Sasraya News, Sundays Literature Special | Issue 80 | 14th September 2025, Sunday | সাশ্রয় নিউজ, রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল। সংখ্যা ৮০। ১৪ জুলাই ২০২৫। রবিবার

SHARE:

🍂মহামিলনের কথা

ওঙ্কার মঠ
২৪ /৯ /৬৩
রাত্রি ১২ টার পর

ঠাকুরের আশীর্বাদ, বাবা— প্রিয়তম, পুস্তকের তাড়া নাই। ভাগবত ভাল লাগছে, ভাগবতই পড়।
মানসিক কামনা, মানসিক চিন্তায় ক্ষয় করতে হয়। যেমন হাতী চাপবো, মানসে উত্তম সুসজ্জিত হাতী কল্পনা করে, তাতে গুরুদেবকে বসিয়ে, হারমোনিয়াম বাজিয়ে নাম করতে করতে কলিকাতা শহর ভ্রমন করা হল এবং পল্লীগ্রাম হাতী চড়ে গুরুদেবকে নিয়ে ঘুরতে লাগলাম, যদি প্রয়োজন বোধ করিস, তাহলে সেবাকে গোবিন্দকে সঙ্গে নিবি, ব্যাস এতেই হাতী চাপার সাধনা হবে।

শ্রীশ্রী ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

এরোপ্লেন চেপে বোম্বাই, চীন, জাপান, ইংল্যান্ড, আমেরিকা ভ্রমন করবো। গুরুদেব সঙ্গে আছেন। এরোপ্লেন এ চেপে তাঁর সঙ্গে নাম করতে করতে দেশ ভ্রমন করছি। ব্যাস কামনা লয় হয়ে যাবে।
রাজভোগ খাবো — উত্তম কথা, প্রচুর রাজভোগের ব্যবস্থা করা হলো। ঠাকুরের ভোগ দেওয়ার পর, সারবন্দি একশত আট ব্রাহ্মণ বসলেন, আমি তাদের নাম শোনাতে লাগলাম, তাঁরা ভোজন করতে লাগলেন। তাঁদের আহারান্তে ৫০০ নরনারায়ণ সার দিয়ে বসিয়ে দিয়ে, নিজহস্তে পরিবেশন করে তাদের উদর পূর্ণ করে খাওয়ালাম, পরে হাত পা ধুয়ে নিজে প্রসাদ গ্রহণ করলাম। এ রাজভোগ খাওয়া মহা সাধনা হবে।
স্ত্রী সঙ্গ যদি প্রবল হয় বিবাহ করা উচিৎ, নচেৎ মানসে বিবাহ করলাম, এই কড়ারে; যে আমরা উভয়ে ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বনে ভগবৎ সেবা করবো। মানসে সেই পত্নীকে নিয়ে ইষ্ট সেবা, গুরু সেবা করতে লাগলি। এতে সাধনাই হবে। ছোট বড় যখন যে কামনা উঠবে তখনই শ্রীগুরবে নমঃ বলে শ্রীগুরুদেবের পূজা করিস। কামনা উঠলেই “গুরবে নমঃ”।
গোবিন্দকে জানিয়ে দে— অমুকের টাকা এলে যেন ফেরত দেয়। তাকে খামে লিখবে, বাবা জানিয়েছেন ভাতৃ বধূর সংস্রব ত্যাগ করে প্রয়শ্চিত্ত করেছে জানালে, টাকা গ্রহণ করা হবে। “পন্ডিতের কাছে আপনার পাপ ব্যক্ত করে, তাদের ব্যবস্থা মত প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।”
হয় কি, মানুষ তো এক জন্মের কর্মে চলে না, জন্ম জন্মান্ততের আকর্ষণে উত্থান পতন হয়। যে দুশ্চচরিত্র হবে জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গে হাতে কপালে এবং কোষ্ঠীতে লেখা হয়ে যাবে। কার দোষ দিব, জন্মান্তরের কর্মফল।
সন্মানীয় ব্যক্তির সন্মান রক্ষা করা উচিত। তাদের জন্য ভাজাভুজি ডাল তরকারি খাওয়ান। অতিথি নারায়ণের সেবার যশই হবে।
তোর সংস্কার ও তার সংস্কার স্বতন্ত্র। তুই ভজন সাধন নিয়ে থাক। সেবা করছে আমার ইষ্ট দেবতা। এইভাবে লীলা করছেন মনে করে চিত্ত শান্ত রাখতে চেষ্টা কর। সব তুমি বলে প্রণাম কর। সব মঙ্গল।
ব্যাপার হল কারও কোন বিষয় কটাক্ষ এলেই, আমি ভাল বুদ্ধিমান এইভাব জাগবে। কিছু মনে করিস না। গুরুদেবের কৃপায়, সীতারাম যে স্তরে আছে, তাতে দোষ দৃষ্টি নাই, সব মঙ্গল, সব আমার ঠাকুরের লীলা, এইভাবে চিত্ত শান্ত কর। উপস্থিত সীতারাম উদাসীন, যা হচ্ছে সব ভালোই, এইভাবে অনুমোদন করে, তার গুরুদেব তাঁর ছেলেদের রক্ষা করছেন। ব্যাস শান্তি।
—-সীতারাম।

🍁ঋণ : শ্রীশ্রীঠাকুরের পত্র। Ref : চিঠিপত্রে সীতারাম ⊕ সংকলক | কিঙ্কর ধীরানন্দ জী

 

 

পুজো সংখ্যার জন্য লেখা আহবান 👉 সাশ্রয় নিউজ-এর পুজো সংখ্যার লেখা নেওয়া শুরু হয়েছে। মহালয়ার আগেই আপনার গল্প, কবিতা (একাধিক), প্রবন্ধ, উপন্যাস, ফিচার পাঠাতে পারেন। মনোনীত লেখাগুলি সাশ্রয় নিউজ-এর পুজো সংখ্যায় প্রকাশিত হবে। মনে রাখবেন, পূর্ব প্রকাশিত লেখা (এমনকী সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রিন্ট মিডিয়া, ডিজিটাল মিডিয়ায় প্রকাশিত লেখা) পাঠাবেন না। ই-মেল : editor.sasrayanews@gmail.com ই-মেল সাবজেক্টে ‘পুজোর লেখা’ কথাটি উল্লেখ করে দিলে ভাল হয়। 

 

 

 

🍂ছোল্প 
দোষ ঠিক সুহাগীর লয়, আমারও লয়। বয়েসের। তখন কাচা বয়েস। সুহাগীকে দেইখ্যে কি যে হইল, হুইদক্যে উইঠল মন। জাইনতম সত্যি বইল্লে বিয়াট হবেক নাই। তাই মিথ্যাই বইল্লম– রেলের চাইকরা বটি। অফিসে কাম করি। সুহাগীর কনহ দুখখু থাইকবেক নাই। কথাটা বোধ হয় সহজেই বিশ্বাস করেছিল সোহাগির বাবা মা এমনকি সে নিজেও। ফলে তলিয়ে দেখার বাসনা হয়নি। বাবু পরামানিক মনের হাওয়ায় সাঁতরাতে থাকে এই ভাবনা।

 

সোহাগী ন্না

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়

বারবার ফিরে আসছে গন্ধটা। নাকমুখ চাপা দিলেও সুয়াস্তি নেই। চারপাশে নর্দমার বাহিত জল। সামনেই ভাগাড় এবং মোদিজির স্বচ্ছ ভারতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এদিক ওদিক যথেচ্ছ প্রাতঃক্রিয়া। এ শহর একদিন সুন্দরভাবে গড়ে উঠবে। শিল্প কারখানার চরাচরে দু’মুঠো ভাতের অভাব থাকবে না। মানুষ কাজ পাবে। পেটের ধান্ধায় আর পুব খাটতে যেতে হবেনা। কথাগুলো বাতাসে উড়ে উইপোকার পারা। কিন্তু কোথায় কী? থমকে গেছে সবকিছু। আধ খেঁচড়া অবস্থায় পড়ে আছে বালাজি ইস্পাত। কারখানার সীমানা প্রাচীরে পেচ্ছাপের দুর্গন্ধ। শ্যাম স্টিল থেকে ল খুলে নিয়ে গেছে কেউ … অনেকদিন নির্বিকার পড়ে থেকে মুছে যাচ্ছে তার সাইনবোর্ড। সামনে কিছু ছাগল চরছে। পচা গন্ধটা ফিরে আসছে বারবার। তবু গড়ে উঠছে শহরটা। একটু একটু করে প্রতিদিন। স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে বলেই মানুষ বেঁচে থাকে এবং জমির দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। নামেই মিউনিসিপিপ্যাল। আসলে গঞ্জ। শিল্পশহর হয়ে ওঠার স্বপ্নে মশগুল এই মানচিত্রে দিনদুপুরে কোথাও ডেকে ওঠে বিপন্ন শেয়াল।
পুকুরপাড়ের এই এক ছটাক জমি অনেক ঝক্কি ঝামেলা করে পেয়েছে সোহাগী দিদিমনি। দিদিমনি মানে আসলে আই সি ডি এস কর্মী। আর জমিটাও ভেস্টেড। পার্টির লোকজন ওকে দিয়েছে। নইলে এই মাগ্যিগণ্ডার দুনিয়ায় রঘুনাথপুর শিল্পতালুকে মাথা গোঁজার জায়গা সে পেত না। এর জন্য কম হুজ্জতি করতে হয়নি। একে ধরো তাকে ধরো। মিটিং-এ যাও। মিছিলে যাও। লোভ অনেকেরই ছিল তারা এখন ত্যারচা চোখে তাকায়।

লোকটা কি কাঁদছে? নিশব্দে ঝরে পড়ছে পাপজল। অনুশোচনার শান্তিবারি। বাবু তাকিয়ে থাকে লোকটার দিকে। ফেলে আসা দশটা বছরের জন্য বিশ মাইল দূর থেকে আজ কেন ছুটে এসেছে লোকটা।
কি দরকার তার সঙে? হঠাট আইজই কি এমন দরকার পইড়ল? একবার কথা বইলতম, মাত্র একবার বুঝাই বইলতম নিজের ভুল। দোষ আর গুনেই ত মানুষ ন কি? আর ফিরিয়ে নিয়ে যেতাম নিজের ঘরে। সুন্দর একটা বাগানের সখ ছিল উয়ার। এখন ত সত্যিই একট অফিসে কাজ কোরি, হোক না পেরাইভেত। উয়ার কথা ভাইবেই অল্প অল্প টাকা জমাই নিজে না খাইয়ে ঘরট কইরেছি।

বাড়িটা বানাচ্ছে বাবু পরামানিক। ঠিকাদার কাম মিস্ত্রী। সোহাগী একা মেয়েছেলে। কতদিক সামলাবে সে। তুতাই-এর ক্লাস ফাইভ হয়ে গেল এর মধ্যে। পড়ার চাপ বাড়ছে। বাড়ি বলতে সেরকম আহামরি কিছু নয়। কোনও রকমে মাথা গুঁজে থাকার মত একটা আশ্রয়। উপরে এসবেস্টসের ছাদ। এর বেশি কি আর চাই!
কাজ মন্দ করছে না বাবু। ছেলেটার দরদ আছে। আন্তরিকতাও। উদয়াস্ত খাটতে পারে। ‘অল্প পয়সায় সুন্দর ঘর বেনাই দিব অ দিদি। ছিমছাম ফুলবাগান… কত কিসিমের ফুল ফুইটবেক। মহকে মহকে ভইরে যাবেক চাইরপাশ। তখন ইসব বদগন্ধ সামনে হাবুড়তে লাইরবেক …।’ সাহস দেয় সোহাগীকে। সোহাগী এই ত্রিসীমানায় আসেনা। বিশ্রী গন্ধে ওর বমি পায়। বাবুই সামলায় সবকিছু। রড সিমেন্ট থেকে লেবার প্রব্লেম।

আধভাঙা চোয়াল। ছন্নছাড়া চুলের গা বেয়ে খড় চুয়ানো জলের মতন ঘাম। গা-ময় ঘামাচি ভিজে সুটরু। উৎকণ্ঠা জেগে আছে। লোকটাকে চেনা চেনা মনে হল না বাবুর। কোথাও দেখেছে কি ভাবতে গিয়ে গুগলি খোঁজার মত তোলপাড় করে স্মৃতি। হদিস পায়না এই মুখের। অনেকেই কাজ কামের ধান্ধায় আসে। ডেলি লেবারের খুব কদর এদিকে। লোকটাকে সেরকমই মনে হল।
সুহাগি দাসের বাড়ি টা চিনেন?
প্রশ্ন নয় আকুতি। লোকটার দিকে ঘুরে তাকাল বাবু। কাঁধে ছেঁড়া ব্যাগ। ফিতে ছিঁড়ে যাওয়া চপ্পলে সেফটিপিনের আদর যত্ন। গেঞ্জিতে দুচার জায়গায় পানের পিক। পোড়া বিড়ি জ্বলছে ঠোঁটে। অনেকদূর থেকে হেঁটে আসা সাকিন বিহীন মানুষের মত লাগছিল তার ঝিমিয়ে পড়া চাহনি।
–চিনি। বেশ ভাল কইরেই চিনি। বলতে গিয়েও থমকাল বাবু। এরকম একজন দিক ভুলা মানুষের সঙ্গে কী সম্পর্ক থাকতে পারে সোহাগীর মত একজন ভদ্রমহিলার। বিবাহবিচ্ছিনা মহিলাদের নিয়ে আজকাল অনেক কিছু শোনা যায়… লোকটা মেয়ে ফুসলানো গোছের নয় তো ভাবতে গিয়েও হোঁচট খেল।
–আপনি?
–আমি মানে, তোতলাচ্ছে লোকটা।
–তার সঙ্গে কী দরকার?
–বিশ মাইল রাস্তা। এক বান্ডিল বিড়ির পথ। পায়ে হাইট্যে…।
–তো? বাবু তাকাল আবার। উন্মাদের মত অসংলগ্ন কথাগুলো গাঁথার চেষ্টা করছে সে। একটা পাখি উড়ছে আকাশে। ১১ কেভি হাই ভোল্টেজ লাইনে কাক বসে আছে। তৈরি হচ্ছে দু’কামরার বাড়িটা। এটা একদিন ঘর হয়ে উঠবে। দুপুরের তীব্র আলোয় খড় কুটোর সন্ধানী পাখিগুলি আশ্রয় বুনছে যত্নে, মমতায়।
–খু উউউ ব দরকার তার সাথে। খুব কথাটায় আকুতি টের পেল বাবু। যেন প্রাণের ভেতর থেকে সটান বেরিয়ে এসেছে।
–এখন তো বাড়ি নাই।
–বাড়ি নাই?
–না।
–আবার ঘুইরে যাইতে হবেক পুরা পথ।
–কি দরকার জাইনতে পারি। অবিশ্যি যদি পেরাইভেট বেপার হয়।
–হামদের আবার পেরাইভেট।রাস্তা থাইক্যে ভাতের হাড়ি টাই দেখা যায়। কনহ আব্রু নাই ঘরদুয়ারের।লোকটা হাসছে। পোকা খাওয়া দাঁতের ফাকে লুকিয়ে আছে বেদনা। যেন তা আড়াল করার চেষ্টা করছে ঠোঁটে ঝুলে থাকা হাসিটা। মেঠো মানুষের আবার আড়াল আবডাল –আমি সুহাগির মরদ। ঘনশ্যাম। বিশ্বাস হইছে নাই ত কথাট। ইট আপনার দোষ লয় আইজ্ঞা। আকাশের চান্দে আর মিনি বাঁদরের…। কিন্তুক এমনটা হইয়ে যায়। কুথায় যে লইটকে যায় কার মন। বলা মুশকিল।
এই ছোটলোক মার্কা অখাদ্য লোকটা সুগাগির বর। এবার হড়বড় করে বেরিয়ে আসছে অতীত। যতদূর সম্ভব একবছরের বেশি স্থায়ী হয়নি ওদের দাম্পত্য। হওয়া সম্ভব ছিলনা। সুহাগি সুন্দরী, শিক্ষিতা, গানবাজনা জানে। তার সাথে এরকম নেশাখোর টাইপের লোকের দীর্ঘ সহাবস্থান কি সম্ভব? তবু বিয়েটা যে কি করে হয়েছিল আবার বছর না ঘুরতে তুতাই। পাড়া পড়শিদের কাছে শোনা কথাগুলো কানে বাজতে থাকে বাবু পরামানিকের।
দোষ ঠিক সুহাগীর লয়, আমারও লয়। বয়েসের। তখন কাচা বয়েস। সুহাগীকে দেইখ্যে কি যে হইল, হুইদক্যে উইঠল মন। জাইনতম সত্যি বইল্লে বিয়াট হবেক নাই। তাই মিথ্যাই বইল্লম– রেলের চাইকরা বটি। অফিসে কাম করি। সুহাগীর কনহ দুখখু থাইকবেক নাই।
কথাটা বোধ হয় সহজেই বিশ্বাস করেছিল সোহাগির বাবা মা এমনকি সে নিজেও। ফলে তলিয়ে দেখার বাসনা হয়নি। বাবু পরামানিক মনের হাওয়ায় সাঁতরাতে থাকে এই ভাবনা।
তারপর।
ভাইবেছিলঅম একদিন সব ঠিক হইয়ে যাবেক। ছিলাপিলা হইলে ভুইলে যাবেক ইসব বিত্তান্ত।
কিন্তু হইল নাই আইজ্ঞা, সব ছিচ্ছাতুর হইয়ে গেল। এরপর লোকটা যা বলল তা এরকম –

দিন দিন কেমন যেন হয়ে যেতে থাকে সোহাগী। ব্যবহারে রুক্ষতা প্রকাশ পায়। একটা জন্তুর মত মনে করে স্বামীকে। ফলে কেবল উপেক্ষা আর অবজ্ঞা ছাড়া আর কিছুই পায়না ঘনশ্যাম। খিটির মিটির অশান্তি হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ঘটনা। সুহাগীর কথার ঝাঁজে বিষ মাখা তীর। ঘনশ্যাম এক কান দিয়ে শোনে অন্য কানে বের করে দেয়। মেয়ে মানুষের কথা অত আঁতে মাখলে চলে না। ঘরে অশান্তি, মন শান্তি খুজল বাইরে। এর ফলে বদপাল্লায় পড়ে মদের নেশায় ধরে। এভাবেই হয় তো চলত। কিন্তু সোহাগি অন্য ধাতের মেয়ে মানুষ। একদিন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল, আমার জীবনটা ত গেল। যাক। কিন্তুক বাচ্চাটার জীবন বরবাদ হইত্যে নাই দিব।
কি কইরবে তুমি ?
ই খেনে থাইকলে মদমাতাল আর মিথ্যাবাদী জুয়াখোর হবেক। আমি লিজের রাস্তা লিজে খুঁজে লিব তুমি তুমার মতন থাক।
দশ বছর হয়ে গেল। ফিরে যায়নি সোহাগী।
প্রথম প্রথম ভাইবেছিলাম আবার একটা বিহা করি। কিন্তুক দিন যত গেছে মনট উয়ার লাইগেই আঁটুপাটু কইরেছে। ভুইলতে লারছি কনহ মতেই।

লোকটা কি কাঁদছে? নিশব্দে ঝরে পড়ছে পাপজল। অনুশোচনার শান্তিবারি। বাবু তাকিয়ে থাকে লোকটার দিকে। ফেলে আসা দশটা বছরের জন্য বিশ মাইল দূর থেকে আজ কেন ছুটে এসেছে লোকটা।
কি দরকার তার সঙে? হঠাট আইজই কি এমন দরকার পইড়ল?
একবার কথা বইলতম, মাত্র একবার বুঝাই বইলতম নিজের ভুল। দোষ আর গুনেই ত মানুষ ন কি? আর ফিরিয়ে নিয়ে যেতাম নিজের ঘরে। সুন্দর একটা বাগানের সখ ছিল উয়ার। এখন ত সত্যিই একট অফিসে কাজ কোরি, হোক না পেরাইভেত। উয়ার কথা ভাইবেই অল্প অল্প টাকা জমাই নিজে না খাইয়ে ঘরট কইরেছি।
চমকে উঠে বাবু। সে দেখতে পায় রাস্তায় নেমে আসছে নরম আর আর্দ্র জলের ধারা। হয়তো বৃষ্টি নয়। কিন্তু কি অদ্ভুত শীতল।
দেখা ত আর হইল নাই। আজ আসি আইজ্ঞা। যদি দেখা হয় আমার কথা বইলবেন। ঘনশ্যাম , বৈরাগী ডাঙ্গার ঘনশ্যাম বইলবেন। ঠিক বুইঝতে পাইরবেক।
রাস্তায় নেমে গেল লোকটা। এখন আর ফোর টুয়েন্টি মনে হচ্ছেনা। কেমন ক্লান্ত বিধ্বস্ত মুখে দুখ চিহ্ন জেগে আছে। আস্তে আস্তে বিন্দুর মত মিলিয়ে যাচ্ছে লোকটা– বাবু দেখল।
যদিও সোহাগীর আসার কথা নয় তবু সে বিকেলে এল একবার। বাড়িটা কতদূর হল এটা দেখার চেয়েও আজ আসলে তার হাতে অফুরন্ত সময়। ঘুরে ঘুরে এপার থেকে ওপার অনেকক্ষণ দেখল। পচা গন্ধটা অনেকটাই মলিন হয়ে এসেছে। কোন অসুবিধে হচ্ছেনা শ্বাস নিতে। তবু নাকে অভ্যাস বশত রুমাল চাপা দেওয়া আছে।
বাবুকে ডাকল একবার। বাবু তখনও কাজে মগ্ন। আজ মিস্তিরি আসেনি। তাকেই সামলাতে হচ্ছে সবদিক।
আবার ডাকল– বাবু।
কখন আইলেন?
এই ত।
–কিছু বইলছেন?
ইখেনে একট ইট ছাইড়ল কি কইরে?
কই। এবার নজরে পড়ল ফাটলটা।
–হুম, বেশ বড় সড় ফাঁক।
–এখনই ঠিক কইরে দিছি দিদিমনি। দেখতে দেখতে বাবু ভাবছিল লোকটার কথা কি বলা ঠিক হবে এখন। কিন্তু জিভ ফসকে কথাটা বেরিয়ে গেল আচমকা, ঘনশ্যামদা আইসেছিল আইজ।
কন ঘনশ্যাম ? দশ বছরের অনভ্যাস থেকে প্রশ্নটা বেরিয়ে এল।
বৈরাগী ডাঙার। আপনার সঙ্গে…
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই কঠোর হয়ে এল সোহাগীর চোখ –জোচ্চোর টার সাথে তোর এত পীরিত কিসের?
জোচ্চোর লয় দিদি। লকটা বড় ভাল। বড় দুখি মানুষ।
তুই কি জমির দালালীর সাথে সাথে এসব দালালীও করছিস?
চুপ করে গেল বাবু। দশ ইঞ্চি গর্তটায় মশলা ভর্তি করতে করতে সে বলল, জমির দালাল নয় আমি মিস্ত্রি। প্লাসটার খইসে যাওয়া ঘরের মেরামত ছাড়া আমি ত আর কিছু শিখি নাই দিদি। 🍁

 

 

🍂ধারাবাহি ন্যাস 
আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। কবি তৈমুর খানের জীবন। বাল্য-কৈশোরের দিনগুলি কেমন ভাবে কেটেছিল। মননে চেতনায় কিভাবে বয়ে গেছিল উপলব্ধির স্রোত। কেমন করে প্রকৃতি ও জীবনকে দেখতে শিখেছিলেন। কেমন করে জীবনে এলো ব্যর্থতা। সেসব নিয়েই নানা পর্ব প্রকাশিত হল সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ। আজ ধারাবাহিক উপন্যাসটির শেষ পর্ব পাঠকদের জন্য।

 

একটি বিষণ্ণরাতের তারা


তৈমুর খান

 

বিয়াল্লিশ.

রাত কাটতে লাগলো

প্রায় মাস খানেক অসুস্থ থাকার পর ২০২৩ সালের ২৫শে ডিসেম্বর বাবা চলে গেল আমাদের ছেড়ে। মৃত্যুর মুহূর্তে বাবার মুখ দিয়ে বেশ কিছু কবিতা শুনতে পেয়েছিলাম। তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ বাবা গড় গড় করে বলতে লাগল। বলতে বলতে এক জায়গায় খুব জোর দিয়ে উচ্চারণ করল—
মনে ভাবিলাম, মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্তে,
তাই লিখি দিল বিশ্বনিখিল দু বিঘার পরিবর্তে।
বাবা পৃথিবীর মায়া ছেড়ে বিশ্বনিখিল তুলে দিলেন বিশ্বপিতার হাতে। পিতাহারা পুত্রের অন্তরে কী যে যন্ত্রণা তা বলে বোঝানো যাবে না। কবরের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে বাবাকে শোয়ানো হলো মাটির নিচে। তারপর বাঁশ দিয়ে, খড় দিয়ে তার উপরে কাদামাটি চাপিয়ে উঁচু করে দেওয়া হলো কবর। বাবার চিহ্ন পৃথিবী থেকে বিদায় হয়ে গেল। কিন্তু মনের পৃথিবীতে বাবা আবার জীবিত হয়ে উঠল। বারবার মনে পড়তে লাগল সেইসব কবিগানের আসরের কথা, যেখানে যেখানে বাবার সঙ্গে গিয়ে কোলে বসেই কবিগান শুনতাম। বাবার কোলেই ঘুমিয়ে পড়তাম। সকালবেলায় ফিরতাম বাবার ঘাড়ে চেপে। মা রেগে গিয়ে বাবাকে বলতো, গান শুনে কি পেট ভরে? রাত জেগে যেন রাজ্য জয় করে চলে এল!

শোকবিহ্বল অবস্থার মধ্যেও সেই প্রেমের উপস্থিতি টের পাচ্ছি। বহুমুখের অগ্রভাগেই রুমার মুখ এসে আমার চোখের সামনে ফুটে উঠছে। সেদিন বাসের মধ্যে একসঙ্গে অনেকক্ষণ ছিলাম। সব যাত্রীগুলোই আমাদের কথাবার্তা মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করছিলেন। কেউ কেউ ভেবেছিলেন স্বামী-স্ত্রী। কেউ কেউ ভেবেছিলেন নিজেদের লোক। রুমার সর্বশেষ আকুতি ছিল একটি সর্বশেষ চুম্বন… 

কখনো কখনো বাবা নীরব থাকত, কখনো বলত, যে গান শুনে না সে আবার মানুষ নাকি!
এই কথা শুনে মা ততোধিক রেগে যেত। থালা বাটি যা পেত ছুঁড়ে দিয়ে বলত, আজ গান খেয়ে থাকো, কপালে কোনো খাবার জুটবে না!
সত্যিই কপালে খাবার জুটত না। বাবা একটা কাস্তে অথবা কোদাল নিয়ে বেরিয়ে যেত মাঠে। কোনো ধানের জমির আল কেটে পেতে দিত মাছ ধরা ব্যানা। ছোট ছোট পুঁটি মাছ দুপুর গড়িয়ে ধরে আনত। আর সেইসঙ্গে নিয়ে আসত এক বোঝা সতেজ সবুজ ঘাস। কখনো সেই ঘাস বিক্রি করত দু কেজি খুদ, অথবা দু কেজি গমে। অবেলায় আমাদের উনান জ্বলে উঠত। আমরা উনানের চারিপাশে বসে থাকতাম। বাবা গুনগুন করে গান ধরত—
আমার সুখের বেলা নাইবা এল
দুখে দুখেই কাটুক দিন
সুখ পেয়ে তো সবাই হাসে
দুঃখে হাসা বড় কঠিন…
বাবা দুঃখেই হাসতে পারত। পৃথিবীর সুখ কোনো মহৎ সুখ নয়, পৃথিবীর জীবনও চিরন্তন নয় এসব বাবা জানত বলেই নিজের দুর্ভোগ আর দারিদ্র্যের মধ্যেই এক দার্শনিক চেতনাকে লালন করত। মা বাবার মতো কখনোই নয়। তাই বাবার কোনো কাজই মায়ের পছন্দ হতো না। বাবাকে বোঝার মতো সামর্থ্যও মায়ের ছিল না।
বাবাকে দাফন করে শহরের ঘরটিতে ফিরে এসেই মনটা আরো হু হু করে উঠল। যেদিকে তাকাই বাবার স্মৃতি। বাবাই যেন দাঁড়িয়ে আছে আমার চোখের সামনে। বাবার বইগুলোর কাছে গিয়ে হু-হু করে কাঁদলাম। সেখান থেকে ফিরে এসে চেয়ে দেখলাম আকাশে আজ যত তারা উঠেছে সব তারাগুলোকেই বড় মলিন নিষ্প্রভ মনে হলো। ছাদে গিয়ে একা একা বসে থাকলাম। সারাদিনের ক্লান্তি তবু দুচোখে কোনো ঘুম নেই। এতোটুকু ঢলে পড়ছি না। কত তারা উঠেছে। আকাশে কোনো চাঁদ নেই। চারিদিকে শুনশান অন্ধকার। পৃথিবীতে এত অন্ধকার কেউ কখনো দেখেছে বলে মনে হয় না। আমি চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলাম। আকাশের তারার ভিড়ে কতগুলো নারীর মুখও ঘুরপাক খেতে লাগল। অনেক অনেক নারী। কতগুলো চেনা চেনা মনে হচ্ছে। কতগুলো নাম ভুলে গেছি। তবে চিনতে পারলাম রুমাকে। রুমা সবার আগেই এলোচুল খুলে দাঁড়িয়ে আছে। তার ডান পাশে আমার বাবা। পেছনে সারিবদ্ধ অনেক মেয়ে। না এখন তাদের সঙ্গে আমার পরিচয় করে পেছনের স্মৃতি তুলে আনার সময় নেই। বরং রুমার কথাই বলা যাক।
একদিন বাসে চড়ে স্কুলের পথে রওনা দিয়েছি। বাস ভর্তি মানুষ বাসের আগের দিকে এক চিলতে ছোট্ট জায়গায় কোনোরকম দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। পেছন থেকে কে একজন ডাকছে, বারবার ডাকছে। কে ডাকে? কে?
একজন বাসযাত্রী ইশারায় দেখিয়ে দিল, ওই পেছনের সিটে বসে থাকা একটি মেয়ে।
মাথা উঁচু করে দৃষ্টি ফেলতেই অবাক হয়ে চেয়ে দেখলাম রুমা। কত পরিবর্তন হয়ে গেছে তার! সামনের দাঁত উঠে গেছে। গালেও টোল পড়েছে। মাথার চুলগুলো যদিও পাকেনি তবু যেন এলোমেলো হয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। শরীরের কাপড়টিও অগোছালোভাবে খসে গেছে। ভিড়ের মধ্যে চেঁচানো যাবে না। তাই রুমাই তার সিট ছেড়ে ছুটে এল আমার কাছে ভিড়ের ফাঁকফোকর দিয়ে। এসেই হাতটি ধরে বলল, আজ ভগবানের ইচ্ছে তাই দেখা পেলাম! মনে হচ্ছিল ইহাজন্মে আর দেখা হবে না!
—আমিও তাই ভেবেছিলাম রুমা, কিন্তু একী দশা হয়েছে তোমার! এতটা বৃদ্ধা হয়ে গেছ, আমি তো ভাবতেই পারিনি! আমার সেই প্রথম দেখা প্রথম জীবনের রাজকন্যা তুমি! আর আজ আমি কাকে দেখছি!
—তুমিও তো সেই রাজপুত্তুরটি আর নেই! শরীর ভারী হয়ে গেছে। মাথার চুল উঠে গেছে। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারো না!
—হাঁটুর ব্যথায় কাবু হয়ে গেছি। চলাফেরা করাও মুশকিল। আর চুল তো উঠতে শুরু করেছে বিগত কয়েক বছর ধরেই। তা তুমি কোথায় যাচ্ছ রুমা?
—আমি যাচ্ছি বড়দির বাড়ি। তুমি স্কুল যাচ্ছ বুঝি!
—হ্যাঁ, আমি স্কুলে যাচ্ছি। তোমার ফোন নাম্বারটা দিয়ে দাও ফোনে কথা বলবো।
—একবার নামো, চলো তোমার সঙ্গে কথা আছে?
—কিন্তু নামা কি সম্ভব? এখানে বলা যাবে না!
রুমা তার মুখটি আমার কানের কাছে এনে চুপে চুপে বলতে লাগল, চলো, আমরা পালিয়ে যাই কোথাও অন্তত কিছুদিন এক সঙ্গে কাটাই। তোমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছি বলা হয়নি কিছুই, সব বলতে ইচ্ছে করছে!
আমি বললাম, এই শেষ বয়সে আবার স্বপ্ন কী?
রুমা বলল, স্বপ্ন কি বৃদ্ধ হয় না বৃদ্ধা হয় যে এই বয়সে বলা যাবে না? স্বপ্নের কখনো বয়স বাড়ে না!
কথাটা যে ঠিক তা আমিও অনুভব করলাম। স্বপ্ন থাকে মানুষের মনে। মনের কোনো বয়স নেই। তাই প্রথম জীবনের স্বপ্ন এখনো স্বপ্ন হয়ে আছে। আর এই স্বপ্ন হচ্ছে প্রেমের। শরীর নয়, সমাজ নয়, পরিস্থিতি নয়, আয়ু নয়, প্রেম চিরন্তন। সব কিছুরই মৃত্যু ঘটে, কিন্তু প্রেমের মৃত্যু ঘটে না। তাই পিতার মৃত্যুর শোকবিহ্বল অবস্থার মধ্যেও সেই প্রেমের উপস্থিতি টের পাচ্ছি। বহুমুখের অগ্রভাগেই রুমার মুখ এসে আমার চোখের সামনে ফুটে উঠছে। সেদিন বাসের মধ্যে একসঙ্গে অনেকক্ষণ ছিলাম। সব যাত্রীগুলোই আমাদের কথাবার্তা মনোযোগ সহকারে নিরীক্ষণ করছিলেন। কেউ কেউ ভেবেছিলেন স্বামী-স্ত্রী। কেউ কেউ ভেবেছিলেন নিজেদের লোক। রুমার সর্বশেষ আকুতি ছিল একটি সর্বশেষ চুম্বন, কিন্তু এত লোকসমক্ষে তা সম্ভব হয়নি। তাই সে পরে টেলিফোন করে জানিয়েছিল, সেদিন তুমি বাস থেকে নামলে না। আমি খুব হা-হুতাশ করে ফিরলাম।
জীবনে অর্থ সুখ-সম্পদ কিছুই চাইনি, শুধু চেয়েছিলাম তোমার একটি চুম্বন। যদি কোথাও নিয়ে তোমাকে পালাতে পারতাম এই বয়সে, তাহলে আমার সকল আশা পূরণ হতো। কিন্তু তোমার ভরা সংসার, সন্তানদের পিতা তুমি। একজনের স্বামীও। কত দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে তোমার। আমার শুধু একটাই মেয়ে সে বিয়ে করে চলে গেছে শ্বশুর বাড়ি। আজ আমি একা। তাই আমার শূন্যতা আমাকে গ্রাস করছে। তোমাকে সর্বক্ষণ এখন কাছে পাওয়ার ইচ্ছা করে। ভগবান কেন যে আমাদের ইচ্ছে পূরণ করেনি এর পেছনে কী মঙ্গল আছে তা আমি আজও বুঝি না। যাক তুমি ভালো থেকো। মাঝে মাঝে ফোন দিও। আমার ভালোবাসা রইলো।
আমার যন্ত্রণা বাড়তে লাগল। সমস্ত রাতই নির্ঘুম উন্মাদের মতো ছাদের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুটতে লাগলাম। যত রাত বাড়তে লাগল আকাশের তারাগুলি যেন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, আমরাও কতকাল অপেক্ষা করে আছি, আমাদের কথা কখন বলবে তুমি?
তারাগুলি যে এমন মানুষের মতো এত জীবন্ত, এত স্বয়ংক্রিয়, এত স্মৃতিময়, এত শক্তিশালী অপেক্ষমান তা বুঝতে পারলাম। রাত কাটতে লাগল। কখন ভোর হবে, কখন আলো ফুটবে, আমি আবার কখন স্বাভাবিক হয়ে উঠব তা ভেবেও কূলকিনারা পেলাম না।🍁 (সমাপ্ত)

[বিজ্ঞপ্তি : আগামী রবিবার থেকে রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হবে কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়-এর ধারাবাহিক উপন্যাস। চোখ রাখুন প্রতি রবিবার সাশ্রয় নিউজ-এর পাতায় ] 

 

 

🍂কবিতা 

 

 

প্রণব মুখোপাধ্যায় -এর কবিতা সিরিজ

সবাই ফুটোয় ফিকে হয় না

১.
দাঁতে দাঁত ফোটে রক্ত

বাসস্ট্যান্ডে গিলে খায় ভিখিরি শব্দ
রুটির গন্ধে মরচে ধরা বাতাস
আমরা দাঁড়াই, দাঁড়াই শুধু ক্ষুধার গর্তে


রাত্রির ভাত অর্ধেক পুড়ে গেছে

মশলার গন্ধে লাশের মিছিল
জ্যোৎস্না এখনও বোতলে ভরে বিক্রি হয়
রাস্তার কুকুর আমাদের ঈশ্বর

৩.
পেটের ভেতর সলতে

হাড়ের ভেতর শূন্যতা
সিনেমা হলে হাহাকার বাজে
আমরা তালি দিই, ভিখিরিরা করতালি তোলে


ধুস শ্লা

মুখে ভাত নেই
তবু পোস্টারে মুখ ভরা প্রতিশ্রুতি
হাসির দাঁতগুলো ধারালো ছুরি
ছিঃ ছিঃ ঘেন্না

অন্ধকারে আমরা খাই ভাঙা স্বপ্ন
কাচের পরোটা আর নিজেদের আলুদ্দম


ক্ষুধা আমার নাম

ক্ষুধাই আমার সমুদ্র
আমি রক্ত মেখে লিখি কবিতা
আমি উলঙ্গ হয়ে পাঠ করি কবিতা

রাস্তার ধুলোয় জন্মায় আমার ভাষা

 

 

রেহানা বীথি -এর একটি কবিতা 

মনের অন্তরাল

কেন যে বেরোই!

জানি, রঙ চটে যাওয়া দেয়ালে চোখ ঘষলেই
রঙিন হয়ে ওঠে আমার মন-বারান্দা
সেই বারান্দায় দোল খায় একটি আরাম কেদারা

তবু,  কেন যে বেরোই!

সীমানা প্রাচীরে বটের বনসাই
বোগেনভিলিয়ার ঊর্বশী ঝাড়
হাত বাড়ালেই স্পর্শে শরৎ আকাশ

তবু,  কেন যে বেরোই!

 

 

মাধুসূদন হাজরা -এর দু’টি কবিতা

শরীরের কসাইখানায়

শরীরের কসাইখানায় ভাসছে সেদ্ধ হাড়গোড়
ওয়াক! গন্ধে দম আটকে যায়।

ভাঙা দাঁত উঠে আসে নষ্ট দুধের মতো
ঘেন্নায় ভরে ওঠে আঙুলের নখ,
যোনীপথ জুড়ে এত চাষাবাদ।

যে ঠোঁট ছিল প্রেমের ঘোষক তা লালা-লেপ্টে বাজারি ফ্লেক্স!
শুধু দগ্ধ হবার শব্দ! গলগলিয়ে নামে রক্তের অন্ধকার।

 

 

দহনকাল 

চোখের ভেতর সাপ লুকোনো
আর বুকের দুধে বিষ মিশে আছে

চুমুর ভেতর মরা শামুকের ওঠানামা

রক্তচোষা হাসি, আড়ালে অপবিত্র কারখানা…
প্রেমের নামে কেবল জীর্ণ দেহ
হাড়গিলে শূন্যতায় ঝুলে থাকে
কয়েকশো যুবকের পচা পেনিস

সব বিশ্বাস ডুবে গেছে কলতলার জলা জলে

শুধু ঘেন্না, ঘেন্না, ঘেন্না
মাথার ভেতর চিৎকার তোলে

আমারা কবিতা লিখি না
কাঁধে জাঙিয়া নিয়ে বেশ্যাখানায় যাই
বিষ পান করি

 

 

আলাপন চট্টোপাধ্যায় -এর দু’টি কবিতা

বৃষ্টির জানালা

আচমকা মেঘ নেমে এলো
ছাদের কার্নিশ ছুঁয়ে
বৃষ্টির ফোঁটা যেন
মনের গোপন কথাগুলো লিখে দিল কাচে।

কে তখন জানালার পাশে
চোখে ঘুরছে গভীর সমুদ্র
আর আমি ভিজে যাচ্ছি
অচেনা আলোয়!

হয়ত আমাদের জীবন
এমনই বৃষ্টির মতো

অর্ধেক ফোঁটা জানালায় আটকায়
অর্ধেক ফোঁটা, নিচে গড়িয়ে হারিয়ে যায়…

 

 

আমিনা তাবাসসুম -এর একটি কবিতা 

সমুদ্দুর

যেখানে লুকোনো প্রেম
সেখানে হৃদয় ছুঁয়ে যায় ধূসর রোদ্দুর

যেমন তুমি হাঁটতে থাকলেও
আমি পেরিয়ে যায় বোবা সমুদ্দুর।

 

 

ঘুম ভাঙল 

ঘুম ভেঙে উঠল সকলে
রোদ্দুর পাখি আঁকা নীল দরজা খুলে
দেখা গেল ঘাসের বুকের ওপর
সোনালি কুয়াশা।

বাতাস বাজাল সেতার,
পাখিরা হল সুরের বাহন
একা দাঁড়িয়ে থাকা গাছ
পাতা ঝারাল কিছু

আমাদের জীবনটাও কি
এমন এক ভোর হতে পারত না?
সব শব্দ ভেসে যেত
শুধু রয়ে যেত সুর

স্বপ্নের মতো নরম।

 

 

মলয় কুমার ঘোষ -এর একটি কবিতা

আঙুল 

আঙুলের ছোঁয়ায় শরীর হয়ে জগতের মানচিত্র।
আমি পথ হারাই। ইচ্ছাকৃতভাবে হারাই নিজেকে।
আপনার নাভির ওপর উপুড় হয়ে
কাঁপতে থাকা স্রোতে আমার সমস্ত কামনা মিশে যায়।

এইভাবে আমি অবিরত দোল খেতে খেতে
আমাদের প্রেমের দেহগাথা লিখি
লিখি শুধুই কম্পন, উত্তাপ, এবং নীরব বিস্ফোরণ।

আমাদের চূড়ান্ত সমর্পণ অবিরাম ছায়াপথের গান।

 

 

পরিচয় মিত্র -এর একটি কবিতা 

একটা কিছু প্রবেশ করবে আমার মধ্যে

তুমি যখন জেগে উঠবে
অন্ধকার ভেদ করে হাত রাখবে আমার বুকে
তখন আমি কাঁপব শিহরণে
শিরায় শিরায় জেগে উঠবে নক্ষত্রের উত্তাপ।

তোমার ঠোঁট ছুঁয়ে, প্রবেশ করবে আমার গলদেশ,
আলতো আঁচড় কেটে দেবে দুই বুকের উপর
আমি টের পাবো তোমার নিঃশ্বাসে
সমুদ্রের নোনাধরা কামনার উন্মত্ততা

শরীরের ভেতর ঢেউ তুলবে তোমার আঙুল
চাদর ভিজে যাবে ঘামে
আর আমরা একে অপরকে জড়িয়ে
সময়কে গলিয়ে ফেলব নিজেদের

তোমার উন্মোচিত দেহ হবে মানচিত্র, আমি ভ্রমণ করব তারার মতো
প্রতিটি বাঁকে আবিষ্কার করব…
সে খানে শুধু তুমি আর আমি কামনার আগুনে জ্বলছি

 

শ্বেতা বসু -এর একটি কবিতা

খেলা

জানি, মনে পড়বে খুব
মাঝে মাঝে ঘুম ভেঙে জেগে উঠবে হঠাৎ, তারপর
তোমার ভেতরে তেষ্টা পাবে
কিন্তু এই অব্দি আসার পর আমি
মহাজাগতিক একজন নিঃসঙ্গ
তারার আলোয় ছায়াপথে ভেসে চলা…

ওই সময় তুমি ডাকলেও শোনে না কেউ
আমি আর মাটি নই
আমার প্রতিটি স্পন্দন তখন
সময়ের অতল স্রোতে বিলীন হয়ে গেছে

তবুও
তোমার চোখের ভেতর যদি একফোঁটা জলের ঝিলিক ওঠে
সেই তরঙ্গেই আমি আবার ফিরে আসব
শূন্যতার ভেতর থেকে
তোমার কোলের ভেতর
নরম সকালগুলোর মতো।

মাঝে মাঝে এভাবে পুড়তে হয় বাবু!

 

 

 

🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যা
সাহিত্যিক তাপস রায়।সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।

কিশাণগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়

 

১৬.

টা যে কিশানগঞ্জের কুকুর। মানে কিশানগঞ্জ থেকে তুলে আনা হয়েছে, এমন কোনও প্রমাণ নেই। আর একটা ব্যাপার খটকা লাগছে, এই ‘হেভেন হোকাস-পোকাস’ রিসর্টের মালকিনকে দেখা গেলেও, মালিককে চোখে দেখা যায় না। কেন যায় না! বোঁদে টেলিফোনের লাইন ট্যাপ করে যা শুনেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে মালকিন রোজ একবার কথা বলছে কিশানগঞ্জে একজন পুরুষের সঙ্গে। সেই কথায় শরীর-টরীরের খোঁজ খবর নেওয়া ছাড়া আর কিছুই নেই। তবে ভিডিও কলের রেকর্ডিং যা পাঠিয়েছে, তাতে কেঁপে উঠেছে পঙ্কজ থাপা। এই পাহাড়ের পরিবেশ তো খুব তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যাবে!। ছেলেপিলেরা সব নেশগ্রস্ত হয়ে পড়লে তো গোল্লায় যাবে কালিম্পং। যদি জানাজানি হয় এখানে ট্যুরিস্ট লোকরা আর আসতেও চাইবে না। এখানে স্কুলে আর বাইরের ছেলেরা পড়তে আসবে না। কালিম্পং-এ তাদের সাত পুরুষের বাস। এ তো বড় বিপদ এল! পঙ্কজ জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং -এর মাস্টার্স। নিজের ব্যবসা খুলেছে বলে, নিজের হাতে কাজ করে বলে মনটাকে যন্ত্র করে ফেলতে পারেনি। বোঁদে খবর পেয়ে ফোনে জানাল, ‘বস, কুকুরটাকে দেখা যখন গেছেই, একটা কিছু করতে হবে। দরকার হলে চুরি করে নিয়ে আসব। ওরা যেমন চুরি করেছে, আমরা বাটপারি করব। শোনোই না গুরু, তুমি এক কাজ করো, চলো দু’জনে একবার ওই রিসর্টে ঘুরে আসি।’
‘ওরা আমাকে চেনে। ওদের গাড়ি সারাতে আমার গ্যারেজে আসে। আমি ওদের ওখানে থাকতে যাব!’
‘আরে শোনোই না। তুমি একটু পাগড়ি-টাগরি পড়ে নিও। আর অন লাইনে দু’টো ঘর বুক করবে। আমিও ছদ্মবেশে যাব। তারপর সুযোগ মতো কুকুরটাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ভোর ভোর লাগেজের ভেতর পুরে ধা।’

আপনার ছেলে খুব খারাপ জায়গায় ফেঁসে গেছে। আপনি তো কোনও খবর রাখেন না। আগের পরীক্ষায় সে সব বিষয়ে ফেল করেছে। সে এখন পাহাড়ি মেয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করছে। মেয়েটির বাবা জানলে কুচিয়ে দেবে।

বোঁদে স্বপনকুমারের ডিটেক্টিভ দীপক চ্যাটার্জির ছদ্মবেশের কথা মাথায় রাখে। রতনলালের ছদ্মবেশের কথা মনে পড়ে। এখানে পঙ্কজ থাপাকে দীপক চ্যাটার্জী যে ছদ্মবেশ পরেছিল, তাই পরাবে। আর সে তো মনেপ্রাণে রতনলাল।
‘কী নামে করা যায় বলো তো! আমি তেমনে হিন্দি জানি না।’
‘তুমি বস ইংরেজিটা ভাল জানো। অল্প হিন্দি আর ইংরেজি দিয়ে কাজ চালিয়ে দিতে পারবে। আর দু’দিন দাড়ি না কাটলে চাপ দাড়ি যা হবে তার উপর ফেট্টি বাঁধলে কেউ-ই ধরতে পারবে না। আর এখন শিখদের রেডিমেড পাগড়ি কিনতে পাওয়া যায়। তুমি আলাদা আলাদা সময়ে দু’টো আলাদা সাইবার কাফে থেকে ঘর বুকিং করাও। চলো গুরু, তাড়াতাড়ি করো। আমার কাছে আরো কিছু খবর আছে। সেসব নিয়ে আসছি।’
আজ মাল খায়নি দু’জনের কেউ। দু’টো চিকেন রোল দিয়ে রাতের খাওয়া শেষ করে স্টেশনের চায়ের স্টল থেকে ফ্লাক্স ভর্তি করে চা নিয়ে এসে বসেছে। চানাচুর বিস্কুটও রেখেছে। বোঁদে দেখল, সেই হেলমেটধারী ভিডিও কল করছে। দিলীপও এক সপ্তাহ ধরে আগ্রহে বসেছিল, পরের দিন কী হয়। বেশ গায়ে কাঁটা দেওয়া উত্তেজনার আঁচ লাগছে। এক্সচেঞ্জে রাতের ডিউটিতে অন্য কারোরই থাকার কথা নয়। তবুও দিলীপ দরজা বন্ধ করে নিয়েছে। আর আজকে কম্প্যুটার থেকে একটা কড নিয়ে টিভির ডিসপ্লেতে গুঁজে দিয়েছে। ছবি বড় আর পরিষ্কার।
হেলমেটধারী বলল, ‘এটা তোমার লক্ষ্যে পৌছানোর আগে শেষ একটা ধাপ। এরপরের সপ্তাহেই তোমাকে হেভেনে ডাকা হবে। এই সোমবার, মানে তোমার স্কুলের অফদিনে তুমি পার্মিশন নেবে রিভার র‍্যাফটিং-এর জন্য। তারপর করোনেশন ব্রীজ পেরিয়ে যেখানে র‍্যাফটিং -এর নৌকা রাখা থাকে, সেখানে গিয়ে টাকা পয়সা মিটিয়ে উঠে পড়বে।’
‘না না, আমি র‍্যাফটিং জানি না। আর তিস্তায় ওইখানে অত স্রোতের ভেতর … অসম্ভব ব্যাপার।’ ঋতব্রতর আর্ত গলা।
লোকটা ঠাণ্ডা গলায় বলল, ‘তুমি এর আগে অনেক অসম্ভব কাজ সম্ভব করেছ। রাতের অন্ধকারে বাড়িতে গিয়ে বাবাকে না জানিয়ে টাকা চুরি করে এনেছ। কাগজপত্র চুরি করে এনেছ।’
ঋতব্রত চেঁচায়, ‘না, আমি চোর নই, চুরি করিনি। আমার মা সব জানে। মা-ই টাকা দিয়েছে।’
‘হ্যাঁ, তোমার মা জানত, তবে বাবার জিনিস বাবাকে না বলে আনাটা তো চুরিই। বাবার কাছ থেকে ক’য়েক লক্ষ টাকা তুমি মিথ্যে বলে হাতিয়েছ। তা অন্যায় না!’
‘না অন্যায় না। আমার বাবা কোনও কারণ ছাড়াই আমি চাইলে যত খুশি টাকা দিয়ে দেবে। বাবা আমাকে এতটা ভালবাসে। আর বাবার টাকা ছেলের নেয়া তেমন কোনও গর্হিত কাজ নয়।।’
‘তোমার বাবা দিয়ে দেবে, যে কোনও অংকের টাকা দিয়ে দেবে?’
‘হ্যাঁ, দেবে।’
বোঁদে দেখছে, লোকটা ইচ্ছে করে ঋতব্রতকে রাগিয়ে দিচ্ছে, আর ব্ল্যাকমেল করছে। আরে আগে দু’টো খারাপ কাজ করেছে বলে কি আবার একটা ভুল কাজ করতে হবে! এ তো অদ্ভুত যুক্তি! লোকটার কানের গোড়ায় দু’টো ঝেড়ে দিতে ইচ্ছে করছে।
‘শোনো, তুমি র‍্যাফটিং করতে পারো বা নাই পারো, তোমাকে র‍্যাফটিং-এর নৌকো ভাড়া করতে হবে। করোনেশন ব্রীজের পর তিস্তা নদীতে যেখানে টুরিস্টদের জন্য রাবারেরে নৌকোগুলো থাক, সেখানে যাবে। তোমার সঙ্গে ওদের লোকও থাকবে। তোমার গায়ে যে সেফটি জ্যাকেট লাগানো থাকবে, তার ভেতর থাকবে পাঁচ কোটি টাকার হেরোইন। সড়ক পথে ক’দিন আগেই ধরা পড়ে গেছে আমাদের অনেক টাকা দামের মাল। এখন পাহাড়ে কিছুই আর নেই। ছেলে-মেয়েদের খুবই অসুবিধা হচ্ছে। উইথড্রয়াল সিন্ড্রোম দেখা দিচ্ছে। অসুস্থ্য হয়ে পড়ছে।’
ঋতব্রতর ফ্যাকাশে চোখমুখ। হেলমেটধারী কথা থামায় না। ‘শোনো, এটাই তোমার এই খেলার শেষ ধাপ।
র‍্যাফটিং -এর নৌকো যে পথে যায়, তোমাকে শুধু লক্ষ্য রাখতে হবে পাহাড়ের গায়ে একটা বাঁকে লেখা আছে ‘তিন তিনে চাপা চু’। তার আশে পাশে ঝপ করে নৌকো থেকে জলে পড়ে যাবে। ভয় পাবে না। তোমার গায়ে লাইফ জ্যাকেট আছে। ডুববে না। স্রোতে ভেসে যাওয়া তোমাদের নৌকো ফিরে আসার আগেই আমাদের লোক তোমাকে জল থেকে তুলে লাইফ জ্যাকেট পালটে দিয়ে বনের পথে অদৃশ্য হবে। মাত্র পাঁচ মিনিটের ব্যাপার। তুমি পারবে। তারপর জেনো শর্ত মতো হেভেনে তুমি একদিনের রাজা।’

**

‘হ্যাঁ চক্কোত্তিবাবু। আপনার ছেলেকে আমরা নিজেদের হেপাজতে রেখেছি। খারাপ নেই। ঘাবড়াবেন না। ভাল আছে। খাওয়া-দাওয়া বিলাস-ব্যসন, কোনও অভাব নেই। সুন্দরী মেয়েরা আছে, ওরা ওকে দেখে শুনে রাখছে। তবে ক’য়েকদিন পড়াশুনো করতে পারছে না, এই আর কি! তা আপনার ছেলের পড়া-শুনোর যা হাল হয়েছে আজকাল! আপনি জানেন না বোধ হয়, লাস্ট টেস্টে সব সাবজেক্টে ফেল করেছে।’
লোকটা একবারে আঘাতে-আঘাতে দুর্বল করে ফেলতে চায়। কথা থামায় না। ‘গ্রাহামস স্কুলের কটেজে নেই বলে হয়ত রাতেই সুপারিন্টেন্ডেন্ট-এর ফোন পেতে পারেন। রাত সাড়ে ন’টায় ওদের অ্যাটেনডান্স। ভয় পাবেন
না, ফোন পেলে বলবেন, বাড়িতে এসেছে জরুরি কাজে। এটুকু মিথ্যে না বলতে পারলে ছেলের ভবিষ্যতই যে নষ্ট হবে। স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেবে।’
মালবাবু, এই অজানা ফোনে ঘাবড়ে যাবার সুযোগ পাচ্ছেন না। অফিসে টেবিলে বসে আছেন। অনেক কাজ। ব্যবসায়ীরা মাল ছাড়িয়ে ট্রাকে করে নিয়ে যাবে। চালান রেডি হচ্ছে। তিনি রেলের ডকুমেন্ট মিলিয়ে সেসব ছাড়বেন। অনেক ব্যবসায়ীর তাড়া থাকে। তারা মালবাবুকে টেবিলের তলায় খুশি করেন। সে সব অবশ্য পিওন মারফত হয়।
মালবাবু বললেন, ‘আচ্ছা, ফোনটা একটু ধরে রাখুন, এখানে চেঁচামেচি হচ্ছে, ভাল করে শুনতে পারছি না। আমি ঘরের বাইরে যাচ্ছি।’
‘শুনুন চক্কোত্তিবাবু, আপনার ছেলে খুব খারাপ জায়গায় ফেঁসে গেছে। আপনি তো কোনও খবর রাখেন না। আগের পরীক্ষায় সে সব বিষয়ে ফেল করেছে। সে এখন পাহাড়ি মেয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করছে। মেয়েটির বাবা জানলে কুচিয়ে দেবে। রোজ নিজে হেরোইন এর নেশা শুধু করে না, ক্লাসের সব ছেলেকে তা ধরিয়ে দিয়েছে। মানে ১৮০ জন ছেলেকে ড্রাগ-এর নেশা ধরিয়েছে। পুলিশ জানলে তিন বছরের সশ্রম জেল। আর গার্ডিয়ানরা জানলে মেরে লাশ করে খাদে ফেলে দেবে আপনার ছেলেকে। ওকে বাঁচানোর জন্য আমরা নিজেদের হেপাজতে রেখেছি। তবে বেশি সময় তো রাখতে পারব না। ওর বাঁচা মরা এখন আপনার হাতে।’ 🍁(চলবে)

 

🍂কণাদ্য 

 

 

নীল সমুদ্র তীরে সবুজ দ্বীপটি দেখো৷ খোঁজ করো কবি জীবনানন্দের অনুভব৷ হয়ত পেয়ে যেতে পারো হাজার বছরের পুরোনো কালো প্রেমের সমাহার কিংবা সেই দারুচিনি বনের গহন অন্ধকার!

অমিত পাল -এর একগুচ্ছ কণাগদ্য 

লজ্জাহীন 

এখন লজ্জাবতী গাছেদের সাথে দেখা মেলে না — দুই-একটি ব্যতীত৷ দেখি গাছগুলি নিজেদের সজীবতা হারিয়ে ফেলেছে৷ গাছগুলিকে স্পর্শ করি, দেখি তারা আমায় প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না৷ জড়িয়ে পড়ছে না নিজের লজ্জার চাদরে!

সবুজের গন্ধ একটু লেগে আছে বটে৷ হাওয়া লেগে মাথা দোলায় তারা৷ তবে মনে হয় গাছগুলি নির্জীব!এখনকার মেয়েদের সাথে তাদের সামঞ্জস্য করি৷ পুরোটাই এক হয়ে গেছে৷ মিশে গেছে দুটি আত্মা৷

এখন একবিংশ শতক চলছে৷ গ্রাস করছে লজ্জাহীনতা…

খেয়া তরীর খোঁজে

ময়ূরাক্ষীর জলে বারবার ডুবেছি৷ খুঁজেছি ভেসে যাওয়া মন্দাকিনী স্রোত৷ আকাশ পাতাল লিখেও ফেলেছি৷ শুধু তুমি হাত বাড়াতে বাকি রেখেছো৷ রেখেছো বাকি সহপাঠী হতে…

চাদর মুড়ি ঢেকে থাকা ভিক্ষুকের দলও সঠিক বাস ট্রেনের যাত্রাপথের খবর জানে৷ কিন্তু তুমি নৌকায় বসিয়ে মাঝপথে দাঁড়হীন করলে৷ সামুদ্রিক চিবুক থেকে বাঁচতে হয়ত আমি পরে ফেলেছি ওয়াটার কোর্ট৷ নিয়েছি মুখে একদম্ভ অক্সিজেন৷ তবে তরীর খোঁজ এখনো চলছে…

 

চাই, আরও চাই

তিতির পাখির ডাক শুনেছ কখনো! কিংবা রাজ হাঁসের অট্টহাসি৷ গাফিলতি ভরা গাছেদের চামড়ায় পিপীলিকারা সহবাস করে৷ তবুও কাঠঠোকরার মনে বিষাদের আকাশ কাটে না৷ সে চাই আরও…

নরখাদক বলে একটা জন্তুর নাম-ডাক শুনেছিলাম৷ আজও তার ডাক শুনি৷ ব্যাঙ্গ ভরা হাসি দিয়ে নিজেকে বাণবিদ্ধ করি৷ আমরাও তো রাক্ষসের উত্তরসূরি৷

চাই, আরও চাই৷ সব চাই৷ শেষ জীবনের যতটুকু রস সব কিছুর মজা লুটব৷ অল্পে আমরা সন্তুষ্ট নই৷ আবার বেশি পেলেও আরও বেশি কিছু খুঁজি৷ বর্তমানকে বারবার কটাক্ষ করি৷ শুধু বাস্তব মানতেই ঘুম ওড়ে…

উত্তরাধিকার

বলো অ, বলো আ— এখন এইভাবেই ভাগ্নীকে পড়াতে শুরু করেছি৷ চারুপাঠ বলতে তেমন কিছু নাই৷ শুধু ভেবে ভেবে আমার ছোটোবেলার স্মৃতি আওড়াচ্ছি৷ জানিনা কতটা গভীরে নামলাম!

একটু বদমায়েশি ছিল৷ ভেসে উঠল আমার স্মৃতিতে সেই দূরন্তপনা৷ চাঞ্চল্যতা৷ কতটা দুষ্টু ছিলাম আমি৷ এখন ভাগ্নীকে শাসন করতে পারি না৷ তবে ভাগ্নীর দূরন্তপনা একটু বেশিই, যা ছোট-খাটো শাসনকেও অগ্রাহ্য করে৷ ভেসে আসে প্রতিধ্বনি…! চাদর মোড়া দিয়ে বয়সের দৌরাত্ম্যকে আটক করে ফেলেছি৷ ছোটোবেলার বদমায়েশি গুলো বেঁচে আছে উত্তরাধিকার সূত্রে…

দারুচিনির গহন অন্ধকার

নীল সমুদ্র তীরে সবুজ দ্বীপটি দেখো৷ খোঁজ করো কবি জীবনানন্দের অনুভব৷ হয়ত পেয়ে যেতে পারো হাজার বছরের পুরোনো কালো প্রেমের সমাহার কিংবা সেই দারুচিনি বনের গহন অন্ধকার!

দারুচিনির গহন অন্ধকারে এখন আর শুখনো রসের গন্ধ পাবে না৷ মেকি মেকি আবেগ একে গ্রাস করেছে কামগন্ধে৷ নীল সমুদ্র কেমন যেন প্লাস্টিক খেয়ে ফেলেছে৷ তবে মাধুর্য্যতা তুমি খুঁজতে পারো৷ পারলে মিশিয়ে ফেলো নিজেকে জীবনানন্দের অনুভূতির সঙ্গে৷ এবার তুমি কল্পনা গুলির সামঞস্য রেখে হাঁটতে থাকো হাজার বছরের পথ…🍁

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার, কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার, অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী কোনও সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

ঋণ: মহামিলনের কথা আন্তর্জাল থেকে সঙ্কলিত। 

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন