সঞ্জয় সান্যাল : কর্ণাটকের (Karnataka) উত্তর প্রান্তে, শোরাপুর পাহাড়ের (Shorapur Hills Range) বুক চিরে, মহাকাব্যিক স্মৃতিস্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে যাদগির দুর্গ (Yadgir Fort)। প্রথম দেখাতেই মনে হয়, ইতিহাসের এক বিশাল অধ্যায় এখানে পাথরে খোদাই হয়ে আছে। শহর থেকে দূরে, কিন্তু আকাশছোঁয়া এই দুর্গের চূড়ায় পৌঁছলে, চোখের সামনে খুলে যায় শতাব্দীর পর শতাব্দীর কাহিনি। তা কেবল বইয়ের পাতায় পড়া যায় না, শুধু দেখা যায়, অনুভব করা যায়। যাদগির শহরের (Yadgir City) প্রায় প্রতিটি পথেই দুর্গের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। ১০০ মিটার উঁচু এক বিশাল মনোলিথ শিলার (monolith) ওপর নির্মিত এই দুর্গের দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৫০ মিটার, আর প্রস্থ ৫০০ মিটার। ডেকান মালভূমির (Deccan Plateau) পাথুরে ভূমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্য যেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের মেধার অদ্ভুত মেলবন্ধন। গাইড বলছিলেন, “এই দুর্গটা কেবল পাথর আর ইটের সমষ্টি নয়, এটা আমাদের অতীতের ধ্বনি।” তাঁর চোখে গর্বের ঝিলিক স্পষ্ট ছিল।
ইতিহাসবিদদের মতে, যাদগির দুর্গের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় দশম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে। তখন পশ্চিম চালুক্য রাজবংশের (Western Chalukyas) শাসন চলত। পরবর্তীতে যাদব রাজবংশের (Yadava Dynasty) হাতে আসে এই দুর্গ, তাঁরা দূর্গটিকে আরও মজবুত করে তোলেন। তবে দুর্গের আসল সোনালি যুগ শুরু হয় ১৩৪৭ খ্রীস্টাব্দে, তখন ডেকান সুলতানাতের (Deccan Sultanates) রাজধানী হিসেবে যাদগিরকে বেছে নেওয়া হয়। তখন থেকে ১৪২৫ সাল পর্যন্ত এখানকার প্রাচীর, প্রাসাদ, মসজিদ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধারাবাহিকভাবে উন্নত হয়।যাদগির দুর্গে ঘুরতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি ইট যেন অতীতের কণ্ঠস্বর বয়ে আনছে। এক কোণে প্রাচীন মন্দিরের (temples) ভগ্নাবশেষ, অন্য কোণে মসজিদের (mosque) মিনার। প্রাচীন কামানগুলো (cannons) এখনও নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে, যেন অপেক্ষা করছে কোনও হারিয়ে যাওয়া যুদ্ধের সঙ্কেতের জন্য। দুর্গের ফ্ল্যাগ বাস্টিয়নগুলো (flag bastions) থেকে দূরের সবুজ মাঠ আর যাদগির শহরের দৃশ্য মনকে এক অদ্ভুত শান্তি দেয়।https://www.youtube.com/@Sasraya

স্থানীয়দের কথায় জানা গেল, দুর্গের ভেতরে ভূগর্ভস্থ কক্ষ, সুড়ঙ্গ ও গোপন ঘাঁটি (underground structures) ছিল, যা শত্রুর হাত থেকে খাদ্যশস্য ও গোলাবারুদ রক্ষা করার জন্য ব্যবহার হতো। দুর্গের ভেতরে গভীর কূপ ও খাল (wells and canals) এখনও রয়েছে, যদিও অধিকাংশই জলশূন্য। বাহমনি সুলতানাত (Bahmani Sultanate) ও বিজাপুরের আদিল শাহী রাজবংশের (Adil Shahi Dynasty) শাসনকালে দুর্গটি নতুন স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য পায়। পরবর্তী সময়ে হায়দরাবাদের নিজামদের (Nizams of Hyderabad) অধীনে চলে আসে যাদগির। প্রতিটি শাসকই দুর্গটিকে তাদের সামরিক ও প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী রূপ দিয়েছে।

আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল ভোরে, যাদগির শহরের একটি ছোট লজ থেকে। স্থানীয় চায়ের দোকানে গরম মালাই চা খেয়ে পায়ে হেঁটে দুর্গের পাদদেশে পৌঁছই। উপরে উঠতে উঠতে কানে ভেসে আসছিল হালকা বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ। পাহাড়ি পথের প্রতিটি বাঁকে ইতিহাস যেন ধরা দিচ্ছিল চোখে, মসজিদের খিলান, ভাঙা মন্দিরের স্তম্ভ, শ্যাওলায় ঢাকা প্রাচীর। চূড়ায় পৌঁছে, বিস্তীর্ণ প্রান্তর আর শহরের ওপর সূর্যের আলো পড়ার দৃশ্য এমন ছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করা মুশকিল। দূরে ধূসর পাথরের প্রাচীরের পেছনে নীল আকাশ, আর নিচে সবুজের সমারোহ। ওইসব যেন প্রাচীনকালের কোনও রাজ্যের প্যানোরামিক দৃশ্যপট। ওইদিন ফিরে আসার পথে মনে হচ্ছিল, রেখে যাচ্ছি যাদগির দুর্গপর্যটনস্থল, এটি এক জীবন্ত পাঠশালা। ওখানকার বাতাসে ইতিহাস মিশে আছে, প্রতিটি পাথরে যেন লেখা আছে গল্প, প্রতিটি ধ্বংসাবশেষে আছে অজানা অনুভূতি। যারা ইতিহাস, স্থাপত্য আর প্রকৃতি ভালবাসেন, তাদের জন্য যাদগির দুর্গ এক স্বপ্নের গন্তব্য। এখানে এসে বোঝা যায়, শতাব্দী পেরিয়েও কিছু স্মৃতি কখনও হারায় না, কেবল সময়ের স্তরে স্তরে ঢাকা পড়ে যায়, আর একজন পর্যটকের জন্য তা উন্মোচন করার অপেক্ষায় থাকে।
সব ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Manali | মানালি: পাহাড়ি রূপকথার পাতায় ছুটি কাটানোর ঠিকানা




