঙালিরা মাতছেন দুর্গাপুজোর (Durga Puja) আনন্দে। পঞ্চম বর্ষে পা দিল ‘তেরো পার্বণ’ (Tero Parbon) -এর আয়োজন, যেখানে দেবী দুর্গাr পূজা হচ্ছে নারী-পুরুষ উভয়ের পৌরোহিত্যে। বর্ণ বা লিঙ্গভেদ নয়, এখানে সকলেই সমানভাবে পূজার দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন। স্থানীয় বাঙালি কমিউনিটির সদস্য সুমনা দে মল্লিক জানান, “বিদেশে থেকেও আমরা চাই আমাদের সন্তানদের সামনে সেই আসল দুর্গাপুজোর রীতি-নীতি তুলে ধরতে। তাই শারদীয়া উৎসবের প্রতিটি দিন আমরা নিয়ম মেনে উদযাপন করি।”

প্রবাসে দুর্গাপুজো মানে সাধারণত সপ্তাহান্তে সামঞ্জস্য রেখে আয়োজন। তবে ব্রাসেলসের এই মণ্ডপে তেমন নয়। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত প্রতিটি রীতি নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়। ভোগ-আরতি থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সবেতেই থাকে বাংলার ছোঁয়া। এই পূজোর অন্যতম আকর্ষণ হল প্রতিমা। প্রখ্যাত মৃৎশিল্পী সনাতন পাল (Sanatan Pal) -এর হাতের তৈরি প্রতিমা প্রতিবছরই দর্শকদের নজর কাড়ে। প্রায় নয় ফুট উচ্চতার এই প্রতিমা ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ দুর্গাপ্রতিমা হিসেবে খ্যাত। পূজার এক সদস্য জানালেন, “আমাদের কাছে এই প্রতিমা শুধু শৈল্পিক নিদর্শন নয়, প্রবাস জীবনে শিকড়ের টানও।”
পঞ্চম বর্ষে এই পুজোকে ঘিরে এবার বাড়তি উচ্ছ্বাস। কলকাতা থেকে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জনপ্রিয় ব্যান্ড ক্যাকটাস (Cactus)। তাঁদের সঙ্গীত ভরিয়ে তুলবে বেলজিয়ামের মণ্ডপের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। ইতিমধ্যেই মণ্ডপসজ্জায় বাংলা ব্যান্ডের স্মৃতি ও আবেগ যুক্ত হয়েছে। পুজোর সাংস্কৃতিক কর্মসূচী নিয়েও উৎসাহ তুঙ্গে। নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক সব মিলিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির বহর তুলে ধরা হবে। আয়োজকদের মতে, প্রবাসে থেকেও বাংলার সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছে দেওয়াই এই পূজোর অন্যতম উদ্দেশ্য।
তবে দুর্গাপুজোর আসল প্রাণ হল ভোগ আর খাবার। প্রতিদিন সকালে মহিলারা মেতে ওঠেন রান্নার প্রস্তুতিতে। ফুলকো লুচি, খিচুড়ি, ল্যাবড়া, চাটনি থেকে শুরু করে ফুচকা, চপ, মোমো সবকিছুই পাওয়া যাবে মেনুতে। এক আয়োজক হেসে বললেন, “বিদেশে থেকেও বাঙালির পেটপুজো কমতে পারে না। পুজো মানেই খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা আর আনন্দ।” উল্লেখ্য যে, চার দিনের এই উৎসব প্রবাসী বাঙালির কাছে একেবারে পুনর্মিলনের আবেগ। বছরের অন্য সময়ে কাজের ব্যস্ততায় হয়তো দেখা হয় না সবার সঙ্গে, কিন্তু পুজোই হয়ে ওঠে একত্রীকরণের মঞ্চ। ছোট থেকে বড়, সবাই মেতে ওঠে দুর্গাপুজোর আনন্দে।
প্রবাস জীবনে এই আয়োজন শুধু আনন্দের নয়, একধরনের দায়বদ্ধতারও উদাহরণ। কলকাতা এবং পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর যে অভ্যেস, তার কিছুটা হলেও এখানে অনুভব করতে চান ভক্তরা। তাই প্রতিটি সজ্জা, প্রতিটি আয়োজনের পেছনে রয়েছে অনেক যত্ন এবং শ্রম। অন্যদিকে, ইউরোপে দুর্গাপুজো মানে শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি হয়ে উঠছে সাংস্কৃতিক বিনিময়েরও একটি বড় মঞ্চ। স্থানীয় ইউরোপীয়রাও এই পূজায় যোগ দিয়ে বাঙালি ঐতিহ্যের স্বাদ পান। “আমরা চাই আমাদের সংস্কৃতিকে স্থানীয়দের কাছেও তুলে ধরতে, যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন বাংলার আসল উৎসব মানে কী,” বলেন এক আয়োজক। অতএব, পঞ্চম বর্ষে পৌঁছে ব্রাসেলসের এই দুর্গাপুজো প্রমাণ করল, দূরত্ব যতই থাকুক না কেন, বাঙালির উৎসব বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে থাকে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একসঙ্গে দেবী পূজা করার এই বিশেষ দৃষ্টান্ত বাঙালিয়ানার প্রকৃত পরিচয় বহন করছে। আর সেই সঙ্গেই প্রবাসে থেকেও প্রাণভরে উৎসবের আবেগ ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিটি বাঙালি পরিবার।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন :



