সম্পাদকীয়
সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবন যত দ্রুত বদলাচ্ছে, মন যেন ততই অস্থির হয়ে উঠছে। এক মুহূর্তে বহু তথ্য, অসংখ্য মত, অজস্র ধরনের ছবি, শব্দ ও খবর মানুষের সামনে এসে উপস্থিত হচ্ছে। হাতে থাকা স্মার্ট ফোন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম, কর্মক্ষেত্র কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত হীনতারর চাপ তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষের কাছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সম্পদ হয়ে উঠছে মন, মনন, বোধ ও স্থিরতা। অর্থ, প্রযুক্তি কিংবা সাফল্যের দৌড়ের বাইরে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ কতটা নিজের ভিতরের জগৎকে বুঝতে পারছেন, সেটিই ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মনে রাখতে হবে, মন মানুষের আচরণ ও সিদ্ধান্তের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। কিন্তু মন সব সময় একই অবস্থায় থাকে না। কখনও তা আনন্দে ভরে ওঠে, কখনও দুঃখে ভারী হয়, কখনও ক্রোধে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, আবার কখনও অকারণ উদ্বেগে অস্থির হয়ে পড়ে। মনের এই পরিবর্তন স্বাভাবিক। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন মানুষ নিজের মনের গতিবিধি বুঝতে না পেরে তার দ্বারা পরিচালিত হতে থাকেন। একটি ক্ষণিকের রাগ দীর্ঘ দিনের সম্পর্কও নষ্ট করতে পারে। একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত কর্মজীবনে বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। একটি ভুল ধারণা মানুষের বিচারবোধকে দীর্ঘ সময়ের জন্য প্রভাবিত করতে পারে।

এখানেই প্রয়োজন মননের। মন থাকা ও মননশীল হওয়া একেবারেই এক বিষয় নয়। মন অনুভব করে, কিন্তু মনন সেই অনুভূতিকে বিচার করার সুযোগ দেয়। কোনও ঘটনা ঘটলেই তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানানো সহজ। কিন্তু কেন এমন প্রতিক্রিয়া তৈরি হল, তার কারণ কী, সেই প্রতিক্রিয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত আর এর পরিণতি কী হতে পারে? এই প্রশ্নগুলি করার জন্য প্রয়োজন সময়ের। সেই সময়টুকু দেওয়ার অভ্যাসই মননশীলতার অন্যতম ভিত্তি।
এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বর্তমান সমাজে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর প্রবণতা বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনও খবর ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই মতামত তৈরি হচ্ছে। অনেক সময় সম্পূর্ণ তথ্য না জেনেই মানুষ পক্ষ নিচ্ছেন, বিরোধিতা করছেন কিংবা অন্যকে আক্রমণ করছেন। তথ্যের গতি যত বেড়েছে, ভাবার সময় যেন ততধিকই কমেছে। ফলে জ্ঞান ও বোধের পরিসর সব সময় একই হারে বাড়ছে না। এই জায়গাতেই স্থিরতার প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। আবার, স্থিরতা কিন্তু থেমে থাকা না। স্থিরতা হল পরিস্থিতির মধ্যে থেকেও নিজের বিচারবুদ্ধিকে সক্রিয় রাখা। চারপাশে যতই চাপ থাকুক, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছুটা সময় নেওয়া। অন্যের কথায় উত্তেজিত না হয়ে নিজের অবস্থান যাচাই করা। কোনও ব্যর্থতায় ভেঙে না পড়ে সেখান থেকে কারণ খোঁজা। আবার, সাফল্যে নিজে হারিয়ে না গিয়ে পরবর্তী দায়িত্বের কথা মনে রাখা। স্থির মানুষ নিষ্ক্রিয় নন, কিন্তু মানুষের সক্রিয়তার ভিতটি অনেক বেশি সুসংহত।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজের ক্ষেত্রেও মন, মনন, বোধ ও স্থিরতার প্রবল গুরুত্ব অনস্বীকার্য। নাগরিক সমাজের মতপ্রকাশের অধিকার যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনই প্রয়োজন তথ্য যাচাই করার অভ্যাস। মতের অমিল থাকতেই পারে। কিন্তু মতের অমিল যেন ব্যক্তিগত বিদ্বেষে পরিণত না হয়। তার জন্য প্রয়োজন সংযম। রাজনৈতিক মত, সামাজিক অবস্থান কিংবা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের পার্থক্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি না হলে সমাজে বিভাজন বাড়ে। সেখানে যুক্তির জায়গা ক্রমশ সঙ্কুচিত হয় ও উত্তেজনা সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। একইভাবে, পরিবারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বাবা-মা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু কিংবা সহকর্মীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি নতুন কোনও ঘটনা না। কিন্তু প্রতিটি ভুল বোঝাবুঝির উত্তর যদি তাৎক্ষণিক দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে দূরত্ব বাড়বেই। কথার আগে ভাবা উচিৎ, শোনার সময় ধৈর্য রাখা আর নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিকতা সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে। মানুষের বোধ তখনই পরিণত হয়, যখন সে কেবল নিজের বক্তব্য প্রকাশই নয়, অন্যের অবস্থান বোঝার চেষ্টাও করে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও মননের চর্চা জরুরি। শুধু তথ্য মুখস্থ করলেই শিক্ষিত হওয়া যায় না। তথ্যটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটির সামাজিক ও মানবিক প্রভাব কী, সেই প্রশ্ন করার ক্ষমতাই শিক্ষাকে অর্থবহ করে। শিশু ও তরুণদের জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন কিছু সময় প্রযুক্তির বাইরে থাকার অভ্যাস। বই পড়া, প্রকৃতির কাছে থাকা, নিজের সঙ্গে কথা বলা, কোনও বিষয় নিয়ে গভীরভাবে ভাবা, এই অভ্যাসগুলি মনকে ধীর করে এবং চিন্তার পরিসর বৃদ্ধি করে।
অন্যদিকে, কর্মজীবনেও স্থিরতা একটি বড় শক্তি। প্রতিযোগিতা, সময়সীমা, কর্মদক্ষতার চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মানুষ অনেক সময় নিজের প্রয়োজনীয় বিশ্রামটুকুও ভুলে যান। দীর্ঘ সময় ধরে অস্থির অবস্থায় কাজ করলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে। তাই কাজের পাশাপাশি বিরতি, আত্মসমীক্ষা ও মানসিক ভারসাম্যের প্রয়োজন রয়েছে। কাজের গতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সঠিক দিক নির্বাচন আরও গুরুত্বপূর্ণ।
মনকে স্থির রাখার কোনও একক পদ্ধতি নেই তা নয়। প্রত্যেক মানুষের অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজন আলাদা। কারও কাছে বই পড়া কার্যকর, কারও কাছে একাকী সময় কাটানো, আবার কারও কাছে সঙ্গীত, হাঁটা কিংবা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো। মূল বিষয় হল নিজের মনের পরিবর্তনগুলি লক্ষ্য করা। কখন ক্লান্তি বাড়ছে, কখন অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, কখন কোনও সিদ্ধান্ত আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, এসব বুঝতে পারা আত্মপরিচয়েরই অংশ। সমাজ যত দ্রুত বদলাবে, মানুষের সামনে তত বেশি তথ্য ও সিদ্ধান্তের চাপ তৈরি হবে। প্রযুক্তি আরও এগোবে, যোগাযোগ আরও দ্রুত হবে, কাজের ধরন বদলাবে। কিন্তু মানুষের ভিতরের প্রয়োজন বদলাবে না। ভাল থাকা, অর্থপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা, সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া আর নিজের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য মনন ও বোধের প্রয়োজন থেকেই যাবে।
অস্থির সময়ের প্রতিষেধক অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার না, আরও বেশি প্রতিক্রিয়াও নয়। প্রয়োজন কিছুটা অপেক্ষা, দেখা, শোনা ও ভাবা। মনকে অস্বীকার না করে তাকে বোঝা, আবেগকে দমন না করে তাকে পরিচালনা করা আর সিদ্ধান্তের আগে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করা, এই অভ্যাসগুলিই মানুষকে পরিণত করে। কিন্তু, মানুষের প্রকৃত শক্তি নিজের ভেতর। প্রয়োজনে কখন থামতে হবে, কোন পথে এগোতে হবে আর কেন এগোতে হবে তা বুঝতে পারার মধ্যেও তার শক্তি নিহিত। মনকে গভীর ভাবে পাঠ করা, মননকে সক্রিয় রাখা, বোধকে জাগ্রত রাখা ও স্থিরতাকে জীবনের অংশ করে তোলাই তাই বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সামাজিক প্রয়োজন। কারণ, বাইরে যত পরিবর্তনই আসুক, মানুষের ভেতর যদি ভারসাম্য থাকে, তাহলে কঠিন সময়ের মধ্যেও সঠিক পথ খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা মানুষের থাকে।🍁
🍂মহামিলনের কথা
সাবধান, কিছুতে নাম বন্ধ করবি না। দেখ, কোটি কোটি জন্মের ভোগের সংস্কার তোকে ভোগের দিকে টানছে, তুই যদি প্রবল পুরুষার্থ না করিস, তাহলে স্হির হতে কি করে পারবি? নাম করে যেমন আনন্দ হয়, অমনি নাম ছেড়ে অন্য কথা বলিস; আবার যখন জ্বালা ধরে, “রাম রাম” করিস্৷ তা হলে আমায় ধরে রাখতে পারবি কেন? আমায় যদি বেঁধে রাখতে চাস— অবিচ্ছিন্ন ভাবে নাম কর্৷ পাপ আছে— তাতেই বা ভয় কি? তুই কি শুনিস নাই—
তন্নাস্তি কর্মজং লোকে বাগজং মানসমেব বা৷
যন্ন ক্ষপয়তে পাপং কলৌ গোবিন্দকীর্ত্তনম্।।
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
ওরে! তুই নাম কর্!
না, আমি আর তোমার নাম করব না। নাম করে যদি পশুত্ব না যায়— সে নাম করে ফল কি? নাম কত করলাম, তথাপি কৈ মানুষ হতে পারলাম না ত? বৈরাগ্য এল না, ভোগপ্রবণতা গেলনা— তবে আর নাম করে কি হবে? নামে কাজ সাধুদের হয়, নামে কাজ জিতেন্দ্রিয় মহাপুরুষগণের হয় আমার মত ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্রের কিছু হয় না,ও সব তোমার বৃথা স্তোক— বাক্য৷ নামে দুঃখশান্তি হবে— আর কবে হবে? দিনদিন দিন চলে যাচ্ছে, এখনও আমি ঠিক তোমার হতে পারলাম না। পতিতপাবন, পাতকিতারণ, দীনবন্ধু— ও সব নামগুলি মিথ্যা! তুমি ভক্তের কল্পতরু— পাপীর কেহ নও৷ যদি পাপীর প্রতি তোমার বিন্দুমাত্র কৃপা থাকত, তাহলে তুমি আমার সমস্ত বন্ধন মোচন করে দিয়ে তোমার করে নিতে৷ তোমার দয়া হয় না— তাই আজ মা ভাগীরথীর আশ্রয়ে এসেছি— মা যদি অভাগা সন্তানকে দয়া করে কোলে তুলে নেন। তুমি বড় কঠিন, পাষাণ দিয়ে তোমার হৃদয় তৈরি। পাপীর ডাক তোমার হৃদয় স্পর্শ করতে পারে না।

তাই নাকি? হাঁরে, তোর মা ভাগীরথী কে?
ও মা ! তাও ত তোমারই কীর্ত্তি! ও হরি, যেখানে যাই— সেইখানেই তুমি।
তুই কি নামে বিশ্বাস হারালি?
যাও যাও, তোমায় সোহাগ করতে হবে না। তুমি যে কেমন লোক, এবার বেশ বুঝে নিয়েছি।
ও তুই কি বলছিস্? তুই কি নামের প্রতাপ ভুলে গেলি?
নাম্নোহস্য যাবতী শক্তিঃ পাপনির্হরণে হরেঃ।
তাবৎ কর্ত্তুং ন শক্নোতি পাতকং পাতকী জনঃ।।
—তত পাপ পাপী করতে পারে না, যত পাপ আমার নামকীর্তনে নষ্ট হয়। সদা সর্বদা নামকীর্ত্তন কর্— পাপ— প্রবৃত্তি থাকবে না। মাঝে মাঝে যদি বিরাম দিস, সেই রন্ধ্রে ভোগ—প্রবৃত্তি প্রবেশ করে তোকে টেনে নিয়ে গিয়ে ভোগে ডুবিয়ে দেবে। সাবধান, কিছুতে নাম বন্ধ করবি না। দেখ, কোটি কোটি জন্মের ভোগের সংস্কার তোকে ভোগের দিকে টানছে, তুই যদি প্রবল পুরুষার্থ না করিস, তাহলে স্হির হতে কি করে পারবি? নাম করে যেমন আনন্দ হয়, অমনি নাম ছেড়ে অন্য কথা বলিস; আবার যখন জ্বালা ধরে, “রাম রাম” করিস্৷ তা হলে আমায় ধরে রাখতে পারবি কেন? আমায় যদি বেঁধে রাখতে চাস— অবিচ্ছিন্ন ভাবে নাম কর্৷ পাপ আছে— তাতেই বা ভয় কি? তুই কি শুনিস নাই—
তন্নাস্তি কর্মজং লোকে বাগজং মানসমেব বা৷
যন্ন ক্ষপয়তে পাপং কলৌ গোবিন্দকীর্ত্তনম্।।
—এমন কোন কর্মজাত, বাগজ ও মানস পাপ নাই, যে-পাপ এই কলিযুগে, নামকীর্ত্তনের দ্বারা নষ্ট না হয়। তবে তুই কেন ভীত হচ্ছিস্? কেবল নাম কর, যাবৎ স্হির হতে না পারিস তাবৎ নাম কর্, নিশ্চয়ই স্হির হতে পারবি,নিশ্চয়ই তোর সর্ব্বদুঃখ নিবৃত্তি হবে৷ দেখ্, একটি লৌহপিণ্ডকে আগুনে যতক্ষণ রাখা যায় তা ততক্ষণ আগুনের মত থাকে, তার দাহিকা-শক্তি জন্মায়। তারপর তাকে আগুন হতে তুলে নিলে কিছুক্ষণ পরে লৌহপিণ্ডের আর কোন শক্তিই থাকে না, সে যে-লৌহ সেই -লৌহই হয়ে যায়। শত শত জন্মের কর্মদোষে তোর মন লৌহের মত কঠিন হয়ে গেছে। যেটুকু সময় আমার নামরূপ অগ্নিতে মনরূপ লৌহকে ফেলে রাখবি ততটুকু সময় সে অগ্নি হয়েই থাকবে, তখন তার বিশ্বের সমস্ত পাপ ধ্বংস করবার শক্তি আসবে। তারপর তুই যখন নাম ছেড়ে চুপ করে বসে থাকবি, অমনি ভোগের বাতাস লেগে তোর মন শীতল হয়ে গিয়ে যে-লৌহ সেই-লৌহই হয়ে যাবে। তাই বলছি, তোর মনকে আর নাম- আগুন হতে তুলিস না— সে আগুনই হয়ে থাক। এখানকার বাতাস বড় দুষ্ট হয়ে গেছে, বুঝলি?
আচ্ছা, কতদিন তোমার নাম-আগুনে মনকে ফেলে রাখতে হবে?
তুলে কাজ কি? অথবা যতদিন মনরূপ লৌহ খাঁটি না হয় ততদিন নামরূপ অগ্নিতে ফেলে রাখতে হবে৷ যেদিন তার ময়লা মাটী অসার অংশ সব দূর হয়ে সে খাঁটি লৌহে পরিণত হবে, সেদিন একজন ভাল কামার দিয়ে একখানি তরবারি তৈরী করে নিস, সেইদিন আত্মধ্যানরূপ তরবারি দিয়ে তোর অহংতা— মমতা-রূপ দুচ্ছেদ্য রজ্জু দুগাছা কেটে ফেলিস,মুক্ত হয়ে যাবি; তোতে আমাতে চিরমিলন হবে —বুঝলি? নাম কর্— পাপ কতক্ষণ থাকবে?
শ্বাদোহপি নহি শক্নোতি কর্ত্তুং পাপানি যত্নতঃ।
তাবন্তি যাবতী শক্তির্বিষ্ণোর্নাম্নোহশুভক্ষয়ে।।
কুকুরভোজী চণ্ডালও তত পাপ যত্ন করে করতে পারে না, যত পাপ নাশ করবার শক্তি আমার নামের আছে। তুই কি সব ভুলে যাচ্ছিস্? ও কিছু নয়, ও সব বিক্ষেপ “মা শুচ”৷ নাম কর্— নাম কর্৷ সুখ-দুঃখ, শান্তি-অশান্তি, রোগ-শোক কোন দিকে লক্ষ্য করিস না, কেবল নাম করে যা, আমার আজ্ঞা জেনে নাম করে যা। পাপ— পাপ! ওরে নাম করতে করতে তুই-ই থাকবি না, তা তোর পাপ! চালাও নাম— উঠতে বসতে,খেতে শুতে অবিরাম “রাম রাম” কর্।
ন নামসদৃশং জ্ঞানং ন নামসদৃশং ব্রতম্।
ন নামসদৃশং ধ্যানং ন নামসদৃশং ফলম্।।
ন নামসদৃশস্ত্যাগো ন নামসদৃশঃ শমঃ।
ন নামসদৃশং পুণ্যং ন নামসদৃশী গতিঃ।।
বুঝলি ত— নামের প্রতাপ বুঝলি ত?
বেশ ত তুমি! কেবল সরে যাবে? দেখ, তুমি সরে গেলে আমি কেমন হয়ে যাই, আমার যেন সব ফাঁকা হয়ে যায়। তাই কত কথা বলে ফেলি— তুমি যেন রাগ কোরো না।
আমি খুব রাগ করব— তুই যদি নাম করা বন্ধ করিস্৷
—না —না —এই নাম করছি—
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।।
🍁মহারসায়ন | শ্রীশ্রীসীতারামদাস ওঙ্কারনাথদেব
🍂ফিরেপড়া | কবিতা
নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্য -এর একটি কবিতা

বিমলার অভিমান
খাব না তো আমি—
দাদাকে অতটা ক্ষীর, অতখানা অবনীর,
আমার বেলাই বুঝি, ক্ষীর মাত্র নাম-ই?
খাব না তো আমি!
ফুল আনিবার বেলা, ‘যা বিমলা যা,
পূজা করি, দাও এনে, সোনামনি মা’;
কাঁদিলে দুরন্ত খোকা রাখা তারে ভার,
তার বেলা, ‘ও বিমলা, নে মা একবার’;
‘ছাগলেতে নটে গাছ খেলে যে মুড়িয়ে,
যা মা একবার, গিয়ে দে তো মা তাড়িয়ে’;
‘দাদা বসিয়াছে খেতে- দাও তো মা নুন’;
‘পানটা যে বড়ো ঝাল, দে মা এনে চুন’;
যার যত ফরমাস সব তুমি করো,
তাতে তুমি বিমলাটি বাঁচো আর মরো—
খাবারটি আসে যেই আর তারে মনে নেই
তার বেলা রাধু মাধু রামী বামী শ্যামী—
খাব না তো আমি!
দাদা বড়ো, বেশি বেশি খাবে দাদা তাই,
অবু বেশি খাবে- আহা, সেটি ছোটো ভাই;
দু’ধারে সোনার চূড়ো, মাঝেতে ছাইয়ের নুড়ো
তাই বুঝি বিমলার কমে গেছে দাম-ই
খাব না তো আমি!
তারাপদ রায় -এর একটি কবিতা

তিনি আমার ছায়া
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখি।
চুল আঁচড়াই, দাড়ি কামাই,
কখনও নিজেকে ভাল করে দেখি,
ফিসফিস করে নিজেকে জিজ্ঞাসা করি,
‘কেমন আছ, তারাপদ?’
কখনও কখনও নিজেকে বলি,
‘ছেষট্টি বছর বয়েস হল,
যদি আর অর্ধেক জীবন বাঁচো,
শতায়ু হবে।’
নিজের রসিকতায় নিজেই হাসি
নিজে অর্থাৎ আমি নিজে এবং আয়নার নিজে।
এইরকম ভাবে একদিন,
কথা নেই, বার্তা নেই আয়নার নিজে
কি কৌশলে আয়নার থেকে বেরিয়ে আসে।
আমি তাকে বোঝাই, ‘এ হয়না, এ হতে পারে না।’
সে আমাকে বোঝায়, ‘এ হয়না, এ হতে পারে না।’
আয়নার সামনে এইরকম কথা কাটাকাটি হতে হতে
হঠাৎ সে আমাকে এক ধাক্কায়
আয়নার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়।
তারপর থেকে আমি আয়নার ভিতরে।
আর যার সঙ্গে আপনাদের কথাবার্তা, চলাফেরা,
সে তারাপদবাবু কেউ নন,
তিনি আমার ছায়া।
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর
ইতিকথা
মমতা রায় চৌধুরী
২৭.
লতাদি
বিকেলের পড়ন্ত রোদ এসে পড়েছে ব্যালকনিতে আজকের প্রকৃতি যেন অন্যভাবে সেজেছে বসন্ত নয় অথচ মনে হচ্ছে বসন্ত যেন দোর গোরায়। কেমন যেন একটা প্রকৃতিতে মাদকতা মেশানো। কত কথা মনে পড়ে যায়, মনে পড়ে যায় তার গ্রামের কথা মনে পড়ে যায় চিংড়িদের কথা। এচিংড়ি যদিও মাছ নয় চিংড়ি হচ্ছে আমাদের পাশের বাড়ির এলোকেশীর মেয়ে। কে জানে এখন চিংড়িরা কেমন আছে? মা মারা যাবার পর তো আর খবর নিতেই ভুলে গেছে। সেভাবে আর যাওয়া হয় না। মানুষের জীবনে কখন যে কী ঘটে যায়, কেউ বলতে পারে না।
এ যেন মনে হচ্ছে গভীর কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ কিছুই দেখতে পাচ্ছে না কখন সূর্যের আলো উঠবে তবে আস্তে আস্তে কুয়াশা দূরীভূত হবে স্পষ্ট করে আকাশ টাকে দেখতে পাবে।
কেউ বলতে পারে লতাদি যাকে ভালবাসল সেই তার জীবনের সঙ্গে এরকম একটি ভেলকি দেখাবে।
—ও বৌমা, বৌমা…
পেছন ফিরে তিথি তাকিয়ে দেখে কাগুজে মাসি।
—কী হয়েছে মাসি? তুমি আবার এখানে উঠে আসলে কেন?
—আসলাম নিজেরও ভাল লাগছিল না।
—কিন্তু তুমি একটু তো শুতে পারতে মাসি।
—শুয়েই তো ছিলাম আর কত ঘুমাবো ঘুম আর আসছে না। তাই ভাবলাম দেখি তুমি কি করছ।
—বেশ করেছ বসো এখানে।
এই জায়গাটা বেশ ভালই লাগছে।
—দোলনাটা এখানেই রেখেছ না বৌমা।
—ও তুমি দোলনাটা দেখে যাওনি তো মাসি।
—না।
—তুমি তো অনেকদিন উপরেও আসোনি দেখবে কি করে।
—হ্যাঁ গো।
—আচ্ছা মাসি, লতাদির ব্যাপারটা বলো তো শুনি।
কাগুজে মাসি চেয়ারে বসতে গিয়ে একটু ককিয়ে উঠল।
—কী হল মাসি?
—ব্যথাটা বেড়েছে গো বৌমা।
—সেই জন্যই তো বলছিলাম… —আবার ওঠার কী দরকার ছিল?
—আসলাম।
কাগুজে মাসি কষ্টের সুরে বলল।
—আচ্ছা, একটু ওয়েট করো চা করে নিয়ে আসি তারপর দু’জন মিলে জমিয়ে গল্প করব।
—আবার তুমি এখন চা আনতে যাবে, বসো তো।
—আরে বাবা তুমি বসো না দেখো চট করে যাব আর আসব।
তিথি পেছন ফিরতেই দেখে।
—ও মাসি, দেখো কে এসেছে?
—ও বাবা পুচু এসেছ।
লেজ নাড়তেই থাকে পুচু।
আচ্ছা তুমি থাকো দিদার কাছে আমি চা করে নিয়ে আসি।
—আয় পুচু আয় বস।
—যাও বসো মাসির কাছে।
বাহ কি সুন্দর বসল দেখো।
—খুব বাধ্য মেয়ে, আচ্ছা তোমরা দু’জন কথা বলো, আমি আসি।
তিথি চট করে চা বানিয়ে নিয়েও আসলো।
—মাসি নাও ধরো ।
উঠতে হবে না ওখানেই বস হাত বাড়াও আমি দিচ্ছি। কাগুজে মাসি হাত বাড়ায়।
—এ বাবা আমি বিস্কিট খাব না।
—খাও খাও টোস্ট বিস্কিট ভাল লাগবে।
—না গো খাব না।
—আবার বলে খাব না, খাও তো।
তিথি জোর করে কাগুজে মাসির হাতে দেয়। কাগজে মাসি বিস্কিট ভেঙে পুচুকে দেবার চেষ্টা করে।
তিথি দেখে বলে,
—না, আমি ওটা তোমার জন্য ওর জন্য এনেছি।
তিথি বিস্কিট নিয়ে বলে,
—পুচু তোমার জন্যও এনেছি বিস্কিট।
চায়ের কাপে চুমুক দিলে তিথি তারপর বলল,
—মাসি শুরু করো।
—হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম, ওকে বিক্রি করে দেয়।
—কী বলছ মাসি? বিক্রি করে দেয়।
—হ্যাঁ গো, বলতে বলতে কাগুজে মাসি একটু অন্যমনস্ক হয়ে যায়। তারপর বলে,
—বাংলাদেশের এক দালালের কাছে। সে দালাল আবার বিক্রি করে আমাদের মাসির কাছে। কী অবস্থা সত্যিই নারীদের কে মালপত্রের সঙ্গেই এরা তুলনা করে ফেলে।
—কি অবস্থা ঠিক যেমন মালপত্র হাত বদলাতে থাকে অনেকটা সে রকম।
—সেই রকমই তো আমরা তো তাই বৌমা।
—সত্যি ভাবতে অবাক লাগে।
—ছাড়ো, বৌমা যেটা বলছি সেটা শোনো…
—লতা তো দেখতে খুব সুন্দর। যেমনি গায়ের রং তেমনি টানা টানা চোখ চুল ছিল কোমর ছাড়িয়ে। দেখার মত সৌন্দর্য।
—হ্যাঁ মাসি, এই বয়সেও আমি দেখেছি। তবে অনেক ভদ্র। হ্যাঁ, ঠিক বলেছ ওকে কেউ কিছু না বললে, ও-আগ বাড়িয়ে কাউকে কিছু বলতে যায় না।
—হ্যাঁ, দেখে মনে হয় আমি দেখেছি কয়েকবার।
—তারপর..?
—কি হবে এখানে এসে উঠল। ওঠার পর যখন ও বুঝতে পারলে এখান থেকে আর বেরতে পারবে না, তখন সেই ব্যবসাতে মনোযোগী হয়ে উঠল।
—বাপরে! কী কথা শোনাচ্ছে মাসি।
—হ্যাঁগো, যে নরক যন্ত্রণা
আমরা ভোগ করেছি, তার কাছে এসব কিছুই না।
—হ্যাঁ গো মাসি কি আর বলি।
—তবে ও খুব শক্ত মনের জানো তো বৌমা!
—কী রকম?
—গলিতে এসে মাসি যখন তার ধান্দার কথা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছিল। সেদিনও নিরুত্তর ছিল।
—-মাসির কোনও কাজে বাধা দেয়নি।
—কি বলছ মাসি।
—হ্যাঁগো, ঠিকই বলছি। ওটাই ওর ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছিল।
—মাসি! এ যেন মনে হচ্ছে গভীর কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ কিছুই দেখতে পাচ্ছে না কখন সূর্যের আলো উঠবে তবে আস্তে আস্তে কুয়াশা দূরীভূত হবে স্পষ্ট করে আকাশ টাকে দেখতে পাবে। এভাবেই কত নারীর জীবন কুয়াশাচ্ছন্ন অন্ধকারে হারিয়ে যায় কেউ কি আর খোঁজ রাখে?🍁 (ক্রমশঃ)
🍂কবিতা
মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

কোজাগরী
চুপচাপ ধানক্ষেতে ঢুকে পড়ল হাওয়া
হাওয়ার কোন লজ্জা নেই
ধানের যৌবনে চক্কর দেয় ধানশীষে ঢেউ তুলে
স্পর্শে তার রোমাঞ্চিত সুখ ।
কৃষক দাঁড়িয়ে দেখে ধানক্ষেতে খুশির মহড়া ।
কৃষাণীর চোখে মুখে নাচছে পূর্ণিমা
তাঁতে বোনা লাল ডুরে শাড়ি পরে হাসে
কপালে সিঁদুর ফোঁটা নাকে নাকছাবি
চোখের কাজলে ভাসে চাঁদ ।
সমস্ত উঠোন জুড়ে মা লক্ষ্মীর পা
পিঠুলি বাটার আল্পনা
আলোয় আলোয় ভর্তি খড়কুটোর ছোট্ট সংসার।
সুনীল মাজি -এর একটি কবিতা

সূর্যশিব
আমাকে জড়িয়ে আছে চাঁদ—
জোৎস্নার পোশাক!
আমি তার ধমনী ও শিরা দিয়ে বহতা
রক্ত চলাচল!
লোহিত ও শ্বেতকণিকারা আমার
ভেষর যেন রাধাকৃষ্ণ!
আমি আকাশের দিকে জপ করি, স্পষ্ট
যদি মুখ ও ময়ূখ!
অশ্চর্য এক গন্ধ ও ঘ্রাণে আমার ঢেউ
ও তরঙ্গ নৃত্য করে।
ভেতরের চিন্তাভাবনাবুদ্ধিমেধাদের বলি, শ্রোতা ও দর্শক হও।
অনুভব তার মাঠ জুড়ে খেলুক—
বোধের পরিচালনায় খেলা হোক।
ক্রিয়ার প্রতি কী তীব্র আকর্ষণ আমার,
হে লীলাবতী!
বৃহস্পতিকে বলি, কতগুলো চাঁদ
তোমার খেলতে নেমেছে?
সে গুণতে গুণতে বলে, তোমার কতজন?
আমি বলি, তারা অনন্ত— সর্পশরীর
জুড়ে সুরাসুর তরঙ্গ মন্থন।
অক্ষ ও চক্র জুড়ে অসীম আমার উৎস-বিদ্যুৎ
চিনতে পেরেছ বলো কে আমি? অচ্যুত
নীলিমার হৃদয় জুড়ে এই অই সূর্যশিব এর উদয়।
বেণু সরকার -এর একটি কবিতা

বনস্থলি
দেরি হওয়ার কথা নয়, খুব দ্রুত নদী সমুদ্র
গাছপালা জীবজন্তু মানুষ অধৈর্য হয়ে দুপুরের
গনগনে সূর্যের নীচে লুডো খেলবে। প্রান্তিক কেউ
শাড়ি কেনার পয়সা জোটাতে দূরবর্তী ফুলের
দোকানে ছুটবে। কে কেমন মোবাইল দেখা
শিখলো তার পরীক্ষার খাতায় লিখবে আর
আই প্যাডে এঞ্জিনিয়ারিঙের ভিডিও তৈরি
করবে, বিভাগীয় প্রধান পড়ানো বন্ধ করে
ও টির ভিডিও ছাত্র ছাত্রীদের পাঠিয়ে দেবে। এর
নাম ক্রিয়াত্মক পরীক্ষা। চলছে বেশ। দেরি হবে না।
দ্রুত সবকিছুই দ্রুতগামী হয়ে যাবে। এসো না
সভায় বসি। কেন চাঁদ দেখার সময় নেই!
কেন নদীর কাছে যাওয়ার সময় নেই!
বনস্থলি কেন দ্রুত দূরে চলে যায়!
শ্বেতা বসু চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

ছায়াঝুরি
শেষ রাতের মিলন সাঙ্গ হলে সব
পাতা ঝরে যাচ্ছে…
রঙের বল্কল আর শব্দ মায়ার শূন্যতা
সবই আছে, কিন্ত…
এইবার ছায়া জুড়ে-জুড়ে পথ
পথ-জুড়ে মহানির্মাণ
সন্ধ্যা নামল
ভোরও হল
আরও নরম, স্তব্ধ, কোলাহলময়
নরম তুলসীতলা, ঝলমল
চন্দন মিত্র -এর গুচ্ছ কবিতা

সিদ্ধ
মুণ্ডুটা বাড়তি তাই বাদ দেওয়া হল
ওখানেই বিষগ্রীহও ওখানেই স্নিগ্ধ ধ্যাৎ
আলোচনা এ দিবালোকে তীব্র শীতলেরাত
কে কাকে গিলে খায় কার পায় বমি
অকন্ড অকস্মাৎ খ প্রাপ্ত হলে
জ্বলন্ত কড়া বা ফ্রিজ কেয়ার করো না।
যুব
বসন্তের ভিতর কোকিল বেজে উঠল
উঠান পলাশ শিমুল পতাকায় লাল
আমি চাইছি তামোহর
কাঁধে তূণীর কলমের নিবেরের মতো
ডগাগুলো উঁকি বোর্ডের ধারণা
ও কোকিল গাও তুমি যৌবন।
হ্যারিকেন
অনবদ্য হ্যারিকেন নিভে গেছে
কেউই দেয় না তেল, পাকায় না
সালতে, মোছে না কাচ বহুদিন।
আমি তাকে আদর মাখিয়ে দিই
ঝুল ঝেড়ে সুরত আনি;
রাহাজানি নেভারন এও ভাই…
নির্বাচন
সার সার রোদনের হিমবাহ
পর্বতের উপর চাপিয়ে শুধু
ধু-ধু তামাটে টিলায় রোদ খাও
টানটান থাকো নির্জলা খেদে।
একটি ফাড়িংও নেই কাছে
যেদিন পর্বত উনোনে সেঁধোবে
নদীরা প্রস্ফুটি হতে পারে
ঝামরে পরতে পারে মেঘও।
হেতু
অ্যাসিডবৃষ্টির ভিতর একটানা হেঁটে যাও যে জীবন
আমি তার দুই পায়ে ও প্রেম সমীহ নামে
সমগ্র কৈশোর সমগ্র জঙ্গলে জঙ্গলে ভিন্নমৃত্যুর সুযোগ
চুমু নিজে নিজে ভেসে বেপাও বিষণ্ণ উন্পঞ্চাশ
বায়ুর মায়াতে ক্ষমতার ভূ-পতিত বন্ধুর মর্মর মূর্তি
সাক্ষাতে সামনে এগিয়েও অনিচ্ছাটা পিছনে ফিরেছি
কনিও কণামাত্র পাছে ফেউ হেতু জানতে চায়…

লেখা তবে
বিশ্ব যা ভাবছ, এখন না আর; ভাবো আগে—
এই ভ্রমে ভোগো। এখন ছবি যুগ চলমান মুখরতা
মোড়ে মোড়ে ফেটে পড়ে কূটশব্দে। কাঞ্চন অনুষঙ্গে
যদি চাহিদা তীব্র কুলীন কোনো অন– শপ ফাঁদো;
নর্তকী সংযোগ ছদ্মের মৌতাতে ভিড় যাবে।
দেখবে বিশুদ্ধ মাতাল তবু নিরালম্ব একা নিজের গহীনে
কী নিমগ্ন থাকে! অন্য চাহিদা সে ধরে না
সে ব্যবস্থা নেই
আকাঙ্ক্ষিত খিস্তিখেউড় । রিপুর তাড়নাহীন অনাঢ্য
মাতাল যদি হতে পারো, লেখো তবে দোহাই তোমার।
চোখ
নাগালে থাকছি তবু নিষ্পত্র দেখা দুই চোখে
আমি আমার কাছে থাকা চিঠি ও পুভারে শ্যামল-আনত;
শুধু এই স্বাচ্ছন্দ্য নয়
সমূহ ভিতরজ্বেলে দাউদাউ দিবালোক হওয়া।
স্থায়ী নির্মানভেজাল বিজ্ঞাপনী-রতি বোঝো তুমি;
এই যে আগম হল— আলো এল, জল এল, হাওয়া এল,
কাময় আর্দ্র ঘ্রাণ স্নেহ ও সুবাস এল, সেসব নিছ—
ভাবো তুমি ঈষৎ রসুন এলে পড়শিরা শার্সি দিত সংখ্যা।
আপনি পেতে পারেন পটীয়সী উর্নাজাল আমি ,
দৃষ্টি নিয়ে তুমি তোমার মত রাখো মদীয় অক্ষরে…
আনন্দময়
চৈত্র অংশ তুমি দেখতে দেখতে একা একা
আমি ঝমঝম অবসাদমাখা দেখতে
আপাত সরল কেত আঁকাবাঁকা
পাকদণ্ডিটা সহসা আমি চিনেছি।
এই যে বিষাদ এই পরম পাওয়া
রাহাখরের মতো রস দেয়
তোমার খোঁপার অমলতাসে হাওয়া
অনেক দূর থেকে আঘ্রাণ বয়ে আনে।
তুমি বারবার চৈত্র দ্বিপ্রহরে
নারী দ্যাখো এ চারণ স্থবির নয়
ছায়া গেছ অকিঞ্চন গঠনের
কায়াবখানি তাই আনন্দময়।
আলিঙ্গন
নিপাতন থেকে সিদ্ধির সাড়া
আমরা আপনাকে থাকতে হবে না।
তোমার আমার বুকের নিগুম মেঘ
ঝামরে কোনো অভিষেক।
স্ফীতোদর তারা এতদিন চুপ করেছিল
দুঃখ বৃষ্টি ঝরে যাবে টুপটুপ।
মেঘের অপর আমরা সদস্য জুঁই
ফুলের মতো নির্ভেদ ফুটব…

বাইসাইকেল
দূরে গেঁয়ো বাইসাইকেল আমি
টিং-টং-টিং ঘণ্টি বাসিয়ে একা
গড়িয়ে গড়িয়ে চলি অনন্যোপায়
সওয়ার বাবুটি নিতান্ত একরোখা।
সন্ধ্যা নাম কৃচ্ছ্রসাধন শুরু
কপালেভারে বিপদেনি হেডলাইটের
লুকিংগ্লাস তো বাহুল্য এই দেহে
পাসিং গেছি কে ছিল আজ কার!
পায়ের তলায় প্যাডেলেরা পাক খায়
পেট্রোল আমি চাখিওনা অবকাশে
শহরতলির ছেলে ছোকরাও হায়!
আমার হুলিয়া মুখটিপে হাসে…
ঋজুপাঠ
পাবওয়াই প্যায়েছি জনপদ
তাতে আমি দিগন্তে দেখতে দেখতে
পথচলা চতুর্না উর্ধ্ব
ফেউরা গেয়েছে রামধুন শক্তি।
তাচ্ছিল্যেরা তর্জনী শান দিয়ে
চিড়তে চেয়েছে নমনীয় মস্তক
পাকদণ্ডীনি অন্ধ হয়ে গেছে
আড়ার খোঁজে ছুটেছি সন্ধ্যা তাক।
বর্ণমালা
আমোদে হেঁসে মান্ধাতা-চৌকাঠ
আরশিনগর থেকে পড়শিরা এসেছে
চিনিয়ে আর আগ্নেয় পাঠ।
সেই থেকে জ্বলি অটল ফিনিক্স পাখি
জ্বলতে জ্বলতে ছাই হয়ে যাওয়া
ছাই থেকে ফেরার জন্মায় পাখি
আলোর ফুলকি ওঠে সে হেসে…

গাছবৃষ্টির মায়া
এলিয়ে গাড়ি দিই ছুয়ে
আলোকতার মায়াজাল
জড়া পড়ে পড়ে
ভুঁই নয়, লোকায়ত কাল।
গাছ নত জাগরুক
গাছের কোটরে দুই পাখি
মৃতপ্রায় কী করুণ মুখ
আরও জবুথবুথ।
মোহময় মুনিয়ার জুটি
পালকের মতো মৃদু রোম
আশ্লেষে ছুই ঠোঁট জোড়া
পাক খায় মরুত ও ব্যোম।
কুশল মৈত্র -এর দু’টি কবিতা

বাবা
বেলা গড়িয়ে যায়
পড়ে থাকে পিছুটান
সংশ্লেষিত আলো
তাও পাতা ঝরে যায়।
রং-এর বল্কল আলো-অন্ধকার খেলা
শৈশবে বাবাকে আঁকড়ে পথ চলা
আজ বুকের শিকড় আর ডালপালায়
হারানোর শোকমালা গভীর নির্মাণ—
চারপাশ গুমরে ওঠে শব্দমায়ার শূন্যতা
অন্ধকারে পড়ে থাকে মায়ার জন্মকথা।

ছায়াপথ
প্রতিটি সন্ধ্যা কুঁড়িয়ে আনে পরমায়ু
তুলসীতলায় দাঁড়িয়ে শঙ্খধ্বনি
দু’চোখ উদাস অতীতটা বড় নড়বড়ে
চৌকাঠে দাঁড়াতে পারি না—
বিরল স্তব্ধতা সূর্যাস্তের ছায়ায়
দেখছি তোমায় কত বছর ধরে
শৈশবে জেগে রয়েছে এখনো
চাঁদের আলোর পানে।
আকাশের জানলা সরিয়ে
এমনি ফি-বছর শুধু ঘোরাঘুরি করে
স্মৃতির অক্ষর চেনা-পরিজনের মাঝে
বৃত্তের চারপাশে বৃত্তকারে সহজিয়ায়
ঘুরছে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সমতটে;
তারপর হয়তো একদিন ছায়াপথ উৎসবে
পৌঁছে যাব নিজেই না হারানোর পথে
রুটির মতো চাঁদ আলো দিচ্ছে আমায়
পথে পথে একলা তুলসী গাছতলাতে।
🍂প্রবন্ধ
রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির সৌন্দর্যকে কোনও একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে আটকে রাখেননি। নদী শুধু পূর্ণ হলে সুন্দর, আর শুকিয়ে গেলে কুৎসিত এমন সরল সৌন্দর্যবোধ তাঁর নেই। পাশাপাশি প্রাচুর্য ও অভাব, উচ্ছ্বাস এবং ক্লান্তি দুই অবস্থাকেই তিনি প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপ হিসেবে দেখেছেন। নদীর শরীর বদলায়, কিন্তু তার অস্তিত্বের মর্যাদা বদলায় না।
রবীন্দ্রনাথের ‘কোপাই’: গ্রামবাংলার জীবন ও কবির কাব্যদৃষ্টি

সৌমিত্র পালিত
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় নদী নিছক জলধারা হয়ে থাকে না। কখনও তা স্মৃতির বাহন, কখনও নিঃসঙ্গতার সঙ্গী, কখনও মানুষের জীবনের নীরব সাক্ষী। আবার কখনও নদী হয়ে ওঠে কবির নিজের কাব্যবোধের পরিবর্তনের চিহ্ন। ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘কোপাই’ সেই অর্থে রবীন্দ্রকাব্যের একটি তাৎপর্যপূর্ণ রচনা। এখানে নদীকে দেখার চোখ যতটা প্রকৃতিনির্ভর, তার চেয়েও বেশি তা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, গ্রামবাংলার চলতি পথ, শ্রম, দারিদ্র্য, আনন্দ এবং স্বাভাবিকতার সঙ্গে যুক্ত। ‘কোপাই’ কবিতাকে ঘিরে রবীন্দ্রসাহিত্য নিয়ে আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরেই নানা মত রয়েছে। সাহিত্যসমালোচক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত কবিতাটিকে রবীন্দ্রনাথের উল্লেখযোগ্য ও অনবদ্য রচনাগুলির মধ্যে স্থান দিয়েছেন। সেই মূল্যায়নের গুরুত্ব অস্বীকার করার কারণ নেই। তবে রবীন্দ্রনাথের সমগ্র কাব্যভুবনের দিকে তাকালে ‘কোপাই’-এর গুরুত্ব অন্য জায়গায় খুঁজে পাওয়া যায়। এটি হয়ত তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতাগুলির তালিকায় প্রথম সারির উদাহরণ নয়, কিন্তু কবির প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক দেখার এক বিশেষ পর্বকে বুঝতে এই কবিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নদীকে কেবল মানচিত্রের একটি রেখা হিসেবে দেখলে তার সামাজিক অস্তিত্ব ধরা পড়ে না। নদীর পাশে যে মানুষ থাকে, যে কৃষিজমি তার জলের ওপর নির্ভর করে, যে পথ নদীকে অতিক্রম করে, যে জনপদ তার গতির সঙ্গে বদলায়, নদীর প্রকৃত পরিচয় তাদের মধ্যেই। রবীন্দ্রনাথ কোপাইকে সেই মানুষের জীবন থেকে আলাদা করেননি। নদীর স্রোতের মধ্যে মানুষের জীবনযাত্রার ছন্দ শুনেছেন।
‘কোপাই’ প্রকাশের সময় রবীন্দ্রনাথের কবিজীবন দীর্ঘ পথ অতিক্রম করেছে। তাঁর কবিতায় তখন কেবল প্রকৃতি, অসীম আকাশ, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কিংবা ব্যক্তিমানসের গভীর অনুভূতি নেই, খুব কাছের পৃথিবীও জায়গা করে নিচ্ছে। গ্রামের রাস্তা, ক্ষেত, কুমোর, গরুর গাড়ি, সাঁওতাল যুবক, গৃহস্থের জীবন, এমনকি পথের কুকুর সবাই কবিতার পরিসরে এসে দাঁড়াচ্ছে। ফলে কোপাই নদী নিজেই যেন একটি কেন্দ্র, যার চারপাশে গড়ে উঠছে গ্রামীণ জীবনের চলমান ছবি।
এই কবিতার শুরুতেই পদ্মার স্মৃতি এসে পড়ে। পদ্মার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক তাঁর জীবন ও সাহিত্যজুড়ে অত্যন্ত গভীর। শিলাইদহের দিনগুলিতে নৌকায় ভেসে পদ্মার বিস্তীর্ণ জলরাশি, নদীতীরের গ্রাম, চর, মানুষের জীবন ও প্রকৃতির পরিবর্তন তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় বারবার ফিরে এসেছে। ‘কোপাই’ -এর ক্ষেত্রেও অতীতের সেই নদী-অভিজ্ঞতা যেন বর্তমানের নতুন ভূদৃশ্যের সঙ্গে কথোপকথন শুরু করে। পদ্মা এখানে দূরের, বৃহৎ ও প্রায় মহাকাব্যিক এক নদী। তার দুই তীরের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড, পুরোনো বৃক্ষ, ভাঙা স্থাপত্য, গ্রাম, খেত, নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ, এসবকিছুর মধ্যে সময়ের লম্বা ছাপ রয়েছে। নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও সেখানে এক ধরনের দূরত্বের। নদী নিজের পথে চলে, মানুষের সুখ-দুঃখকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। সেই নদী যেন জীবনের বৃহত্তর ও নিরাসক্ত গতির চিহ্ন।
কোপাই সম্পূর্ণ আলাদা। তার আয়তন ছোট, তার চলন ঘনিষ্ঠ, তার জীবন মানুষের বসতির সঙ্গে মিশে আছে। তাই কবি কোপাইকে দেখেছেন প্রতিবেশী হিসেবে। এই প্রতিবেশী কোনও দূরবর্তী মহিমার অধিকারী নন। সে গ্রামেরই একজন। তার নামের মধ্যেও রয়েছে স্থানীয় মানুষের গন্ধ। নদীর পরিচয় তাই কোনও রাজকীয় ঐতিহ্যে নয়, মাটির কাছাকাছি থাকা এক স্বাভাবিক অস্তিত্বে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার অন্যতম সাফল্য এখানেই। তিনি কোপাইকে শুধু নদী হিসেবে আঁকেননি, তাকে মানুষের মতো করে তুলেছেন। তার চলন আছে, তার শরীর আছে, তার মেজাজ আছে, এমনকী তার হাসি-নাচও আছে। বর্ষায় নদীর জল বাড়ে, স্রোত তীব্র হয়, দুই তীরের দিকে ছুটে যায় তার জলরাশি। কবির চোখে সেই দৃশ্য হয়ে ওঠে মাতাল গ্রাম্য নারীর উচ্ছল নৃত্য। আবার ঋতু বদলালে নদী শুকিয়ে আসে, জল কমে যায়, তলার বালি দেখা যায়। তখন তার শরীরে আসে ক্লান্তি ও শীর্ণতা। কিন্তু সেই দৈন্যও নদীর সৌন্দর্যের অংশ হয়ে থাকে। এখানে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির সৌন্দর্যকে কোনও একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে আটকে রাখেননি। নদী শুধু পূর্ণ হলে সুন্দর, আর শুকিয়ে গেলে কুৎসিত এমন সরল সৌন্দর্যবোধ তাঁর নেই। পাশাপাশি প্রাচুর্য ও অভাব, উচ্ছ্বাস এবং ক্লান্তি দুই অবস্থাকেই তিনি প্রকৃতির স্বাভাবিক রূপ হিসেবে দেখেছেন। নদীর শরীর বদলায়, কিন্তু তার অস্তিত্বের মর্যাদা বদলায় না।
‘কোপাই’ কবিতার আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক তার ভাষা। রবীন্দ্রনাথ সচেতনভাবেই এখানে অতিরিক্ত অলংকারের আশ্রয় নেননি। কবিতার ভাষা যেন নদীর মতোই স্বাভাবিক। তার মধ্যে কথ্য জীবনের স্বর রয়েছে। গ্রামবাংলার মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, সেই ভাষার কাছাকাছি এসে কবিতাটি দাঁড়িয়েছে। ফলে কবিতা ও জীবনের দূরত্ব কমে যায়। এই ভাষাবোধের সঙ্গে কবিতার বিষয়ও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদী যদি গ্রামের মানুষের পাশে থাকে, তবে তাকে বর্ণনা করার ভাষাও মানুষের কাছাকাছি হবে, এ যেন কবির নির্মাণের অন্তর্নিহিত যুক্তি। কোপাই কোনও অভিজাত কাব্যিক প্রতীক নয়। সে গ্রামের নদী। তাই তার ভাষাও গৃহস্থপাড়ার ভাষা। কবিতার শেষ অংশে এই ভাবটি আরও গভীর হয়ে ওঠে। কোপাই যেন কবির কাব্যছন্দের সঙ্গী হয়ে যায়। নদীর বাঁক, তার জল, তার চলার তাল, এসবকিছু মিশে যায় মানুষের চলাফেরার সঙ্গে। ধনুক হাতে সাঁওতাল ছেলে নদীর পাশে হাঁটে, খড় বোঝাই গরুর গাড়ি নদী পার হয়, কুমোর হাটের পথে যায়, তার পেছনে গ্রামের কুকুরটি চলে। মাসে অল্প বেতনের গ্রামের শিক্ষকও সেই একই পথের যাত্রী। এই ছবিগুলির মধ্যে কোনও রাজকীয়তা নেই। কিন্তু জীবন আছে।
এইখানেই ‘কোপাই’ কবিতার সামাজিক তাৎপর্য। রবীন্দ্রনাথ এখানে সাধারণ মানুষকে কোনও দূরের দর্শক হিসেবে দেখেননি। তাঁদের জীবন প্রকৃতিরই অংশ। নদী, মাঠ, পথ, মানুষ, গবাদি পশু, গাছপালা ইত্যাদি সবকিছু মিলে একটি সম্পূর্ণ পরিবেশ তৈরি করেছে। মানুষের জীবনকে প্রকৃতি থেকে আলাদা করে দেখার প্রবণতা এখানে নেই। অন্যদিকে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রায়ই তাঁর বিশ্বমানবতার কথা সামনে আসে। কিন্তু তাঁর বিশ্বদৃষ্টি যে ছোট ছোট স্থানীয় অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়েও তৈরি হয়েছিল, ‘কোপাই’ তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একটি ছোট নদী, একটি গ্রাম, কয়েকজন সাধারণ মানুষ এবং কয়েকটি দৈনন্দিন দৃশ্য এই সামান্য উপকরণ দিয়েই তিনি জীবনের বিস্তৃত অর্থ ধরতে চেয়েছেন।
কোপাইয়ের পাশে দাঁড়িয়ে কবি যেন নিজের কাব্যজীবনের দিক পরিবর্তনের কথাও জানান। একদিকে রয়েছে পদ্মার বিশালতা, অন্যদিকে কোপাইয়ের ঘনিষ্ঠতা। পদ্মা তাঁকে দূরের পৃথিবী দেখিয়েছে, কোপাই তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে কাছের মানুষের কাছে। তাই এই কবিতা কেবল নদীর বর্ণনা নয়; এটি এক ধরনের কবিসত্তার পুনর্বিন্যাসের দলিলও। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিচেতনার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন বিশেষভাবে লক্ষণীয়। প্রকৃতি তাঁর কাছে কখনও মানুষের বাইরে কোনও পৃথক সত্তা নয়। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের জীবন ক্রমাগত আদানপ্রদান করে। কোপাইয়ের জল যেমন গ্রামের পথকে গ্রহণ করে, তেমনই গ্রামের মানুষ নদীর গতির সঙ্গে নিজেদের জীবনকে মিলিয়ে নেয়। জল ও স্থল, প্রকৃতি ও মানুষ, একাকিত্ব ও জনজীবন এখানে পাশাপাশি অবস্থান করছে। কবিতার ভেতরে কবির নিজের নিঃসঙ্গতার কথাও রয়েছে। এক সময় তিনি নদীর ধারে একা থেকেছেন, ভোরের আকাশ দেখেছেন, রাতের নক্ষত্র দেখেছেন। নদীর ধারা তাঁর একান্ত চিন্তার পাশে দিয়ে চলে গেছে। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে মানুষের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করেনি; বরং পরবর্তী সময়ে তিনি আরও ঘনিষ্ঠভাবে জনজীবনের দিকে তাকিয়েছেন।
এখানে ‘কোপাই’ যেন একটি সেতু। এক প্রান্তে কবির একান্ত আত্মজগৎ, অন্য প্রান্তে গ্রামের সাধারণ মানুষের জীবন। নদী সেই দুই জগতের মধ্যে যাতায়াতের পথ তৈরি করেছে। কবির নিঃসঙ্গতা যেমন আছে, তেমনই আছে হাটে যাওয়া কুমোর, মাঠে চলা সাঁওতাল যুবক, গরুর গাড়ির শব্দ এবং গ্রামের শিক্ষকের দৈনন্দিন সংগ্রাম। সেই কারণে ‘কোপাই’-কে শুধুমাত্র নিসর্গকবিতা বলে সীমাবদ্ধ করলে কবিতাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। এটি প্রকৃতির কবিতা অবশ্যই, কিন্তু প্রকৃতির মধ্যে মানুষের উপস্থিতিই এখানে কবিতার প্রাণ। নদীকে বুঝতে গেলে নদীর তীরের মানুষকে বুঝতে হয়, রবীন্দ্রনাথের নির্মাণে এই সম্পর্কটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, কবিতাটিকে রবীন্দ্রনাথের শ্রেষ্ঠতম কবিতার পর্যায়ে রাখার বিষয়ে মতভেদ থাকা স্বাভাবিক। তাঁর দীর্ঘ কাব্যজীবনে এমন বহু কবিতা রয়েছে, যেখানে ভাষা, দর্শন, আবেগ ও নির্মাণ আরও বহুস্তরীয় হয়ে উঠেছে। ‘কোপাই’ -এর শক্তি অন্যত্র। এর সৌন্দর্য তার স্বাভাবিকতায়, তার স্থানীয়তায় এবং জীবনের একেবারে কাছাকাছি এসে দাঁড়ানোর ক্ষমতায়।
কবিতাটির রচনাকাল ১৩৩৯ বঙ্গাব্দের ১ ভাদ্র। ‘পুনশ্চ’-এর সূচনায় এই কবিতা বসানোর মধ্যেও একটি তাৎপর্য খুঁজে পাওয়া যায়। যেন নতুন কাব্যপর্বের দরজা খুলছে একটি নদীর দৃশ্য দিয়ে। সেই নদী কোনও পৌরাণিক বিস্ময়ের নদী নয়; সে আমাদের চেনা গ্রামের নদী। তার জল কখনও স্বচ্ছ, কখনও কম, কখনও বর্ষায় উচ্ছ্বসিত। তার পাশে মানুষ বেঁচে থাকে, কাজ করে, পথ চলে। কিন্তু, আজকের পাঠকের কাছে ‘কোপাই’ তাই কেবল রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিবর্ণনার একটি নমুনা নয়। পরিবেশ, স্থানীয় জীবন ও মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার ক্ষেত্রেও কবিতাটি প্রাসঙ্গিক। নদীকে কেবল মানচিত্রের একটি রেখা হিসেবে দেখলে তার সামাজিক অস্তিত্ব ধরা পড়ে না। নদীর পাশে যে মানুষ থাকে, যে কৃষিজমি তার জলের ওপর নির্ভর করে, যে পথ নদীকে অতিক্রম করে, যে জনপদ তার গতির সঙ্গে বদলায়, নদীর প্রকৃত পরিচয় তাদের মধ্যেই। রবীন্দ্রনাথ কোপাইকে সেই মানুষের জীবন থেকে আলাদা করেননি। নদীর স্রোতের মধ্যে মানুষের জীবনযাত্রার ছন্দ শুনেছেন। তাই শেষ পর্যন্ত ‘কোপাই’ একটি নদীর নাম হলেও কবিতাটির আসল বিষয় জীবন। বড় নদীর মহিমা পেরিয়ে ছোট নদীর ঘনিষ্ঠতায় এসে কবি যেন আবিষ্কার করেন, মানুষের প্রতিদিনের পথচলাতেও কাব্য রয়েছে। আর সেই কাব্য কোনও দূর আকাশে নয়, মাটির রাস্তার ধারে, খড় বোঝাই গরুর গাড়িতে, হাটে যাওয়া কুমোরের বাঁকে, সাঁওতাল যুবকের পদচারণায়, গ্রামের শিক্ষকের ছেঁড়া ছাতার নিচে এবং নদীর কলকল স্রোতের পাশে। ‘কোপাই’-এর সবচেয়ে বড় শক্তি সম্ভবত এখানেই, রবীন্দ্রনাথ ছোট নদীর শরীরে বৃহৎ জীবনের চলমান ছবি এঁকেছেন।🍁
🍂গ্রন্থ-আলোচনা/১
দর্শকের ভূমিকা নিয়ে বাদল সরকারের ভাবনাও গ্রন্থটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রথাগত নাট্যব্যবস্থায় দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থাকে। দর্শক সাধারণত প্রদর্শনের বাইরে অবস্থান করেন এবং অভিনেতা তাঁর জন্য অভিনয় করেন। বাদল সরকারের নাট্যচর্চায় এই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা দেখা যায়। দর্শককে নাট্যপ্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
থিয়েটারের বদলে যাওয়া ভাষা: বাদল সরকার -এর ‘দ্য চেঞ্জিং ল্যাঙ্গুয়েজ অফ থিয়েটার’

পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায়
বাংলা নাট্যচর্চার ইতিহাসে বাদল সরকার -এর অবস্থান নিয়ে দ্বিমত থাকার অবকাশ কম। নাট্যকার হিসেবে তাঁর পরিচিতি যেমন বিস্তৃত, তেমনই নাট্যপ্রদর্শনের প্রচলিত কাঠামো নিয়ে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাংলা থিয়েটারের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। মঞ্চ, দর্শক, অভিনেতা, নাট্যস্থানের ব্যবহার এবং নাটকের সামাজিক ভূমিকা, এই প্রতিটি বিষয়কে তিনি নতুন করে দেখার চেষ্টা করেছেন। তাঁর সেই দীর্ঘ নাট্যভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল ‘দ্য চেঞ্জিং ল্যাঙ্গুয়েজ অফ থিয়েটার’। গ্রন্থটির প্রকাশক কালি কলম ও ইজেল। বইটির কেন্দ্রীয় বিষয় থিয়েটারের পরিবর্তনশীল ভাষা। এখানে ‘ভাষা’ বলতে শুধু নাটকের সংলাপ বা লিখিত শব্দকে বোঝানো হয়নি। নাট্যপ্রদর্শনের সম্পূর্ণ কাঠামো অভিনেতার শরীর, মঞ্চের পরিসর, দর্শকের অবস্থান, নাট্যকারের লেখা, নির্দেশকের ভূমিকা ও নাটকের সামাজিক প্রেক্ষিত এসবই এই ভাষার অন্তর্ভুক্ত। এই বিস্তৃত অর্থে গ্রন্থটি থিয়েটারকে একটি সমগ্র শিল্পমাধ্যম হিসেবে বিচার করতে চায়।
দ্য চেঞ্জিং ল্যাঙ্গুয়েজ অফ থিয়েটার’-এর মূল্যায়নে অন্ধ প্রশংসার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনই এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও উপেক্ষা করা যায় না। বইটির শক্তি তার প্রশ্ন তোলার ক্ষমতায়। সীমাবদ্ধতা রয়েছে কিছু ধারণার সময়নির্ভরতায় এবং বর্তমান নাট্যপরিবেশে তার সরাসরি প্রয়োগের ক্ষেত্রে।
বাদল সরকারের নাট্যভাবনা বোঝার জন্য তাঁর সময়ের দিকে তাকানো জরুরি। ষাট ও সত্তরের দশকের বাংলা থিয়েটারে একদিকে ছিল প্রথাগত প্রেক্ষাগৃহকেন্দ্রিক নাট্যচর্চা, অন্যদিকে সমাজ ও রাজনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নাট্যভাষার অনুসন্ধান। এই সময়েই নাটককে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা জোরদার হয়। বাদল সরকার সেই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ। প্রসঙ্গত, ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর কার্জন পার্কের গাছতলায় যে নাট্যচর্চার সূচনা হয়েছিল, তার সঙ্গে পরবর্তী তৃতীয় থিয়েটারের বিকাশের সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৭২ সালের ১৮ জুন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের ঘটনাও সেই নাট্যযাত্রার একটি পর্যায়। এই ইতিহাসের তাৎপর্য কেবল নতুন একটি নাট্যদলের আত্মপ্রকাশে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল থিয়েটারের স্থান, দর্শক এবং অভিনয়পদ্ধতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার প্রয়াস।
‘দ্য চেঞ্জিং ল্যাঙ্গুয়েজ অফ থিয়েটার’ -এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হল, থিয়েটার কোনও স্থির শিল্পরীতি নয়। সমাজ বদলালে তার শিল্পভাষাও বদলাতে পারে। দর্শকের অভ্যাস, সামাজিক সম্পর্ক এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে নাটকের প্রকাশরীতিরও পরিবর্তন প্রয়োজন। এই যুক্তির মধ্যে সময়ের সঙ্গে শিল্পমাধ্যমের অভিযোজনের একটি ধারণা কাজ করে। এই বক্তব্যকে একেবারে নতুন তত্ত্ব হিসেবেও দেখা যায় না। বিশ্বের বিভিন্ন নাট্যচর্চায় বহুদিন ধরেই প্রেক্ষাগৃহের বাইরে অভিনয়, দর্শকের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ন্যূনতম উপকরণে নাট্যপ্রদর্শনের নানা পরীক্ষা হয়েছে। ফলে, বাদল সরকারের কাজের অভিনবত্ব বিচার করতে গেলে আন্তর্জাতিক নাট্যচর্চার বৃহত্তর ইতিহাসও বিবেচনায় রাখা দরকার। তাঁর গুরুত্ব অনেকাংশে এই ধারণাগুলিকে বাংলা ভাষা ও ভারতীয় সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করার মধ্যে।
এই জায়গায় তৃতীয় থিয়েটারের ধারণাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রচলিত প্রেক্ষাগৃহের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নাটককে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এই নাট্যভাবনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বড় মঞ্চ, জটিল দৃশ্যসজ্জা কিংবা বিপুল ব্যয়ের পরিবর্তে অভিনেতার শরীর, কণ্ঠ, দলগত উপস্থিতি ও ব্যবহৃত স্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে নাট্যচর্চার অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু এখানেই একটি পালটা প্রশ্নও সামনে আসে। প্রেক্ষাগৃহের বাইরে নাটক করার ফলে থিয়েটার সহজলভ্য হলেও তার সব নান্দনিক সম্ভাবনা কি বজায় থাকে? আলো, শব্দ, দৃশ্যসজ্জা, মঞ্চ-পরিকল্পনা এবং দর্শক নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রথাগত প্রেক্ষাগৃহের যে সুবিধা রয়েছে, তা খোলা জায়গার নাটকে সব সময় পাওয়া যায় না। আবার সীমিত উপকরণের ওপর নির্ভরশীলতা অনেক সময় নাট্যনির্মাণের পরিসরও সংকুচিত করতে পারে। তাই তৃতীয় থিয়েটারকে প্রথাগত থিয়েটারের বিকল্প হিসেবে দেখার পাশাপাশি তার নিজস্ব সীমাবদ্ধতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দর্শকের ভূমিকা নিয়ে বাদল সরকারের ভাবনাও গ্রন্থটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রথাগত নাট্যব্যবস্থায় দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব থাকে। দর্শক সাধারণত প্রদর্শনের বাইরে অবস্থান করেন এবং অভিনেতা তাঁর জন্য অভিনয় করেন। বাদল সরকারের নাট্যচর্চায় এই দূরত্ব কমানোর চেষ্টা দেখা যায়। দর্শককে নাট্যপ্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধারণার শক্তি যেমন রয়েছে, তেমনই তার বাস্তব প্রয়োগে কিছু প্রশ্নও থাকে। প্রত্যেক দর্শক সক্রিয়ভাবে নাটকে অংশ নিতে আগ্রহী হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই। আবার দর্শকের অংশগ্রহণ বেশি হলে নাটকের পূর্বনির্ধারিত কাঠামো কতটা বজায় থাকবে, সেটিও বিবেচনার বিষয়। ফলে দর্শক-অভিনেতার দূরত্ব কমানো নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাট্যপ্রয়াস, কিন্তু সেটিকে সব ধরনের নাটকের জন্য কার্যকর সূত্র হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
গ্রন্থে নাট্যকার, নির্দেশক ও অভিনেতার সম্পর্ক নিয়েও ভাবনার অবকাশ রয়েছে। একটি নাটকের সাফল্য শুধু পাণ্ডুলিপির গুণে নির্ধারিত হয় না। নির্দেশকের ব্যাখ্যা, অভিনেতার অভিনয় এবং দর্শকের গ্রহণক্ষমতা নাটকের চূড়ান্ত রূপকে প্রভাবিত করে। এই সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া গ্রন্থটির একটি শক্তিশালী দিক। একই সঙ্গে বলা যায়, নাট্যপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সৃজনশীলতার সংঘাতও থাকতে পারে। নাট্যকারের বক্তব্য, নির্দেশকের দৃষ্টিভঙ্গি এবং অভিনেতার ব্যাখ্যা সব সময় এক জায়গায় মিলবে না। এই দ্বন্দ্বও নাট্যসৃষ্টির স্বাভাবিক অংশ। বাদল সরকারের নাট্যচিন্তায় বাস্তব জীবন একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, সামাজিক বৈষম্য, নাগরিক বিচ্ছিন্নতা ও সময়ের রাজনৈতিক আবহ তাঁর নাট্যকর্মে বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। থিয়েটারকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার এই প্রবণতা তাঁর নাট্যদর্শনের অন্যতম পরিচয়। তবে বাস্তবতার ওপর বেশি নির্ভর করলে নাটকের কল্পনাশক্তি বা নান্দনিক স্বাধীনতা কমে যেতে পারে, এই বিতর্কও অপ্রাসঙ্গিক নয়। বাস্তবতা ও শিল্পরূপের ভারসাম্য প্রত্যেক নাট্যকারের নিজস্ব সিদ্ধান্তের বিষয়।
বইটির ভাষার ক্ষেত্রেও পাঠকের অভিজ্ঞতা একরকম নাও হতে পারে। নাট্যচর্চার সঙ্গে পরিচিত পাঠকের কাছে আলোচনাগুলি সহজে গ্রহণযোগ্য হলেও সাধারণ পাঠকের কাছে কিছু অংশ তাত্ত্বিক বা ধারণানির্ভর বলে মনে হতে পারে। গ্রন্থের বিষয় যেহেতু থিয়েটারের কাঠামো ও তত্ত্ব, তাই নাট্যশিক্ষার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয় এমন পাঠকের জন্য পাঠের গতি কিছু জায়গায় ধীর মনে হতে পারে। তবে এই তাত্ত্বিক প্রবণতাই বইটিকে শুধুমাত্র স্মৃতিকথা বা নাট্যজীবনের বিবরণে সীমাবদ্ধ রাখেনি। গ্রন্থটির আর একটি সীমা তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে যুক্ত। বাদল সরকারের নাট্যভাবনা যে সময় তৈরি হয়েছিল, সেই সময়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা আজ অনেকটাই বদলে গেছে। ফলে তাঁর কিছু প্রশ্ন আজও কার্যকর হলেও সব উত্তর বর্তমান থিয়েটারের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। ডিজিটাল মাধ্যম, নতুন দর্শকসংস্কৃতি, পরিবর্তিত প্রেক্ষাগৃহব্যবস্থা ও নাট্যপ্রযোজনার নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো বর্তমান সময়ের আলাদা বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই কারণে বইটিকে বর্তমান থিয়েটারের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশিকা হিসেবে পড়া ঠিক হবে না। বরং এটি একটি ঐতিহাসিক নাট্যদৃষ্টির দলিল ও পরিবর্তন নিয়ে ভাবার একটি মাধ্যম। এর সবচেয়ে বড় মূল্য সম্ভবত এখানেই যে এটি পাঠককে কোনও নির্দিষ্ট নাট্যরীতির অনুগামী হতে বলে না, তা থিয়েটারের প্রচলিত কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়।
একজন পাঠকের কাছে বইটির আর একটি তাৎপর্য রয়েছে। সাধারণত নাটক দেখার সময় দর্শকের নজর থাকে কাহিনি, অভিনয় ও মঞ্চসজ্জায়। কিন্তু এই গ্রন্থ নাট্যপ্রদর্শনের পিছনে থাকা কাঠামোগুলিকে লক্ষ করার সুযোগ করে দেয়। অভিনেতা কোথায় দাঁড়াচ্ছেন, দর্শক কেন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসছেন, মঞ্চের পরিসর কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং আলো বা দৃশ্যসজ্জার প্রয়োজন কতটা, এসবও নাটকের অর্থ নির্মাণে ভূমিকা রাখে। ফলে বইটি নাটক দেখার দৃষ্টিকেও কিছুটা বদলে দিতে পারে। বর্তমান সময়ে এর প্রাসঙ্গিকতা আরও একটি কারণে রয়েছে। থিয়েটার এখন চলচ্চিত্র, ওয়েব সিরিজ ও ডিজিটাল বিনোদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে। দর্শকের সময় ও মনোযোগের ধরন বদলেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরাসরি মানুষের সামনে অভিনেতার উপস্থিতির যে স্বাতন্ত্র্য, তা নতুনভাবে ভাবা দরকার। বাদল সরকারের দর্শক-অভিনেতার সম্পর্কের ধারণা সেই আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। তবে এখানেও সতর্কতা প্রয়োজন। বর্তমান থিয়েটারের সব সমস্যার সমাধান তৃতীয় থিয়েটারের কাঠামোর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না। আধুনিক নাট্যচর্চায় প্রযুক্তি, আলো, শব্দ, দৃশ্যশিল্প ও বহুমাধ্যমের ব্যবহারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এগুলিকে অপ্রয়োজনীয় বলে বাদ দেওয়া নয়, বরং কখন কোন উপাদান প্রয়োজন ও কোনটি নাটকের বক্তব্যকে সমৃদ্ধ করে, সেই বিচারই অধিক কার্যকর।
সুতরাং ‘দ্য চেঞ্জিং ল্যাঙ্গুয়েজ অফ থিয়েটার’-এর মূল্যায়নে অন্ধ প্রশংসার যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনই এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও উপেক্ষা করা যায় না। বইটির শক্তি তার প্রশ্ন তোলার ক্ষমতায়। সীমাবদ্ধতা রয়েছে কিছু ধারণার সময়নির্ভরতায় এবং বর্তমান নাট্যপরিবেশে তার সরাসরি প্রয়োগের ক্ষেত্রে। কিন্তু একটি নাট্যগ্রন্থের মূল্য শুধু তার সব বক্তব্য আজও একইভাবে কার্যকর কি না, তা দিয়ে বিচার করলে তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব ধরা পড়ে না। বাদল সরকার যে সময়ে থিয়েটারের প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করেছিলেন, সেই সময়ের নাট্যপরিসরে তাঁর অবস্থান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কাজ প্রমাণ করেছে যে থিয়েটারের জন্য নির্দিষ্ট একটি ভাষা বা একমাত্রিক কাঠামো আবশ্যক নয়। একই সঙ্গে তাঁর নাট্যভাবনা এটিও দেখিয়েছে যে বিকল্প রীতি তৈরি করাও সহজ নয়, তার নিজস্ব নান্দনিক ও বাস্তব সমস্যা রয়েছে। ‘দ্য চেঞ্জিং ল্যাঙ্গুয়েজ অফ থিয়েটার’ তাই এক অর্থে পরিবর্তনের পক্ষে লেখা এমন একটি গ্রন্থ, যা তার মূল্য শুধু পরিবর্তনের আহ্বানে নয়। এর মূল্য রয়েছে থিয়েটারকে কীভাবে দেখা উচিত সেই প্রশ্নে। মঞ্চ ও দর্শক, অভিনেতা ও দর্শক, শিল্প ও সমাজ, বাস্তবতা ও কল্পনা এই দ্বন্দ্বগুলিকে একসঙ্গে ভাবার সুযোগ তৈরি করে বইটি।
গ্রন্থটি পড়ার পর বাদল সরকারের সঙ্গে একমত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান নাট্যবাস্তবতার তুলনা করাই পাঠের অধিক ফলপ্রসূ পদ্ধতি। কোন ধারণা সময় পেরিয়েও কার্যকর, কোনটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পর্বের সঙ্গে যুক্ত এবং কোন প্রশ্ন এখনও উত্তর দাবি করে, এই বিচার পাঠক নিজেই করতে পারেন। সেই জায়গা থেকেই ‘দ্য চেঞ্জিং ল্যাঙ্গুয়েজ অফ থিয়েটার’ একটি মূল্যবান গ্রন্থ হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, বাংলা থিয়েটারের ইতিহাসে বাদল সরকারের অবদান নিয়ে যত আলোচনা হবে, তাঁর নাট্যচিন্তার এই দিকটিও তত বেশি ফিরে আসবে। কারণ তাঁর কাছে থিয়েটার ছিল কোনও স্থির প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, পরিবর্তনশীল সমাজের সঙ্গে ক্রমাগত সম্পর্ক স্থাপন করা একটি শিল্পমাধ্যম। সেই সম্পর্কের ভাষা কীভাবে বদলায়, কেন বদলায় ও সেই পরিবর্তনের মূল্য কোথায়? ‘দ্য চেঞ্জিং ল্যাঙ্গুয়েজ অফ থিয়েটার’ মূলত সেই প্রশ্নগুলির কাছেই পাঠককে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। আর একটি গ্রন্থসমালোচনার বিচারে এর সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এটাই, বইটি তার পাঠককে থিয়েটার সম্পর্কে শেষ কথা বলে না, বরং আরও প্রশ্ন করার জায়গা তৈরি করে।🍁
🍂গ্রন্থ-আলোচনা/২
দীপাবলি আবেগহীন নয়। তার অনুভূতি রয়েছে, সম্পর্কের আকর্ষণ রয়েছে, ভালবাসার প্রয়োজনও রয়েছে। কিন্তু প্রেমের বিনিময়ে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে সে রাজি নয়। যে সম্পর্ক তার ব্যক্তিসত্তাকে খর্ব করতে চায়, তার সামনে সে আপসের পথ বেছে নেয় না। ফলে দীপাবলির একাকিত্বও পরাজয়ের মাপকাঠি হয়ে ওঠে না। নিজের শর্তে জীবনযাপন করার সিদ্ধান্ত হিসেবে তা পাঠ করা যায়। এখানেই ‘সাতকাহন’ প্রচলিত নারীজীবনের কাহিনি থেকে আলাদা হয়ে ওঠে।
সাতকাহন-এর দীপাবলি কেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম স্মরণীয় নারীচরিত্র?

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়
বাংলা উপন্যাসে নারীচরিত্র নির্মাণের প্রসঙ্গ উঠলে সমরেশ মজুমদারের নাম অনিবার্যভাবেই সামনে আসে। তাঁর সৃষ্ট নারীচরিত্রেরা নিছক কাহিনির সহায়ক চরিত্রই না, তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্ত, সঙ্কট, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মমর্যাদা নিয়ে তাঁরা উপন্যাসের নিজস্ব জগৎ তৈরি করেন। ‘কালবেলা’ ও ‘কালপুরুষ’ -এর মাধবীলতার পাশাপাশি ‘সাতকাহন’ -এর দীপাবলি সেই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। দীর্ঘ জীবনপথ পেরিয়ে একটি মেয়ের আত্মপ্রতিষ্ঠার কাহিনিকে কেন্দ্র করে রচিত এই উপন্যাস তাই শুধু ব্যক্তিগত সংগ্রামের কাহিনি নয়, নির্দিষ্ট একটি সময়ের সামাজিক কাঠামো, নারীজীবন ও ক্ষমতার ব্যবস্থাকেও পাঠ করার সুযোগ দেয়। ‘সাতকাহন’ -এর কেন্দ্রীয় চরিত্র দীপা, যাকে পরবর্তী সময়ে দীপাবলি নামে চেনা যায়। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স অঞ্চলের আংরাভাসা নদীর কাছের চা-বাগানকে ঘিরে তার জীবনযাত্রার সূচনা। প্রকৃতির নিবিড়তা, চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবেশ এবং গ্রামীণ সমাজের নানা রীতি-রক্ষণশীলতার মধ্যে বেড়ে ওঠা মেয়েটির জীবনে খুব অল্প বয়সেই নেমে আসে গভীর বিপর্যয়। বাল্যবিধবা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে যেন সমাজ একটি নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ লিখে দিতে চায়। কিন্তু দীপাবলি সেই নির্ধারিত জীবনের কাছে আত্মসমর্পণ করে না। এই জায়গা থেকেই চরিত্রটির মূল শক্তি তৈরি হয়েছে। দীপাবলির সংগ্রাম কোনও একদিনের বিদ্রোহ নয়। এটি ধীরে ধীরে নিজের জীবনকে নিজের মতো করে গড়ে নেওয়ার দীর্ঘ প্রয়াস। সমাজের চোখরাঙানি, বিধবাজীবন সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা, পারিবারিক বাধা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, প্রতিটি স্তর পেরিয়ে সে শিক্ষাকে নিজের মুক্তির পথ হিসেবে গ্রহণ করে। উত্তরবঙ্গেই কলেজের পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় যাওয়া তার জীবনের একটি বড় বাঁক।
সমরেশ মজুমদারের দীপাবলি পাঠকের আলোচনায় ফিরে আসেন মূলত তাঁর ব্যক্তিসত্তার কারণে। তিনি কোনও নিখুঁত প্রতিমা নন, আবার নিছক প্রতিবাদী চরিত্রও নন। তাঁর সাফল্যের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা আছে, আবেগের পাশাপাশি যুক্তি আছে, সম্পর্কের আকর্ষণের পাশাপাশি নিজের শর্তে বেঁচে থাকার তাগিদ আছে। এই দ্বৈততাই চরিত্রটিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
কলকাতা দীপাবলির কাছে শুধু নতুন শহর নয়, নতুন অভিজ্ঞতারও জায়গা। গ্রামীণ পরিবেশ থেকে মহানগরের জীবনে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তার সামনে খুলে যায় অন্য এক পৃথিবী। কফি হাউস, ছাত্রজীবন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শহরের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ এবং নানা মতাদর্শের সংঘাত তার চিন্তাজগৎকে প্রসারিত করে। কিন্তু লেখক দীপাবলিকে কেবল শহরে এসে বদলে যাওয়া একটি মেয়ের ছকে আটকে রাখেননি। তার ভিতরের দৃঢ়তা, আত্মমর্যাদা এবং নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই চরিত্রটিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। উপন্যাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলির একটি হল দীপাবলির আত্মনির্ভরতার নির্মাণ। সে সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় ঠিকই, কিন্তু পুরুষবিদ্বেষী কোনও চরিত্রে পরিণত হয় না। তার লড়াই পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, সেই সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যেখানে নারীর জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অনেক সময় অন্যের হাতে থাকে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। লেখক নারীস্বাধীনতাকে কোনও স্লোগানে পরিণত করেননি। দীপাবলির স্বাধীনতা এসেছে তার শিক্ষা, সিদ্ধান্ত, কর্মজীবন এবং নিজের ভুল-সঠিকের দায় নিজে নেওয়ার মধ্য দিয়ে।
প্রেমের ক্ষেত্রেও এই চরিত্রের নির্মাণ লক্ষ্যণীয়। দীপাবলি আবেগহীন নয়। তার অনুভূতি রয়েছে, সম্পর্কের আকর্ষণ রয়েছে, ভালবাসার প্রয়োজনও রয়েছে। কিন্তু প্রেমের বিনিময়ে নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিতে সে রাজি নয়। যে সম্পর্ক তার ব্যক্তিসত্তাকে খর্ব করতে চায়, তার সামনে সে আপসের পথ বেছে নেয় না। ফলে দীপাবলির একাকিত্বও পরাজয়ের চিহ্ন হয়ে ওঠে না। নিজের শর্তে জীবনযাপন করার সিদ্ধান্ত হিসেবে তা পাঠ করা যায়। এখানেই ‘সাতকাহন’ প্রচলিত নারীজীবনের কাহিনি থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। দীপাবলিকে লেখক নিখুঁত বা ত্রুটিহীন মানুষ হিসেবে নির্মাণ করেননি। তার পথেও দ্বিধা রয়েছে, আবেগ রয়েছে, সম্পর্কের টানাপোড়েন রয়েছে। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই তার চরিত্রকে দৃঢ় করে। এই মানবিক অসম্পূর্ণতা দীপাবলিকে কেবল আদর্শ নারীচরিত্র না রেখে একজন বিশ্বাসযোগ্য মানুষ করে তুলেছে।
উপন্যাসটির পরিসর শুধু ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ নয়। দীপাবলির জীবনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশও। উত্তরবঙ্গের চা-বাগান থেকে কলকাতার নাগরিক পরিসর, সেখান থেকে প্রশাসনিক কাঠামো, প্রতিটি স্তরে লেখক আলাদা আলাদা সামাজিক বাস্তবতা হাজির করেছেন। ফলে দীপাবলির ব্যক্তিগত উত্থানকে বৃহত্তর সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। বিশেষত, প্রশাসনিক জীবনে প্রবেশের পর চরিত্রটির সামনে যে নতুন ধরনের সংকট তৈরি হয়, তা উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষিত এবং উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানেই অন্যায় থেকে মুক্ত একটি জীবন, লেখক এমন সরল ধারণা দেননি। ক্ষমতা, রাজনৈতিক প্রভাব, দাপ্তরিক চাপ ও স্বার্থের সংঘাতের মধ্যে একজন ব্যক্তির নৈতিক অবস্থান কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, তা দীপাবলির অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দেখানো হয়েছে।
এখানে উপন্যাসটির সামাজিক পাঠ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শৈশবে যে মেয়ে পারিবারিক ও সামাজিক বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে লড়েছিল, কর্মজীবনে গিয়ে তাকে লড়তে হয় ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে। অর্থাৎ বাধার ধরন বদলায়, কিন্তু নিজের অবস্থান রক্ষার প্রয়োজন বদলায় না। এই ধারাবাহিকতাই দীপাবলির চরিত্রকে একটি দীর্ঘ জীবনযাত্রার রূপ দেয়। সমরেশ মজুমদারের লেখার একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য তাঁর সময় ও পরিবেশকে কাহিনির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। ‘সাতকাহন’ -এ-ও তার ব্যতিক্রম নেই। উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের পরিবেশ, গ্রামীণ সমাজের মানসিকতা, কলকাতার ছাত্রজীবন, রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং প্রশাসনিক জগত, এসবকিছু মিলে উপন্যাসের বিস্তৃত পটভূমি তৈরি হয়েছে। তবে এই পটভূমি নিছক সাজসজ্জা নয়। চরিত্রের মানসিক বিকাশ এবং সিদ্ধান্তের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
আবার, গ্রন্থটির মূল্যায়নে কিছু প্রশ্নও রাখা প্রয়োজন। দীপাবলির চরিত্র যত শক্তিশালী, উপন্যাসের কিছু জায়গায় তাঁর সংগ্রামকে পাঠকের কাছে আদর্শনির্ভর করে তোলার প্রবণতা দেখা যেতে পারে। একটি দীর্ঘ সময়জুড়ে একজন নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার কাহিনি লিখতে গেলে ঘটনাবহুলতা কখনও কখনও চরিত্রের অন্তর্লোকের সূক্ষ্মতার ওপর প্রাধান্য পেতে পারে। ‘সাতকাহন’ -এর ক্ষেত্রেও কিছু পাঠকের কাছে এই প্রবণতা অনুভূত হতে পারে। আরও একটি বিষয় হল, দীপাবলির সাফল্য যে শিক্ষাগত যোগ্যতা, ব্যক্তিগত দৃঢ়তা এবং কর্মজীবনের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত, তার পাশাপাশি তার সময়ের অসংখ্য নারীর সামনে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ফলে দীপাবলির জীবনকে সব নারীর অভিজ্ঞতার প্রতিনিধি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তিনি একটি নির্দিষ্ট সামাজিক পরিসর থেকে উঠে আসা একটি বিশেষ চরিত্র। তাঁর জীবনসংগ্রাম বৃহত্তর নারীজীবনের কিছু প্রশ্নকে সামনে আনে, কিন্তু সব অভিজ্ঞতার পূর্ণ প্রতিরূপ নয়। এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও চরিত্রটির সাহিত্যিক শক্তি কমে না। কারণ দীপাবলি পাঠকের সামনে এমন একটি প্রশ্ন রাখে, যা কেবল তাঁর সময়ের নয়, নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার? সামাজিক পরিচয় কি মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেবে? বিধবা, নারী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা প্রান্তিক সামাজিক অবস্থান, এই পরিচয়গুলির কোনও একটি কি মানুষের সম্ভাবনাকে চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে পারে? উপন্যাসের দীর্ঘ পথচলায় দীপাবলির জীবন এই প্রশ্নগুলির মুখোমুখি দাঁড়ায়।
‘সাতকাহন’ -এর নারীস্বাধীনতার ধারণাটিও তাই আলোচনার দাবি রাখে। এখানে স্বাধীনতা মানে কেবল পুরুষের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্তি নয়। স্বাধীনতা মানে নিজের সিদ্ধান্তের দায় নেওয়া, শিক্ষার অধিকার অর্জন, কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়া এবং সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নিজের মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া। এই ধারণা আজকের পাঠকের কাছে নতুন নয়, কিন্তু উপন্যাসের সময়কাল বিবেচনা করলে এর সামাজিক তাৎপর্য আলাদা করে ধরা পড়ে। দীপাবলির নামের মধ্যেও লেখক একটি প্রতীকী অর্থ তৈরি করেছেন। ‘দীপাবলি’ আলো ও অন্ধকারের দ্বন্দ্বের সঙ্গে সহজেই যুক্ত হয়। তবে চরিত্রটিকে কেবল অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো হিসেবে দেখলে তার মানবিক জটিলতা কিছুটা কমে যায়। সে নিজেও দ্বিধা, আবেগ, ব্যর্থতা এবং সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে এগোয়। তার শক্তি এই যে, এসবের কোনওটিই তাকে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে সরিয়ে দিতে পারে না। সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য নারীচরিত্রের সঙ্গে দীপাবলির তুলনা করলেও তাঁর স্বাতন্ত্র্য ধরা পড়ে। মাধবীলতার মধ্যে যে রাজনৈতিক সময় ও ব্যক্তিগত আবেগের সংঘাত দেখা যায়, দীপাবলির ক্ষেত্রে তার সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘ কর্মজীবন ও প্রশাসনিক পরিসর। ফলে তাঁর জীবনকাহিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে। ‘সাতকাহন’ সেই কারণে শুধু একজন নারীর বড় হয়ে ওঠার গল্প নয়। এটি একাধিক সামাজিক স্তর অতিক্রম করে নিজের পরিচয় নির্মাণের কাহিনি। উত্তরবঙ্গের একটি চা-বাগানের পরিবেশ থেকে যে যাত্রা শুরু হয়, তা শেষ পর্যন্ত একজন কর্মজীবী, প্রতিষ্ঠিত ও নিজের নৈতিক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন নারীর জীবনে গিয়ে পৌঁছয়। এই দীর্ঘ পরিসরই উপন্যাসটির নামের তাৎপর্যকেও সমর্থন করে, একটি জীবনের বহু অধ্যায়, বহু বাঁক এবং বহু অভিজ্ঞতা।
বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে ‘সাতকাহন’ পড়লে কিছু সামাজিক বাস্তবতা বদলে যাওয়া চোখে পড়ে, আবার কিছু প্রশ্ন একই জায়গায় থেকে গেছে বলেও মনে হয়। নারীশিক্ষা, কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতি এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের অধিকার নিয়ে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে। কিন্তু পরিবার, সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র এবং সামাজিক প্রত্যাশার চাপ এখনও অনেক নারীর জীবনকে প্রভাবিত করে। এই কারণে দীপাবলির আত্মমর্যাদা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্ন আজও পাঠযোগ্য। গ্রন্থটির সাহিত্যিক সাফল্য তাই একটি শক্তিশালী নারীচরিত্র সৃষ্টিতে নয়ই, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সময়ের সামাজিক ছবি, উত্তরবঙ্গ ও কলকাতার দুই ভিন্ন জীবনপরিসর ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা। কোথাও কোথাও কাহিনির বিস্তার দীর্ঘ এবং ঘটনাপ্রবাহ ঘন হলেও, সেই বিস্তারই দীপাবলির জীবনকে একক কোনও ঘটনার মধ্যে আটকে রাখেনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, দীপাবলি করুণার পাত্র হয়ে থাকেনি। বাল্যবিধবা হওয়ার পর তার জীবন থেমে যেতে পারত, কিন্তু লেখক তাকে সেই অবস্থায় স্থির রাখেননি। শিক্ষা, কর্মজীবন, সম্পর্ক এবং সামাজিক অবস্থানের নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে চরিত্রটি নিজের পরিচয় তৈরি করেছে। পাঠকের সঙ্গে তার সম্পর্কও তৈরি হয়েছে সহানুভূতির পাশাপাশি প্রশ্নের মাধ্যমে। ‘সাতকাহন’-কে তাই নারীমুক্তির উপন্যাস হিসেবে চিহ্নিত করলে এর পরিসর কিছুটা সঙ্কুচিত হয়। এটি একই সঙ্গে একটি সময়ের সামাজিক দলিল, একটি দীর্ঘ জীবনকাহিনি ও একজন মানুষের আত্মপরিচয় নির্মাণের উপন্যাস। দীপাবলি তার কেন্দ্রীয় চরিত্র হলেও তাকে ঘিরে থাকা সমাজ, প্রতিষ্ঠান এবং সময়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অবশ্য উল্লেখ্য, সমরেশ মজুমদারের দীপাবলি পাঠকের আলোচনায় ফিরে আসেন মূলত তাঁর ব্যক্তিসত্তার কারণে। তিনি কোনও নিখুঁত প্রতিমা নন, আবার নিছক প্রতিবাদী চরিত্রও নন। তাঁর সাফল্যের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা আছে, আবেগের পাশাপাশি যুক্তি আছে, সম্পর্কের আকর্ষণের পাশাপাশি নিজের শর্তে বেঁচে থাকার তাগিদ আছে। এই দ্বৈততাই চরিত্রটিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে। ‘সাতকাহন’ পড়ার পর তাই দীপাবলির জীবনকে একটি নারীর সাফল্যের কাহিনি হিসেবেই দেখা যায় না। উপন্যাসটি এমন এক সমাজের ভেতর দিয়ে একজন নারীর নিজের জায়গা তৈরি করার কাহিনি। জন্মপরিচয়, লিঙ্গ, পারিবারিক বিধিনিষেধ ও সামাজিক রীতিনীতি মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে চায়। সেই নির্ধারণকে অস্বীকার করেই দীপাবলি নিজের পথ তৈরি করে। আর এখানেই সমরেশ মজুমদারের এই উপন্যাসের দীর্ঘস্থায়ী পাঠমূল্য, দীপাবলির গল্প শেষ হয়ে গেলেও, নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার প্রশ্নটি শেষ হয় না।

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আইডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’, ফিরেপড়া- কবিতা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।




