পরিধি চক্রবর্তী ★ সাশ্রয় নিউজ : চিত্রনাট্যের খাতিরে নিজের শরীরকে অস্ত্র করে তুলতে কখনও পিছপা হননি রাধিকা আপ্টে (Radhika Apte)। ক্রমাগত নিজের অভিনয়দক্ষতা ও সাহসিকতা দিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, নগ্নতা কি শুধুই শরীরের প্রদর্শন, নাকি শিল্পের অনিবার্য এক দিক? তাঁর সাম্প্রতিক ছবি ‘সিস্টার মিডনাইট’ (Sister Midnight)-এ নগ্ন দৃশ্যে অভিনয় করে আবারও সেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তিনি। তবে এই প্রথম নয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতা নিয়ে যেভাবে ছুঁতমার্গ ছিল, তাতে ফাটল ধরিয়েছেন রাধিকা বহু আগেই। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টুবি (Tubi)-তে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে কর্ণ কান্ধারির (Karan Kandhari) ছবি ‘সিস্টার মিডনাইট’। ছবিতে উমা নামের এক মধ্যবিত্ত বাঙালি মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রাধিকা। একটি সম্বন্ধ করে বিয়ের গল্পের পরতে পরতে সেখানে মিশে আছে সামাজিক নিয়ম, দাম্পত্য অস্বস্তি আর নারীর নিজের শরীর নিয়ে দ্বন্দ্ব। উমার চরিত্রে রাধিকার সাহসী অভিনয় প্রশংসিত হলেও, সেন্সর বোর্ডের (CBFC) আপত্তিতে ছবির নগ্ন দৃশ্য বাদ দিতে বলা হয়েছে নির্মাতাকে। এই নির্দেশ নিয়েই নতুন করে আলোচনা, কেন বার বার এই সাহসী দৃশ্যের সামনে এসে দাঁড়ায় ‘সেন্সর’? রাধিকার ভক্তরা বলছেন, নগ্নতাকে তিনি কখনও ‘সস্তা দেখনদারি’তে নামিয়ে আনেননি। চরিত্রের গভীরে গিয়ে যা দরকার, সেটাই করেছেন। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘পার্চড’ (Parched) ছবিতে তাঁর সাহসী দৃশ্য ঘিরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তবে সেই সময়েই এক সাক্ষাৎকারে রাধিকা বলেছিলেন, “মহিলার দেহমাত্রই তা যৌনতার প্রতীক নয়।” এই বক্তব্যেই তাঁর শিল্প-দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে।
অনুরাগ কাশ্যপ (Anurag Kashyap)-এর স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি ‘দ্যাট ডে আফটার এভরিডে’ (That Day After Everyday)-তেও তাঁর সাহসিকতা ছিল অন্য রকমের। সেই ছবিতে রাধিকার মুখে কোনও প্রসাধন ছিল না। চোখেমুখে কালি, গায়ে অত্যাচারের চিহ্ন। একজন নির্যাতিত নারীর চরিত্রে অভিনয়ের জন্য রূপ বা যৌনতা নয়। গুরুত্ব পেয়েছিল নিঃসঙ্গতা, ভয় আর সাহস। ওই ছবি নিয়ে একবার কাশ্যপ বলেছিলেন, “রাধিকার মতো অভিনেত্রী থাকলেই এমন চরিত্ররা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।” ‘বদলাপুর’ (Badlapur) ছবিতে বরুণ ধওয়ান (Varun Dhawan)-এর সঙ্গে খোলামেলা দৃশ্যে দেখা যায় রাধিকাকে। কিন্তু দৃশ্যের ‘বোল্ড’ দিক নয়। চরিত্রের জটিলতাই তখন আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। দর্শকদের অনেকেই সেই সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, “রাধিকার অভিনয়ে নগ্নতা একটা আবহ, মূল বিষয় নয়।” ২০১৬ সালে রাধিকা অভিনীত আন্তর্জাতিক ছবি ‘দ্য ওয়েডিং গেস্ট’ (The Wedding Guest)-এ দেব পটেল (Dev Patel)-এর সঙ্গে যৌনদৃশ্য ঘিরেও বিতর্ক হয়েছিল। ওই দৃশ্য ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই নেতিবাচক মন্তব্য করেন। কিন্তু ছবির নির্মাতা বলেছিলেন, “এই দৃশ্য আবেগের, শরীরের নয়।” রাধিকাও বলেছিলেন, “আমরা ছবিতে মানুষের সম্পর্কের বাস্তব দিকটাই দেখাতে চেয়েছিলাম।” একইভাবে ‘ম্যাডলি’ (Madly) ছবিতে এক আতঙ্কিত, অত্যাচারিত স্ত্রী হিসেবে রাধিকা যে চরিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন, তা দেখে অনেকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। যৌনতা বা নগ্নতার বাইরে গিয়েও, স্ত্রীর মানসিক অস্থিরতা, সমাজের চাপ, ভয় এবং অচেনা এক নিঃসঙ্গতা সেখানে উঠে এসেছিল।এই ধারাবাহিকতায় ‘সিস্টার মিডনাইট’-এ উমার চরিত্র যেন এক নতুন পরীক্ষা। এক তরুণী, যে নিজের দাম্পত্য নিয়ে সংকটে, সমাজের চোখে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পেতে মরিয়া। এই চরিত্রে রাধিকার নগ্নতা নয়, তাঁর চোখ, অভিব্যক্তি, দেহভঙ্গিতে ফুটে উঠেছে এক গূঢ় অন্তর্দ্বন্দ্ব। ছবিটি যদিও ‘এ’ সার্টিফিকেট পেয়েছে, তবু সেন্সরের কাটছাঁট সেই পুরনো প্রশ্ন তোলে কতটা সাহস ভারতীয় দর্শক মেনে নিতে পারে?
একদিক থেকে দেখলে, রাধিকা আপ্টে নিছকই এক অভিনেত্রী নন। তিনিই হয়ত এই সময়ের এক ‘সীমা-পরীক্ষক’। যিনি শিল্পের প্রয়োজনে দেহকে দৃষ্টিকোণ বদলানোর এক মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরেন। নগ্নতা সেখানে লজ্জা নয়, একটি মূর্তির মতো আত্মপ্রকাশের ভাষা হয়ে ওঠেন।
বর্তমানে যখনও বহু অভিনেত্রী চিত্রনাট্যের প্রয়োজনেও সাহসী দৃশ্যে পিছিয়ে যান, তখন রাধিকা নিজের চরিত্র, বিশ্বাস আর শিল্পবোধের জোরেই এগিয়ে যান সামনে। তার জন্য তাঁকে ট্রোলও হতে হয়, প্রশংসাও পান। তবে তিনি নিজের অবস্থানে অটল। হয়ত সেই কারণেই, নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি শুধু অভিনেত্রী নন, একটি ভাবনার নাম।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Kajol | তিন খানের তুলনায় সালমানের স্টার পাওয়ার অনন্য! অকপট স্বীকারোক্তি কাজলের




