‘সাইলেন্ট ভোটার’- এর প্রভাবেই বদলে যেতে পারে ফল, এক্সিট পোলকে চ্যালেঞ্জ মৌন জনমত
সাশ্রয় নিউজ, কলকাতা : হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের নির্বাচনে ফলাফল নির্ধারণে অনেক সময় সবচেয়ে বড় ভূমিকা নেয় সেই ভোটারদের একটি অংশ, যাঁরা নিজেদের মতামত প্রকাশ্যে আনেন না। নির্বাচনী পরিভাষায় এঁদের বলা হয় ‘সাইলেন্ট ভোটার’ (Silent Voters)। বিশেষজ্ঞদের মতে, বুথফেরত সমীক্ষা (Exit Poll) যতই কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে এগিয়ে রাখুক না কেন, এই মৌন ভোটারদের অবস্থানই শেষ পর্যন্ত সমীকরণ বদলে দিতে পারে। নির্বাচনী বিশ্লেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, মৌন ভোটার হলেন সেই সব মানুষ, যাঁরা ভোট দেওয়ার পর সমীক্ষাকারীদের কাছে নিজেদের পছন্দের দল বা প্রার্থীর নাম বলতে অনিচ্ছুক থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক মেরুকরণ (Political Polarization) বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের কারণে তাঁরা নিজেদের মত গোপন রাখেন। বিশিষ্ট নির্বাচন বিশ্লেষক Pradeep Gupta – র মতে, “অনেক সময় প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার তাঁদের প্রকৃত মতামত প্রকাশ করেন না, যা সমীক্ষার ফলাফলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।”
বুথফেরত সমীক্ষা মূলত ভোটারদের দেওয়া উত্তরের উপর নির্ভর করে তৈরি হয়। কিন্তু যদি বড় একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তর না দেয় বা ভিন্ন তথ্য প্রদান করে, তাহলে সমীক্ষার নির্ভুলতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই পরিস্থিতিকে বিশ্লেষকরা ‘স্ট্রাকচারাল ব্লাইন্ড স্পট’ (Structural Blind Spot) হিসেবে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, সমীক্ষার কাঠামোর মধ্যেই এমন একটি দুর্বলতা তৈরি হয়, যা প্রকৃত জনমতকে সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত করতে ব্যর্থ হয়। পশ্চিমবঙ্গের মতো উচ্চ মেরুকরণের রাজ্যে এই প্রবণতা আরও প্রকট বলে মনে করা হচ্ছে। এখানে Bharatiya Janata Party এবং All India Trinamool Congress – এর মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক লড়াই চলায় অনেক ভোটার নিজেদের পছন্দ প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ ভোটদানের হার (High Voter Turnout) এবং ভোটারদের এই নীরবতা একসঙ্গে মিলে ফলাফলকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে তামিলনাড়ু (Tamil Nadu) এবং পশ্চিমবঙ্গ দুই রাজ্যেই বুথফেরত সমীক্ষাগুলিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এই সমীক্ষা প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে পারছে না, কারণ মৌন ভোটারদের অবস্থান অজানা রয়ে গেছে। এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের কথায়, ‘এক্সিট পোল ট্রেন্ড দেখায়, কিন্তু চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে অপ্রকাশিত ভোট (Hidden Vote Bank)।’ আজ ৪ মে-র গণনা (Vote Counting Day) যতই এগিয়ে আসছে, ততই এই ‘হিডেন সুইং ফ্যাক্টর’ (Hidden Swing Factor) নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, শেষ মুহূর্তে এই ধরনের ভোটাররাই ফলাফল পুরোপুরি উল্টে দিয়েছেন। অতীতের একাধিক নির্বাচনে এক্সিট পোলের পূর্বাভাস ভেস্তে যাওয়ার পিছনে এই মৌন ভোটারদের বড় ভূমিকা ছিল বলে মত বিশেষজ্ঞদের। তবে এটাও স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে, মৌন ভোটাররা কোনওভাবেই উদাসীন নন। বরং তাঁরা সচেতনভাবেই নিজেদের মত গোপন রাখেন, যা গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত (Strategic Voting Behaviour) হিসেবে দেখা হয়। স্থানীয় রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা, সামাজিক সম্পর্ক বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই অনেকেই এই পথ বেছে নেন। সব মিলিয়ে, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে যতই পূর্বাভাস দেওয়া হোক না কেন, বাস্তব চিত্র স্পষ্ট হবে শুধুমাত্র গণনার দিনই। আর সেই দিনেই জানা যাবে, মৌন ভোটারদের অদৃশ্য শক্তি শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে রায় দিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘গণতন্ত্রে শেষ কথা বলে ভোটবাক্স, আর সেই বাক্সে থাকা নীরব ভোটই সবচেয়ে বড় নির্ধারক।’



