মধুজা সান্যাল ★ সাশ্রয় নিউজ : আলিঙ্গনের পরশে যে মন ভাল হয়ে যায়, তা নতুন কথা নয়। চিরকালই মানুষের শরীর ও মনের যত্নে কাছের মানুষের ছোঁয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। প্রেমিক-প্রেমিকা, বাবা-মা, সন্তান, কিংবা প্রিয় বন্ধু, কাউকে জড়িয়ে ধরার মধ্যে থাকে এক প্রাকৃতিক আরাম। এক নির্ভরতার আশ্বাস। কিন্তু যদি পাশে কেউ না থাকেন? কিংবা হয়ত আছে। কিন্তু মুহূর্তটা শূন্য? সেই একাকিত্বের গভীরে আলিঙ্গনের উষ্ণতা তখন কোথা থেকে পাবেন? এই প্রশ্নের উত্তরই যেন নিয়ে এসেছে আধুনিক মনোবিজ্ঞান ও নার্সিং-গবেষণা। বিজ্ঞান বলছে, আপনি নিজেই হতে পারেন নিজের আশ্রয়। হ্যাঁ, নিজেকে আলিঙ্গন করার মধ্যেও রয়েছে অশেষ মানসিক ও শারীরিক উপকারিতা, এমনই দাবি করছেন একাধিক গবেষক।

সম্প্রতি ‘জার্নাল অফ নার্সিং প্র্যাক্টিস’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে উঠে এসেছে আশ্চর্য তথ্য। ইন্দোনেশিয়ার গবেষক ইউলিয়া সুসান্তি (Yulia Susanti)-র নেতৃত্বে একটি গবেষকদল ২২ জন স্বেচ্ছাসেবী অংশগ্রহণকারীর উপর এই পরীক্ষা চালান। তাঁদের বলা হয়, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে নিজেকে জড়িয়ে ধরতে। আগে ও পরে তাঁদের উদ্বেগের মাত্রা পরিমাপ করতে হয় একটি ফর্ম ফিল-আপের মাধ্যমে। গবেষণার ফলাফলে স্পষ্ট, নিজেকে আলিঙ্গন করার পরে অংশগ্রহণকারীদের উৎকণ্ঠা অনেকটাই কমে যায়। শুধু উদ্বেগ নয়, নিজেকে জড়িয়ে ধরলে শরীরের ব্যথা উপশমেও পাওয়া যেতে পারে উল্লেখযোগ্য উপকার। ২০১১ সালে প্রকাশিত এক নিউরোসায়েন্স গবেষণাপত্রে বলা হয়, শরীর যখন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যথা অনুভব করে এবং সেই অবস্থায় আমরা নিজেকে জড়িয়ে ধরি, তখন মস্তিষ্ক বিভ্রান্ত হয় ব্যথার অবস্থান নির্ধারণ করতে গিয়ে। এতে ব্যথার তীব্রতা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ প্রসঙ্গে হরমোনের কথাও উল্লেখযোগ্য। মানব শরীরে অক্সিটোসিন (Oxytocin), যাকে ‘হ্যাপি হরমোন’ বা ‘লাভ হরমোন’ বলা হয়, তার নিঃসরণ বেড়ে যায় আলিঙ্গনের ফলে। ফলে উদ্বেগ, দুঃখ, রাগ বা নিরাপত্তাহীনতার মতো আবেগ অনেকটা হালকা হয়ে যায়। অন্যকে আলিঙ্গনের মতোই নিজের শরীরকেও জড়িয়ে ধরলে এই হরমোন নিঃসরণ হয় বলে জানিয়েছেন মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশ।

আরও পড়ুন : Palak Tiwari: সলমনের জন্য পারিশ্রমিক নেননি পলক তিওয়ারি
আসলে মানব মস্তিষ্ক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার মধ্যে এক সূক্ষ্ম সেতু গড়ে তোলে। আমরা কোনও কাজ যখন অভ্যাসগতভাবে করি, তা সে ব্যায়াম হোক বা প্রার্থনা, কিংবা আলিঙ্গন। তাতে নির্দিষ্ট হরমোন নিঃসৃত হয়, যা প্রভাব ফেলে আমাদের স্নায়ুতন্ত্রে। নিজেকে আলিঙ্গন করার ফলে তৈরি হয় এক রকম নিরাপত্তার অনুভব, যা অন্তঃস্থলে আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। অনেক সময় আমরা নিজের প্রতি অত্যন্ত কঠোর হয়ে পড়ি। আত্মসমালোচনা, আত্মদ্বন্দ্ব আমাদের ভেতরে জন্ম দেয় এক অদ্ভুত দূরত্ব, নিজেরই সঙ্গে। এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে জড়িয়ে ধরা এক ধরনের আত্মিক সংযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আলিঙ্গন একটি গভীর বার্তা বহন করে, ‘আমি তোর পাশে আছি’। এই বার্তাটি যত বেশি মনের গভীরে পৌঁছয়, ততই গড়ে ওঠে এক ইতিবাচক মনোভাব। একাকিত্বে ভোগা মানুষের সংখ্যা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। ডিজিটাল যুগের নির্জনতা, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম সংযোগ। সব মিলিয়ে বাস্তব যোগাযোগ কমে এসেছে অনেকটাই। তাই হেলথ ওয়েলনেস কাউন্সেলরদের মতে, আত্মসম্মান ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতিতে নিজেকে আলিঙ্গন করা এক কার্যকরী কৌশল হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এটি কোনও ‘প্লেসহোল্ডার’ নয়। অর্থাৎ অন্য কাউকে আলিঙ্গনের বিকল্প নয়। এটি নিজেকে ভালবাসার একটি প্রয়াস। যদি কেউ গভীর হতাশা বা অবসাদে ভোগেন, তবে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

তবে প্রাথমিক স্তরে মানসিক ভারসাম্য রক্ষায় এই ছোট্ট অভ্যাসটি বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে। অতএব, পরবর্তী বার যখন মনে হবে, কেউ বুঝছে না, পাশে নেই, আপনি একা, তখন দাঁড়িয়ে আয়নার সামনে নিজেকে একটু জড়িয়ে ধরুন। হয়ত তা আপনাকে সেই ক্ষণিক ভালবাসা ও নিশ্চিন্তি দেবে, যা আপনি এত ক্ষণ ধরে খুঁজছিলেন বাইরের জগতে।আলিঙ্গন, হোক তা নিজের সঙ্গেই। একটি নিঃশব্দ আশ্বাস, এক বিনম্র প্রেম। নিজেকে আপন করে নেওয়ার প্রথম ধাপ হতে পারে এই নিঃশব্দ স্পর্শ।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Salman Khan : ‘ভাইজান’ থেকে বিনয়ী শিল্পী সলমন খানের মুখে তাঁর সাফল্য আর সংশয়ের গল্প




