সাশ্রয় নিউজ ★ শিমলা, ৪ জুলাই ২০২৫ : বর্ষা মানেই সাধারণত গ্রীষ্মের জ্বালা মুছে শীতলতার ছোঁয়া, অথচ হিমালয়ের কোলে হিমাচলপ্রদেশে (Himachal Pradesh) এবারের বর্ষা যেন এক রক্তচক্ষু দানব। প্রবল বৃষ্টিপাতে গত ক’য়েক দিনে রাজ্য জুড়ে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৩৭ জনের। নিখোঁজ বহু, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসেবে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ গৃহহীন, পানীয় জল এবং বিদ্যুৎ পরিষেবা সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। চরম দুর্যোগের এই সময়ে আশা হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে ভারতীয় বায়ুসেনা (Indian Air Force), যারা পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছে দিচ্ছে খাদ্য ও ওষুধ, উদ্ধার করছে আটকে পড়া মানুষজনকে।
হিমাচলপ্রদেশ রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের তরফে জানানো হয়েছে, সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে মান্ডি (Mandi), কুলু (Kullu), সোলান (Solan) এবং চাম্বা (Chamba)। পাহাড়ি অঞ্চলে একের পর এক ভূমিধসে মাটি চাপা পড়েছে বহু গ্রাম। অনেকেই এখনও ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২৫০-র বেশি রাস্তায় যাতায়াত বন্ধ, ৭০০-রও বেশি জলপ্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত এবং ৫০০-রও বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র অচল হয়ে পড়েছে। একাধিক হাসপাতাল ও স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এমনকি জাতীয় সড়কও বন্ধ বহু জায়গায়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে একাধিক গ্রাম। ডিসি রানা (D.C. Rana), রাজ্যের শুল্ক দফতরের বিশেষ সচিব জানান, “এই মুহূর্তে সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে উদ্ধারকাজ। ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানতে আরও সময় লাগবে, কারণ বহু এলাকা এখনও পৌঁছনো যায়নি।” তাঁর কথায়, একাধিক স্থানে পাহাড় ধসে রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ, ফলে প্রশাসনিক তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে।
হিমাচলের এই পরিস্থিতিতে এগিয়ে এসেছে ভারতীয় বায়ুসেনা (Indian Air Force)। যোগাযোগ ছিন্ন হওয়া এলাকায় হেলিকপ্টারের মাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাদ্যসামগ্রী, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী। কিছু ক্ষেত্রে যেখানে হেলিকপ্টার নামানো সম্ভব নয়, সেখানেও ঝুলন্ত দড়ির সাহায্যে নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে জরুরি রসদ। উদ্ধার করা হচ্ছে দুর্গম অঞ্চলে আটকে পড়া অসুস্থ ও প্রবীণ নাগরিকদের। উদ্ধারকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষিত সেনা। এই তৎপরতা বহু প্রাণ বাঁচিয়েছে বলেই জানাচ্ছেন স্থানীয় প্রশাসনের আধিকারিকরা। বায়ুসেনার একটি সূত্র জানিয়েছে, “আমরা এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করেছি ও হাজারের বেশি পরিবারকে জরুরি ত্রাণ সরবরাহ করেছি। যতক্ষণ না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে, ততক্ষণ আমরা এই কাজ চালিয়ে যাব।” এমন নির্ভরতার বার্তাই এখন ভরসা সাধারণ মানুষের কাছে।
রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে খোলা হয়েছে অস্থায়ী ত্রাণশিবির। কিন্তু এখনও বহু মানুষ এই শিবিরে পৌঁছতে পারেননি। বিশেষ করে পাহাড়ের ঢালে বসবাসকারী পরিবারগুলি এখনও একপ্রকার বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা প্রেম সিং (Prem Singh) জানান, “গত চার দিন ধরে আমরা বিদ্যুৎ আর পানীয় জল ছাড়াই আছি। যেটুকু খাবার ছিল, তাও ফুরিয়ে এসেছে। যদি বায়ুসেনার হেলিকপ্টার না আসত, তবে বাঁচতাম না।” তাঁর চোখে তখনও আতঙ্কের ছায়া। এই মুহূর্তে হিমাচলের আবহাওয়া নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের কারণ, কারণ IMD (Indian Meteorological Department)-র পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ৭ জুলাই পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে নতুন করে ধস নামার আশঙ্কা যেমন থাকছে, তেমনই বাঁচানো মানুষগুলিকেও স্থানান্তরিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আশার কথা, বিপর্যয়ের মাঝেও মানুষের সহানুভূতি, সংহতি আর সহযোগিতা এক নতুন আলোর দিশা দেখাচ্ছে। প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও নিজেদের মতো করে একে-অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। কেউ খাবার দিচ্ছেন, কেউ নিজের বাড়ির একাংশ খুলে দিয়েছেন আশ্রয়হীনদের জন্য। এই সঙ্কট মুহূর্তে মানুষে মানুষে এই সম্পর্কই যেন একমাত্র শক্তি। সাধারণ মানুষ বুকে বল নিয়ে ভাবছেন, হিমাচলপ্রদেশ আবার উঠে দাঁড়াবে। পাহাড়ের গায়ে নতুন করে গড়ে উঠবে ঘরবাড়ি, হাসবে শিশু, সেজে উঠবে প্রকৃতি। কিন্তু এই দুর্ঘটনার স্মৃতি থেকে যাবে যারা হারিয়েছেন পরিবার, যারা নিখোঁজ, যাদের জীবন এক মুহূর্তে বদলে গেল। আর থেকে যাবে ভারতীয় বায়ুসেনার (Indian Air Force) এই মানবিক মুখ, যারা শুধু সীমানা রক্ষা করে না, দেশের প্রতিটি দুর্যোগে বুক চিতিয়ে লড়ে মানুষের প্রাণ রক্ষা করে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Deepika Padukone Walk of Fame | দীপিকার হলিউড জয়, ‘ওয়াক অফ ফেম’-এ নাম উঠল অভিনেত্রীর




