সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক অভিযোগে জড়িয়ে পড়ছেন তৃণমূল কংগ্রেস -এর জনপ্রতিনিধিরা। শুক্রবার রাত থেকে শনিবার ভোর, এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই দুই কাউন্সিলরের গ্রেফতারির ঘটনায় তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে রাজ্য রাজনীতিতে। একদিকে বসিরহাটে (Basirhat) আবাস যোজনা (Awas Yojana) ঘিরে তোলাবাজির অভিযোগে ধরা পড়েছেন কাউন্সিলর গোপাল দাস (Gopal Das), অন্যদিকে রাজপুর-সোনারপুরে (Rajpur Sonarpur) মাছ চুরির অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছেন কাউন্সিলর বরুণ সরকার (Barun Sarkar)। পরপর এই দুই ঘটনায় শাসকদলের ভাবমূর্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। বসিরহাট পুরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গোপাল দাসকে শুক্রবার রাতে তাঁর বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অভিযোগ, আবাস যোজনার সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে স্থানীয়দের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা তুলতেন তিনি। এলাকার বহু মানুষের দাবি, ‘যাঁদের সত্যিই ঘর প্রয়োজন ছিল, তাঁরা টাকা না দেওয়ায় বঞ্চিত হয়েছেন।’ আবার অনেকে অভিযোগ করেছেন, টাকা দেওয়ার পরেও ঘর মেলেনি।
স্থানীয় একজন বাসিন্দার কথায়, ‘ঘর পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অনেকের কাছ থেকে টাকা নিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি।’ এই অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় ঘুরছিল। কিছুদিন আগে গোপাল দাসের বাড়ির সামনে বিক্ষোভও দেখান স্থানীয়রা। সেই সময় থেকেই তাঁর গ্রেফতারির দাবি উঠেছিল। অবশেষে শুক্রবার রাতে পুলিশ পদক্ষেপ করে। অন্যদিকে রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর বরুণ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও সমানভাবে চাঞ্চল্যকর। শনিবার ভোরে তাঁকে একটি মাছের ভেড়ি থেকে মাছ চুরির অভিযোগে হাতেনাতে ধরে ফেলে স্থানীয় মানুষ। অভিযোগ, তিনি কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে ভেড়িতে গিয়ে মাছ তুলছিলেন। বিষয়টি নজরে আসতেই এলাকাবাসী তাঁকে ঘিরে ফেলে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, ‘আমরা দেখেছি ভেড়ি থেকে মাছ তোলা হচ্ছে। পরে বুঝতে পারি, তিনি আমাদের এলাকার কাউন্সিলর।’ পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং স্থানীয়রা তাঁকে আটক করে রাখেন। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় পুলিশ। উত্তেজিত জনতার হাত থেকে বরুণ সরকারকে উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে মাছ চুরির অভিযোগে মামলা রুজু করে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই দুই ঘটনার পর রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও তপ্ত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই তৃণমূলের সংগঠনে অস্থিরতার ছবি সামনে আসছে। বিভিন্ন জায়গায় কাউন্সিলরদের পদত্যাগ, গ্রেফতারি এবং নানা বিতর্ক একের পর এক সামনে আসছে।
হুগলির (Hooghly) চন্দননগরে (Chandannagar) সম্প্রতি একসঙ্গে ৩০ জন কাউন্সিলরের পদত্যাগে পুরবোর্ড ভেঙে পড়ার ঘটনা ইতিমধ্যেই আলোচনায় ছিল। তার মধ্যেই আবার নতুন করে গ্রেফতারির ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শুধু তাই নয়, কয়েকদিন আগে দমদমে (Dum Dum) এক কাউন্সিলরের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। সেই মৃত্যুকে ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। যদিও পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, এটি আত্মঘাতী ঘটনা হতে পারে, তবুও রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে।
বসিরহাটের ঘটনায় আবাস যোজনার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প নিয়ে অভিযোগ সামনে আসায় প্রশাসনের উপর চাপ বাড়ছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য যেখানে দরিদ্র মানুষের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা, সেখানে যদি অর্থের বিনিময়ে সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে প্রকৃত প্রাপকেরা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। সোনারপুরের ঘটনাও কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। একজন জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে সরাসরি চুরির অভিযোগ এবং তা ঘিরে জনতার ক্ষোভ প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থার প্রশ্ন তুলছে। স্থানীয়দের বক্তব্য, ‘জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ প্রত্যাশিত নয়।’ পুলিশ সূত্রে খবর, দুই ক্ষেত্রেই তদন্ত শুরু হয়েছে। গোপাল দাসের বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে বরুণ সরকারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে, এই ধরনের ঘটনার ফলে রাজ্যের শাসকদলের ওপর চাপ বাড়তে পারে। বিরোধী দলগুলিও ইতিমধ্যেই এই ইস্যুতে সরব হয়েছে। তাদের দাবি, প্রশাসনিক স্তরে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তবে, তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই ঘটনাগুলি নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। দলের অভ্যন্তরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গিয়েছে। পরপর এই ঘটনাগুলি রাজ্যের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এনে দিয়েছে। আগামী দিনে তদন্ত কোন দিকে এগোয় এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে আপাতত সোনারপুর ও বসিরহাটের এই দুই ঘটনা রাজ্যের জনমানসে গভীর প্রভাব ফেলেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Samik Bhattacharya | মন্দারমণির অবৈধ রিসোর্ট থেকে রাজবংশী-কামতাপুরি ভাষা স্বীকৃতি : রাজ্যসভায় দ্বিমুখী ইস্যুতে সরব শমীক ভট্টাচার্য



