শর্মিষ্ঠা সাহা মৈত্র ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : বলিউড ও দক্ষিণী চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রির মধ্যেকার পুরনো লড়াই ফের নতুন করে জেগে উঠল দীপিকা পাড়ুকোন (Deepika Padukone)-এর আট ঘণ্টার কাজের শিফটের দাবিকে কেন্দ্র করে। এই দাবির পর বহু বিতর্ক, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ও পক্ষ-বিপক্ষের আলোচনায় উত্তাল হয়েছে সিনেমা মহল। কেউ দীপিকার পাশে দাঁড়িয়েছেন, কেউ বা তাঁকে ঠাট্টা করে পেশাদারিত্বের অভাবের তির ছুঁড়েছেন। তবে এই বিতর্কে এবার নতুন মাত্রা যোগ করলেন বিদ্যা বালান (Vidya Balan)। দীপিকাকে সমর্থন জানালেন ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে থাকল একটি গভীর ব্যক্তিগত উপলব্ধির ছোঁয়া।সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বিদ্যা বালান (Vidya Balan) বলেন, ‘মায়েরা কত ঘণ্টা কাজ করবেন, সেটাই আজ আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। কেউ যদি মা হিসেবে সন্তান ও কাজের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে আট ঘণ্টার বেশি কাজ না করতে চান, সেটা সম্পূর্ণ ন্যায্য দাবি। সদ্য মা হওয়া অভিনেত্রীদের জন্য ফ্লেক্সিবল সময়সীমা থাকা উচিত। সব ইন্ডাস্ট্রিতেই আজ সে ব্যবস্থাই গড়ে উঠছে।’ এই প্রসঙ্গেই তিনি বলেন, ‘আমি মা নই, তাই ১২ ঘণ্টার শিফট করতেও আমার সমস্যা নেই। আমার সিনেমাগুলোর কাজ আট ঘণ্টায় শেষ করা সম্ভব নয়। আমার হাতে সময় আছে বলেই আমি বেশি সময় কাজ করতে পারি।’

উল্লেখ্য যে, বিদ্যার এই কথায় ব্যক্তিগত জীবনের ছায়া স্পষ্ট। ২০১২ সালে প্রযোজক সিদ্ধার্থ রায় কাপুর (Siddharth Roy Kapur)-এর সঙ্গে সাতপাকে বাঁধা পড়লেও এখনও নিঃসন্তান বিদ্যা কখনও এই বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেননি। তাই তাঁর এই মন্তব্য শুধু একটি সমর্থনেরই বিবৃতি নয়, তার মধ্যে আছে এক ধরণের সংবেদনশীল আত্মপ্রকাশও। এদিকে দীপিকা পাড়ুকোন (Deepika Padukone)-এর আট ঘণ্টার শিফট নিয়ে প্রথম বিতর্ক তৈরি হয় পরিচালক সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা (Sandeep Reddy Vanga)-র ‘স্পিরিট’ (Spirit) সিনেমার প্রেক্ষিতে। ওই দক্ষিণী ছবি থেকে দীপিকাকে বাদ দেওয়া হয়, কারণ তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, আট ঘণ্টার বেশি তিনি কাজ করবেন না। এই সিদ্ধান্তে দক্ষিণী সিনেমা হারালেও, দীপিকার মনে একটুও আক্ষেপ নেই।
একটি সাক্ষাৎকারে দীপিকা পাড়ুকোন বলেন, ‘আমি সবসময় মনের কথা শুনে চলি। কঠিন সময়েও নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকাই আমার নিয়ম।’ এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, দীপিকা কোনও আপস করতে নারাজ, তা সে বিগ বাজেট দক্ষিণী সিনেমা হোক বা নামী পরিচালকের প্রজেক্ট। তবে দীপিকার এই অবস্থানে বলিউডের অনেকেই পাশে দাঁড়িয়েছেন। কাজল (Kajol), অজয় দেবগণ (Ajay Devgn), সইফ আলি খান (Saif Ali Khan), রাধিকা আপ্তে (Radhika Apte)-র মতো তারকারা দীপিকার পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁদের যুক্তি, একজন মা যখন নতুন শিশু জন্ম দেন, তখন তাঁর পেশাগত সময়সীমা স্বাভাবিকভাবেই সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত। সময় বদলাচ্ছে, সমাজ বদলাচ্ছে, এবং সেই সঙ্গে বদলানো উচিত ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কাজের নিয়মও। দক্ষিণী মহলেও কিছু সমর্থনের সুর শোনা গেছে। পরিচালক মণিরত্নম (Mani Ratnam) দীপিকার যুক্তিকে সমর্থন করেছেন। তবে ব্যতিক্রমও আছে। রশ্মিকা মন্দানা (Rashmika Mandanna)-সহ দক্ষিণী ইন্ডাস্ট্রির একাধিক তারকা দীপিকার কাজের সময় নিয়ে তোলা দাবিকে অবান্তর বলে ব্যঙ্গ করেছেন। কারও মতে, পেশাদার অভিনেত্রী হয়ে কাজের সময় সীমা বেঁধে দেওয়া মানে দায় এড়ানো। আবার কেউ বলছেন, চলচ্চিত্র জগতের কাজ কখনওই নির্দিষ্ট সময়ে আটকে থাকে না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিতর্ক উস্কে দেয় সন্দীপ রেড্ডি ভাঙ্গা (Sandeep Reddy Vanga)-র এক সাক্ষাৎকার, যেখানে তিনি শুধু দীপিকার শিফট সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নয়, তাঁর ‘লাইফ ফিলোসফি’ ও ‘নারীবাদী মনোভাব’ নিয়েও মন্তব্য করেন। তাঁর দাবি, একজন শিল্পীর উচিত ‘টোটাল কমিটমেন্ট’ থাকা, ও এই ধরণের শর্ত দিয়ে কাজ করা অপেশাদারিত্বের পরিচায়ক। এই মন্তব্যকে ঘিরে ঝড় ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ায়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, যখন একজন পুরুষ অভিনেতা সন্তান জন্ম দেয় না বা পারিবারিক দায়িত্ব বহন করে না, তখন তাঁর শিফট বা সময় নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠে না। তাহলে একজন মা হয়ে অভিনেত্রীর এমন শর্তে সমস্যা কোথায়?

এই বিতর্কের মাঝেই বিদ্যা বালানের (Vidya Balan) মন্তব্য তাই বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে তিনি দীপিকার যুক্তিকে ন্যায্য বলে মেনে নিয়েছেন, অন্যদিকে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে একটি বড় প্রশ্নও রেখেছেন, ‘আমরা কি এমন একটা ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করতে পারছি যেখানে মা হওয়া মানেই ক্যারিয়ারে ছেদ নয়?’ শেষ পর্যন্ত এই বিতর্ক কি গন্তব্যে পৌঁছবে? ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির কাজের পরিবেশ কি বদলাবে? একমাত্র ভবিষ্যতই দিতে পারে তার উত্তর। তবে এটুকু নিশ্চিত, দীপিকা পাড়ুকোনের একটি কথায় আলোড়ন উঠেছে বহু স্তরে, আর বিদ্যা বালানের মতো শিল্পীরা সেই আলোড়নে যুক্ত হয়ে তাকে আরও গভীর ও প্রাসঙ্গিক করে তুলেছেন।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ranveer-Deepika : রণবীর-দীপিকার কন্যাকে দেখতে হাসপাতালে মুকেশ আম্বানি



