কৌশিক রায় ✪ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে ‘৫০-৫০ সম্ভাবনা’ কথাটি বহু দিন ধরেই প্রচলিত। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত এক সমীক্ষাভিত্তিক গবেষণা এই তত্ত্বে বড়সড় ধাক্কা দিয়েছে। গবেষকরা বলছেন, কিছু কিছু দম্পতির ক্ষেত্রে কেবলমাত্র একটি লিঙ্গের সন্তানের জন্ম দেওয়ার প্রবণতা থাকে, ও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রবণতা আরও দৃঢ় হতে পারে। কী সেই প্রবণতা? ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে ১৮ জুলাই প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে বস্টনের হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অফ পাবলিক হেলথের (Harvard T.H. Chan School of Public Health) প্রজনন বিশেষজ্ঞ জর্জ চাভারো (Jorge Chavarro) ও তাঁর সহকর্মীরা জানান, ১৯৫৬ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত ৫৮ হাজারেরও বেশি গর্ভধারণ সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দেখা গিয়েছে, এক তৃতীয়াংশ পরিবারের সন্তানদের লিঙ্গ একেবারে একই। কোনও কোনও দম্পতির তিন, চার, এমনকী পাঁচটি সন্তানও একই লিঙ্গের। চাভারোর কথায়, ‘সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের সম্ভাবনা প্রতিটি দম্পতির ক্ষেত্রে আলাদা। কারও ক্ষেত্রে কন্যা সন্তানের সম্ভাবনা বেশি, আবার কারও ক্ষেত্রে পুত্র সন্তানের।’
আরও পড়ুন : Parenting | সন্তানদের মধ্যে পছন্দ-অপছন্দ! একটিকে বেশি ভালবাসলে অন্যটির ওপর পড়ে যে ছায়া
প্রশ্ন উঠছে, তাহলে সম্ভাবনার ৫০-৫০ তত্ত্বটি কি ভুল? চাভারো বলেন, ‘জনসংখ্যার বৃহত্তর পরিসরে গড় সম্ভাবনা ৫০-৫০ হলেও, পরিবারভেদে সেই সম্ভাবনা বদলে যায়। বিশেষ করে যে দম্পতিরা বেশি বয়সে প্রথম সন্তান নেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এক লিঙ্গের সন্তানের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।’ গবেষকরা জানিয়েছেন, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের প্রজনন অঙ্গের পিএইচ পরিবর্তিত হয়। স্ত্রীর যৌনাঙ্গের অভ্যন্তর বেশি অ্যাসিডিক হয়ে উঠলে এক্স ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণুর পক্ষে তা অনুকূল হয়। এক্স ক্রোমোজোমবাহী শুক্রাণু তুলনায় বড় ও এতে বাফার জাতীয় রাসায়নিক থাকে, যা অ্যাসিডিক পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে। এর ফলে কন্যা সন্তান জন্মানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে। অন্যদিকে, বয়স বাড়লে ঋতুচক্রের নির্দিষ্ট পর্যায় ছোট হতে থাকে। এতে ওয়াই ক্রোমোজোম বহনকারী শুক্রাণুর টিকে থাকার সুযোগ বাড়ে এবং পুত্র সন্তানের সম্ভাবনাও তৈরি হয়। অর্থাৎ বয়সের প্রভাবে যৌনাঙ্গের জৈবিক পরিবেশ কোন দিকটিতে অনুকূল হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করছে সন্তানের লিঙ্গ। গবেষণায় আরও জানা গিয়েছে, বারবার একই লিঙ্গের সন্তান জন্ম দেওয়া দম্পতিদের জিনগত বিশ্লেষণে দু’টি বিশেষ জিন চিহ্নিত হয়েছে। যদিও এই জিনগুলির ভূমিকা স্পষ্ট নয়। চাভারো বলেন, ‘এখনও নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না, এই জিনগুলিই সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণে প্রধান। তবে এটি ভবিষ্যতের গবেষণায় দিশা দেখাবে।’
কিন্তু এই নতুন তত্ত্বকে ঘিরে মতভেদও তৈরি হয়েছে। ইতালির বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Bologna) গবেষক নিকোলা বারবান (Nicola Barban) বলেন, ‘এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরও বিস্তারিত সমীক্ষা দরকার।’ অন্যদিকে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Queensland) জেনেটিসিস্ট ব্রেন্ডন জিট্শ (Brendan Zietsch) এই ফলাফলে সন্তুষ্ট নন। তাঁর মতে, ‘১৯৩১ সালের পর জন্মানো সমগ্র সুইডিশ জনসংখ্যার উপর আমাদের সমীক্ষায় এমন কোনও ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। সন্তানের লিঙ্গ ও জিনগত সংযোগের মধ্যে সরাসরি সমীকরণ টানা সহজ নয়।’ জিট্শ আরও বলেন, চাভারোর সমীক্ষার অংশগ্রহণকারীরা মূলত মার্কিন ও শ্বেতাঙ্গ। ফলে বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যায় একই ফলাফল পাওয়া যাবে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এছাড়া, পিতার বয়সের প্রভাবও অবজ্ঞা করা যাবে না। চাভারোর সমীক্ষায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পিতার বয়স মায়ের সমান ছিল। ফলে পিতার বয়স কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ব্রেন্ডন জিট্শের কথায়, ‘এ ধরনের জটিল বিষয়ে এক দেশের একরকম নমুনা থেকে সার্বিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো বিজ্ঞানসম্মত হবে না।’ তবে কিছু বড় অংশের বিজ্ঞানী মনে করছেন, এই নতুন গবেষণার মাধ্যমে অন্তত একটিই প্রমাণিত যে, সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ কেবল সম্ভাবনার খাতা পর্যন্ত সীমিত নয়। প্রকৃতির গভীরতর জৈবিক, জিনগত এবং বয়সজনিত রহস্য এই নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এর সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পেতে ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Parenting | ছেলের বড় হওয়া, পারফেকশনের খোঁজে আমি ব্যস্ত, আর ও হাঁটছিল নিজের পথেই : অনুকৃতি




