🍂মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
পাওয়া জিনিষ পাই না কেন? প্রাণরূপে তুমি আমাকে ধরে রেখেছ তবু যেন আমি তোমা থেকে দূরে আছি বলে মনে হয়, এ কি রহস্য?
তুমি অন্তরে বাহিরে বিরাজমান, তুমি শ্বাস প্রশ্বাস, তুমি দৃষ্টির দৃষ্টি, কর্ণের কর্ণ, মনের মন, তবু তোমায় হারিয়ে ফেলি।

দধিতে ননী আছে কিন্তু দধি মন্থন না করলে ননী মেলে না। কাষ্ঠে অগ্নি নিত্য বর্ত্তমান, কিন্তু অরণী মন্থন না করে অন্য কোন উপায় অবলম্বনে তা দেখা যায় না,কাষ্ঠকে খণ্ড খণ্ড করলেও একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ কেহ দেখতে পায় না। ক্ষুদ্র ব্রহ্মাণ্ডদেহের ভিতরে বাইরে আমি আছি। দেহের উপাদান ক্ষিত্যাদি পঞ্চভূত আমি। অন্তঃকরণ ও ইন্দ্রিয়গণ আমি, এ অতি সত্য কিন্তু যতক্ষণ না উপাসনার দ্বারা শরীরকে মন্থন করা হবে ততক্ষণ কেহ আমার কোন সন্ধান পাবে না।
কি দিয়ে মন্থন করতে হবে?
নাম হল মন্থন দণ্ড। নামরূপ মন্থনদণ্ড দ্বারা যে দেহ মন্থন করতে পারে আমি প্রেম-নবনী-রূপে দেহ থেকে আবির্ভূত হয়ে তাকে সর্ব্বত্র আমার স্বরূপ দেখাই।🍁
—শ্রীশ্রী ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব | ঋণ : শ্রীশ্রীনামামৃত লহরী✪ শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী
🍁ভ্রমণ কথা
সতেরো শতকের রাজসভার এক অপূর্ব নিদর্শন। কিন্তু যতই যাই না কেন, আমাদের মন পড়ে রইল সেই মন্দির চত্বরে, সেই স্তম্ভের ছায়ায়। চলতি পথে একজন স্থানীয় দোকানি বললেন, “আপনারা ভালবাসতে এসেছেন, তাই দেবী আপনাদের ডেকেছেন।
মীনাক্ষী মন্দির ছায়ায়, পুরাকথার শহরে দিন ক’য়েক

সৈকত মুখোপাধ্যায়
মাদুরাই। একটি প্রাচীন শহরের নাম, এক জীবন্ত পৌরাণিক ইতিহাস, আর এক অলঙ্ঘ্য স্থাপত্যচর্চার বিস্ময়। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) বুকে অবস্থিত এই শহরটি শুধু একটা জায়গা নয়, এ যেন এক ধরনের বিশেষ অনুভূতি। হাজার বছরের পুরনো ইতিহাস, চকমকে রঙের গাথা আর নিঃশব্দে উচ্চারিত দেবভক্তির হাওয়ায় ঢেকে রাখা এক আত্মিক অভিজ্ঞতা, এই শহরে একবার আসলে আপনার অন্তর্দেশ বদলে যাবে।
ভেতরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই অনুভব করলাম সময় যেন থমকে গিয়েছে। অন্ধকার, ধূপের গন্ধে ভরা, স্তম্ভশ্রেণিতে ঘেরা সেই প্রকাণ্ড হলঘরগুলো যেন অতীতের প্রাসাদ। স্তম্ভে স্তম্ভে আলো-আঁধারির খেলা, আর সেই আলোর ফাঁকে পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ!
আমার এই ভ্রমণের সূচনা হয় একান্ত ভালবাসার মানুষটির হাত ধরে। আমরা দু’জনেই সদ্য বিবাহিত, আর আমাদের প্রথম পোস্ট-ওয়েডিং ট্রিপের জন্য খুঁজছিলাম এমন এক স্থান, যেখানে ইতিহাসের গভীরতা, সংস্কৃতির জাঁকজমক আর প্রেমের নিঃশব্দ ছোঁয়া একসঙ্গে মেলে। গুগলের বহু ঘাঁটাঘাঁটির পর আমাদের চোখ আটকে গেল মীনাক্ষী মন্দিরের (Meenakshi Amman Temple) ছবি দেখে। এক চোখজোড়া মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধার সম্মিলন, যেন দেবী স্বয়ং আমাদের ডাকছেন।
মাদুরাই পৌঁছোনোর পর প্রথম যে অনুভূতিটা হয়, তা হল, এই শহর এখনও সময়কে ছুঁতে দেয়নি। পাথরের গায়ে সময় জমেছে, কিন্তু গড়িয়ে পড়েনি। টুকটুকে রোদে ঝলমল করা দুপুরে যখন মীনাক্ষী মন্দিরের উত্তর গোপুরম (North Gopuram) চোখে পড়ে, তখন মাথা নিচু হয়ে যায় স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধায়। প্রায় ১৪টি গোপুরম নিয়ে তৈরি এই সুবিশাল মন্দিরটি প্রতিটি কোণ থেকে একেকটি ভাস্কর্য-জগৎ। হাজার হাজার দেবদেবী, অসুর, রথ, নাগিনী আর পৌরাণিক কাহিনির দৃশ্য ফুটে উঠেছে রঙিন নিপুণতায়।
প্রবেশমুখে দাঁড়িয়েই আমার স্ত্রীর মুখে একটা নিঃশব্দ ‘ওহ্’ বেরিয়ে যায়। শাড়িতে সে যেন এক অপার্থিব চরিত্র, আর এই বিশাল মন্দির যেন তার পেছনের ক্যানভাস। ভেতরে ঢুকতেই প্রথম চোখে পড়ে আয়রন পিলার আর পাথরের উপর খোদাই করা হাজার হাজার চরিত্র। প্রতিটি পিলার যেন গোপন করে রেখেছে একেকটি গল্প। স্থানীয় গাইড বললেন, ‘এই মন্দির শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি দক্ষিণ ভারতের এক স্থাপত্য-কাব্য।’
আমরা দেবী মীনাক্ষী ও শিবের মন্দির দর্শন করি। দেবী এখানে ‘মীনাক্ষী’ রূপে পূজিতা হন, ‘যার চোখ মাছের মতন’। শিব এখানে ‘সুন্দরেশ্বর’। এই দুই দেব-দেবীর বিবাহ এখানে জীবন্ত হয়ে ওঠে; একটানা ১২ দিনের বার্ষিক উৎসব ‘তীরুক্কল্যানম’ (Thirukalyanam) মাদুরাই শহরকে এক বিরাট মণ্ডপে পরিণত করে। আমাদের গাইড জানালেন, ‘এই মন্দিরে প্রতিদিন প্রায় ১৫,০০০ দর্শনার্থী আসেন।’
ভেতরে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই অনুভব করলাম সময় যেন থমকে গিয়েছে। অন্ধকার, ধূপের গন্ধে ভরা, স্তম্ভশ্রেণিতে ঘেরা সেই প্রকাণ্ড হলঘরগুলো যেন অতীতের প্রাসাদ। স্তম্ভে স্তম্ভে আলো-আঁধারির খেলা, আর সেই আলোর ফাঁকে পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ!আমরা কিছুটা সময় কাটালাম ‘হল অফ থাউজ্যান্ড পিলার্স’-এ (Aayiram Kaal Mandapam)। এখানে প্রতিটি স্তম্ভ ভিন্ন ভিন্ন অলংকরণে মোড়ানো। কোনও স্তম্ভে চতুর্মুখী ব্রহ্মা, কোনটিতে দশভুজা দুর্গা, আবার কোথাও শিব ও পার্বতীর একান্ত মুহূর্তের প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়রা বলেন, স্তম্ভগুলোর মধ্যে কিছুতে হাত দিলে সুর ওঠে, গাইড বললেন, ‘Each pillar produces a different musical note.’
আমরা দু’জনেই কিছুক্ষণ বসে রইলাম এক কোণে। আমার স্ত্রীর চোখে খুশির ঝলক। বলল, ‘এটা শুধু ট্রিপ নয়, মনে হচ্ছে কোনও স্বর্গীয় স্থানে এসেছি।’ সেই মুহূর্তে আমরা যেন ভুলেই গিয়েছি বাইরের শহর, ব্যস্ততা, ক্যামেরা। এখানে শুধু ছিলাম আমরা, আর ছিল দেবী মীনাক্ষীর আশীর্বাদে ভরা এক অদৃশ্য সুর। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া বেরলাম। মন্দির চত্বরের পাশের স্থানীয় এক তামিল রেস্তোরাঁ। কলাপাতায় গরম গরম সাদা ভাত, সাম্বার, রসাম, আপ্পলম আর শেষে পায়েস। দক্ষিণ ভারতের স্বাদ যেন আরও বেশি প্রাণবন্ত লাগছিল এই পরিবেশে। রেস্তোরাঁর প্রবীণ মালিক, শ্রীনিবাসন, বললেন ‘বিয়ের পর প্রথম যদি মীনাক্ষীর দর্শন, সংসারে শুভ হয়। তোমরা সৌভাগ্যবান।’ সন্ধ্যেবেলা আবার ফিরলাম মন্দিরের গেটে। আলো জ্বলে উঠেছে প্রতিটি গোপুরমে। নিচ থেকে উপরে তাকালে যেন মনে হয়, দেবতারা স্বর্গ থেকে নেমে আসছেন রঙিন ধাপে ধাপে। আলোর খেলায় প্রতিটি ভাস্কর্য যেন জীবন্ত। ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করলাম আমরা সেই মুহূর্ত। মীনাক্ষী মন্দির-এর পেছনে দাঁড়িয়ে তোলা আমাদের সেই ছবি, যেটি পরবর্তীতে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে লেখলাম, ‘এটাই আমাদের ভালবাসার পবিত্র সূচনা।’
এই মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, ভীষণ জাগ্রত স্থাপত্য, আর মনে মনে একজোড়া নারী-পুরুষের দেবত্বে পৌঁছে যাওয়ার অদ্ভুত অনুভূতি। গোপুরম-এর প্রতিটি কোণ যেন বলছে, ‘ভালবাসা এক দিব্য উপলব্ধি, এক পবিত্রতা।’ মাদুরাই ঘোরা মানেই শুধু মীনাক্ষী মন্দির নয়। আমরা ঘুরে এলাম ‘গান্ধী মেমোরিয়াল মিউজিয়াম’, যেখানে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দেখলাম তিরুমালাই নাইকার মহল (Thirumalai Nayakar Mahal) সতেরো শতকের রাজসভার এক অপূর্ব নিদর্শন। কিন্তু এখান থেকে যতই যাই না কেন, আমাদের মন পড়ে রইল সেই মন্দির চত্বরে, সেই স্তম্ভের ছায়ায়। চলতি পথে একজন স্থানীয় গাইড বললেন, ‘আপনারা ভালবাসতে এসেছেন, তাই দেবী আপনাদের ডেকেছেন। মীনাক্ষীর আশীর্বাদ যারা নিয়ে যান, তাদের সম্পর্ক অটুট থাকে।’ এমন কথায় একধরনের ভিতরের শান্তি চলে আসে।
ফিরছি মাদুরাই থেকে, কিন্তু মনে হচ্ছে মীনাক্ষী আমাদের মনে থেকে গেছেন। সেই গন্ধ, সেই পাথরের গায়ে চিত্রিত পৌরাণিক কাহিনি, সেই স্তব্ধতা, সবকিছু মনের ভেতরে এক নরম আলোর মতো জ্বলে রয়েছে। এই ভ্রমণ শুধু একটি স্থানদর্শন নয়, এ যেন আমাদের জীবনের শুরুতেই এক আধ্যাত্মিক আশীর্বাদ, এক নীরব নির্দেশনা, যেন বলছে, ‘প্রেম, শ্রদ্ধা আর ইতিহাস মিলিয়েই তো জীবনের আসল যাত্রা।’ 🍁
🍂কবিতা
বৃন্দাবন দাস-এর কবিতাগুচ্ছ
জরুরি পাঠ
ঠিক কতটা শিক্ষিত হলে
মিথ্যেটা গুছিয়ে বলা যাবে
ঠিক কতখানি গুণী হলে
মিথ্যেকে সুন্দরের বেদীতে বসানো যাবে
ঠিক কোন বিদ্যালয়ের শিক্ষা নেয়া জরুরি
ঠিক কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি একান্ত প্রয়োজন
খোঁজ পাইনি
নিতান্ত দুর্ভাগা মেনেই বেঁচেবর্তে আছি
আমি যে সত্য মিথ্যে আরেকটু শিখে নেব
আমার সেই মাস্টারমশাইরা আর নেই
মাটির পৃথিবীতে
খুব খোঁড়াখুঁড়ি করে কচিত্ দু- এক জন মেলে
দেখি, তাঁরা এখন বধিরতার পাঠ নিচ্ছেন—

সময়
সব কথা বলা যায় না
তোমাকে দেখলেই
চেনা যায় না
সময় অন্ধ তা হোক
বড় সুজন
কাছে ডাকো
বসাও—

শিল্প
একটা শুকনো কাঠের গুঁড়ি
বিছানার মাঝ বরাবর এঁকে দিলে
ঘরের পর্দা হয়ে গেল
বইয়ের প্রচ্ছদ হয়ে গেল
অমনি চোখ মুখ চুল
আলাদা করে ফেললে
ওরা বললে– বাহ্—
সব রাস্তায়
সব রাস্তায় আমার নামে
আলো জ্বলবে–
নেপোলিয়ান কি জেনেছিল
বন্ধু হিটলার জানতো
নাকি হরিহর-মুসোলিনী ভেবেছিল
এ বিধান মানুষের নয়
এ বিধান সিংহাসনের নয়
–শ্বাপদের
শান্তনু মৈত্র

আমার ভেতরে তুমি
তুমি জানো এই চায়ের কাপে
ঝড় ওঠে রাতে, ঢেউ গুনে রাখি?
পাশের বাসনটা হেলে পড়ে চুপে,
তবু কেউ জাগে না, আমি ছাড়া আঁখি।
রাস্তার ধারে উলটো হাওয়া,
কাগজ উড়ে যায়, কেউ পড়ে না।
তোমার মতোন এক গন্ধ আসে,
শরীর ভিজে যায়, মন খোলে না।
মেট্রোর নিচে দাঁড়ায় একটা আলো,
তুমি কি ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলে?
আমার নোটবুকে, পুরনো পাতায়
আজও ভিজে শব্দ, শুকিয়ে মেলে…
হলুদ আলোতে ছায়া পড়ে গায়ে,
বৃষ্টির নিচে কি কথা ছিলো?
ফিরে এসো- এই লাইনটা কেটে,
তুমি বলেছিলে, ‘থেমো না, চলো।’
সিগারেট ছুঁড়ি ফেলে নিঃশ্বাসে,
তবু একটা শ্বাস তোমার মতো।
তুমি যে শহর, ধোঁয়ার ভিতরেও
রয়ে যাও ঠিকই, উধাও যতই।
দেবাশিস সাহা -এর তিনটি কবিতা
ভয় রঙের মানুষ
চারপাশে নানা রঙের ভয়
ঘুরে বেড়ায় ভয় দেখায়
ভয় রঙের মানুষ সকাল সন্ধ্যে
তর্জনী উঁচিয়ে আস্তিন গুটিয়ে
অপমানে ভিজিয়ে দেবার
ছবি করে দেবার ভয় দেখায়
লেজ গুটিয়ে কেন্নো হয়ে যাই
জোরে কথা বলতে পারি না
মিথ্যে বলতে গলার জোর লাগে
কলিজায় থাকতে হবে দম
চোখের পর্দা থাকতে নেই
আমার তো কিছুই নেই
আত্মসম্মানটুকু ছাড়া
এই গরীবের এইটুকুও তোমার চাই!
ভয় রঙের মানুষ ছদ্মবেশে
আত্মীয় হয়ে ত্রাতা রূপে
সেঁধিয়ে যায় চুপিসারে
নিরিবিলি ভাবনাঘরে
তছনছ আর তোলপাড় করে দেয়
আমাদের শান্তিনিকেতন

চলো পথ বদলায়
বদলায় ভয় তাড়ানোর কৌশল
ধুপ জ্বালিয়ে আর ভয় যায় না
চারিদিকে চাপ চাপ ভয় রঙের মানুষ

ভয় তাড়ানোর ধুপ
ভয় তাড়ানোর ধুপ হবে?
মহাকালের দোকানে প্রশ্ন করে সময়
চারিদিকে ভীষণ ভাবে বাড়ছে ভয়
আগে রাত হলে
জানালা খোলা থাকলে
ঘর অন্ধকার হলে
একটু -আধটু ভয় পেত
এখন রাত নয়
সকালে বিকালে দিনের আলোয়
চাপ চাপ ভয় ঘুরে বেড়ায়
মা বার বার বলে
উঠতে বসতে বলে
এখন বাড়ি থেকে বের হলেই
সঙ্গে ভয় তাড়ানোর ধুপ রাখবি
ঘরেও যেন হাতের কাছে থাকে।
দেবব্রত সরকার

চোখে চোখ রাখার আগেই
সেদিন, হাওয়ায় ছিল একটুখানি অপেক্ষা
আমরা কেউ কিছু বলিনি, তবু বলার ছিল।
তুমি পাশে বসে ছিলে, গভীর ভাবে।
তোমার চুলে আলতো আলো পড়ছিল
যেন সূর্য নিজেই থেমে গেছে গোপন কথা শোনার আশায়।
তুমি একবার তাকিয়েছিলে,
তবে কীসের ছুঁয়ে গিয়েছিলে চোখ, না হৃদয়, না পুরোনো কোনো ভুল?
আমি স্পষ্ট বুঝিনি, বুঝতে চাইনি
হয়তো ভয় ছিল, বুঝলেই একান্ত হয়ে পড়ব।
শব্দহীন সেই মুহূর্ত আজও বাজে,
একটা না-করা চুম্বনের মতো
যেটা ঠোঁটে নয়, স্মৃতিতে পুড়ে যায়।
তুমি কি জানো? আমি তাকিয়েছিলাম বহু ভিড়ের মধ্যেও
একটুখানি তোমার মতো মুখের খোঁজে—
হয়তো কোনোদিন তুমি বুঝতে পারবে না,
যে আমি সারাটা জীবন
একটা মুহূর্তকে ছুঁতে চাইনি, শুধু ধরে রাখতে চেয়েছি–
অসংখ্য সৌর জগতের প্রেম
সমস্ত আকাশ জুড়ে শুয়ে থাকি অন্ধকারে
সেই অন্ধকার গলিতে,
যেখানে আলো পায়না চিহ্নের ঠাঁই,
সেখানে পড়ে আছে
তোমার একটি না-করা স্পর্শের স্মৃতি।
সৌরভ মুখোপাধ্যায়-এর কবিতাগুচ্ছ

নীরবতার খাঁচা
একদিন তুমি এসেছিলে
ঠোঁটে নীরবতা, চোখে পাখির পালক।
বলেছিলে, বাঁচতে চাই,
এই খাঁচাটা খুব ছোট।
আমি আমার বুকের খাঁচা খুলে দিলাম
ভেবেছিলাম, এখানেই পাবে মুক্তির আকাশ।
তুমি এলেও উড়লে না
ডানা ছুঁয়েছিলে, কিন্তু ডানায় ছিল ক্ষত।
তখন আমরা দু’জনে
এক খাঁচার ভেতরে বসে থাকতাম,
তুমি আমার গল্প শোনাতে
আর আমি তোমার ক্ষত বুনতাম শব্দে।
তুমি বললে, ‘তুমিও তো পাখি
তোমারও ডানায় রক্ত জমেছে,’
আমি চুপ করে রইলাম,
কারণ সত্যি কথা অনেক সময় শব্দ হারায়।
এখন খাঁচার বাইরে রোদের আলো পড়ে,
ভিতরে কেবল ছায়া নড়ে।
দুজনে পাশে বসে থাকি
আর নীরবতা দিয়েই গড়ি আরেক খাঁচা।

খাঁচার ভেতর ছায়া
খাঁচার ভেতর দাঁড়িয়ে দেখি,
অন্ধকারটা আমার ছায়ার
যত এগোই, ততই পালায়।
পাখিরা এখানে গান গায় না
গলায় জমে থাকে বিষন্নতা
আর ঠোঁটে লেগে থাকে
পালানোর অভিশাপ।
যে খাঁচা খুলে দিয়েছিলে
সে-খাঁচাই আজ আমার ঘর।
দু’জনে পাশাপাশি বসি,
আর একে অন্যকে বলি
তুই আমায় বন্দি করেছিস।

ঠোঁটের রক্তে লেখা চিঠি
তুমি বলেছিলে,
পালক পোড়ে না
পোড়ে শুধু হৃদয়।
আমি বলেছিলাম,
হৃদয়ের চেয়ে বেশি জ্বলে
একটা না বলা বাক্য।
আজ আমরা পাশাপাশি বসে আছি,
দু’টো খাঁচায়
একটা শব্দহীন, আর একটা শব্দবিদ্ধ।
তোমার ঠোঁটে রক্ত
আমার হাতে আগুন
তবুও কেউ চিঠি লিখি না আর।

পালকের জ্বালা
একটা পাখি বলেছিল
তার ডানায় সংসারের ছ্যাঁকা লেগেছে
আমি বিশ্বাস করেছিলাম।
তারপর একদিন দেখলাম
আমার পালকেও আগুন লেগেছে!
তুমি বললে, এটাই তো প্রেম!
আজ দু’জনেই উড়তে পারি না,
ছটফট করি একে অন্যের ডানা কেটে
তবু বিশ্বাস করি,
এইটুকুই মুক্তি।
সন্ধের আগে
সন্ধের আগেই আসে ঝড়,
আমরা তখন ব্যস্ত
তর্ক করি,
কে খাঁচায় ঢুকিয়েছিল কাকে।
ঝড় থেমে গেলে দেখি,
আমরা দু’জনেই জলে ভেজা,
আর খাঁচার দরজাটা খুলে আছে
অনেকক্ষণ ধরেই।
কেউ বাইরে যাই না,
কেননা
দোষারোপ অনেক নিরাপদ।
তানজিন হিয়া

মুক্তি, প্রতিচ্ছবি
একবার ও-বলেছিল,
আমায় বাঁচিয়ে দাও
আমি তাকে এনে রাখলাম
আমার সুন্দর বুকে
আমরা হাসলাম, গান গাইলাম,
দুপুরে রোদে বসে ডানা মেললাম,
কিন্তু রাতে, ঘুমোতে যাওয়ার আগে
সে আমায় জিজ্ঞেস করল
এটাও কি মুক্তি?
আমি উত্তর দিতে পারিনি,
কারণ তখন আয়নায় আমি দেখেছি
আমারও ডানায় তালা লেগে আছে।
🍁ধারাবাহিক উপন্যাস
শুরু হয়েছে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। কবি তৈমুর খানের জীবন। বাল্য-কৈশোরের দিনগুলি কেমন ভাবে কেটেছিল। মননে চেতনায় কিভাবে বয়ে গেছিল উপলব্ধির স্রোত। কেমন করে প্রকৃতি ও জীবনকে দেখতে শিখেছিলেন। কেমন করে জীবনে এলো ব্যর্থতা। সেসব নিয়েই নানা পর্ব।
একটি বিষণ্ণরাতের তারা
তৈমুর খাঁন

সাঁইত্রিশ.
আর কোনো দিকেই তাকাবার অবসর পাইনি
অনেক রাত্রি। ভাড়ার ঘরে একাকী ঘুমিয়ে আছি। ওপরতলায় বাড়িওয়ালা থাকে। নিচে কাঠের মিল। লোকজন থাকে না বললেই চলে। ঘুম ভেঙে দেখি খোলা জানালায় একটি পরিচ্ছন্ন যুবতী মুখ। আমার দিকে উঁকি মেরে দেখছে। কী দেখছো অমন করে? আচ্ছা রোজই কি দ্যাখে তাহলে? আমি কি জানতেও পারি না? দরজা ভেতর থেকে বন্ধই থাকে। ঘুমের ভান করেই অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে রইলাম। ছায়ামূর্তির যুবতীটি একটু পরেই সরে গেল। মনে মনে একটা কৌতুক যেমন জাগলো তেমনি কেন আসে তা নিরীক্ষণ করারও প্রচেষ্টা অব্যাহত থেকে গেল।
হ্যাঁ, বাড়িওয়ালারই মেয়ে। সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছে। দীর্ঘাঙ্গী সুন্দরীও বটে। মাঝে মাঝে তো সাহিত্যের ইতিহাসটাও বুঝতে আসে আমার কাছে। তাহলে রাতে ওভাবে আসার প্রয়োজন কেন? না তার কোনও গোপন ইচ্ছা আছে? আমি এই সম্পর্কের মধ্যে জড়াতে চাই না। সদ্য চাকরি পেয়ে ভাড়াটিয়া হিসেবে এসেছি। আমি প্রেম করতে আসিনি। ওরকম শরীরের প্রতিও অবৈধভাবে আকৃষ্ট হতেও চাই না। মনে মনে একটা ভয় এবং সম্মান হারানোর চিন্তা আমাকে এক দ্বান্দ্বিক অভিঘাতে ক্ষতবিক্ষত করতে লাগলো। যদিও মেলামেশাটা বাইরে বাইরেই ছিল তা কখনো গভীরতা পায়নি। শুধু দু একবার যেতে হয়েছিল বইমেলাসহ আরও ক’য়েকটি স্থানীয় মেলায়। ঠিকমতো রাস্তাঘাট জানা ছিল না। ছাত্র-ছাত্রীসুলভ একটা আবদারও এই কাজে প্রবৃত্ত করেছিল। একদিন দুপুর বেলায় যে-কোনো কারণেই হোক স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি ফিরেছিলাম। হঠাৎ করে এসেই দেখি আমার ঘরের দরজাতেই চিত হয়ে শুয়ে আছে মেয়েটি। তার ছোট ভাইটি সমস্ত শরীর মেসেজ করে দিচ্ছে। মেয়েটি নির্লজ্জভাবেই তা উপভোগ করছে। তার নগ্নতা কোনোমতেই তাকে লজ্জিত করছে না। তার কুমারী অঙ্গের শিহরন নানা শীৎকার ধ্বনিতে তরঙ্গায়িত হচ্ছে। তার শরীরী সৌষ্ঠব এত আকর্ষণীয় যে তার ভাইটি ছোট হলেও পরম কৌতুকে এই কাজ করে চলেছে। মনে হচ্ছে যেন এক বৃহৎ মৎস্যকুমারী জল থেকে ডাঙায় উঠে এসেছে। কিংবা টোপ খাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছে।
কলেজে অংশকালীন শিক্ষক হিসেবে থাকার সময়ই বেশ কয়েকজন ছাত্রীকেও পড়িয়েছিলাম। তাদের সঙ্গে তুলনা করে এর এক কিঞ্চিতও উৎকর্ষ লক্ষ্য করলাম না। একে দেখতে এসেই হঠাৎ মনে পড়ে গেল পাপিয়ার কথা। হ্যাঁ, পাপিয়া নামে একটি মেয়ে বাংলা অনার্সের ছাত্রী ছিল। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে তাকেই উপযুক্ত মনে হলো। বহু কষ্টে ফোন নাম্বার জোগাড় করে তাকে ফোন করলাম।
না, চোখ ফেরাতে পারলাম না। এই প্রথম নারী শরীরের উত্তাপ দূর থেকেই আমাকে আকৃষ্ট করে তুললো। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে ছিলাম তা আর বলতে পারবো না। সম্বিৎ ফিরলো মেয়েটির মায়ের ডাকে। সে এসে বলতে লাগলো, “দ্যাখেন মাস্টার, দিদি-ভাই-এ কেমন খেলাধুলা করছে! এত বকাবকি করি তবু শুনে না।” এসব বলতে বলতেই সে ছুটে গেল তাদের দিকে। আর তারা এক দৌড়ে পালিয়ে গেল ছাদের ওপর। আমি ঘরের তালা খুলে অনেকক্ষণ বিশ্রাম নিতে লাগলাম আর ভাবতে লাগলাম এদের কথা।
এমন একটা বাড়িতে বেশি দিন ভাড়া থাকা যাবে না। যেখানে ভাই-বোন শরীর নিয়ে খেলা করতে পারে, সেখানে শালীনতার মূল্য কোথায়? কিন্তু হঠাৎ করে বাড়ি ছাড়তেও পারলাম না। একদিন এই মালকিন এসেই আমাকে বললো, বিয়া-শাদী করলে আমাদেরকে জানিয়ে করিও।” মালকিন আমাকে ভাইপো সম্বন্ধে উল্লেখ করেই বললো, “তোমার চাচা কহাই ছিল, তোমার সঙ্গে বিয়ার সম্বন্ধের কথা।”
একথা শুনেই আমার বুকখানা ধড়াস করে উঠলো। এই কথাতেই বুঝতে পারলাম গভীর রাতে ছায়ামূর্তির জানালায় উঁকি মারার কারণও। না, আমাকে সাবধান হতে হবে। মনিরুদ্দিনকে সে কথা বললামও একদিন। সে বললো, “এখনই ভাড়া ঘর পরিবর্তন করা দরকার।”
তারপরই ভাড়া ঘর পরিবর্তন করি। পরিবর্তন করার কালে তাদের ঘর থেকে সব জিনিস আনা সম্ভব হয়নি। কিছু বসার টুল, চেয়ার ওরা দখল করে নিয়েছিল। আমি তার জন্য ঝগড়াও করতে পারিনি। কিন্তু বেঁচে ছিলাম একটা চক্রান্ত থেকে।
নতুন ভাড়ার ঘরে এসে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম বিবাহের কাজটি খুব দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। কারণ আমার স্কুল অফিস পর্যন্ত বিবাহের ঘটকেরা ছোটাছুটি শুরু করেছিল। আমি যেন নিঃশ্বাস ফেলবারও অবসর পাচ্ছিলাম না। সবথেকে ক্লান্ত বিষণ্ণ লাগতো তাদের সামনাসামনি হতে। প্রতিদিনই এক কথায় জবাব দিতে হতো, কিন্তু তবু তারা শুনতো না। একদিন এক বৃদ্ধ দাড়িওয়ালা ঘটক আমাকে বলেছিল, “আর কত বয়স হলে বিয়ে কবুল করবা ভাই? নারীর কাছে শুবেই বা কী করে? তোমার কি পৌরুষত্ব আছে না নাই?” এই কথা শুনে আমি খুব অপমানিত বোধ করেছিলাম। ঘটকেরা একগাদা ছবি নিয়ে ঘুরতো। কোন ছবিটা কার মেয়ে, কেমন তার গুণ, একে একে বিশ্লেষণ করে শোনাতো। আমার সে-সবে কোনো আগ্রহই ছিল না। এতদিন বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে ঘুরেছিলাম, কিন্তু কোনো মেয়ের বাপই বিয়ে দিতে চায়নি। শেষ পর্যন্ত টাকা দিয়ে একটা মেয়ে কিনতেও চেয়েছিলাম, কিন্তু সে মেয়েও পছন্দ হয়নি। আর আজ ভারি বয়সে চাকরি পেয়ে এত ঘটকের আনাগোনা আমাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। তাই সেসব বড়লোকের অহংকারী মেয়েদের আমি বিয়ে করতে চাইনি। আমি চেয়েছিলাম গরিব অতি সাধারণ মার্জিত রুচির একটি মেয়েকে সঙ্গী করতে। নিজের কখনো আভিজাত্য ছিল না। নিজেও মাটির কাছে থাকা মানুষ। শুধু একমাত্র মূলধন ছিল সততা। সৎ পথে চলাটাই ছিল জীবনের ব্রত। কিন্তু আজ যে জীবনের হাতছানি আমাকে নানাভাবে জড়িয়ে ফেলছে তাতে যে কোনো সময় পা পিছলে পড়ে যেতে পারি। একা একাই সব কথা ভাবতে থাকি আর সেরকমই একটি মেয়ের খোঁজ পেতে চাই। একদিন বইমেলা চত্বরে সুভাষ রবিদাসকে নিয়েই ঘুরছিলাম। সন্ধেবেলায় বইমেলার স্টলগুলিতে বেশ জনসমাগমও হয়েছে। দেখলাম একটি পাতলা ভরসা উজ্জ্বল মেয়ে কবিতার বইগুলি খুলে খুলে পড়ছে। কার কবিতা পড়ছে? পড়ছে সুকান্ত সমগ্র, সুকুমার রায় সমগ্র। আর কার কবিতা? তারপর দেখলাম রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান-এরও পাতা উল্টাছিল। সুভাষকে জিজ্ঞেস করলাম, “কোথাকার মেয়ে এটি? চেনো একে?”
সুভাষ বললো, “হ্যাঁ, চিনি, বালিয়ার মেয়ে, এ বছরই বিএ পাস করেছে।”
জানতে চাইলাম, “বাড়ির অবস্থা কেমন?”
সুভাষ বললো, “ভীষণ গরিব।”
তার কাছে এই সব কথা শুনে একদিন পৌঁছে গেলাম তার বাড়িতেও। পরিচয় করলাম তার বাবার সঙ্গে। দেখলাম মেয়েটিকেও। হ্যাঁ, মেয়েটি পছন্দেরই ছিল। কিন্তু দিনের আলোয় দেখে একেবারেই ভালো লাগলো না। সে বই পড়ছিল ঠিকই, কিন্তু সাধারণ বিষয়গুলিও ছিল সবই অজ্ঞাত। এমন একটা পরিবেশে সে বসবাস করে যেখানে মানুষ থাকতে পারে না। মানুষ গরিব হলেও তার রুচি ও মনন তাকে আলাদা করে চিনিয়ে দেয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সবই নিম্নমুখী। আদিম অন্ধকারের মধ্যেই তারা রয়ে গেছে। জীবনচেতনার কোনো উৎসেই তারা ধারণা লাভ করতে পারেনি। সুতরাং সেখান থেকে ফিরে এসেছিলাম এবং এতোটুকুও উপযুক্ত ভাবতে পারিনি। কলেজে অংশকালীন শিক্ষক হিসেবে থাকার সময়ই বেশ কয়েকজন ছাত্রীকেও পড়িয়েছিলাম। তাদের সঙ্গে তুলনা করে এর এক কিঞ্চিতও উৎকর্ষ লক্ষ্য করলাম না। একে দেখতে এসেই হঠাৎ মনে পড়ে গেল পাপিয়ার কথা। হ্যাঁ, পাপিয়া নামে একটি মেয়ে বাংলা অনার্সের ছাত্রী ছিল। এই মুহূর্তে আমার পক্ষে তাকেই উপযুক্ত মনে হলো। বহু কষ্টে ফোন নাম্বার জোগাড় করে তাকে ফোন করলাম।
—পাপিয়া ভালো আছো? তোমার সেই কলেজের শিক্ষক মহাশয় বলছি।
—হ্যাঁ স্যার, বলুন, আপনি এখন কোথায়?
—এইতো তোমাদের জেলাতেই আছি, রঘুনাথগঞ্জে।
—তুমি এখন কী করছো?
—এম এ পরীক্ষা দিয়েছি। এখন পড়াশোনা করছি এসএসসির জন্য।
—তোমাকে একটা কথা বলবো?
—হ্যাঁ, স্যার বলতে পারেন, যে কথাই হোক আমি উত্তর দেব।
—তুমি খুব পছন্দের ছিলে আমার। যদি রাজি থাকো….
—তা আমিও বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমি এনগেজ সেই কলেজ জীবন থেকেই।
—আর কিছুই বলার নেই। তাহলে ভালো থেকো। আমার আশীর্বাদ রইলো তোমাদের জন্য।
তারপরে আর কোনো দিকেই তাকাবার অবসর পাইনি। আলোকময় শহরে নিজেকে বড় বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছিল। মনে মনে জোর সংকল্প করেছিলাম, যেমন করেই হোক এবার বাড়ি গিয়ে একটা মেয়ে খুঁজে শুভ কাজটি আমাকে শিগগিরই সম্পন্ন করতে হবে। এ বিষয়ে আর কারো কথা শুনলেই চলবে না। 🍁(চলবে)
🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস
সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।
কিশাণগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়
১১.
মুখে বলল, “সে প্যাণ্ডেল ফ্যান্ডেল হয়ে যাবে। এখন তুমি তোমার কাজ বলো।” দিলীপ জানে প্যাণ্ডেলের কাজটাই আসল। তাতে হাজার খানেক টাকা আসবে। কিন্তু বোঁদে দার ব্যাগার খাটতে তাকে হবেই। না হলে তো প্রতিমাসে খুচখাচ কাজ পাবে না।
বোঁদে নীল রঙের ডায়েরিটা বের করে। গত বছর ফেলুদা দিয়েছিল। ফেলুদা শ’খানেক পেয়েছিল উসমানি সাহেবের কাছ থেকে। তার পঞ্চায়েতের ভেতর যারা পড়া-লেখা জানে, তাদের ভেতর বিলি করতে। বোঁদে স্কুল-ফাইন্যাল পাশ। বোঁদের হক আছে। একটা ডায়েরি পেয়েছিল বোঁদে।
ঋতব্রত নিজের ভেতরে এখন বেশ শক্তপোক্ত হয়ে গেছে। ক্লাসের ১২০টা ছেলেই ঋতব্রতর ভক্ত। গত পনেরো দিন আট-দশ জন করে সবাইকেই হেরোইনের নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। ওই তিন লাখ টাকা এভাবে খরচ করার নির্দেশ ছিল। ঋতব্রতর হাতে এখনও কিছুটা বেঁচে আছে।
ডায়েরির পাতায় একটা ফোন নং দেখায় দিলীপকে। তারপর বলে, “তোকে ভাই এই নংটা দেখতে হবে।”
“হ্যাঁ দেখছি তো! এই তো লাল মোটা অক্ষরে লিখে এনেছ ০৬৪৫৬২২৩১০ আর ৯৪৩১৯৯৫৫৪৮।”
“হ্যাঁ, এই নাম্বার দুটো একটু ট্যাপ করতে হবে। পারবি?”
“না না , ওরকম হয় না। ট্যাপ করার আগে পুলিশে কমপ্লেন করতে হয়। লিখিত অনুমতি আনতে হয়, তারপর।” দিলীপ তার জানা সবটুকু উগড়ে দেয়।
“পুলিশের অনুমতি আনলে তোর কাছে আসব কেন রে! তুই জানিস না তোর টেলিফোনের অফিসের মাথার সাথে আমার ফেলুদার কি দহরম মহরম আছে! পুলিশ দেখালে সেখানে যাব। তোর মতো দু’পয়সার লোকের সাথে কথা বলতাম!”
এই রাগটা না দেখালে যে হবে না তা বোঁদে জানে। নরমে গরমে সে কাজ হাসিল করে। এটা তার বহুদিনের শিক্ষা। ওই দু-পয়সার লোক বলে দিলীপকে মরমে মেরে দিয়ে পরে ওকে আবার তোল্লাই দেবে বোঁদে। সে লক্ষ্য করে, দিলীপের মুখ থেকে নিমেষে সব রং মুছে গেছে। তার মুখ থেকে কথা সরছে না। রাস্তার জানবাহনের দিকে চোখ রেখেছে। মানে হেরে যাওয়াটা লুকোতে চাইছে।
বোঁদে দিলীপের কাঁধে হাত রেখে দিলীপের নজর ডায়েরির দিকে নিয়ে এসে দেখায়। “এই নম্বরের মালিক, তুই দেখ প্রতি বৃহস্পতিবার অত রাতে নেট ব্যবহার করে, একদম নিয়ম করে। ব্যাপারটা কি! আমার একটা প্রশ্নের মীমাংসা হচ্ছে না। কিন্তু মনে হচ্ছে, এখানে সূত্র মিলতে পারে। তুই আমাকে একটু সাহায্য কর দিলীপ। শোন, তোকে আমি এই পাঁচশ টাকা দিচ্ছি।” বলতে বলতে বোঁদে পকেট থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিলীপের দিকে এগিয়ে দেয়। এগুলো তার শোনা কথা। অনেক বাঘা বাঘা লোক টাকার সামনে কুঁই কুঁই করে মাথা নুইয়ে ফেলেছে।
আর দিলীপ তো হাড় হাভাতের একজন। ওকে তো টেলিফোনের কোনো ক্ষতি করতে হবে না, শুধু নিয়ম ভেঙে একটু ইনফরমেশন দেয়া। তা পারবে না! পারবে পারবে।
দিলীপ এতক্ষণ খুব হতাশ হয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল প্যান্ডেলের কাজটা না হাতছাড়া হয়ে যায়। বোঁদেদা হাত গুটিয়ে নিতে পারে তার মাথার উপর থেকে। খুব ক্ষতি হয়ে যাবে তার। কিন্তু হঠাৎ করে দেখল হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া তির যেন আবার ফিরে এসেছে। বোঁদেদার হাত লক্ষ্য করে তার ডান হাত ঝাঁপাল। আর পাঁচশ টাকার নোটটি খুব ক্ষীপ্রতায় টেনে নিয়ে বলল, “ আজই তো বৃহস্পতিবার বোঁদে দা!”
“আরে তাই তো! তুই পারবি ভাই দিলীপ!আরে শোন, শোন, শোন। আমরা আজ রাতে একটা ছোটোখাটো স্কিম করি। শুয়োরের মাংসের কাবাব আর বিএস এফ ক্যানটিন থেকে দুটো জনি ওয়াকার নিয়ে বসে যাব।” বোঁদের স্বরে উৎকন্ঠা আর আগ্রহের ককটেল। আজই জানা ভাল। রহস্য বেশি দূর গড়াতে দিতে নেই। দীপক চ্যাটার্জীও দিতেন না। মনে পড়ল ড্রাগনের আবির্ভাব গল্পে নাইট ক্লাবে সারমাদ খাঁ নামে এক গুন্ডা সর্দারকে মদ খাইয়ে আর দু’খানা দশ টাকার নোট দিয়ে ড্রাগনের আড্ডার খোঁজ পেয়েছিল। পরের দিনই ছিল দীপক চ্যাটার্জীর নৈশ অভিজান।
“হয়ে যাবে বোঁদে দা। এক্সচেঞ্জে রাতের ডিউটি আমার উপর ছেড়ে দিয়ে সব বাড়ি গিয়ে ঘুমোয়। আমিও ঘুমোই, জাগি। কম্প্যুটরে গেম খেলি। কখনো সিনেমা ডাউনলোড করে সিনেমা দেখি। আজ না হয় তুমি আমি দু’জনে মিলে রাত জাগব। তবে হ্যাঁ, মদের বোতল টোতল নিয়ে এক্সচেঞ্জে ঢোকা যাবে না। কেউ দেখে ফেললে আমার এই ভাড়া খাটা চাকরিটুকুও চলে যাবে।”
বোঁদে আকাশের চাঁদ হাতে পেল। “আরে না না। তুই চিন্তা করিস না। আমি ওসব চায়ের ফ্লাস্কের ভেতর কোল্ড ড্রিঙ্কস মিশিয়ে নিয়ে আসব। আর চায়ের কাপ থাকবে কাগজের। টিফিন বাক্সের ভেতর নিয়ে আসব কাবাব। তুই ভাবিস না। এখন আমি চললাম। রাত এগারোটায় তোর অফিসের গেটে পৌঁছে যাব।”
**
“তোমার পারফর্ম্যান্সে কর্তৃপক্ষ খুব খুশি ওহে ছোকরা। ওরা বলেছে তোমাকে শেষ রাউন্ডের আগেই একদিন হেভেনে ডেকে নেবে। সর্গের পরীদের সাক্ষ্যাত পাবে। মুখোমুখি। চাইকি একরাত তোমার পছন্দ মতো যে কোনো পরীর সঙ্গে সময় কাটাতে পারবে। ”হেলমেট পরা মুখ থেকে কথা পড়তে থাকে। রাত তিনটে। বৃহস্পতিবার।
ঋতব্রত নিজের ভেতরে এখন বেশ শক্তপোক্ত হয়ে গেছে। ক্লাসের ১২০টা ছেলেই ঋতব্রতর ভক্ত। গত পনেরো দিন আট-দশ জন করে সবাইকেই হেরোইনের নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। ওই তিন লাখ টাকা এভাবে খরচ করার নির্দেশ ছিল। ঋতব্রতর হাতে এখনও কিছুটা বেঁচে আছে।
“সব কটা স্টেপ-ই তুমি ভাল করছ। কিন্তু কাল থেকে আর তোমার ছেলে বন্ধুদের তুমি হেরোইন কিনে খাওয়াবে না। এবার চেষ্টা করবে, রেসিডেন্সিয়াল মেয়েদের ভেতর এটা দিতে। দেখতেই তো পাচ্ছ, তোমার ক্লাসের ছেলেরা তোমার কেমন ভক্ত হয়ে উঠেছে। এখন কিছু মেয়ে ভক্ত বানাও। তোমার হাতে এখনও হাজার পঞ্চাশেক আছে। ওটা দিয়েই শুরু করো।”
“ঋতব্রত ওয়েব ক্যামের দিকে মুখ বাড়িয়ে দিয়ে স্বর শান্ত রেখে বলল, “কিন্তু মেয়েদের হস্টেলে আমি কী করে যাব? ওখানে গেটের ভেতর আমাদের ঢোকা নিষেধ। কোনো ছেলেকে মেয়েদের কটেজের ধারে-কাছে দেখলে গার্জিয়ান কল আর তারপর রাস্টিকেট।”
হেলমেটপরা মুখ হো হো করে হেসে ওঠে। একটু দোল খায়। বোঝা যায় নরম কিছুতে বসে আছে। ঘরের দেয়ালে সাদা কাপড় টাঙিয়ে রেখেছে। চারিদিকে সাদা। ল্যাপটপের ক্যামেরার আলো যেন ঘরের আইডেন্টিটি ধরতে না পারে তার ব্যাবস্থা। । তবে লোকটা খানিকটা দুলে উঠতেই পেছনের দেয়ালের কাপড় কোথাও টান লেগে একটু নেমে আসে। দেখা যায় ঘর নয় কোনো গাড়ির পেছনের সিটে বসে লোকটা ভিডিও কল করছে। গাড়ির রিয়ার
উইন্ডো র উপর থেকে একটা পেপার পাল্পের খুলি দুলছে।
“দিলীপ ভিডিও করছিস তো?এই ছবিটা দরকার। গুরুকে দেখাতে হবে।” স্বরে উত্তেজনা বোঁদের। তার মাথা গরম হয়ে গেছে। স্কুলের বাচ্চাদের নষ্ট করছে এই লোক। না না এর একটা হেস্তনেস্ত আগে করতে হবে, তারপর মালবাবুর কুকুর। মালবাবু মাথায় থাক। এই লোকটা তো মেয়েগুলোকেও নষ্ট করবে। আর অন্যদিকের বাচ্চাটা তো বলছিল গ্রাহাম স্কুলের কথা। সেটা তো কালিম্পং-এ। সেখানেই তো মালবাবুর ছেলেও পড়ে। সেও কি এই নেশার খপ্পরে পড়েছে! ওকেও তো বাঁচাতে হবে। বোঁদের কয়েক পেগের নেশা এই ছবি দেখে কেটে গেছে। সে এবার চেয়ারটা আরো টেনে নিয়ে টেবলের উপর ঝুঁকে পড়ে। নিজের ডায়েরিতে সময় লেখে রাত তিনটে আঠাশ। হেলমেট পরা লোক কথা বলছে ভিডিও কলে। লোকটা দুলছে, হাসছে। আর দুলছে সেই কিম্ভূত মুখোশও।
হেলমেটধারী দোলা আর হাসি থামিয়ে নির্দেশের সুরে বলে, “তুমি এত বুদ্ধিমান ছেলে এই সামান্য সমস্যার হিল্লে করতে পারছ না?”🍁 (চলবে)

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার, কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার, অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী কোনও সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।








