হৈমন্তী বন্দ্যোপাধ্যায় : জৈষ্ঠ্য পূর্ণিমায় উদযাপিত জগন্নাথ দেবের এক মহান আচার হল স্নান যাত্রা (Jagannath Dev Sanan Yatra)। প্রকৃত অর্থে রথযাত্রার পূর্বাভাস বলা যেতেই পারে। স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী পুরীর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এই স্নান যাত্রার প্রবর্তক। এই দিনে পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দির থেকে জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রাকে (Jagannath, Balaram, Subhadra) বাইরে আনা হয় এবং স্নান করানোর পরে মণ্ডপে নিয়ে যাওয়া হয়। ১০৮টি পবিত্র কলসির জল দিয়ে, স্নান করানো হয়। সেই জল আনা হয় মন্দির চত্বরের অন্তর্গত অলৌকিক “সোনা কুয়ো” থেকে। এই স্নান পর্ব একটি গভীর আধ্যাত্মিক বার্তা বহন করে। একমাত্র সনাতন ধর্মেই আমরা ঈশ্বরের মানবিক রূপ দেখে থাকি। এখানে ঈশ্বরকে ক্লান্ত হতে দেখা যায় , বিশ্রাম নিতে দেখা যায়। এই স্নান যাত্রা আসলে এক বিশেষ কর্মযোগ—যেখানে ভক্তরা স্নান করানোর মাধ্যমে ঈশ্বরের সেবা করে।
বিরহ তাপে অঙ্গ জ্বলছে ব্রজধামের, যমুনার, স্থাবর-জঙ্গল গোবৎস, গাভী, গোপ গোপী, মা যশোদা নন্দ বাবা সকলের। সকলেই কুরুক্ষেত্রে ছুটলেন। যোগমায়া সেসময় এক অপূর্ব কুঞ্জ রচনা করলেন রাধা আর প্রিয় সখীদের জন্য। কৃষ্ণ আসবেন রাধার সেই অপূর্ব কুঞ্জে। কিন্তু এর জন্য রুক্মিণী অর্থাৎ লক্ষ্মীকে রাজি করাতে হবে। কিন্তু লক্ষ্মী তাঁকে কিছুতেই যেতে দিতে নারাজ। এই নিয়ে দু’জনের মধ্যে রাগারাগি। লক্ষ্মী রাগে রান্নাবান্না করে। তখন কৃষ্ণ বলেন, আমার দাদা বলরামের দোষ কোথায়? তিনি কি খেয়ে থাকবেন? তাই শুধু পাচন রান্না করেন।
শোনা যায়, একবার স্নান যাত্রার দিন হঠাৎ প্রবল বজ্রপাত ও কালো মেঘে ঘিরে গিয়েছিল স্নানমণ্ডপ তীব্র বৃষ্টির মাঝে ভগবানের বিগ্রহ ঢাকা পড়ে যায়। উৎসব থমকে যায়। হঠাৎ সেই সময় এক অচেনা বৃদ্ধ মহিলা, যিনি ফকির বেশে ছিলেন , এগিয়ে এসে বললেন— “স্নান করানো বন্ধ কোরো না আজ দেবতা জলেই জন্ম নেবেন”। তারপর তিনি এক হাতে ভগবানের ওপর কাপড় ধরে রাখলেন, আর অন্য হাতে কলসি থেকে জল ঢালতে সাহায্য করলেন পুরোহিতদের। আশ্চর্যের বিষয় তখনই বৃষ্টি ধীরে ধীরে থেমে যায়। কিন্তু পরে যখন তাঁকে খুঁজতে গিয়েছিল সবাই, তখন দেখা যায় তিনি অদৃশ্য হয়ে গেছেন। আজও সেই নারীকে মা লক্ষ্মী রূপে দর্শন বলেই মানেন অনেক পুরাতন সেবায়েত ও স্থানীয়রা। এই ঘটনাটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ভক্তির রূপ যেমন মন্দিরে তেমনই অচেনা এক নারীত্বে। ঈশ্বর আমাদের মধ্যেই বিরাজমান, যখন আমরা সেবা করি, আমরা কর্ম করি।
স্নান যাত্রার মাহাত্ম্য : আজকের দিনে ভগবানের স্নানযাত্রা দর্শন করলে যে-কোনও ব্যক্তি অনায়াসেই মুক্তি লাভ করতে পারে। এমনকী কেউ যদি ভক্তি সহকারে একবারও স্নান যাত্রা মহোৎসব দর্শন করেন, তাঁর সংসার বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ সুনিশ্চিত হয়ে যায়। তাকে আর শোক করতে হয় না। জৈমিনি ঋষি স্নান যাত্রার মাহাত্ম্য হিসেবে বলেছেন, ভগবান পুরুষোত্তমের স্নানযাত্রা দর্শন করলে সমস্ত তীর্থ সমূহে স্নান করার থেকেও শতগুণ অধিক ফল পাওয়া যায় এবং এতে কোনও সংশয় নেই। তিনি আরও বলেন, কেউ যদি আন্তরিকতার সাথে স্নান কালে ভগবানকে নিরীক্ষণ করেন তাদেরকে আর মাতৃগর্ভে বাস করতে হয় না। উৎসুকতাপূর্ণ হৃদয়ে স্নান যাত্রা দর্শন করলে মানুষ আজ জন্ম যা পাপ করেছে তা বিনষ্ট হয়ে যায়।জগন্নাথদেবের স্নান যাত্রার পর মন্দির পনেরো দিন বন্ধ থাকে। জগন্নাথের জ্বর হয়। ১৫ দিন পর মন্দির খোলা হয়। নয়নকল উৎসবে নয়ন খুলবে। জগন্নাথকে সাজানো হয়।
শ্রীক্ষেত্র পুরী হল মর্তের বৈকুণ্ঠ, দ্বারকা। পুরী মন্দিরের চারটা দরজা। অশ্ব, হস্তী, ব্যাঘ্র, সিংহ। অশ্ব অর্থাৎ অর্থ, হস্তী অর্থাৎ মোক্ষ, ব্যাঘ্র অর্থাৎ কাম এবং সিংহ অর্থাৎ ধর্ম। জগন্নাথ সিংহ দরজা দিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করেন। মহাপ্রভুও এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেন জগন্নাথ দর্শনে। হস্তী দরজা দিয়ে জগন্নাথ বের হয় সমাধিতে যাওয়ার জন্য। দরজা বন্ধ থাকে সবসময়।
এবার মূল প্রসঙ্গে আসা যাক। একবার দেবকী, বাসুদেবের বাসনা হল তীর্থস্থান করবে। তখন বলরাম এবং কৃষ্ণ বললেন কুরুক্ষেত্রে অমাবস্যায় সূর্যগ্রহণের স্নান করলে মোক্ষ লাভ হয়। কুরুক্ষেত্রে ২১ বার ক্ষত্রিয়দের বিনাশ করেছিল। তাদের রক্ত থেকে এই সরোবর। আবার পরশুরাম ওখানে তর্পণ করে ওই ক্ষত্রিয়দের ওই সরোবর পূর্ণ তীর্থে পরিণত হয়। যখন সকলে কুরুক্ষেত্রে আসছেন সেকথা নারদ মুনি ব্রজ বাসীদের জানালেন। একমাসের বেশি এই কুরুক্ষেত্রে তিনি থাকবেন। কিন্তু ব্রজে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে নারদের সমস্ত অঙ্গ জ্বলতে শুরু করল। একথা জানতে তিনি ধ্যানে বসলেন। বিরহ তাপে অঙ্গ জ্বলছে ব্রজধামের, যমুনার, স্থাবর-জঙ্গল গোবৎস, গাভী, গোপ গোপী, মা যশোদা নন্দ বাবা সকলের। সকলেই কুরুক্ষেত্রে ছুটলেন। যোগমায়া সেসময় এক অপূর্ব কুঞ্জ রচনা করলেন রাধা আর প্রিয় সখীদের জন্য। কৃষ্ণ আসবেন রাধার সেই অপূর্ব কুঞ্জে। কিন্তু এর জন্য রুক্মিণী অর্থাৎ লক্ষ্মীকে রাজি করাতে হবে। কিন্তু লক্ষ্মী তাঁকে কিছুতেই যেতে দিতে নারাজ। এই নিয়ে দু’জনের মধ্যে রাগারাগি। লক্ষ্মী রাগে রান্নাবান্না করে। তখন কৃষ্ণ বলেন, আমার দাদা বলরামের দোষ কোথায়? তিনি কি খেয়ে থাকবেন? তাই শুধু পাচন রান্না করেন।
প্রকৃতপক্ষে কুরুক্ষেত্রের এই প্রাণ হল জগন্নাথের স্নান যাত্রা। ওগো মায়ার কুঞ্জ হলো গণ্ডিচা মন্দির। জগন্নাথের জ্বর হল রাধার বিরহ জ্বর হল। জগন্নাথ যাবে রথে করে ভক্ত দর্শনে। রাধার কুঞ্জে গণ্ডিচা মন্দিরে যাবে রথে করে। বাধ সাধলেন লক্ষ্মী। এই কথা শুনে বলরাম এবং সুভদ্রা দুজনেই জগন্নাথের সঙ্গী হলেন। তাই রথের প্রথমে বলরাম পরে সুভদ্রা, তারপর জগন্নাথ। এই স্নান যাত্রা উৎসবের পর পূর্ণিমা থেকে আষাড়ী অমাবস্যা পর্যন্ত ১৫ দিন ভগবানকে জনসাধারণ থেকে দূরে রাখা হয়। এই অনবসর কালে স্নান করানোর ফলে বিগ্রহ বিবর্ণ হয়ে যায়। ১৬ তম দিনে জগন্নাথ দেবকে আবার আগের নব সাজে ফিরিয়ে আনা হয়। সবার দর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এই অনবসর কালে ঈশ্বর কিছু বিশেষ লীলা করে থাকেন তার কারণ হল সবার অগোচরে থেকে প্রত্যেকের হৃদয়ে ভগবানের প্রতি প্রেমকে তিনি আরও সমৃদ্ধ করেন বিরহের দ্বারা এবং ভগবান জগন্নাথ তিনি অবসর সময়ে তিনি নব শৃঙ্গারে সজ্জিত হন। এই অনবসর সময়ে ভগবান জগন্নাথদেবের অভিন্ন রূপকে দর্শন করার জন্য ভক্তরা ব্রহ্মগিরিতে আলালনাথ অভিন্ন জগন্নাথ এবং আলালনাথ মন্দিরে এই সময়ে প্রচুর ভক্তদের সমাগম হয়। এরপর এই জ্বরের চিকিৎসা চলে এবং চিকিৎসা করেন স্বয়ং লক্ষ্মী মাতা। সেরে উঠতে সময় লাগে ১৫ দিন। ততদিন জগৎ রক্ষাকারী এই দেবতাকে কম্বল চাপা দিয়ে রাখা হয়। এরপর আবার প্রভুর দর্শন পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই যে দেবতার আসনে থেকে, মানবের মত আচরণ এখানেই মানবতা ও কর্মযোগের অদ্বিতীয় মিলন। ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্মতা লাভ করলে তবেই মোক্ষ সম্ভব হয়।
ছবি : লেখক
আরও পড়ুন : Palak Tiwari: সলমনের জন্য পারিশ্রমিক নেননি পলক তিওয়ারি




