সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আবারও উত্তপ্ত বিতর্ক। ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া (SIR) ঘিরে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির (BJP) সংঘাত নতুন মাত্রা পেল বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) -এর সাম্প্রতিক এক্স (X) পোস্টের মাধ্যমে। তাঁর দাবি, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) -এর চিঠি প্রমাণ করছে, “স্বচ্ছ ভোটার তালিকাই নাকি তৃণমূলের সবচেয়ে বড় ভয়।”
রাজনৈতিক মহল মনে করছে, ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণ নিয়ে এমন সরাসরি আক্রমণ আগামী বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতিকে আরও তীব্র করবে। শমীক ভট্টাচার্য তাঁর পোস্টে আরও অভিযোগ তুলেছেন, SIR শুরু হতেই নাকি একের পর এক ‘ভুয়ো ভোট’, ‘ডুপ্লিকেট নাম’ এবং ‘মৃত ভোটারের নাম’ সামনে এসে পড়ছে। তাঁর বক্তব্য, “তাই এখন ‘অমানবিক’, ‘অবাস্তব’, ‘থামান থামান’ বলে চিৎকার শুরু হয়েছে। সত্যি খুব সহজ- স্বচ্ছ ভোটার তালিকা মানেই তৃণমূলের ভুয়ো ভোটের রাজনীতি শেষ হয়ে যাওয়া।” উল্লেখ্য, তাঁর এই মন্তব্য মুহূর্তেই চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, ভোটার তালিকা নিয়ে লড়াই বাংলার রাজনীতিতে বহুদিনের, কিন্তু এবার বিষয়টি সরাসরি শাসক ও বিরোধীর সংঘাতে নতুন রূপ নিচ্ছে।

বিজেপি রাজ্য সভাপতির অভিযোগ, রাজ্যের BLO-দের প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা এবং সমন্বয়- এসবের দায়িত্ব রাজ্য সরকারের। তাঁর কথায়, “নিজেদের অপদক্ষতা ঢাকতেই এখন কৃষক, ব্যস্ত মরসুম, অতিরিক্ত চাপ- এসবের নামে নাটক চলছে।” শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেন, প্রকৃত প্রশ্ন অন্যত্র। তিনি বলেন, “রেশন, আবাস, আয়ুষ্মান বা PM-কিসান- কোনও সুবিধা সঠিকভাবে মানুষকে দিতে গেলে সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে সঠিক তালিকা। অথচ তৃণমূল সেই মৌলিক বিষয়েই আপত্তি তুলছে।”
বঙ্গ রাজনীতিতে কৃষক শব্দটি এখন অত্যন্ত স্পর্শকাতর। শাসক দল কৃষকদের সমস্যার কথা তুলে ধরে SIR আটকে দেওয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছে। কিন্তু শমীক ভট্টাচার্য বলেন, তৃণমূল কৃষকের কথা বলে আবেগ দেখানোর চেষ্টা করছে মাত্র, বাস্তবে ভুয়ো ভোট মুছে গেলে তৃণমূলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাঁর কথায়, “বাংলার মানুষের প্রশ্ন- SIR বন্ধ হলে লাভ কার? সাধারণ ভোটারের নয়, কেবল তৃণমূলেরই।” এই বক্তব্য ঘিরে সরগরম রাজনৈতিক মহল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপির এই বার্তা স্পষ্ট, তাঁরা চাইছেন ‘স্বচ্ছ ভোটার তালিকা’ এবং ‘ভুয়ো ভোট’ ইস্যুকে আগামী নির্বাচনের মূল অস্ত্র বানাতে। অপরদিকে তৃণমূল কংগ্রেস দাবি করছে, কেন্দ্রীয় সংস্থার নির্দেশে যে ‘অমানবিক সময়সূচি’ তৈরি করা হয়েছে, তা কৃষকদের কাজের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। কিন্তু বিজেপির বক্তব্য, এগুলো ‘অজুহাত’ মাত্র।

শমীক ভট্টাচার্য স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “SIR চলবে। ভোটার তালিকা ভুয়ো মুক্ত হবেই। তৃণমূল যতই চিঠি লিখুক, নাটক করুক- পশ্চিমবঙ্গ এবার স্বচ্ছ ভোটের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।” এই মন্তব্যের পর থেকেই রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে। শাসক দল এখনও সরাসরি প্রতিক্রিয়া না দিলেও তৃণমূলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই বিজেপি বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।” তাঁদের মতে, কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন এমন সময় তালিকা সংশোধনের কাজ চাপিয়ে দিচ্ছে যখন কৃষক এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য সময়টা অত্যন্ত ব্যস্ত, এটাই তাদের আপত্তির মূল কথা। তবে বিজেপির দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, ভুয়ো ভোট নির্মূলের প্রক্রিয়ায় আপত্তি দেখানো মানেই রাজ্য সরকারের ‘অস্বচ্ছ রাজনীতির’ প্রমাণ। আগামী নির্বাচনে এই প্রসঙ্গ বিরোধীদের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের একাংশ।
বাংলার ভোটার তালিকা নিয়ে লড়াই যে আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও প্রকট হবে, তা নিশ্চিত। ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণ ইস্যু তাই এখন কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়, তা রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। একদিকে শাসক তৃণমূল বলছে, ‘মানুষের স্বার্থে অতিরিক্ত চাপ দেওয়া যাবে না’; অন্যদিকে বিজেপির বক্তব্য, ‘স্বচ্ছ ভোটই গণতন্ত্র বাঁচাবে।’এই অবস্থায় জনগণের সামনে একটি প্রশ্নই ঘুরে ফিরে আসছে, ভোটের আগেই কি ভোটার তালিকা নিয়ে এই সংঘাত বাংলার রাজনৈতিক আঙিনায় আরও অস্থিরতা তৈরি করবে? নাকি এই বিতর্ক ভুয়ো ভোটের ইস্যুকে আবারও সামনে এনে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করবে? সব মিলিয়ে, SIR নিয়ে এই দ্বন্দ্ব যে ভোট-রাজনীতির ময়দানে বড় প্রভাব ফেলবে, তা বলাই যায়।
ছবি : সংগৃহীত




