সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লি : দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশক ধরে জীববিজ্ঞানের পাঠ্যপুস্তকে যে ‘সিগমা চক্র’ (Sigma Cycle) তত্ত্ব পড়ানো হয়েছে, তার পুনর্মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিলেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা। নতুন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ব্যাকটেরিয়ার জিন সক্রিয়করণের প্রচলিত মডেল সব ক্ষেত্রে খাটে না। এই আবিষ্কার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে উন্নত অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি, জিন নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্যভিত্তিক অবরোধক নকশা এবং জৈব জ্বালানি বা জৈব-অবক্ষয়যোগ্য প্লাস্টিক উৎপাদনকারী অণুজীব তৈরিতে ভবিষ্যৎ গবেষণাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি দপ্তর (Department of Science and Technology বা DST)-এর স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান বোস ইনস্টিটিউট (Bose Institute) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয় (Rutgers University) -এর যৌথ উদ্যোগে এই গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেসের কার্যবিবরণীতে (Proceedings of the National Academy of Sciences বা PNAS)। গবেষকদলের বক্তব্য, ‘দশকের পর দশক যে ধারণা প্রতিষ্ঠিত ছিল, আমাদের পর্যবেক্ষণ তা সব ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে দেখাচ্ছে।’ প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী, ব্যাকটেরিয়া তাদের জিন সক্রিয় করতে ‘সিগমা ফ্যাক্টর’ ব্যবহার করে। এই সিগমা ফ্যাক্টর আরএনএ পলিমেরেজের (RNA Polymerase) সঙ্গে যুক্ত হয়ে ট্রান্সক্রিপশন বা প্রতিলিপি প্রক্রিয়া শুরু করে এবং পরে আলাদা হয়ে যায়, যাতে জিনের সম্প্রসারণ ঘটে। এই ধারণা মূলত ইশেরিশিয়া কোলাই (Escherichia coli) প্রজাতির σ70 ফ্যাক্টর পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল।
আরও পড়ুন : Kiss Day 2026: শুধু ঠোঁটে ঠোঁট নয়, চুম্বনের আছে বিজ্ঞান, ইতিহাস ও বহু রূপ, জানেন সবটা?
কিন্তু বোস ইনস্টিটিউটের প্রধান লেখক ড. জয়ন্ত মুখোপাধ্যায় (Dr. Jayanta Mukhopadhyay) জানান, ‘আমাদের গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ব্যাসিলাস সাবটিলিস-এ (Bacillus subtilis) σA ফ্যাক্টর ট্রান্সক্রিপশন চলাকালীন আরএনএ পলিমেরেজ থেকে আলাদা হয় না; বরং তা যুক্ত অবস্থাতেই থাকে।’ তাঁর কথায়, এই ফলাফল ব্যাকটেরিয়ার জিন নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণায় মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। গবেষকরা জৈবরাসায়নিক পরীক্ষা, ক্রোমাটিন ইমিউনোপ্রেসিপিটেশন (Chromatin Immunoprecipitation) এবং ফ্লুরোসেন্স-ভিত্তিক ইমেজিং প্রযুক্তির সমন্বয়ে সিগমা ফ্যাক্টরের আচরণ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, ব্যাসিলাস সাবটিলিস-এর σA এবং ই. কোলাই σ70 -এর একটি পরিবর্তিত রূপ, যেখানে ১.১ নামক অংশ অনুপস্থিত, ট্রান্সক্রিপশন কমপ্লেক্সের সঙ্গে স্থিতিশীলভাবে যুক্ত থাকে। এটি পূর্ণদৈর্ঘ্য ই. কোলাই σ70 -এর আচরণের থেকে ভিন্ন, যা সম্প্রসারণ পর্যায়ে অনিয়মিতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সহ-লেখক অনিরুদ্ধ তিওয়ারি (Aniruddha Tiwari) বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে গৃহীত সিগমা চক্র সব ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এই ধারণা আমাদের ফলাফলে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ব্যাকটেরিয়ার জিন নিয়ন্ত্রণ ও তার বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে এটি নতুন দিক উন্মোচন করছে।’
গবেষণায় আরও অংশ নিয়েছেন শ্রেয়া সেনগুপ্ত (Shreya Sengupta), সৌম্য মুখার্জী (Soumya Mukherjee), নীলাঞ্জনা হাজরা (Nilanjana Hazra) এবং রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইয়ং ডব্লিউ. এব্রাইট (Yon W. Ebright), রিচার্ড এইচ. এব্রাইট (Richard H. Ebright)। আন্তর্জাতিক এই সহযোগিতা প্রমাণ করছে, অণুজীববিজ্ঞানে মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব কতটা জরুরি। এই আবিষ্কারের প্রভাব কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাকটেরিয়ার ট্রান্সক্রিপশন প্রক্রিয়া লক্ষ্য করে নতুন প্রজন্মের অ্যান্টিবায়োটিক তৈরির ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হতে পারে। সংক্রমণ সৃষ্টিকারী জীবাণুর জিন সক্রিয়করণ প্রক্রিয়া যদি ভিন্নভাবে কাজ করে, তবে ওষুধের লক্ষ্য নির্ধারণেও পরিবর্তন প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিল্পক্ষেত্রে উপযোগী অণুজীব, যারা দক্ষতার সঙ্গে জৈব জ্বালানি, বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক বা চিকিৎসায় ব্যবহৃত যৌগ তৈরি করতে সক্ষম, তাদের জিন নিয়ন্ত্রণে উন্নত কৌশল উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। অণুজীবের চাপ-প্রতিক্রিয়া, বিপাকক্রিয়া এবং পরিবেশগত অভিযোজন বোঝার ক্ষেত্রেও এই গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। ট্রান্সক্রিপশন চলাকালীন সিগমা ফ্যাক্টর যুক্ত থাকা বা বিচ্ছিন্ন হওয়ার ধরন ব্যাকটেরিয়ার শারীরবৃত্তীয় আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ব্যাকটেরিয়ার অভিযোজনক্ষমতা ও রোগসৃষ্টির ক্ষমতা বিশ্লেষণে নতুন প্রশ্ন উঠে আসছে।
পঞ্চাশ বছরের প্রতিষ্ঠিত মডেলকে পুনর্মূল্যায়ন করা সহজ কাজ নয়। তবু পরীক্ষাগার-ভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ও তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ দেখাচ্ছে, জিন নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়া ব্যাকটেরিয়া-ভেদে ভিন্ন হতে পারে। এই উপলব্ধি ভবিষ্যৎ গবেষণাকে আরও সূক্ষ্ম ও লক্ষ্যভিত্তিক পথে এগিয়ে নিতে সহায়ক হবে। অণুজীববিজ্ঞানের পাঠ্যক্রম, গবেষণার পদ্ধতি এবং অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনের কৌশলে এই আবিষ্কার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। বৈজ্ঞানিক সমাজে ইতিমধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সিগমা চক্রের পুনর্বিবেচনা। নতুন তথ্য ইঙ্গিত করছে, জিন সক্রিয়করণের গতিবিদ্যা একরৈখিক নয় বরং প্রজাতিভেদে তার রূপভেদ রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের গবেষণায় আরও বিস্তৃত প্রজাতি-ভিত্তিক বিশ্লেষণের প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে।
ছবি : প্রতিনিধিত্বমূলক।
আরও পড়ুন : Are Women Choosing Motherhood Less? Shocking Research Insights | মহিলাদের মধ্যে সন্তান নেওয়ার চাহিদা কি কমছে? গবেষণার চমকপ্রদ তথ্য



