Global economy : বর্তমান বিশ্ব পরিবেশে ও অর্থনীতির পরিকাঠামোগত দিক ও স্থিতি

SHARE:

দেবব্রত সরকার ★ সাশ্রয় নিউজ : বিশ্ব এক অস্থির, পরিবর্তনশীল ও সংকটাপন্ন সময়ে প্রবেশ করেছে। একদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের রোষানলে নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে প্রকৃতি ও মানবসভ্যতার; অপরদিকে অর্থনীতির (Global economy) প্রতিটি স্তম্ভ টলমল করে দাঁড়িয়ে আছে নানা সঙ্কট ও পুনর্গঠনের মাঝখানে। এই দুই পরম বাস্তবতা, পরিবেশ ও অর্থনীতি, যেন আজ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। যেখানে একটির নড়াচড়া অন্যটির ভারসাম্যকে টলিয়ে দেয়। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকের শেষভাগে এসে আমরা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে বিশ্বব্যবস্থা নিজের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছে। পরিবেশের প্রসঙ্গেই যদি শুরু করা যায়, তবে আমাদের প্রথমে স্বীকার করতে হবে, বিগত একশো বছরে মানুষের উন্নয়নচিন্তা প্রকৃতিকে প্রান্তিক করে রেখেছে। শিল্পায়ন, নগরায়ন, খনিজ আহরণ ও অতিরিক্ত ভোগবাদী সংস্কৃতির জেরে বিশ্ব-উষ্ণায়ন ভয়ঙ্কর মাত্রায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে এসে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে, যা প্যারিস চুক্তির পূর্বনির্ধারিত সীমার প্রায় কাছাকাছি। মেরু অঞ্চলে বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, মরু এলাকা দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে, এবং বিশ্বের অনেক অঞ্চলেই চরম জলবায়ুগত ঘটনাবলীর সংখ্যা ও মাত্রা বেড়ে চলেছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, দক্ষিণ এশিয়ার উপকূলবর্তী অঞ্চল, লাতিন আমেরিকার কিছু অংশ, অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরভাগ সবই মারাত্মকভাবে প্রাকৃতিক বৈরিতার শিকার।

বিশ্ব জুড়ে অনেক জায়গায় ‘ডিগ্রোথ’ বা ‘অববৃদ্ধি’ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এক ধরনের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা, যেখানে অনর্থক উৎপাদন, অপচয় ও পরিবেশ-ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ড কমিয়ে এনে সঠিক বণ্টন ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠনের দিকে এগোনো হয়। তবে এই দিকটি এখনও মূলধারার রাজনীতি বা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কাঠামোতে প্রবেশ করেনি। তবু কিছু ছোট দেশ যেমন ভুটান, কোস্টারিকা কিংবা ফিনল্যান্ড নিজ নিজভাবে চেষ্টা করছে বিকল্প সূচকের ভিত্তিতে জাতীয় উন্নয়নের মূল্যায়ন করতে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে শুধু প্রাকৃতিক পরিবেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং বিশ্ব অর্থনীতির পরিকাঠামোতেও এর গভীর প্রভাব পড়েছে। কৃষিক্ষেত্র, মৎস্যচাষ, পর্যটন শিল্প, নির্মাণ ও আবাসন, এবং শ্রম-নির্ভর উৎপাদনশীল খাতগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে শস্য উৎপাদনের অনিশ্চয়তা খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, অন্যদিকে অপ্রত্যাশিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও খরচবৃদ্ধির কারণে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি হিমশিম খাচ্ছে। পরিবেশগত দুর্যোগ এখন কেবল মানবিক বিপর্যয় নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এক বিশাল উৎসে পরিণত হয়েছে। এছাড়া, সাম্প্রতিক কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাত আজও বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি বড় ধাক্কা। গ্লোবাল সাপ্লাই চেনের ভাঙন, শ্রমিক সঙ্কট, কাঁচামালের দামের অস্বাভাবিক উত্থান, ও বাণিজ্য কাঠামোর পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর ও অটোমেশনভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা যে কতটা প্রয়োজনীয় ও বিপজ্জনক দুই-ই হতে পারে, তা এই মহামারি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

-প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি

বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে একদিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সঙ্কট, খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ছন্দপতন ঘটছে। ইউরোপের দেশগুলো— রুশ গ্যাসের উপর নির্ভরশীলতা কমাতে গিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ছুটছে। কিন্তু সেই পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কষ্টকর করে তুলছে। এদিকে, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কিছু দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের যুগল আক্রমণে দিশেহারা। অভিবাসন ও শরণার্থী সঙ্কট আরেক দফা মানবিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে বিশ্বব্যাপী। উন্নত দেশগুলো অভ্যন্তরীণ চাপ সামাল দিতে গিয়ে অভিবাসন বিরোধী নীতির দিকে ঝুঁকছে যা আবার বৈশ্বিক শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক কাঠামো আজ এক বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে। ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যে বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে উঠছে। বিশ্ব ব্যাংক, IMF বা WTO-এর মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলো যদিও বৈশ্বিক সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে চলেছে, কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও অভ্যন্তরীণ জাতীয় স্বার্থ-সর্বস্বতা সেই প্রচেষ্টাকে বহু ক্ষেত্রে অকার্যকর করে তুলছে।পরিবেশগত সঙ্কট ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার এই যুগে নতুন কিছু সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। সবুজ অর্থনীতি বা গ্রীন ইকোনমির ধারণা এখন ধীরে ধীরে বিশ্ব পরিসরে গুরুত্ব পাচ্ছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ছে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও টেকসই নগর পরিকল্পনা নিয়ে নানা আলোচনা ও প্রয়োগ শুরু হয়েছে। ESG (Environmental, Social and Governance)-নির্ভর বিনিয়োগ ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। অনেক বড় কর্পোরেট সংস্থা এখন নিজেকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে তুলে ধরার জন্য আগ্রহী হয়ে উঠছে। তবে এখানেও সমস্যার জায়গা রয়েছে। বহু সংস্থা নিজেদের ‘সবুজ’ বা ‘ইকো-ফ্রেন্ডলি’ দাবি করলেও, বাস্তবে তা প্রোপাগান্ডার বেশি কিছু নয়। ‘গ্রীনওয়াশিং’ নামে একধরনের প্রতারণা বিশ্বজুড়ে চালু রয়েছে। যেখানে কাগজে-কলমে পরিবেশ রক্ষার কথা বলা হলেও, কার্যক্ষেত্রে তার কোনও প্রতিফলন নেই। বিশ্বের অর্থনীতির আরেক বড় পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তির প্রসারে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, মেশিন লার্নিং, ব্লকচেন, আইওটি ও ক্লাউড কম্পিউটিং-এর প্রভাবে কাজের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। যেমন প্রযুক্তির কারণে কাজের গতি ও উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, তেমনই প্রচুর সংখ্যক শ্রমিক চাকরি হারাচ্ছেন বা নতুন প্রযুক্তির উপযোগী হয়ে ওঠার চাপের মুখে পড়ছেন। এই অবস্থায়, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের পদ্ধতি বদলানো, পুনঃপ্রশিক্ষণ (re-skilling) ও নীতিনির্ধারণে দ্রুততার প্রয়োজনীয়তা আজকের বাস্তব চাহিদা।
বর্তমান সময়ে আর্থিক বৈষম্য এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। একদিকে গুটিকয় ধনী ব্যক্তি ও কর্পোরেট সংস্থা অভাবনীয় সম্পদের মালিক হচ্ছে। অন্যদিকে কোটি কোটি মানুষ মৌলিক চাহিদা মেটাতে অক্ষম। ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের মোট আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি আয় যাচ্ছে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে। এই অবস্থার জন্য কেবল বাজারনীতি দায়ী নয়, দায়ী রাজনৈতিক ও নীতিগত পক্ষপাতও। এর ফলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে। তরুণ প্রজন্ম একদিকে চাকরির অনিশ্চয়তা, অপরদিকে জীবনের অর্থহীনতা ও মানসিক বিষণ্ণতার শিকার হচ্ছে। একইসঙ্গে নাগরিক চেতনার জায়গায় একধরনের অসহায়ত্ব ও উদ্বেগ কাজ করছে। যেখানে মানুষ বিশ্বাস হারাচ্ছে সরকারের সদিচ্ছা, বৃহত্তর সমাজের সহমর্মিতা ও ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি থেকে। এই বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে নতুন বিশ্বদর্শনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। একটি এমন দৃষ্টিভঙ্গি যা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার না করে, এবং সামাজিক ন্যায়, পরিবেশগত ভারসাম্য, ও আত্মিক শুদ্ধিকে অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে সক্ষম। বিকল্প অর্থনীতির কথা যেমন মহাত্মা গান্ধী একসময় বলেছিলেন—”Earth provides enough to satisfy every man’s needs, but not every man’s greed”—এই উপলব্ধি আজকের সময়ের অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।বিশ্ব জুড়ে অনেক জায়গায় ‘ডিগ্রোথ’ বা ‘অববৃদ্ধি’ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এক ধরনের অর্থনৈতিক চিন্তাধারা, যেখানে অনর্থক উৎপাদন, অপচয় ও পরিবেশ-ধ্বংসকারী কর্মকাণ্ড কমিয়ে এনে সঠিক বণ্টন ও পরিবেশবান্ধব সমাজ গঠনের দিকে এগোনো হয়। তবে এই দিকটি এখনও মূলধারার রাজনীতি বা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের কাঠামোতে প্রবেশ করেনি। তবু কিছু ছোট দেশ যেমন ভুটান, কোস্টারিকা কিংবা ফিনল্যান্ড নিজ নিজভাবে চেষ্টা করছে বিকল্প সূচকের ভিত্তিতে জাতীয় উন্নয়নের মূল্যায়ন করতে। তারা GDP-এর পাশাপাশি GNH (Gross National Happiness) বা পরিবেশ-সমর্থ নীতির ভিত্তিতে তাদের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলছে।

সমগ্র বিশ্ব যখন এক বিরাট পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রয়োজন সাহসী নেতৃত্ব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি মানবিক চিন্তার প্রয়োগ। উন্নয়ন কেবল রাস্তা, ব্রীজ, ডাটা বা ডলারে সীমাবদ্ধ নয়। উন্নয়ন হওয়া উচিত এমন এক শক্তি, যা মানুষকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, সজীব ও সুরক্ষিত করে তোলে। এই মুহূর্তে, পরিবেশ ও অর্থনীতি এই দুই পরিকাঠামোর যে সংঘর্ষ, তার একমাত্র সমাধান হতে পারে সমন্বয়ের পথ। একটি এমন বিশ্বব্যবস্থা, যেখানে পুঁজি ও প্রযুক্তি মানবিকতার সহচর হয়ে উঠে। আর তার জন্য দরকার নতুন চিন্তা, নতুন নীতি ও সবচেয়ে বেশি দরকার একটি নতুন মনুষ্যত্ববোধ। যা এই সঙ্কটময় সময়েও আগামী দিনের জন্য আশার আলো হয়ে জ্বলতে পারে।

ছবি : প্রতিনিধিত্বমূলক 

আরও পড়ুন : Paid Hugging in China : অর্থের বিনিময়ে পাঁচ মিনিটের আলিঙ্গন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে চিনে 

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন