প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বলিউডের জনপ্রিয় ছবি ‘ইয়ে জওয়ানী হ্যায় দিওয়ানী’ (Yeh Jawaani Hai Deewani) মুক্তির পর কেটে গিয়েছে প্রায় ১৩ বছর। কিন্তু ছবিটির জনপ্রিয়তা এখনও কমেনি। সময় যত এগিয়েছে, ততই নতুন প্রজন্মের কাছে ছবিটি আরও আপন হয়ে উঠেছে। এ বার সেই জনপ্রিয়তার মুকুটে যোগ হল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আরও একটি মুহূর্ত। দীপিকা পাড়ুকোন (Deepika Padukone) অভিনীত নৈনা তলওয়ারের (Naina Talwar) একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য নিজেদের সমাজমাধ্যমের পাতায় তুলে ধরেছে অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস (Academy Awards)।

ছবির একটি সংলাপকে সামনে রেখে প্রকাশ করা হয়েছে সেই দৃশ্য, যা ফের মনে করিয়ে দিয়েছে নৈনা ও বানির সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে। ২০১৩ সালে মুক্তি পেয়েছিল অয়ন মুখোপাধ্যায় (Ayan Mukherjee)। পরিচালিত ‘ইয়ে জওয়ানী হ্যায় দিওয়ানী’। দীপিকা পাড়ুকোনের পাশাপাশি ছবিতে ছিলেন রণবীর কাপূর (Ranbir Kapoor), আদিত্য রায় কাপূর (Aditya Roy Kapur) ও কল্কি কেকলাঁ (Kalki Koechlin)। মুক্তির পর বক্স অফিসে সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি ছবিটি ধীরে ধীরে এমন একটি জায়গা তৈরি করে, যেখানে প্রেম, বন্ধুত্ব, ভ্রমণ, স্বপ্ন এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পেয়েছেন দর্শকের একটি বড় অংশ।

অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের সমাজমাধ্যমের পাতায় যে দৃশ্যটি প্রকাশ করা হয়েছে, সেটি ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অদিতির বিয়ের আগে উদয়পুরে সূর্যাস্তের সময় নৈনা এবং বানির কথোপকথনের দৃশ্য এটি। বানি চরিত্রে রণবীর কাপূরকে দেখা যায় এমন এক তরুণ হিসাবে, যার চোখ সব সময় পরবর্তী গন্তব্যের দিকে। পৃথিবী ঘুরে দেখতে চান তিনি, নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সন্ধানে ছুটতে চান। একটি জায়গায় থেমে থাকা যেন তাঁর স্বভাবের সঙ্গে যায় না। অন্য দিকে, নৈনা একেবারে অন্য মনের মানুষ। প্রথম দিকে লাজুক, নিজের জগতে থাকা নৈনা ধীরে ধীরে জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বদলে যায়। বানি যখন পরবর্তী কোথায় যাওয়া যায়, কী করা যায়, ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে, সেই ভাবনায় ব্যস্ত, তখন নৈনা তাঁকে বর্তমানের দিকে তাকাতে শেখায়। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কেবল পরবর্তী গন্তব্যের জন্য ত্যাগ করে দেওয়া উচিত নয়, সেই কথাই নিজের মতো করে বোঝায় নৈনা।
অ্যাকাডেমির প্রকাশ করা ক্লিপের সঙ্গে ক্যাপশনে নৈনার সেই বক্তব্যকে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘চোখের সামনে যেটা রয়েছে, সেটাকেই উপভোগ করো।’ ছোট একটি বাক্য হলেও ‘ইয়ে জওয়ানী হ্যায় দিওয়ানী’-র দর্শকদের কাছে এই সংলাপের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ এটি শুধু নৈনা ও বানির কথোপকথন নয়, ছবির অন্যতম প্রধান ভাবনারও অংশ। বানি সব সময় সামনে এগিয়ে যেতে চায়। তার কাছে পৃথিবী যেন একটি বিশাল মানচিত্র, যেখানে একের পর এক জায়গায় পৌঁছতে হবে। কোনও একটি শহর, কোনও একটি সম্পর্ক কিংবা কোনও একটি মুহূর্তে বেশিক্ষণ আটকে থাকা তাঁর পছন্দ নয়। নৈনা সেই মানসিকতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলে, সামনে যাওয়ার তাড়ায় যদি বর্তমান মুহূর্তটিই হারিয়ে যায়, তা হলে সেই দৌড়ের অর্থ কী?

উদয়পুরের সূর্যাস্তের দৃশ্যটি সেই কারণেই ছবির আবেগঘন মুহূর্তগুলির একটি। অদিতির বিয়ের আয়োজন চলছে। চার বন্ধুর জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় এসেছে। এমন একটি মুহূর্তে বানি ভবিষ্যতের কথা ভাবছে, আর নৈনা তাকে বর্তমানকে অনুভব করার কথা বলছে। দৃশ্যটির মধ্যে বন্ধুত্বের পাশাপাশি তাঁদের ব্যক্তিত্বের পার্থক্যও ধরা পড়ে। উল্লেখ্য, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের মতো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানের সমাজমাধ্যমে এই দৃশ্য জায়গা পাওয়ায় ‘ইয়ে জওয়ানী হ্যায় দিওয়ানী’কে ঘিরে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ছবিটি বহু বছর আগে মুক্তি পেলেও তার দৃশ্য, গান, সংলাপ ও চরিত্রগুলি এখনও সমাজমাধ্যমে নিয়মিত ফিরে আসে। বিশেষ করে দীপিকার নৈনা এবং রণবীরের বানির সম্পর্ককে ঘিরে দর্শকদের আবেগ এখনও যথেষ্ট প্রবল।

অ্যাকাডেমির পোস্টের পর অনুরাগীরাও নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকেই জানিয়েছেন, ছবিটির সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। কারও কাছে এটি বন্ধুত্বের ছবি, কারও কাছে প্রেমের, আবার কারও কাছে নিজের স্বপ্ন ও জীবনের মধ্যে ভারসাম্য খোঁজার গল্প। এক অনুরাগী জানিয়েছেন, ‘এই ছবিটি চিরকাল আমার হৃদয়ের খুব কাছাকাছি থাকবে।’ অন্য এক দর্শকের মন্তব্য, জীবনে বহু ছবি দেখলেও ‘ইয়ে জওয়ানী হ্যায় দিওয়ানী’ বার বার দেখার মতো একটি ছবি। যত বার দেখা হয়, তত বারই নতুন কোনও অনুভূতি তৈরি হয় বলেও জানিয়েছেন তিনি। ছবিটির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ এর গল্পের সহজ অথচ আবেগপূর্ণ কাঠামো। চার বন্ধুকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে কাহিনি। হিমালয়ে ভ্রমণ দিয়ে শুরু হওয়া গল্প পরে পৌঁছয় উদয়পুরে অদিতির বিয়ের অনুষ্ঠানে। এই পথচলায় চারটি চরিত্রের ব্যক্তিত্ব, স্বপ্ন, সম্পর্ক এবং জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে।

দীপিকার নৈনা প্রথমে নিজের চারপাশ নিয়ে অত্যন্ত সংযত। পড়াশোনা এবং নিজের দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ তাঁর জীবন। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে পাহাড়ে ভ্রমণে গিয়ে তাঁর জীবনে পরিবর্তনের সূচনা হয়। সেখানে বানি, অদিতি এবং অবিনাশের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁর ভাবনাচিন্তাকে বদলে দেয়। সময়ের সঙ্গে নৈনা নিজের ইচ্ছা ও অনুভূতিকে নতুন ভাবে চিনতে শেখে। অন্য দিকে, বানি নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটতে চায়। সাংবাদিকতা ও ভ্রমণের প্রতি তাঁর আকর্ষণ তাঁকে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়। তাঁর কাছে স্বাধীনতা এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই দৌড়ের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কতটা জায়গা দেওয়া যায়, সেটিই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। ছবির এই দ্বন্দ্বই ‘ইয়ে জওয়ানী হ্যায় দিওয়ানী’-কে শুধু একটি প্রেমের ছবি হয়ে থাকতে দেয়নি। বন্ধুত্ব এবং প্রেমের পাশাপাশি নিজের স্বপ্নকে অনুসরণ করা, পরিবার ও সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝা এবং জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তকে গ্রহণ করার বিষয়ও গল্পের মধ্যে এসেছে।
নৈনার সেই সংলাপ তাই আজও দর্শকদের কাছে প্রাসঙ্গিক। দ্রুতগতির জীবনে ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করতে গিয়ে বর্তমানকে উপেক্ষা করা খুবই সহজ। কাজ, সাফল্য, ভ্রমণ কিংবা ব্যক্তিগত লক্ষ্য প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ পরবর্তী ধাপের দিকে তাকিয়ে থাকে। নৈনার কথোপকথন সেই জায়গাতেই থামিয়ে দেয় বানিকে। বলে, সামনে কী রয়েছে, তার পাশাপাশি এখন কী ঘটছে, সেটিও অনুভব করা দরকার। অয়ন মুখোপাধ্যায়ের পরিচালনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল চরিত্রগুলির ব্যক্তিগত পরিবর্তনকে গল্পের সঙ্গে যুক্ত করা। ‘ইয়ে জওয়ানী হ্যায় দিওয়ানী’-তেও চার বন্ধুর জীবনের কয়েকটি বছরের ব্যবধান দেখানো হয়েছে। তাঁদের স্বপ্ন বদলেছে, সম্পর্ক বদলেছে, জীবনযাপনের ধরন বদলেছে। কিন্তু বন্ধুত্বের টান রয়ে গিয়েছে। ছবির গানগুলিও জনপ্রিয়তার বড় কারণ। ‘বদতামিজ দিল’, ‘বালাম পিচকারি’, ‘কবিরা’ কিংবা ‘দিলওয়ালি গার্লফ্রেন্ড’ প্রতিটি গানই ছবির চরিত্র এবং পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে ‘কবিরা’ এবং ‘ইলাহি’-র মতো গান ছবির আবেগ ও ভ্রমণের অনুভূতিকে আরও জোরালো করে।

মুক্তির এত বছর পরেও ছবির সংলাপ এবং দৃশ্য নিয়ে সমাজমাধ্যমে আলোচনা হয়। নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও নৈনা ও বানির গল্প নতুন করে পরিচিত হচ্ছে। অ্যাকাডেমির সমাজমাধ্যমে ছবির দৃশ্য প্রকাশ সেই পুরনো ছবিকে আবার আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে নিয়ে এল। দীপিকার অভিনয় করা নৈনা চরিত্রটিও তাঁর কেরিয়ারের উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলির মধ্যে অন্যতম। নৈনার লাজুকতা থেকে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা, নিজের অনুভূতিকে চিনতে শেখা এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার যাত্রা দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছিল। রণবীরের বানি চরিত্রের বিপরীতে দীপিকার অভিনয় ছবির আবেগকে আরও জোরালো করেছিল। এখন অবশ্য ছবির অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কেরিয়ার অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। দীপিকা পাড়ুকোন বলিউডের অন্যতম পরিচিত মুখ। রণবীর কপূরও একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ছবিতে কাজ করেছেন। অয়ন মুখোপাধ্যায়ও ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ (Brahmastra) ছবির মাধ্যমে নতুন ধরনের বড় পরিসরের সিনেমা তৈরি করেছেন।
আরও পড়ুন : Ranbir Kapoor Alia Bhatt relationship | অনলাইন ট্রোল, মিম আর গুঞ্জনের জবাব আলিয়ার

তবু তাঁদের কেরিয়ারের আলোচিত ছবির তালিকায় ‘ইয়ে জওয়ানী হ্যায় দিওয়ানী’ এখনও জায়গা ধরে রেখেছে। অ্যাকাডেমির পোস্ট তাই একটি পুরনো ছবির দৃশ্য নতুন করে প্রকাশ্যে আনল তা না, বহু বছর পরও একটি ভারতীয় ছবির সংলাপ কীভাবে দর্শকের মনে জায়গা ধরে রাখতে পারে, তারও একটি উদাহরণ। নৈনার ‘বর্তমানকে উপভোগ করা’র কথা নতুন করে সামনে আসায় ছবিটির পুরনো অনুরাগীরা যেমন ফিরে গিয়েছেন সেই দৃশ্যে, তেমনই নতুন দর্শকের মধ্যেও ছবিটি দেখার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু, ‘ইয়ে জওয়ানী হ্যায় দিওয়ানী’ ২০১৩ সালের ছবি। কিন্তু জীবনের যে প্রশ্নগুলি ছবিটি তুলেছিল, সেগুলি এখনও পুরনো হয়নি। ভবিষ্যতের দিকে ছুটতে ছুটতে বর্তমানকে কতটা দেখা হচ্ছে, স্বপ্নের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য কোথায়, আর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের জন্য কতটা সময় রাখা হচ্ছে, সেই প্রশ্নগুলিই নৈনা ও বানির গল্পকে এখনও দর্শকের কাছে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ranveer Singh family time | দীপিকা অন্তঃসত্ত্বা, শুটিংয়ের মাঝেও পরিবারে সময় দিলেন রণবীর, জানালেন সহ-অভিনেতা




