সম্পাদকীয়
প্রতিটি বছরের শেষে এসে জানুয়ারি আমাদের সামনে দাঁড়ায় এক আশ্চর্য নীরবতা নিয়ে। উৎসবের কোলাহল পেরিয়ে। বছরের ভার নামিয়ে রেখে। এই মাস যেন মানুষের ভেতরের দিকে তাকাতে শেখায়। বড়দিনের আলো তখনও পুরো নিভে যায় না! তুলসী দিবসের পবিত্রতা তখনও বাতাসে ভাসে আর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে জানুয়ারি আমাদের প্রশ্ন করে মানুষ হওয়া মানে কী?

বড়দিন কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়! এটি মানবিক উষ্ণতার প্রতীক। ভালবাসা, ক্ষমা, সহমর্মিতা এই শব্দগুলো বড়দিনে নতুন করে অর্থ পায়। শিশুর হাসি, দরিদ্রের দিকে বাড়িয়ে দেওয়া হাত, একে অপরকে গ্রহণ করার মানসিকতা সব মিলিয়ে বড়দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষ আগে মানুষ। তার পরে সব পরিচয়। এরপর আসে তুলসী দিবস নিঃশব্দ অথচ গভীর। তুলসী আমাদের সংস্কৃতিতে কেবল একটি গাছ নয়! তুলসী সংসারের কেন্দ্র, বিশ্বাসের প্রতীক, আত্মিক শুদ্ধতার চিহ্ন। তুলসীর সামনে প্রদীপ জ্বালানো মানে শুধু প্রার্থনা নয়! নিজের ভেতরের অন্ধকারটুকুকে আলোর মুখ দেখানো। এই দিবস আমাদের শেখায় আড়ম্বর নয়! স্থায়িত্বই আসল। উচ্চস্বরে নয়! নীরবতায়ও শক্তি থাকে। আর এই দুই ভাবনার মাঝখানে জানুয়ারি মাস দাঁড়িয়ে থাকে এক সংযমী শিক্ষক হয়ে। জানুয়ারি কোনও উৎসবের ঘোষণা দেয় না। সে হিসাব চায়। গত বছরের ব্যর্থতা, হারানো সম্পর্ক, অসমাপ্ত স্বপ্ন সবকিছুকে সে শান্তভাবে সামনে এনে রাখে। জানুয়ারি আমাদের বলে, নতুন শুরু মানে ভুলে যাওয়া নয়! নতুন শুরু মানে বোঝা, গ্রহণ করা এবং এগিয়ে যাওয়া। সাহিত্যের কাজ এখানেই। সাহিত্য আমাদের শেখায় এই তিনটি সময়কে একসঙ্গে অনুভব করতে বড়দিনের মানবিকতা, তুলসীর আত্মিকতা, জানুয়ারির আত্মসমালোচনা। সাহিত্য পত্রিকা সেই আয়না, যেখানে সমাজ নিজের মুখ দেখে কখনো আলোয় কখনো ছায়ায়। এই জানুয়ারিতে দাঁড়িয়ে আমরা যদি বড়দিনের ভালবাসা আর তুলসী দিবসের সংযমকে হৃদয়ে রাখি। তবে হয়ত আমাদের লেখাও আরও মানবিক হবে। আমাদের পাঠও আরও গভীর হবে। কারণ সাহিত্য কেবল শব্দের বিন্যাস নয় সে সময়ের সঙ্গে মানুষের নৈতিক কথোপকথন।
‘সাশ্রয় নিউজ’ পত্রিকার পাতায় সেই কথোপকথনেরই একটি ক্ষুদ্র প্রয়াস রইল। আমাদের সকল পাঠক-পাঠিকা লেখক-লেখিকা ও সাংবাদিক-কর্মী সকলকেই তুলসী দিবস, বড়দিন ও প্রথম ইংরেজি মাসের বর্ষবরণ উৎসবের আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালবাসা জানাই।🍁
🍂মহামিলনের কথা
অপরের দোষ দেখবার আগে তুমি নিজের দোষ দেখ। সারাজীবন কত শত শত দোষ করেছ, এখনও করছ। তোমার দোষগুলি একটি একটি করে বেছে বেছে দূর করে দাও। ব্যস একেবারে নির্ম্মল হয়ে যাবে,অপরের দোষ দেখতে পাবে না। তোমার দোষ আছে বলেই অন্যের দোষ দেখতে পাচ্ছ। যে দিন তুমি দোষশূন্য হবে সেদিন আর কারো দোষ দেখতে পাবে না। মানুষ যেমন নিপুণভাবে অপরের দোষ দেখে যে দিন তদ্রূপ আপনার দোষ দেখবে সেই দিন একেবারে নির্ম্মল ও দোষশূন্য হয়ে যাবে।

ভাল হবার উপায়?
ভাল হবে? তার আর ভাবনা কি।
বল, কি করে ভাল হবো?
কারুর দোষ দেখবে না, তা হলেই ভাল হয়ে যাবে। যে অপরের দোষ দেখে সে সেই দোষগুলি সব টেনে নিয়ে আপনি দোষময় হয়ে যায়। যদি সত্য সত্য ভাল হতে চাও তা হলে অদোষদর্শী হও। অন্যের দোষ দেখার মত আর পাপ নাই। যে অন্যায় করেছে সে ত করেছে, তুমি তার অন্যায় দেখে ঢাক বাজিয়ে চোখটা, জিভটা কলঙ্কিত করে ফেল,তাই কেঁদে সারা হও। চোখ পেয়েছ “সব ভগবান” বলে দর্শন করে প্রণাম করবার জন্য; জিভ পেয়েছ শ্রীভগবানের নাম, রূপ, লীলা গুনগান করবার জন্য। সেই চোখকে সেই জিভকে যদি অপরের দোষ দর্শনে কীর্ত্তনে নিযুক্ত কর,বল দেখি তোমার চেয়ে জগতে হতভাগ্য আর কে আছে?
অপরের দোষ দেখতে পাচ্ছি, বলবো না?
অপরের দোষ দেখবার আগে তুমি নিজের দোষ দেখ। সারাজীবন কত শত শত দোষ করেছ, এখনও করছ। তোমার দোষগুলি একটি একটি করে বেছে বেছে দূর করে দাও। ব্যস একেবারে নির্ম্মল হয়ে যাবে,অপরের দোষ দেখতে পাবে না। তোমার দোষ আছে বলেই অন্যের দোষ দেখতে পাচ্ছ। যে দিন তুমি দোষশূন্য হবে সেদিন আর কারো দোষ দেখতে পাবে না। মানুষ যেমন নিপুণভাবে অপরের দোষ দেখে যে দিন তদ্রূপ আপনার দোষ দেখবে সেই দিন একেবারে নির্ম্মল ও দোষশূন্য হয়ে যাবে। শিক্ষিতের মধ্যেও এমন দুর্ভাগ্য ব্যক্তি দেখা যায় যে তিনি অপরের লেখার শুধু দোষই আবিষ্কার করেন। হয়ত অন্য লেখকের লেখায় কত সুন্দর ভাব আছে, সে দিকে দৃষ্টি না দিয়ে কোথায় দোষ আছে, কোন্ লেখক কোথায় ভুল করেছেন,তাই অন্বেষণ করতে থাকেন এবং জনসমাজে তা প্রকাশ করে আপনার কৃতিত্ব প্রদর্শন করেন। হরি, হরি, পরই যে পরমেশ্বর, তার দোষ দেখা কৃতিত্ব নয়— মহা অকৃতিত্ব।
বল বল, কি করে আমার দোষ যাবে?
চক্ষু, মন বা বাক্যের দ্বারা কারো দোষ দর্শন, চিন্তন বা বর্ণনা করবে না। প্রত্যক্ষেই হোক, বা পরোক্ষেই হোক কখনও কারও নিন্দা করবে না।
ইচ্ছা না করলেও অপরের দোষ দেখে ফেলি। এ দারুণ রোগ কি করে যাবে?
সংযম অভ্যাস ও সাত্ত্বিক আহারাদির দ্বারা যখন সত্ত্বগুণ বৃদ্ধি পায় তখন দোষ ধ্বংস হয়ে যায় আর রাজসিক তামসিক আহার ও অসংযমে গুণবিনাশকারী দোষ সকল অত্যন্ত বর্দ্ধিত হয়ে থাকে।
যেমন মানুষ আপনার এবং স্বীয় পুত্রের হিত কামনা করে তদ্রূপ যখন সে ব্যক্তি সর্ব্বভূতের হিতকামী হয় তখন তাঁর দ্বারা হরি নিরন্তর তুষ্ট হয়ে থাকেন।
দোষ দর্শন করা অতিশয় দোষাবহ তাতো বুঝি তথাপি করে ফেলি। তার উপায় কি?
এ যুগে উপায়ের তো কোন ভাবনা নাই কেবল নাম কর।
নিরতিশয় দুষ্ট কলিযুগেরই এ একটি মহান গুণ যে শ্রীকৃষ্ণের নাম কীর্ত্তনে সমস্ত বন্ধন মুক্ত হয়ে সেই পরমপুরুষকে প্রাপ্ত হয়।
অনুক্ষণ কর তুমি নাম সঙ্কীর্তন।
হেলায় লভিবে প্রিয় প্রেম মহাধন॥
কেবল নাম কর। নাম করতে করতে বৈরাগ্য এসে উপস্থিত হবে।
বিষয় বৈরাগ্য উপস্থিত হলেই আপনার দোষের দিকে দৃষ্টি আসে এবং তাহাই অতি শীঘ্র “অহং মম” -রূপ বন্ধন হতে মুক্ত করে দেয়। নাম কর আর “সব তুমি” বলে প্রণাম কর।
উঠিতে বসিতে আর খাইতে শুইতে।
যে করে সতত নাম সে তরে ত্বরিতে॥
নামরূপে অবতীর্ণ স্বয়ং ভগবান।
নাম গানে নাম দানে সপ মন প্রাণ।
শ্রী জয় রাম জয় জয় রাম।
>শ্রীওঙ্কারনাথ-রচনাবলী | শ্রীশ্রী ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব
(*বানান সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত)
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
১২.
এবং অবাধ্য পা
অনুষ্ঠানের পর হিরণ্য যেন নতুন মানুষ হয়ে উঠেছিল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে যে হাততালি পেয়েছিল, সেটি কেবল কবিতার জন্য নয়, ওটা ছিল তার নিজের পুনর্জন্মের জন্যও। বহু বছর পর সে অনুভব করল, সে এখনও জীবিত। শব্দেরা এখনও তার মধ্যে বেঁচে আছে, গোপনে, অচেতনভাবে। মীরা যেন সেই স্ফুলিঙ্গ, যিনি আবার আগুন ধরিয়ে দিলেন।
পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে হিরণ্যর দিনচক্র পাল্টে গেল। সকালে টিউশন থাকলেও সন্ধ্যা হলেই সে লিখতে বসত। খাতার পাতা ভরে উঠতে লাগল নতুন কবিতায়। অবাধ্য পা তাকে প্রায়ই টেনে নিয়ে যেত কবিতা কর্নারে। সেখানে গিয়ে মীরার সঙ্গে বসে গান-কবিতার মিলনে এক নতুন আবহ তৈরি করত।
মীরা প্রায়ই বলত,
—আপনি লিখুন, আমি সুর দেব। আমরা একসঙ্গে কিছু সৃষ্টি করব।
হিরণ্যর মনে হত- কবিতা শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ নয়, সুরে মিশলেই তা পূর্ণ হয়। তার মনে পড়ত অরুণিমাকে। সে কবিতা পড়ত, কিন্তু গান গাইত না। অথচ মীরা সেই ফাঁক পূর্ণ করছে। যেন নিয়তি অরুণিমার অসম্পূর্ণতাকে পূর্ণ করতে পাঠিয়েছে মীরাকে।
হিরণ্য জানল, সে আর একা নয়। তার পাশে এখন এমন কেউ আছে, তিনি তার অবাধ্যতাকে ভয় পান না। অরুণিমা তার জীবনে থেকে গেল স্মৃতি হয়ে, আর মীরা হয়ে উঠল বর্তমানের আলো। অবাধ্য পা তাকে একদিন যে ভুল পথে নিয়ে গিয়েছিল, সেই ভুল পথই শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে দিল জীবনের আসল পথে।
আর কবিতা?
একদিন গভীর রাতে হিরণ্য স্বপ্ন দেখল। অরুণিমা দাঁড়িয়ে আছে নদীর ধারে। সাদা শাড়ি, বাতাসে উড়ছে চুল। সে ধীরে ধীরে বলল,
—আমি তোমার কাছে ফিরে আসিনি, তবু তুমি কী আমাকে ভুলতে পারলে?
হিরণ্য মৃদু স্বরে উত্তর দিল,
—তুমি তো আমার কবিতার ভেতরে আছ। আমি তোমাকে মুছিনি, মুছতে পারব না। কিন্তু আমার পা আর তোমার দিকে হাঁটে না।
অরুণিমা মৃদু হেসে নদীর জলে মিলিয়ে গেল। হিরণ্য ঘুম ভেঙে উঠে দেখল, চোখ ভিজে গিয়েছে। কিন্তু বুকের ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত শান্তি। মনে হল, অবশেষে অরুণিমা তাকে মুক্তি দিয়েছে।
পরদিন সে মীরাকে সব কথা খুলে বলল। অরুণিমার কথা, সেই হারানো দিনের কথা, নিজের ব্যর্থতার কথা। মীরা অনেকক্ষণ নীরবে শুনল। তারপর ধীরে তার হাত ধরে বলল,
—প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটা না একটা অমোচনীয় ছায়া থাকে। কিন্তু তুমি যদি সেই ছায়ার আড়ালে থেকো, তবে আলোতে পৌঁছতে পারবে না। আমি তোমার পাশে আছি, যতদিন তুমি চাইবে।
হিরণ্যর চোখ ভিজে উঠল। মনে হল, জীবনে প্রথমবার কেউ তার হাত শক্ত করে ধরল, তাকে সামনে এগোনোর ভরসা দিল।
এরপর থেকে অবাধ্য পা আর তাকে অস্থির করত না। পা যেমন তাকে টেনে নিয়ে যেত রাস্তায়, সে জানত, যেখানেই যাক, সেখানেই তার কবিতা অপেক্ষা করছে। পথ ভুল বলে আর কিছু নেই; প্রতিটি পথই আসলে শব্দের পথ।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হিরণ্যর লেখা ছাপা হতে শুরু করল ছোট পত্রিকায়। পাঠকের প্রশংসা আবার ফিরে এল। কিন্তু এবার তার মধ্যে কোনও অহঙ্কার ছিল না, ছিল একধরনের প্রশান্তি। মীরা পাশে বসে গাইত, তার গানের সঙ্গে কবিতা মিশে এক নতুন রূপ নিত।
একদিন সৌম্য মজা করে বলল,
—তোর অবাধ্য পা তোকে আবার বাঁচিয়ে দিল রে। নইলে তুই তো নিজেকে কবর দিয়ে বসেছিলি।
হিরণ্য হাসল। বলল,
—হ্যাঁ, অবাধ্য পা-ই আসলে আমার নিয়তি।
সন্ধ্যার পর হিরণ্য মীরার সঙ্গে হাঁটছিল। রাস্তায় কুয়াশা নেমেছে, বাতি ঝাপসা হয়ে আছে। হিরণ্য হঠাৎ থেমে বলল,
—আমার মনে হয়, জীবনটা একরকম অবাধ্য পায়ের মতো। যতই তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, সে নিজের মতো চলে। হয়ত ভুল পথে, কিন্তু সেই ভুল পথেই আসলে সঠিক দৃশ্যের জন্ম হয়।
মীরা হেসে তার হাত চেপে ধরল।
—হ্যাঁ, আর সেই দৃশ্যই তো কবিতা।
হিরণ্য জানল, সে আর একা নয়। তার পাশে এখন এমন কেউ আছে, তিনি তার অবাধ্যতাকে ভয় পান না। অরুণিমা তার জীবনে থেকে গেল স্মৃতি হয়ে, আর মীরা হয়ে উঠল বর্তমানের আলো। অবাধ্য পা তাকে একদিন যে ভুল পথে নিয়ে গিয়েছিল, সেই ভুল পথই শেষ পর্যন্ত তাকে ফিরিয়ে দিল জীবনের আসল পথে।
আর কবিতা? কবিতা তার ভেতরে নতুন করে জন্ম নিল। আর সে বুঝল, শব্দকে কেউ কখনও কবর দিতে পারে না। যতই চাপা থাকুক, অবাধ্য পা একদিন তাকে খুঁজে বের করে আনে।🍁(চলবে)
🍂কবিতা
সজল গঙ্গোপাধ্যায় -এর একটি কবিতা

দেওয়ালে মুখ
আমি গলির দেওয়ালে মুখ রেখে কথা বলি
কারণ মানুষের মুখে আজ তালা ঝুলছে
আমার রক্তে ট্রামলাইন, প্রতিটা শিরায় হর্ন বাজে
ভাঙা বিজ্ঞাপনের নিচে দাঁড়িয়ে
আমি ঈশ্বরকে ধূমপান করতে দেখি
এই শহর আমার শরীর চিবোয়
খোলা দাঁতে, বিনা লজ্জায়…
পেটের ভেতর ঢুকে পড়ে খবরের কাগজ
শিরোনামগুলো হাঁ করে চিৎকার করে
আমি হাত বাড়ালে প্রেম নয়
পুলিশের লাঠি এসে পড়ে তালুতে
আমার ঠোঁটে জমে থাকা শব্দগুলো
অশ্লীল নয়, ওরা কেবল খুব বেশি জীবন্ত
মা বলেছিলেন, চুপ থাকলে বাঁচবি
আমি চুপ করিনি, তাই আমার ফুসফুসে আগুন
চোখে পোস্টার, আর হৃদয়ে একটানা বিস্ফোরণ
যৌনতা এখানে অপরাধ নয়
অপরাধ হল ক্ষুধা নিয়ে বেঁচে থাকা।
আমি সেই ক্ষুধার নাম দিয়েছি কবিতা
আর কবিতাকে ছেড়ে দিয়েছি রাস্তায়
নগ্ন, ক্ষুধার্ত, বিপজ্জনক
আজও আমি কাগজে আগুন লাগাই
কলমের মাথায়, কারণ ইতিহাস
এখনো আমাকে গ্রেফতার করতে পারেনি
কুহু মিত্র -এর একটি কবিতা

নিঃশ্বাসের মানচিত্র
তোমার কাঁধে ঘুমিয়ে আছে সন্ধ্যা,
ঘাম-নোনতা আলোয় জ্বলে ওঠে কলারবোন।
আমি আঙুল রাখি, শব্দ গলে যায় চামড়ার নিচে।
ত্বক এখানে মানচিত্র, নিঃশ্বাস তার নদী।
হালকা কাঁপুনিতে খুলে যায় দরজা
ভেতরে ঢোকে উষ্ণতা, ধীরে নামে।
ঠোঁটের কিনারায় থেমে থাকা কথা
শরীর বেছে নেয়, ভাষা নয়।
পিঠ বেয়ে নামা ছায়া, আমাকে পড়তে শেখায়
কীভাবে নীরবতা স্পর্শ হয়।
তোমার হাঁটুর ভাঁজে জমে থাকা বিকেল
আমি তুলে নিই কপালে, লাজ নয়-
শুধু তাপের স্বীকারোক্তি।
রাত যখন শুয়ে পড়ে আমাদের মাঝখানে
শরীরেরা জেগে থাকে, কোনও চিৎকারও নয়,
শুধু ধুকপুক, শুধু কাছে আসার ব্যাকরণ।
পুষ্পল রায় চৌধুরী -এর একটি কবিতা

ঘর-শরীর
আমি আর ভয় পাই না
শাল নয় ত্বক দিয়ে…
অন্ধকার আমাকে ঢাকে
আমার শরীরের প্রতিটি ইচ্ছা
আর লুকিয়ে নেই
সে জানে
চাওয়া আসলে অপরাধ নয়
আমি শুয়ে থাকি জানলার ধারে
হাওয়া এসে চুলে আঙুল বুলিয়ে দেয়
কেউ দেখে না
তবু আমি লজ্জা রাখি না
আমার স্তব্ধতার ভেতরেও শব্দ আছে
নিঃশ্বাসে জমে থাকে স্পর্শের স্মৃতি
আমি কাউকে ডাকিনি তবু কেউ এসে বসে পাশে
এই শরীর আমার ঘর
এখানে ঢুকতে হলে অনুমতি লাগে
যখন মন বলে- এবার পারো
আমি খুলে দিই দরজা
ভালবাসা খুব চুপচাপ
সে চিৎকার করে না শুধু পাশে থাকে
আমার মতোই নগ্ন, আমার মতোই স্বাধীন
কাকলি দাস ঘোষ -এর একটি কবিতা

অবকাশে
সোনালি বিকেল ঝিম হয়ে এলে রোজ
ছায়াতে হারায় আমার ব্যস্ত শহর
বেগুনী কুয়াশা চোখে মুখে মেখে নিয়ে
ধীর পায়ে আসা সন্ধ্যে ঘিরেছে প্রহর।
একখানা চিল হারিয়ে যাচ্ছে দূরে
শেষ পাক দিয়ে আকাশের বুক ছিঁড়ে
জোনাকিরা ঐ আলো হয়ে ফুটে গেলে
রাত পাখী কোন আবার এসেছে ফিরে।
অন্ধকারের মখমলে জমি ছুঁয়ে
কারা যেন ঐ তারাবাতি জ্বালে আকাশে
ফ্যাকাশে জীবন দূরে ছুঁড়ে ফেলি আমি
তারা ছুঁয়ে থাকি রোজ এই অবকাশে।
বিশ্বজিৎ মণ্ডল -এর একটি কবিতা

চাঁদহীন অন্ধকারে একা
অদূরেই জেগে আছে, সুশোভিত উদ্যান
অথচ ঠিক তার নিচেই এক কোমর অন্ধকার
চাঁদের শহরে আমি যেন মরচে ধরা কুয়াশা
সামলাচ্ছি, প্লাবিত জ্যোৎস্নার অরণ্য
আমি তো জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র, দেখিনি কুরুক্ষেত্র আঁকা
অস্তিত্বের লড়াই
আজন্ম বিধ্বস্ত শব্দে সাজাই, মান্যতাহীন নগ্ন পৃষ্ঠা
শকুনির পাশায় জন্ম নিয়েছে, আমার এইসব দুর্ভাগ্য
মেনেছি, এইসব অনর্থক গল্প
সোপানের পর সোপানজুড়ে জেগে আছে, মোমবাতির ওম
অথচ চাঁদহীন অন্ধকারের শহরে আমি একা
বসে আছি, অভিশপ্ত প্রতীকী ধৃতরাষ্ট্রের মতো…
শুভজিৎ নাগ -এর একটি কবিতা

শীতের পরশ
শিশির ভেজা ঘাসগুলি,
কুয়াশায় ঘেরা চারদিক,
ওই শোনা যায়
শীতের আগমনীর গীত।
মন চায় না সকালে বিছানা ছেড়ে তাড়াতাড়ি উঠি,
লেপ কম্বল মুড়ে শুয়ে থাকি গুটিসুটি।
ঝরা পাতা ছড়িয়ে থাকে বাড়ির উঠোন গুলোয়,
সাধের বাগান ভরে ওঠে রঙিন ফুলের আলোয়।
পাকা ধানের মাঠগুলি যেন
পড়েছে সোনার অলঙ্কার,
পল্লীর ঘরে ঘরে নবান্নের প্রস্তুতি জোরদার।
কৃষকটি দ্রুত চলে আল ডিঙিয়ে,
ফিরতে হবে ক্ষেতে আবার তাকে,
খেজুর গাছের রসের হাঁড়ি নামিয়ে।
সন্ধ্যা বেলায় সুইয়ের মতো ঠান্ডা বাতাস বিধে,
রাস্তা ঘাট হচ্ছে শুনশান কুয়াশায় সব যায় ভিজে।
দূরে শোনা যায় জলসার চরাসুরের আওয়াজ
মনটা চায় শীতল রাতে আরেক কাপ গরম চায়ের মেজাজ।
আরো আছে অনেক কিছু ভুলে যায়নি একদম,
নতুন সব্জির তরকারি আর ছোট আলুর দম।
সঙ্গে আছে পিঠে-পুলি নলেন গুড়ের পায়েস,
মিঠেল রোদে গা এলিয়ে একটুখানি আয়েশ।
সঙ্গে চলে নানান মেলা বনভোজন আর সার্কাস সবমিলিয়ে ‘ শীতের পরশ ‘ লিখে দিয়ে যায় এক আমেজের ইতিহাস।
তুহিন কান্তি ভট্টাচার্য্য -এর একটি কবিতা

প্রতীক্ষা
তুমি আসবে, আর একটা কবিতা পাঠ করবে,
এই উন্মুক্ত রঙ্গমঞ্চে, সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা হবে!
উন্মত্ত জনগণ, অধীর অপেক্ষায় বসে আছে,
‘প্রতিনিয়ত সম্পর্কের বলিদান’ এরা শুনেছে!
এই শিশু উদ্যানে, এতদিন কোন শিশু ছিল না,
এই বৃক্ষে, কোনদিনও পুষ্প শোভিত ছিল না,
নিদেন পক্ষে কোন পাখির দেখা মিলতো না!
আজ উদ্যানে ঢাকা পড়েছে সমস্ত মলিনতার,
বজ্র আঁটুনি, একটা কবির সম্পূর্ণ নিরাপত্তার!
পৃথিবীর বুকে ঘটে চলা স্মৃতিরা ভোলা যায় না,
ধ্বংসলীলার আবহাওয়া, চোখে দেখা যায় না
অগ্নিসংযোগ-ধর্মীয়মেরুকরণ-সাম্প্রদায়িকতা,
যুদ্ধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, মানুষের বিরুদ্ধে মানবিকতা!
হে অনাগত কবি, বর্তমান দিনের সমস্ত শৈশব
দেখেছো সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, জনগণের বৈভব?
একদিন তোমরাও জানতে পারবে, কি ঘটেছিল,
শিক্ষা-শিল্প-সাহিত্য, কিভাবে নিষ্পেষিত হয়েছিল!
স্বাধীনতা বলে শব্দটা, পুস্তকে শিখে এসেছিলে,
তা ধ্বংস হয়েছে, গুলি বন্দুক বোমা রাইফেলে!
এসেছে শ্রমিক-কেরানি-নারী-কৃষক-মধ্যবিত্তরা,
ভবঘুরে-ফেরিওয়ালা-বেশ্যা-বৃদ্ধ ও নিম্নবিত্তরা!
দৃপ্ত-কণ্ঠে, জনগণ গেয়ে উঠবে বন্দে মাতারাম,
রবীন্দ্রনাথ-বঙ্কিমচন্দ্র-নজরুল কে করি স্বাগতম!
প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো, আলোর ঝলকানিতে,
সকল হৃদয়ে দোলা লাগলো, অসামান্য কবিতাতে!
“এই বীভৎস সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে মুক্তি পাবো
আমরা সকলে মিলে জীবনের গান গাইতে পারব।”
এই কবিতাই এখন আমাদের স্বপ্ন!
শিপ্রা পাল -এর একটি কবিতা

ছায়া ও রং
ছায়াও কখনও ভারী হয়ে যায়। রাস্তা খুঁড়তে খুঁড়তে যখন তলিয়ে যাচ্ছে, ভীষণভাবে আশ্রয়হীন আর তখনই এটা-ওটা আঁকড়ে ওঠার চেষ্টা।
আজকাল মাটির কাছাকাছি যাবতীয় বড়ই কাছে টানে, উত্তরের জানলা গলিয়ে পাশেই দো’চালা ঘরে জনা কতকের বাস। এই শহরে এ সত্যিই দুর্লভ, কুয়োপারে বালতিতে জল তোলার আওয়াজ কিংবা গাছের ডালে ঝুলছে দোলনা কখনও লাকড়ির রান্নায় ধোঁয়া-ওঠা গন্ধ আর নির্জন দুপুরে হাতপাখার তরঙ্গে শিউলী ফুলের বোঁটা শুকানো রংমশল্লা।
কতটা রঙ দেবে বা নেবে সেটা তোমার ওপর, বৃষ্টি পড়ছে শিশির পড়ছে বিদ্যুৎ পড়ছে তারা খসছে রোদ পড়ছে আর এই মুহূর্তে কাঞ্চনজঙ্ঘা ঝরছে আমার শহর জুড়ে।
গ্রাম্য কিশোরী আড়ালে প্রথম প্রেমের আস্বাদন নেয়, ওপরতলায় হৈ হুল্লোড় নীরব হয় তেতো প্রণয়ের ভোরঘুমে।
জল হাতের কনুই গড়িয়ে ঝুলবারান্দায় দিনের সূর্যকে ছুঁয়ে প্রতিধ্বনিত হয়, ওঁ জবাকুসুমসঙ্কাশং কাশ্যপেয়ং মহাদ্যুতিম্ —।
মিতা নূর –এর একটি কবিতা

তারা ভাল থাকুক
নিদ্রাহীন চোখ ভাস্যমান স্বপ্ন,
মগজ গলানো কিছু কথায়
বুক চেপে ধরে….!
আর দীর্ঘশ্বাস যেন টেনে আসে,
একমাত্র মৃত্যুতেই বুঝি মানুষ
হাফ ছেড়ে বাঁচে….!
তিলে তিলে শেষ হয়ে যাওয়া মানুষগুলো,
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে,
আমি চাই…
আমি চাই বিধাতা তাদের আশা
সফল করুক…!
আমি তো ভুলের দণ্ডে-দণ্ডিত,
ভুল আমার পথগুলো আষ্টেপৃষ্টে
অবরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে…!
আমার জীবনে লজ্জা ঘৃণা আর যন্ত্রণা,
মিলেমিশে একাকার, আজ আমি জানি,
মৃত্যুই আমার নিয়তি…!
তবু যেতে যেতে বিষাদ ভরা হসি মুখে বলে যাই,
আমার মতো ভাগ্য কেউ না পায়,
তারা ভাল থাকুক…
তারা ভাল থাকুক!
🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস
সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য। আজকে শেষ পর্ব।
কিশাণগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়
২৮.
ফেলুদা মালবাবুর চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘মালবাবুর গঙ্গারামকে ফিরিয়ে দেবার কাজটা বোঁদেই করেছে। যা পুরস্কার তা ওকেই দেবেন। আপনার তো পঞ্চাশ লাখ টাকা বেঁচে গেল মালবাবু! আর আপনার বন্ধু বনবিহারীকে চিনে রাখুন। উনিই আপনার কুকুর সরিয়েছিলেন আপনার মহাজনি ব্যবসায় ঢুকবেন বলে। কয়েক বছরের মধ্যে শুধু টাকা ধার দিয়ে আপনি এত টাকা কামিয়েছেন যে তা ওকে ঈর্ষায় ফেলেছিল। ‘মালবাবু বিস্মিত। তিনি অবিশ্বাসীর চোখে চাইলেন বনবিহারীর দিকে। বিস্মিত হলেও কথা বলতে পারছেন না। পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ। এখান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরতে পারবেন তাই বা ভোরবেলায় ভেবেছিলেন নাকি! অটোর ভেতর তখন তো মনে হয়েছিল, তার টাকা কেড়ে নিয়ে পাহাড় থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে চম্পট দেবে ওই অজ্ঞাত দুস্কৃতি।
প্রথম হেলমেটধারীর পাঠের পর দ্বিতীয় হেলমেটধারী পাঠ করা শুরু করতেই ঋতব্রত দ্বিধাহীন উঠে দাঁড়াল। আর হেলমেটধারী প্রথম বাক্যটি শেষ করতে না করতেই ঋতব্রত তার মাথা থেকে হেলমেট খুলে নিল।
ভীত, সন্ত্রস্ত চানুমতির চোখ চলছিল সবচে দ্রুততায়। তার প্রাণের সম্পদকেকে এমন বিপদের ভেতর টেনে এনেছে, কে! হেলমেট মুখ থেকে উঠতে চানুমতির বিস্মিত আর আর্ত স্বর। ‘তুমি, ডাক্তার তুমি?’
ভেবেছিলেন সেই অটোচালকই তাকে টাকা আনতে বলেছে। তারপর তো পুলিশের হস্তক্ষেপে যখন অটোচালকের মুখ থেকে মাফলার বাঁধা আবরণ সরে গেল দেখলেন, সেই ইসলামপুরের সুশান্ত নন্দী। গঙ্গারাম যাকে কামড়ে দিয়েছিল।
ফেলুদা বললেন, ‘দেখুন, আমি মালবাবুর ছেলেকে বাঁচানোর কথাই বেশি ভেবেছি। বাচ্চাদের পণবন্দী করে যারা টাকা চায়, কাগজে পড়েছি, টাকা পেলেও তারা বাচ্চাটাকে মেরে ফেলে প্রমাণ লোপাটের জন্য। মালবাবুর ছেলের হাতের উল্কি আমাকে রহস্যের গন্ধ দিয়েছিল। সেই গন্ধ শুঁকে শুঁকেই আমার এখানে আসা।’
মালবাবু ছেলের দিকে তাকালেন, ছেলে মালবাবুর দিকে। ফেলুদা মালবাবুর ছেলে ঋতব্রতকে জিজ্ঞাসা না করে পারলেন না, যে সে কেন এরকম একটা বাক্য দিয়ে হাতের ট্যাটু করল। এই প্রশ্নটি্র উত্তর তার অধরা রয়ে গেছে। সে পেল কোথায় এই ধ্বনিময় শব্দগুলো।
ঋতব্রতর গলা থেকে কোনও শব্দই বের হচ্ছে না। পুলিশ প্রধানের রাশভারি গলা বেজে উঠল, ‘লাউডার প্লিজ।’ কেঁপে ওঠা স্বাভাবিক। আগেই তিনি বলে রেখেছেন, কোনও রকম তথ্য গোপন করার চেষ্টা হলে শাস্তি হবে মারাত্মক।
ঋতব্রত বলল, ‘তেমন বিশেষ কিছু নয়। আমাকে বাংলা শেখানোর জন্য গ্রাহামস-এর রেসিডেন্সে আমার বন্ধু অনেক বই এনেছিল। তার মধ্যে একটা ছড়ার বই-এর নাম ছিল’তিন তিনে চাপা চু’। নতুন অ্যাপস ডাউনলোড করার পর ব্লু হোয়েলের মতো ওই খেলাটায় ওরা যখন আমায় আইডেন্টিটি মার্ক চাইল তখন সামনে ওই বইটা ছিল। তারপর ওদের নির্দেশেই ঐ নামটাই ট্যাটু বানালাম।’
‘আর বাবার লাল মহাজনি খাতাগুলোকে কী করলে?’
মালবাবু চমকে উঠলেন। এট পঙ্কজের স্বর। সে তো বোঁদের পাঠানো ভিডিও তে দেখেছে হেলমেটধারী লালখাতা চুরির কথা বলে থ্রেট করছে ঋতব্রতকে।
ঋতব্রত আবার বলল, ‘হেলমেটধারী খেলার প্রথম শর্ত হিসেবে বাবার প্রিয়তম প্রয়োজনীয় জিনিস চুরি করে আনতে বলেছিল। মানে প্রথম ধাঁপে সহজ ঝুঁকির খেলা। আমি কয়েক বছর ধরেই দেখেছি বাবা খুব যত্নে আর গোপনে ওই লাল খাতাগুলো রাখতেন। একদিন দুপুরে বাবা অফিসে গেলে, বাড়িতে গিয়ে চুরি করলাম। জানতাম মা কিছুতেই বাবাকে এসব বলবে না।’
উল্টোদিকে মাথা নিচু করে বসা চানুমতি দেবী কেঁপে উঠলেন। এখানে না বলে আসার জন্য মালবাবুর হাতে একবার ফাঁসি হবে। আবার এই চুরির সাক্ষী হিসেবে আর একবার।
ঠিক উল্টোদিকে নয়, চানুমতির বাঁ দিকে পাঁচ-সাত জন ছেড়ে চারজন বসে আছে। প্রত্যেকের মাথায় হেলমেট। এবার পুলিশ প্রধানের কণ্ঠস্বর। ঋতব্রত, ডিয়ার এই চারজনই কথা বলবে এখন। তুমি এদের ভেতর থেকে যে সেই হেলমেটধারী তার মাথা থেকে হেলমেট খুলে নেবে। কি পারবে তো?’
ঋতব্রত মাথা নাড়ল। তার স্মরণশক্তি তীব্র। বইয়ের কোনো একটা পড়া একবার চোখে দেখলে সে ভোলে না। আর এই কন্ঠের প্ররোচনায় সে তো পঞ্চাশ দিনের একটা খেলা খেলেছে। গতকালও তার কণ্ঠ শুনেছে ফোনে। ‘তিন তিনে চাপা চু’ -এর পথে এই হেভেন আসতে সেই তো বলেছে। তার এত হেনস্থা, অপমানের জন্য সেই তো দায়ী। তাকে তো চিনতেই হবে।
চার হেলমেটধারীর হাতেই একটা রিটেন টেক্সট দেওয়া হয়েছিল। তা দেখেএক এক করে পড়া শুরু হল।
‘পরম করুণাময়ের অনুপ্রেরণায় দেশকে সমৃদ্ধ, উন্নত, প্রগতিশীল করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের এই সমবেত প্রার্থনা। এই প্রার্থনা করব আমরা সামাজিক সুরক্ষার জন্য, আনন্দক্রীড়ায় উদবেলিত হওয়ার জন্য, অন্তরের প্রশস্তিকরণের জন্য।’
প্রথম হেলমেটধারীর পাঠের পর দ্বিতীয় হেলমেটধারী পাঠ করা শুরু করতেই ঋতব্রত দ্বিধাহীন উঠে দাঁড়াল। আর হেলমেটধারী প্রথম বাক্যটি শেষ করতে না করতেই ঋতব্রত তার মাথা থেকে হেলমেট খুলে নিল।
ভীত, সন্ত্রস্ত চানুমতির চোখ চলছিল সবচে দ্রুততায়। তার প্রাণের সম্পদকেকে এমন বিপদের ভেতর টেনে এনেছে, কে!
হেলমেট মুখ থেকে উঠতে চানুমতির বিস্মিত আর আর্ত স্বর। ‘তুমি, ডাক্তার তুমি?’
এই ডাক্তার হিসেবে আইডেন্টিটিটা দরকার ছিল পঙ্কজ থাপার। কারণ তাকে দু’য়ে দু’য়ে চার মেলাতে হবে। এই ডাক্তারকে আইডেন্টিফাই নাও করতে পারেন ম্যাডাম কর্মা। তিনি যা ধড়িবাজ মহিলা। এই বিশাল সাম্রাজ্য ফেঁদে বসেছেন। রাশি রাশি টাকার মালকিন।
পঙ্কজ থাপা ছুটে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ডাক্তার লোকটার উপর। ‘বলো, তুমি কেন এতগুলো অবলা জীবের চোখ ছিনিয়ে নিয়েছ?’
বোঁদে জানে পঙ্কজ কেমন কুকুর ভালবাসে। পঙ্কজ হয়ত গলা টিপে মেরেই ফেলবে লোকটাকে। সে কাছেই ছিল, পেছন থেকে জাপটে ধরে ডাক্তারের উপর থেকে তুলে নিয়ে আসে তাকে।
পঙ্কজ হাঁফাচ্ছে, তার চোখে জল।
চানুমতির চোখেও জল। তার ডাক্তারের উপরে এই আক্রমণে কেঁপে গিয়েছে সে। চানুমতি যে ডাক্তারকে ভালবাসে।
ডাক্তার আদিত্য বিশ্বাস বড় করে অনেকগুলো শ্বাস নিল। শুধু বুকের উপরে পঙ্কজের বিরাট শরীরের উঠে আসা নয়, বুকের ভেতরেও তো ভাঙচুর হয়ে চলেছে। সে জাঁতাকলে পড়ার পর থেকেই বুঝে ফেলেছে পঞ্চাশ লাখ টাকার অচ্ছে দিন নয়, খুব বুড়া হাল তার জন্য অপেক্ষা করছে। সে চেয়েছিল মালবাবুকে একটু টাইট দিতে। মালবাবুর বউকে মালবাবু যেমন বাবা-মায়ের সম্পর্কচ্যুত করিয়েছেন, ঠিক তেমন। মানে ইটের বদলে পাটকেল। ঋতব্রতকে নেশাড়ু বানিয়ে ছেড়ে দেওয়া ঠিক ছিল। তারপর এই পঞ্চাশ লাখের লোভ করা ঠিক হয়নি।
আদিত্য বিশ্বাস আরও ভাবল, নার্কোটিকের নিয়ম অনুযায়ী তার তিন বছরের জেল বাঁধা। কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিন্তু যে মহিয়সী তার প্রেমে ফাঁসিয়ে একজন ডাক্তারকে এমন অপরাধ জগতে নামিয়েছে, তার কথা বলতে হবে না!
‘হ্যাঁ আমি এই ‘হেভেন হোকাস-পোকাস’ এর ফ্যামিলি ডক্টর আদিত্য বিশ্বাস। ম্যাডাম কর্মা আমার বিশেষ বন্ধু। তাদের ছেলেমেয়েদের, হোটেলের কর্মচারীদেরও অসুখ-বিসুখ-এ আমি আসি। এছাড়া আমার সংসার নেই বলে মাঝে মাঝেই এই রিসর্টের স্বর্গীয় আবহ আমাকে টেনে আনে।’
ডাক্তার বিশ্বাস কোনও দিকে তাকাচ্ছে না। মাথা নিচু করেই কথা বলছে। ডাক্তার জানে ম্যাডাম কর্মার চোখে একবার চোখ পড়ে গেলাই হয়ত আর বলে ওঠা যাবে না। এমনই ‘হিপটোনাইজিং পার্সোনালিটি তাঁর। সামান্য থেমে ডাক্তার বলতে থাকে, ‘ম্যাডাম কর্মা ‘পেট’ ভালোবাসেন। তার কোলে, আপনারা যারা দেখেছেন,চোখে পড়বেই সবসময় একটা কালো বেড়াল আছে। বছর পাঁচেক আগে যখন এসেছি এখানে, এত কুকুর বেড়াল ছিলনা। ছিল ওই কোলেরটি-ই। ম্যাডাম কর্মা কিছুতেই তাকে কোল থেকে নামাতেন না। সেও যেতে চাইত না। সে পড়ে থাকত ওই কোলেই। বেশ বছর কয়েক বাদে তাঁর নৈকট্যের দাবীতে জিজ্ঞাসা করেছি এর কারণ। নাছোড়বান্দা আমি। তিনি বললেন, ওই বেড়াল নাকি তার প্রাণভ্রমর। ঐ বেড়ালের চোখ দিয়েই নাকি তার সিকিউরিটির ব্যবস্থা। আর বেড়ালকে অল্প অল্প হেরোইন খাওয়ান, তিনিও খান। তাই সে ঝিম মেরে থাকে।’
সবাই নড়েচড়ে বসে। বেশ গল্পে রং লেগেছে। ভিডিও হচ্ছে পুরোটা। ম্যাডাম কর্মা ছটফট করছেন। কেন ডাক্তার এসব বলছে!
ডাক্তার আদিত্য বিশ্বাস বলতে থাকে, ‘এরপর একদিন ম্যাডাম কর্মা বললেন, আমার এখানে যত পেট আছে, ডাক্তার, তুমি তাদের সব কটির একটি চোখ খুলে সেখানে ক্যামেরার লেন্স বসিয়ে দাও। দু’লাখ করে তেরোটার জন্য ছাব্বিশ লাখ পেলাম। ম্যাডাম কর্মা আরো বেড়াল কুকুর সব এনে দিলেন। সেগুলো দার্জিলিং-এর কর্মা গ্রুপস এর হোটেলে থাকে। আমার দার্জিলিং নার্সিং হোমেই অপারেশন হল তাদের। আমি বললাম, তুমি তো এখানে থাকবে না। তো এরা তোমার কী সিকিউরিটি দেখবে! তখন অন্য গল্প। বললেন, হটেলের লবিতে তো সি সি টিভির ক্যামেরা থাকেই। ঘরের ভেতর রাখা তা বারণ। ওই বেড়াল গুলো ঘরের ভেতরে গিয়ে সি সি টিভির ক্যমেরার কাজ করে আর বোর্ডারদের গোপন ছবি মনিটরে পাঠিয়ে দেয়। সেই ছবি নানা ভাবে এডিট করে, ট্রাক লাগিয়ে পর্ণ সাইটে চলে যায়। ম্যাডাম কর্মার হাতে গোছা গোছা টাকা আসে। কিন্তু তার তো আরো টাকা চাই, আরো টাকা। টাকা পেতে পেতে কোথায় থামতে হবে জানেন না তিনি। তিনি হেরোইন স্মাগল করা শুরু করলেন। কালিম্পং শুধু নয়, গ্যাংটক, নেপাল, ভুটান, দার্জিলিং-এ সব তাঁর লোক। মাল শিলিগুড়ি হয়ে কলকাতা, বাংলাদেশ, পাকিস্তানেও যায়। অনেক লম্বা হাত ম্যাডাম কর্মার। ম্যাডাম কর্মা চেঁচালেন, ‘স্টপ ডাক্তার, স্টপ। কেন মিথ্যে কথা বলছ!’
‘না মিথ্যে বলছে না।’ পঙ্কজ থাপার কণ্ঠ।
‘তুমি ইউ টিউবে ইনক্রেডিবল গোখেল’ বলে একটা পর্ণ সাইট চালাও। এই যে গঙ্গারাম, এর ডান দিকের চোখ কে খেয়েছে? জল গড়ায় কেন তোমার সব পোষ্যদের চোখ থেকে? বনবিহারীকে দিয়ে জোর করে গনেশ ছেত্রীর দু-একর জমি দখল করে এই হেভেনের সাথে কে মিশিয়ে নিয়েছে? তাকে কর্মচারীর মতো রেখেছ এই হেভেনে! তোমার স্বামী কেন বেশিটা সময় বিহারের কিশানগঞ্জে কাটায়? তোমার এই নোংড়ামি তার সহ্য হয় না বলেই তো! তুমি জানো না সেই পাপ বোধে বনবিহারী বাবু কত কষ্ট করে গনেশ ছেত্রীর মেয়ে চানুমতিকে এখানে নিয়ে এসেছেন।’
একটা কোণে হাত বাঁধা অবস্থায় বৃদ্ধ গনেশ ছেত্রী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি অপমানে মাটিতে মিশে যাচ্ছিলেন। কোনো খারাপ কাজ তো তিনি করেননি জীবনে। তবুও তার কাছে জীবন এমন কঠিন হয়ে আসে কেন।!
চানুমতির নামটা শুনে উত্তেজিত হয়ে ভিড়ের ভেতর থেকে ঠেলে ঠুলে ভেতরে এলেন গনেশ ছেত্রী। চোখ ছটফট করছে তাঁর। কই কই! হ্যাঁ ম্যাডাম কর্মা ছাড়া অন্য মহিলাকে তার চানুমতির মতো লাগছে। শরীরে শরীর লেগেছে। ছোট্ট দু’বেণী কিশোরী, যা তার স্মৃতিতে ছিল তা এখন নেই। তবে মুখ এখনও একই রকম পান পাতার মতো। হাত বাঁধা অবস্থাতেই ছুটে যেতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন গনেশ ছেত্রী।
পঙ্কজ থাপা সামনেই ছিল। সে বৃদ্ধকে মাটি থেকে তুলে হাতের বাঁধন খুলে দিল। এটুকু সময়ে চানুমতিও তার বুড়ো বাবাকে চিনে ওঠে। সে ছুটে এসে বাবার মুখোমুখি। তার চোখ থেকে বন্যা ছুটছে। অসহায় বেঁধে রাখা দুটি হাত একসাথে ওঠানামা করছে। গনেশ ছেত্রী চানুমতির হাতের বাঁধন খুলে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
‘হিসেব আর একটু বাকি আছে।’ এটা ফেলুদার কন্ঠস্বর।
‘গঙ্গারামের মালিক মালবাবু মোটেও ধোঁয়া তুলসিপাতা নন। তিনি নিজের স্ত্রী এই চানুমতির উপর অকথ্য নির্যাতন করেন। শুধু মানসিক ভাবেই নয়। শারীরিক ভাবেও। কী যেন বলে না ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স। চানুমতির শরীর
সেই ভায়োলেন্সের স্বাক্ষ্য দেবে। পুলিশ আছে, কোর্ট আছে, ব্যাপারটা নিশ্চয়ই দেখবে তারা।’ ফেলুদা যে মালবাবুর উপরে খুব রেগে আছেন, বোঝা যায়।
সভা ভঙ্গ হওয়ার আগে যেমন শেষ একটা ধন্যবাদ জানাতে হয় উপস্থিত সবাইকে, এখানে কিশানগঞ্জের বোঁদে যেন সেই দায়িত্ব নিয়ে নিল।
বন্ধু পঙ্কজ থাপার কাঁধে হাত রেখে বেশ তৃপ্ত স্বরে বোঁদে বলল, ‘আমরা কুকুর চুরি ধরতে এসে পুকুর চুরির খবর জানিয়ে গেলাম সবাইকে। হেরোইন স্মাগলিং, অস্ত্র স্মাগলিং, নারী শরীরের ছবি স্মাগলিং— কত কী না সামনে চলে এলো! প্রশাসন আইন কে আইনের পথে নিয়ে যাবেন। কিন্তু আমাদের কুকুর গঙ্গারামকে হিরোর ভূমিকা থেকে যেন বাদ না দেয়া হয়। দু-চারদিন হেরোইন না খেলে ও ফের জবরদস্ত মেজাজ ফিরে পাবে। ঝিমোবে না। আবার সে শত্রুর যম হয়ে উঠবে । ওই যে দাঁড়িয়ে আছে অটোচালক, যে মালবাবুকে আজ ভোরে ডেলো পাহাড়ের কুয়াশায় নিয়ে খাদে ফেলে মেরে ফেলতে চাইছিল, সে হাড়ে হাড়ে জানে গঙ্গারামের কেরামতি।’ 🍁(সমাপ্ত)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।





