সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : কলকাতা বিমানবন্দর (Kolkata Airport) ঘিরে আবারও সামনে এল আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণ পাচারের চাঞ্চল্যকর চিত্র। মালয়েশিয়ার (Malaysia) উদ্দেশে পাচারের আগে আন্তর্জাতিক কার্গো বিভাগ থেকে উদ্ধার করা হল ৫৫০টি বিরল প্রজাতির ‘স্নেক হেড’ মাছ, যা ‘তিলা শোল’ নামেও পরিচিত। এই ঘটনায় তদন্তকারীদের নজরে এসেছে এক বাঙালি ব্যবসায়ীর নাম, যাঁর সংস্থার মাধ্যমেই এই পাচারের ছক কষা হয়েছিল বলে অভিযোগ। রবিবার গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ওয়াইল্ড লাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরো (Wildlife Crime Control Bureau বা WCCB) কলকাতা বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক কার্গো টার্মিনালে হানা দেয়। সেখানে একটি সন্দেহজনক চালান পরীক্ষা করতে গিয়ে চমকে ওঠেন আধিকারিকরা। সামুদ্রিক মাছ হিসেবে ঘোষিত প্যাকেটের ভিতরে পাওয়া যায় বিরল প্রজাতির ৫৫০টি জীবন্ত মাছ। উদ্ধার হওয়া মাছগুলির বৈজ্ঞানিক নাম ‘চান্না বার্কা’ (Channa barca), যা আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত মূল্যবান হিসেবে পরিচিত।
আরও পড়ুন : Donald Trump vs Elon Musk | ডোনাল্ড ট্রাম্প ইলন মাস্ক সংঘাত, ট্রাম্পের তীব্র আক্রমণ ইলন মাস্ককে
তদন্তকারী আধিকারিকদের একাংশ জানিয়েছেন, ‘মালয়েশিয়ার কুয়ালা লামপুরে (Kuala Lumpur) এই মাছ পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। চালানে ভুয়ো তথ্য দিয়ে পাচারের চেষ্টা করা হচ্ছিল।’ প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে, সামুদ্রিক মাছের আড়ালে এই বিরল প্রজাতির মাছ বিদেশে পাচারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। উদ্ধার হওয়া ‘স্নেক হেড’ বা তিলা শোল মাছ সাধারণত উত্তর-পূর্ব ভারতের (Northeast India) নদী ও জলাভূমিতে পাওয়া যায়। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র (Brahmaputra) অববাহিকায় এই প্রজাতির উপস্থিতি বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে পরিবেশগত পরিবর্তন ও অতিরিক্ত শিকারের কারণে এই মাছের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা বেড়েছে বহুগুণ।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই পাচারচক্রের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন হিন্দোল হালদার (Hindol Halder) নামে এক ব্যবসায়ী। অভিযোগ, তাঁর সংস্থার মাধ্যমেই এই মাছগুলি বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে এই মাছগুলি কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা নিয়ে খোঁজ শুরু হয়েছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ‘এই চক্রের সঙ্গে আরও কয়েকজন যুক্ত থাকতে পারে। পুরো নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করার কাজ চলছে।’ প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের পাচারের ক্ষেত্রে উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশ (Bangladesh) থেকে মাছ সংগ্রহ করে তা কলকাতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর একটি রুট ব্যবহার করা হয়। অতীতে কলকাতা ও অসমে (Assam) একাধিক অভিযানে এই ধরনের পাচার রুখে দেওয়া হয়েছে। তবুও চক্রটি নতুন নতুন কৌশল নিয়ে সক্রিয় রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া মাছগুলির স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে ও তাদের নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ আইন অনুযায়ী, এই ধরনের বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণ পাচার গুরুতর অপরাধ। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা। এই ঘটনায় আবারও সামনে এল বিমানবন্দরকে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পাচারের প্রবণতা। বিশেষ করে বিরল প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদ বিদেশে পাচারের জন্য ভুয়ো নথি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ‘কার্গো স্ক্যানিং এবং নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানো যায়।’
বিমানবন্দর সূত্রে খবর, চালানটি নিয়মিত পরীক্ষার মধ্যে পড়লেও গোপন তথ্যের ভিত্তিতেই বিশেষ নজর দেওয়া হয়। সেই কারণেই এই বিপুল পরিমাণ মাছ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, ‘এই অভিযান না হলে বিরল প্রজাতির এই মাছগুলি বিদেশে পৌঁছে যেত এবং চক্রটি ধরা পড়ত না।’ উল্লেখ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা মহলের একাংশ মনে করছে, এই ধরনের পাচার রুখতে কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আরও বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বিরল প্রজাতির প্রাণী পাচার বন্ধ করতে নজরদারি বাড়ানো জরুরি।
ঘটনার পর থেকেই কলকাতা বিমানবন্দর এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহজনক কার্গো চালানগুলির উপর বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একাধিক সূত্রে তথ্য সংগ্রহ করছে তদন্তকারী দল। এই ঘটনায় আইন অনুযায়ী বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনের (Wildlife Protection Act) বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু হতে পারে বলে জানা গিয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের প্রস্তুতি চলছে। তদন্তকারীরা এখন জানতে চাইছেন, এই পাচারের পেছনে বড় কোনও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক কাজ করছে কি না। কলকাতা বিমানবন্দরের এই অভিযান আবারও দেখাল, বিরল প্রজাতির প্রাণী পাচার একটি সংগঠিত অপরাধ হিসেবে ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে। এই ধরনের অপরাধ রুখতে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : US tariff on India Russia oil | রাশিয়ার তেল কেনায় ১০০% শুল্কের প্রস্তাব, ভারত-চিনকে ঘিরে নতুন মার্কিন কৌশল নিয়ে জোর জল্পনা




