সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত দর্শনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজ্যের এক বিশেষ রূপবদলের সময় আগামী ‘২৬ যা এক নতুন যুগের সূচনা ঘটতে চলেছে। কে হবে এই রাজ্যের মুখ্য মুখ। জনগণ কি চাইছে সমস্ত কিছু নিয়ে রাজনৈতিক কলমে কলম ধরলেন–
দেবব্রত সরকার
(আজ উনিশ -তম কিস্তি)

ভোটযজ্ঞ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালের ২৭ মার্চ। প্রথম ধাপে একসঙ্গে মোট ১০,২৮৮টি ভোটগ্রহণ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছিল যেখানে প্রায় ৭৪ লক্ষ ভোটার নথিভুক্ত ছিলেন। এই প্রথম পর্যায়ে ৫,৩৯২টি কেন্দ্রে ওয়েবকাস্টিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। প্রতিটি কেন্দ্রেই ব্যবহার করা হয়েছিল ১০,২৮৮টি ব্যালট ইউনিট (BU), ১০,২৮৮টি কন্ট্রোল ইউনিট (CU) ও ১০,২৮৮টি ভিভিপ্যাট (VVPAT)। এ-পর্যায়ে নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India — ECI) একটি গাড়িতে অজ্ঞাত পরিচয়ের দুই দুষ্কৃতির আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ২৭ মার্চ নির্বাচনের দিন, কাঁথি দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের মাজনা ১৭২ নম্বর বুথে অভিযোগ ওঠে, “ভোট দিলে তৃণমূল কংগ্রেসকে (Trinamool Congress) ভোট দিলে ভিভিপ্যাটে বিজেপি (Bharatiya Janata Party)-এর পদ্ম চিহ্ন দেখাচ্ছে” বলে। শুধু মাজনায় নয়, পার্শ্ববর্তী বুথেও একই ধরণের অভিযোগ আসে। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার সাতসাতমাল গ্রামে প্রথম ধাপে ভোটগ্রহণের দিন গোলাগুলি ও বোমাবাজির ঘটনায় দুই নিরাপত্তাকর্মী আহত হন। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় এক বিজেপি কর্মীর মৃত্যুও হয়। যদিও নির্বাচন কমিশন পরে জানায়, ওই ব্যক্তির মৃত্যুর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খুঁজে পাইনি। বাঁকুড়া জেলার নন্দীগ্রাম এলাকায় দুষ্কৃতিদের হামলায় তৃণমূল কর্মী রবীন মান্নার মৃত্যুও ঘটে। তিনি গুরুতর আহত ছিলেন এবং ১৪ দিন পর মারা যান। এছাড়া দাঁতন বিধানসভা কেন্দ্রে সিআরপিএফ (CRPF) -এর বিরুদ্ধে ভোটারদের ভোট দিতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে; নির্বাচন কমিশন পরবর্তী দিন জানায়, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার নরেন্দ্রপুর থেকে ঘটনাস্থলে ৫৬টি বোমা উদ্ধার হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে, ১০,৫৯২টি কেন্দ্র ও প্রায় ৭৩ লক্ষ ভোটার নথিভুক্ত ছিল। এই পর্যায়ে ৫,৫৩৫টি কেন্দ্রে ওয়েবকাস্টিং, এবং ব্যবহৃত হয়েছিল ১০,৬২০টি BU, CU ও VVPAT। নগদ টাকা, মদ, ড্রাগ ও বিনামূল্যে পণ্য সরবরাহ করে ভোটারদের প্রভাবিত করা হচ্ছে কিনা, এটি খতিয়ে দেখতে ১,১৩৭টি ফ্লাইং স্কোয়াড (FS) ও ১,০১২টি স্ট্যাটিক সার্ভিলেন্স টিম (SST) কার্যকর করা হয়েছিল। এছাড়া কলকাতা, দুর্গাপুর অণ্ডাল ও বাগডোরা এলাকায় তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে ৩টি এয়ার ইনটেলিজেন্স ইউনিট স্থাপন করা হয়েছিল। সারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে আদর্শ নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের ১৪,৪৯৯টি অভিযোগ দায়ের হয়, যার মধ্যে নির্বাচনের দিন সাড়ে চারটার মধ্যে ১১,৬৩০টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়। এই পর্যায়ে পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ময়না বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী অশোক দিন্দা (Ashok Dinda) নির্বাচনী প্রচারাভিযানে আক্রান্ত হন ও তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

তৃতীয় পর্যায়ে, ১০,৮৭১টি কেন্দ্রে মোট নথিভুক্ত ভোটার ছিল ৭,৮৫২,৪২৫, যাদের মধ্যে ৬৪,০৮৩ জন শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ও ১২৬,১৭৭ জন অশীতিপর (elderly)। তৃতীয় পর্যায়ে ২২ জন সাধারণ পর্যবেক্ষক, ৭ জন পুলিশ পর্যবেক্ষক ও ৯ জন ব্যয়নির্বাহী পর্যবেক্ষক নিযুক্ত ছিলেন। এই পর্যায়ে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার ব্যারাকপুরে বিজেপি প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় গোলাগুলি ও সংঘর্ষ হয়। আগেভাগে ভাঙড় বিধানসভা কেন্দ্র থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ৪১টি তাজা বোমা বাজেয়াপ্ত করে।চতুর্থ পর্যায়ে, মোট নথিভুক্ত ভোটার ছিল ১১,৫৮১,০২২ জন, যার মধ্যে ৫০,৫২৩ জন প্রতিবন্ধী, ২০৩,৯২৭ জন অশীতিপর নাগরিক। এই পর্যায়ে কোচবিহার জেলার শীতলকুচি বিধানসভা কেন্দ্রে দুটি বড় হিংসাত্মক ঘটনা সংঘটিত হয়, এক, পাঠানটুলিতে প্রথমবারের ভোটার আনন্দ বর্মণ গুলিতে নিহত হন; দুই, জোড়পাটকিতে পোলিং স্টেশনে প্রবেশ প্রহরায় নিয়োজিত CISF জওয়ানদের গুলিতে চার গ্রামবাসীর মৃত্যু হয়, দু’পক্ষের বিবাদ রয়েছে। পঞ্চম পর্যায়ে, নথিভুক্ত ভোটার ছিলেন ১১,৩৪৭,৩৪৪ জন, যার মধ্যে ৬০,১৯৮ জন প্রতিবন্ধী, ১৭৯,৬৩৪ জন অশীতিপর নাগরিক। পঞ্চম পর্যায়ে বিধাননগর কেন্দ্রের শান্তিনগরে তৃণমূল-বিজেপি কর্মীদের মধ্যে ইট ও পাথর ছোঁড়াছুড়ি হয়, দুই পক্ষের আট জন আহত হন।
ষষ্ঠ পর্যায়ে, মোট নথিভুক্ত ভোটার ছিলেন ১০,৩৮৭,৭৯১ জন, যার মধ্যে ৬৪,২৬৬ জন প্রতিবন্ধী, ১৫৭,২৯০ জন অশীতিপর নাগরিক। এই পর্যায়ের আগেই মালদহ জেলায় নির্বাচন প্রচারণায় বিজেপি প্রার্থী গোপালচন্দ্র সাহা (Gopal Chandra Saha) গুলিবিদ্ধ হন ও হাসপাতালে ভর্তি হন। অষ্টম পর্যায়ে, ভোটগ্রহণ হয় ২৯ এপ্রিল। ওই দিন উত্তর কলকাতার মহাজাতি সদনের কাছে বোমা ছোঁড়ার ঘটনা ঘটে। এই সার্বিক পরিমণ্ডলে দেখা যায়, ইউনিটভিত্তিক বৃহৎ আয়োজন, কোভিড-১৯ সংকটের মধ্যে নিরাপত্তার যন্ত্রণা, নির্বাচনপ্রক্রিয়ার দৈর্ঘ্য, সহিংসতা ও অভিযোগের পরিমাণ, সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের এই ভোটযুদ্ধ ছিল এক যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্ত।
নির্বাচন কমিশন, রাজ্য প্রশাসন, কেন্দ্রীয় বাহিনী ও রাজনৈতিক দল—সব পক্ষেই এই আট ধাপের আয়োজন ও তার সংগঠিত কার্যবিবরণীর দিকে নজর রাখতে বাধ্য হয়েছিল। একদিকে ভোটাধিকার বাস্তবায়নের যন্ত্রপাতি যেমন VVPAT, ওয়েবকাস্টিং, ফ্লাইং স্কোয়াড, এসব নতুন মডেলের প্রচেষ্টা ছিল; অন্যদিকে সহিংসতা, অভিযোগ, অবাধ-নির্বাচিত পরিবেশের প্রশ্নও উঠে আসে। এই নির্বাচন শুধু একটি পার্টি-পরাজয় বা জয়লাভের ঘটনা নয়; এটি ছিল পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতির এক বিশ্লেষণাত্মক অধ্যায়, যেখানে ডিজিটাল ভোটিং প্রযুক্তি, কোভিড-১৯ নির্দেশিকা, আসন-বণ্টন ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার জটিলতা সবকিছু একসাথে উপস্থিত ছিল। ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়গুলো স্পষ্ট: নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যক্ষমতা, ভোটার সচেতনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব, এই চারটি স্তম্ভকে আরও মজবুত করতে হবে। কারণ শুধু ভোটাভোট নয়, ওই ভোটবাহী যাত্রার প্রতিটি ধাপই এখন নির্বাচন প্রশাসনের পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন: ধাপে ধাপে ভোট ও সংঘাতের চিত্র

২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ছিল রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ, জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ এক রাজনৈতিক অধ্যায়। আট দফায় অনুষ্ঠিত এই ভোটযুদ্ধ শুধু দলবদল বা আসন-বণ্টনের খেলা নয়, বরং প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জের এক অনন্য মিশ্রণ।
প্রথম দফা: আগুন, অভিযোগ ও বোমাবাজির ছাপ
ভোট শুরু হয় ২৭ মার্চ ২০২১-এ। প্রথম দফায় ১০,২৮৮টি ভোটকেন্দ্রে প্রায় ৭৪ লক্ষ ভোটার ভোট দেন। প্রতিটি কেন্দ্রে ব্যবহৃত হয় ব্যালট ইউনিট (BU), কন্ট্রোল ইউনিট (CU) ও ভিভিপ্যাট (VVPAT)। তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হওয়ায় এদিন একাধিক জায়গায় সহিংসতা ঘটে।
কাঁথি দক্ষিণের মাজনা বুথে অভিযোগ ওঠে, “তৃণমূলকে ভোট দিলেও মেশিনে বিজেপির পদ্মচিহ্ন দেখা যাচ্ছে।” পশ্চিম মেদিনীপুরে এক বিজেপি কর্মীর মৃত্যু, আর বাঁকুড়ায় তৃণমূল কর্মী রবীন মান্নার মৃত্যুতে রাজ্যজুড়ে উত্তেজনা ছড়ায়।
দ্বিতীয় দফা: প্রচারে হামলা ও নির্বাচন কমিশনের কঠোরতা
এই পর্যায়ে ১০,৫৯২টি ভোটকেন্দ্রে ৭৩ লক্ষ ভোটার অংশ নেন। কমিশন গঠন করে ১,১৩৭টি ফ্লাইং স্কোয়াড ও ১,০১২টি নজরদারি দল। নির্বাচন আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ ওঠে ১৪,৪৯৯টি, যার মধ্যে ১১,৬৩০টি নিষ্পত্তি হয়। পূর্ব মেদিনীপুরের ময়না কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী অশোক দিন্দা প্রচারে আক্রান্ত হন, তাঁর গাড়ি ভাঙচুর করা হয়, ঘটনা নিয়ে রাজনীতি তুঙ্গে ওঠে।
তৃতীয় দফা: ভোটের আগেই গোলাগুলি
তৃতীয় দফায় মোট ভোটার ছিল ৭৮.৫ লক্ষ, এদের মধ্যে ৬৪ হাজার প্রতিবন্ধী ও ১.২৬ লক্ষ অশীতিপর। নির্বাচনের আগেই ব্যারাকপুরে গোলাগুলি ও সংঘর্ষে উত্তেজনা ছড়ায়। ভাঙড়ে পুলিশের অভিযানে ৪১টি তাজা বোমা উদ্ধার হয়।
চতুর্থ দফা: শীতলকুচির রক্তাক্ত দিন
এই দফায় ভোট দেন ১.১৫ কোটি ভোটার। কোচবিহারের শীতলকুচিতে দু’টি বড় ঘটনা ঘটে, প্রথমে আনন্দ বর্মণ নামে এক তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান, পরে সিআইএসএফ-এর গুলিতে আরও চারজন নিহত হন। নির্বাচন কমিশন তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ দেয়।
পঞ্চম দফা: বিধাননগরে সংঘর্ষ
এই পর্যায়ে ভোটার সংখ্যা ছিল ১.১৩ কোটি। বিধাননগরের শান্তিনগরে তৃণমূল ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে পাথর ছোঁড়াছুড়িতে আটজন আহত হন। রাজ্যজুড়ে ছোটখাটো সংঘর্ষে দিনটি উত্তপ্ত থাকে।
ষষ্ঠ দফা: প্রার্থী গুলিবিদ্ধ
ষষ্ঠ পর্যায়ে ভোট দেন ১.০৩ কোটি মানুষ। মালদহে বিজেপি প্রার্থী গোপালচন্দ্র সাহা গুলিবিদ্ধ হন, যা রাজ্যে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। নির্বাচন কমিশন বাড়তি বাহিনী মোতায়েন করে।
সপ্তম দফা: উত্তাপ ও অভিযোগে মোড়া দিন
এই দফায় উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার আসনগুলিতে ভোটগ্রহণ হয়। দুই শিবিরের প্রচারে ‘ভোট লুট’ ও ‘ভয় দেখানো’ -এর পাল্টাপাল্টি অভিযোগে উত্তাপ ছড়ায়।
অষ্টম দফা: শেষ দফায় বোমা ও উত্তেজনা
শেষ দফা ভোট হয় ২৯ এপ্রিল ২০২১। উত্তর কলকাতার মহাজাতি সদনের কাছে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। দিনভর টানটান উত্তেজনা ও কড়া নিরাপত্তার মধ্যে শেষ হয় রাজ্যের দীর্ঘতম নির্বাচন পর্ব।
সব দিক দিয়ে এই আট দফার ভোটযাত্রা শুধু একটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, এটি ছিল প্রশাসনিক পরীক্ষার ক্ষেত্র। ওয়েবকাস্টিং, ভিভিপ্যাট, ফ্লাইং স্কোয়াডের ব্যবহারে প্রযুক্তিগত স্বচ্ছতা আনতে চেষ্টা হলেও, সহিংসতা ও অভিযোগে স্বাভাবিকতা ব্যাহত হয়। তবু এই বিশাল প্রক্রিয়া পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক কাঠামোর এক জীবন্ত প্রমাণ হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়।
(চলবে)
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত




