সম্পাদকীয়
বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ও সংবাদ সংস্কৃতির মূল্যবান সময়। সাহিত্য বিষয়ক চেয়ারগুলি যেন সঠিক ব্যক্তি দ্বারা পূর্ণ হয় ও সমন্বয় বজায় থাকে।
আমাদের মনে রাখতেই হবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি শুধুমাত্র ভোটের অঙ্ক হিসেবে দেখা উচিৎ না। এ দীর্ঘদিন ধরেই এক সাংস্কৃতিক আবেগ। এক সামাজিক অভ্যাস এবং এক মানসিক পরিসর। কলকাতার চায়ের দোকান থেকে জেলা শহরের মোড় সর্বত্র রাজনীতি এখানে আলোচনার প্রধান বিষয়। এই রাজ্যে মানুষ শুধু দলকে সমর্থন করে না। তারা মতাদর্শকেও আত্মপরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখে। কিন্তু বর্তমান সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ বাম শাসনের পর যে তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান হয়েছিল সেই আবেগও এখন নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণের সামনে দাঁড়িয়ে। বিজেপির দ্রুত উত্থান বাংলার রাজনীতিকে দ্বিমুখী সংঘর্ষে পরিণত করেছে। একদিকে আঞ্চলিক বাঙালি আবেগ। আবার অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্রবাহ। এই দুইয়ের সংঘর্ষ আজকের বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল ‘সংবাদ’ আর ‘রাজনীতি’ -এর সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাওয়া। সংবাদমাধ্যমের একটি বড় অংশ এখন নিরপেক্ষ তথ্য পরিবেশনের বদলে মতাদর্শিক অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। টেলিভিশনের প্রাইম টাইমে বিতর্ক অনেক সময় তথ্যের চেয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক ভাষা ক্রমে আক্রমণাত্মক হচ্ছে। আর সেই ভাষাই সংবাদ সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করছে। সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্তার এই পরিবর্তনকে আরও দ্রুত করেছে।

আমরা সকলেই জানি, আগে সংবাদপত্র ছিল মত গঠনের প্রধান মাধ্যম। এখন Facebook, YouTube, WhatsApp এবং X (Twitter) জনমত তৈরির শক্তিশালী অস্ত্র। এর ফলে সংবাদ দ্রুত পৌঁছালেও বিভ্রান্তি- গুজব এবং বিদ্বেষমূলক প্রচারের ঝুঁকিও বেড়েছে। বাংলা ভাষায় ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং বিভাজনমূলক প্রচার নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। যা এই পরিবর্তনের গভীরতা নির্দেশ করে। এখন সংবাদমাধ্যমের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা। এটা ঠিক যে এখন দর্শক বা পাঠক আজ শুধু খবর জানতে চান না। তারা জানতে চান কোন সংবাদমাধ্যম কতটা নিরপেক্ষ। ফলে সংবাদপত্র ও নিউজ চ্যানেলগুলির উপর রাজনৈতিক প্রভাব কর্পোরেট চাপ এবং TRP নির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে। তবে এই অস্থিরতার মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা এখনও বাংলার সবচেয়ে বড় শক্তি। মানুষ প্রশ্ন করে, তর্ক করে, নিজেদের মত দেয় বা পরিবেশন করে। গণতন্ত্রে এই প্রশ্ন করার সংস্কৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিধানসভা সম্প্রচার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বা রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহও সেই সচেতনতারই প্রতিফলন।বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতি একসময় সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তি ও মতাদর্শিক বিতর্কের জন্য পরিচিত ছিল। আজ প্রয়োজন সেই পরম্পরাকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনা। যেখানে সংবাদ হবে তথ্যনির্ভর। রাজনীতি হবে মানুষের উন্নয়নের ভাষা। এবং মতভেদ থাকলেও সামাজিক সহনশীলতা বজায় থাকবে।কারণ শেষ পর্যন্ত একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে তখনই যখন সংবাদ ভয় সৃষ্টি না করে সত্যকে সামনে আনে। আর রাজনীতি বিভাজন না করে মানুষের ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ দেখায়।🍁
🍁মহামিলনের কথা
শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
গুরু। যে মানব ভক্তি সহকারে নিত্য গুরুপাদদোক পান করে, সে নিশ্চয় সার্দ্ধ-ত্রিকোটি-তীর্থের ফল লাভ করিয়া থাকে।

শিষ্য। গুরু পাদদোক পানের এত মহিমা?
গুরু। হাঁ বাবা—
যে সুবুদ্ধিমান শিষ্য ত্রিসন্ধ্যা গুরু পাদদোক পান করে, তাহার মোহপথরূপ সংসারে পুনর্জ্জন্ম হয় না।
শিষ্য। এত অল্পায়াসে যাতায়াত নিবৃত্ত হয় তাহা তো এতদিন শুনি নাই। হায়! কাঞ্চন ত্যাগ করিয়া কাঁচে গ্রন্থি দিয়া জীবনটাকে ব্যর্থ করিয়া ফেলিয়াছি।
গুরু। বৎস, বড় অপূর্ব্ব কথা!
ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র সমস্ত পিতৃ-দেবতাগণ শ্রীগুরুপাদপদ্মার্চ্চিত শুভ জলে অবস্থান করেন।
যে মানব নিত্য গুরুপাদদোক পান করে, সে ব্যক্তি ধর্ম্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষের অধিপতি হয়, অর্থাৎ চতুর্ব্বর্গ তাহার করতলগত হয়।
গুরুচরণবিগলিত হইলেও যে ব্যক্তি সেই প্রক্ষালন জল পান করে, সে দেবীপুরে গমন করিয়া থাকে।
যে ব্যক্তি গুরুপাদদোক মস্তকে ধারণ করে, সে সমস্ত তীর্থজাত ফললাভে সমর্থ হয় এ সম্বন্ধে সংশয় নাই।
গুরুপাদদোক মস্তকে ধারণ করিলে সর্ব্বতীর্থ অবগাহনের ফল হয় ইহা নিশ্চিত, গুরুপাদোদক সম্যকরূপে সংসারসাগর হইতে উদ্ধার করে।
অজ্ঞান-মূল-হরণ, জন্ম-কর্ম্ম-নিবারণ, জ্ঞান, বৈরাগ্য সিদ্ধির জন্য গুরুপাদদোক পান করিবে।
🍁শ্রীশ্রীগুরুমহিমামৃত | শ্রীওঙ্কারনাথ রচনাবলী
ধারাবাহিক উপন্যাস। ১
কবি ও সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় আদ্যোপান্ত একটি সাহিত্য পরিমণ্ডলে বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর লেখায় আমরা দেখতে পাই, সমাজের নানান দিক উঠে আসতে, যা পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করে, এবং লেখক পাঠকদের একটি নিজস্ব জগতে নিয়ে যান। শুধু কবিতা, গল্প বা উপন্যাস নয় সাহিত্যের অন্য সমস্ত দিকেই লেখকের চমকপ্রদ অবাধ বিচরণ। সাহিত্যিক বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায় অজস্র পুস্তকের প্রণেতা। যা ওঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হয়ে রয়েছে। এছাড়াও সম্পাদনা করেন ‘কেতকী’ নামে একটি স্বনামধন্য সাময়িকপত্র। সাশ্রয় নিউজ-এ তাঁর লেখা ধারাবাহিক উপন্যাস, আজকে ‘রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল’ -এ।
শব্দদের রাত্রি হয়

বিপ্লব গঙ্গোপাধ্যায়
২৯
অক্ষরের আড়ালে সুর
হোস্টেল থেকে বাড়ি ফেরার অভিজ্ঞতা অনীকের কাছে কখনওই নিছক স্থানান্তর ছিল না; বরং একধরনের অন্তর্গত সরে আসা—নিজের এক অবস্থান থেকে অন্য অবস্থানে ধীরে, প্রায় অচেতনভাবে চলে যাওয়া। ট্রেনের কামরায় বসে থাকতে থাকতে সে বারবার টের পায়, মানুষ যে-দূরত্ব অতিক্রম করে তা কেবল মানচিত্রে মাপা যায় না; তার ভেতরেও একটি অদৃশ্য দূরত্ব কমে বা বাড়ে, যার হিসাব রাখা যায় না কোনও ক্যালেন্ডার বা ঘড়িতে।
সেদিন বিকেলের আলো জানালার কাঁচে এসে লেগে ছিল এমনভাবে, যেন আলো নিজেই ক্লান্ত। দূরের মাঠগুলো ক্রমশ ফাঁকা হয়ে আসছিল, মাঝেমধ্যে ছোট স্টেশন, যেখানে নামা-ওঠার তাড়াহুড়োর মধ্যেও কিছু মানুষ স্থির, যেন তারা কোথাও যায় না, বরং একই জায়গায় থেকে যায় বছরের পর বছর। হকারের গলা ভেসে আসছিল, “চা… কফি…” সেই চেনা সুর, যা ভ্রমণের অংশ হয়ে গিয়েছে বহুদিন। পাশের সিটে বসে থাকা লোকটির ফোনালাপ, অন্য প্রান্তের কারও হাসি, কোথাও শিশুর কান্না সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত সঙ্গীত তৈরি হচ্ছিল, যার মধ্যে কোনও কেন্দ্র নেই, তবু একটি ছন্দ আছে।
মায়ের জীবনে এমন কী আছে যা সে জানে না? এই চিঠি কি অতীতের কোনো অসমাপ্ত সম্পর্ক? কোনও স্মৃতি, যা মুছে যায়নি?
বিছানায় শুয়ে তিতাসের কথা মনে পড়তেই তার দ্বিধা তীব্র হয়। সে এখনও বলেনি। কীভাবে বলবে? কোন ভাষায় বলবে? মা কীভাবে গ্রহণ করবেন?
এই প্রশ্নগুলোর ভেতরেই হঠাৎ সে বুঝতে পারে, বিলম্ব জটিলতা তৈরি করে।
পরদিন দুপুরে রান্নাঘরের শব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে ভাষা খুঁজছিল। কিন্তু প্রস্তুত বাক্যগুলো মাথা থেকে উধাও হয়ে গেল। হঠাৎ, অপ্রস্তুতভাবে, নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে ফেলল, ‘মা, তোমার একজন ছাত্রীকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি।’
অনীক জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু তার দৃষ্টি বাইরে থেমে থাকছিল না। সে অনুভব করছিল, তার ভেতরে কিছু বদলেছে। কলেজের দিনগুলো, গান, অচেনা মানুষের প্রশংসা, ভিডিওর ছড়িয়ে পড়া এসবই যেন জীবনের স্বাভাবিক প্রবাহের অংশ, অথচ তাদের মধ্যে দিয়ে অজান্তেই তৈরি হয়েছে নতুন এক অভ্যন্তরীণ পরিসর। আগে গান ছিল ব্যক্তিগত, এখন তা প্রকাশ্য; আগে অনুভূতি ছিল নিজের। এখন তা শেয়ারযোগ্য। এই পরিবর্তন তাকে পুরোপুরি স্বস্তি দেয় না, আবার অস্বস্তিও তৈরি করে না; বরং একধরনের নিরপেক্ষতা তৈরি করে, যা তাকে নিজের কাছেই কিছুটা অচেনা করে তোলে।
এই অচেনা হওয়ার মধ্যেই হঠাৎ একটি নাম ভেসে ওঠে, তিতাস।
নামটি উচ্চারণ না করলেও তার ভেতরে তার প্রতিধ্বনি তৈরি হয়। সম্পর্কটির কোনএ নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই, বন্ধুত্ব? আকর্ষণ? নাকি তার থেকেও সূক্ষ্ম কিছু? তবু এটুকু নিশ্চিত, এই উপস্থিতি এড়িয়ে যাওয়ার নয়। এই প্রথম সে অনুভব করে, বাড়ি ফেরার আনন্দের পাশাপাশি একটি অস্বস্তিও কাজ করছে। কারণ এবার তার সঙ্গে একটি অনুচ্চারিত সত্যও ফিরছে।
স্টেশনে নামার সময় সন্ধ্যা নেমে এসেছে। প্ল্যাটফর্মের আলো জ্বলছে, মানুষের ভিড় তীব্র, শব্দ ঘন। তবু এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই একটি পরিচিতির বোধ আছে, এই শহর তার নিজের, অন্তত স্মৃতির দিক থেকে। প্রতিটি মোড়, প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি গন্ধ তার ভেতরে জমে আছে বহুদিন ধরে।
অটোয় বসে বাড়ির দিকে যেতে যেতে সে হঠাৎ মায়ের কথা ভাবল, সোমদত্তা। মা কেবল একটি সম্পর্ক নয়, একধরনের নীরব উপস্থিতি। তার ভেতরে এমন একটি স্তর আছে, যা সবসময় দৃশ্যমান নয়, কিন্তু অনীকের অনুভূতিতে স্থায়ীভাবে থেকে যায়। সে জানে, মায়ের জীবন কেবল তার জানা অংশ দিয়ে গঠিত নয়; সেখানে আরও কিছু আছে, যা অপ্রকাশিত।
দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে পায়ের শব্দ। দরজা খুলে মা দাঁড়ালেন।
এক মুহূর্ত, সময় স্থির।
তারপর সেই পরিচিত, সহজ, অথচ গভীর উচ্চারণ,
—এসেছিস!
এই দুটি শব্দের ভেতরে যে অনুভূতি থাকে, তা বিশ্লেষণযোগ্য নয়। অনীক ব্যাগ নামানোর আগেই মা তাকে জড়িয়ে ধরলেন। এই আলিঙ্গন কোনও নাটকীয়তার দাবি করে না; তবু এর মধ্যে এমন এক আশ্রয় আছে, যা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না।
—এত শুকিয়ে গেছিস কেন?
—খাবার ভাল না।
—মিথ্যে কথা। ঠিকমতো খাস না।
এই কথোপকথন বহুবারের পুনরাবৃত্তি, তবু প্রতিবারই নতুন, কারণ এর ভেতরে থাকে অদৃশ্য যত্নের পুনর্নবীকরণ।
ঘরে ঢুকতেই সেই অপরিবর্তিত বিন্যাস, বইয়ের তাক, টেবিলের উপর ছড়ানো খাতা, জানালার পাশে রাখা চশমা। যেন তার অনুপস্থিতি ঘরের সময়কে থামিয়ে রেখেছে।
রাতের খাবারের আগে কথাবার্তা ধীরে ধীরে গভীর হল।
—কলেজ কেমন?
— চলছে।
—বন্ধু-বান্ধব?
—আছে।
—গান?
এই প্রশ্নে অনীক অল্প হাসল।
— গান তো আছেই।
মায়ের চোখে হালকা আলো ফুটল।
—ভিডিও দেখেছি।
অনীক বিস্মিত।
— তুমি দেখেছ?
— তুমি দেখেছ?
—আমার ছাত্রীরা দেখিয়েছে।
কণ্ঠে সংযত গর্ব, যা প্রকাশ্যে নয়, তবু স্পষ্ট।
—তোর গলায় বদল এসেছে।
—কেমন?
—আগে সুর ছিল। এখন অভিজ্ঞতা ঢুকেছে।
এই বাক্য অনীককে থামিয়ে দিল। কারণ এটি শুধু প্রশংসা নয়, একটি গভীর পর্যবেক্ষণ। সে বুঝল, মা তাকে কেবল শুনছেন না, পড়ছেন।
গিটার হাতে নিয়ে বসতেই মা সামনে এসে চুপচাপ বসলেন। ঘরের আলো নরম, বাইরের রাত ধীরে ঘনীভূত।
অনীক গাইতে শুরু করল।
তার কণ্ঠে কোনও অতিরঞ্জন নেই, একধরনের সংযত প্রবাহ। সোমদত্তা শুনছিলেন, কিন্তু তার দৃষ্টি যেন অন্য কোথাও, অতীতের কোনও স্তরে। যেন এই সুর তার ভেতরে পুরনো কোনও দরজা খুলে দিচ্ছে।
গান শেষ হলে মা বললেন,
—এই লাইনটা আবার গা।
অনীক গাইল। লক্ষ্য করল, এই নির্দিষ্ট লাইনে মায়ের মুখের রেখা বদলে যায়। সেখানে এমন এক আবেগের ছায়া, যা সে পুরোপুরি বুঝতে পারে না।
রাত গভীর হলে জল খেতে উঠে সে দেখল, ঘরের আলো জ্বলছে।
মা জানালার পাশে বসে আছেন।
হাতে একটি চিঠি।
এই দৃশ্য এতটাই স্থির যে মুহূর্তটি প্রায় অবাস্তব মনে হয়। কাগজটি পুরনো, হাতের লেখা। মায়ের আঙুলে সামান্য কাঁপন।
অনীক দূর থেকে দাঁড়িয়ে থাকে। অক্ষরগুলো পড়তে পারে না। কিন্তু মায়ের চোখের জল স্পষ্ট। এই কান্না দুঃখের নয়। আনন্দেরও নয়। একধরনের অদ্ভুত মিশ্র অনুভূতি, আনন্দমাখা বিষাদ।
মা ধীরে চিঠিটি ভাঁজ করেন, চোখ মুছেন, দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
অনীক সরে আসে।
তার ভেতরে প্রশ্ন জমে ওঠে, মায়ের জীবনে এমন কী আছে যা সে জানে না? এই চিঠি কি অতীতের কোনো অসমাপ্ত সম্পর্ক? কোনও স্মৃতি, যা মুছে যায়নি?
বিছানায় শুয়ে তিতাসের কথা মনে পড়তেই তার দ্বিধা তীব্র হয়। সে এখনও বলেনি। কীভাবে বলবে? কোন ভাষায় বলবে? মা কীভাবে গ্রহণ করবেন?
এই প্রশ্নগুলোর ভেতরেই হঠাৎ সে বুঝতে পারে, বিলম্ব জটিলতা তৈরি করে।
পরদিন দুপুরে রান্নাঘরের শব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে সে ভাষা খুঁজছিল। কিন্তু প্রস্তুত বাক্যগুলো মাথা থেকে উধাও হয়ে গেল। হঠাৎ, অপ্রস্তুতভাবে, নাটকীয় ভঙ্গিতে বলে ফেলল, ‘মা, তোমার একজন ছাত্রীকে আমি ভালোবেসে ফেলেছি।’
শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সময় যেন স্থির হয়ে গেল। রান্নাঘরের শব্দ থেমে গেল। মা ধীরে তাকালেন। চোখে বিস্ময় নয়, গভীর অনুসন্ধান।
–আ আমার ছাত্রী?
এই তিনটি শব্দের মধ্যে ছিল না কোনও সরাসরি প্রতিক্রিয়া, ছিল একধরনের মাপজোখ। অনীকের বুক ধুকপুক করছে। কিন্তু এখন আর ফেরার পথ নেই। একটি স্বীকারোক্তি ঘরের ভেতর ঝুলে রইল অদৃশ্য, অথচ ভারী, যার প্রতিক্রিয়া এখনও উচ্চারিত হয়নি।🍁 (ক্রমশ:)
🍂গল্প
সুলতানের চোখজোড়া টকটকে লাল, ঢুলুঢুলু। হঠাৎ করে বুড়োর থমকে শুয়ে পড়ায় ও-কি স্বস্তি পেল?
বোধহয়। ও-নিজেও শরীর পেতে দিল বুড়োর পাশে। চোখ বুঁজল। ওর করকরে চোখজোড়ায় কেমন এক শান্ত- শীতল অনুভূতি। ওর মনে হল – ও-বুঝি কোনো টলটলে জলাশয়ে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে। ডুবিয়ে আবারও ভাসিয়ে তুলছে। নাকি আসমানে ভাসছে! ওর এই ডুব আর ভেসে ওঠা, এ কী ঘুম, না স্বপ্ন, নাকি শুধুই তলিয়ে যাওয়া!
শূন্যে বসত

রেহানা বীথি
১.
আকাশের রঙ আজ যেন কেমন। চাঁদ-তারাহীন ঘুটঘুটে অন্ধকার। দূরে যে বাড়িগুলো আছে, সেগুলোর পেটের মধ্যে জ্বলতে থাকা আলোদের একটু রোশনাই আছে বলেই চরাচর পুরোপুরি ঢেকে যায়নি। এই চরাচরেরই কোথাও থেমে থেমে বাদ্য বাজছে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিহরিত হওয়ার মতো একটি দৃশ্য দৃষ্টিগোচর হল।
ওই রোশনাই থেকেই কমলা আর গোলাপি রঙের মিশ্রণে তৈরি অদ্ভুত এক আলোর লেজ যেন ছুটে চলেছে আকাশের দিকে। দূর থেকে যে বাদ্যের আওয়াজ ভেসে আসছে , মনে হচ্ছে, আলোর লেজটি সেই বাদ্যের তালে তালে নেচে নেচে উড়ে উড়ে ছুটে চলেছে। কিন্তু যতটা শিহরিত হওয়ার কথা, কেন যেন ততটা শিহরণ বুড়ো লোকটির মধ্যে খেলল না।
বুড়োদের মনের মধ্যে কি শুধু হাজার রকমের চিন্তাই খেলে? আর সেই চিন্তাগুলো বোধহয় ভয়ানকভাবে ডালপালা মেলে। এই যেমন এখন, তাঁর চিন্তাগুলো এমনভাবে ডালপালা মেলছে, যেন এই অন্ধকারেও তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন – ওই ডালপালা পুরো আকাশ ছেয়ে ফেলছে।
সুলতানের চোখজোড়া টকটকে লাল, ঢুলুঢুলু। হঠাৎ করে বুড়োর থমকে শুয়ে পড়ায় ও-কি স্বস্তি পেল?
বোধহয়। ও-নিজেও শরীর পেতে দিল বুড়োর পাশে। চোখ বুঁজল। ওর করকরে চোখজোড়ায় কেমন এক শান্ত- শীতল অনুভূতি। ওর মনে হল – ও-বুঝি কোনো টলটলে জলাশয়ে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে। ডুবিয়ে আবারও ভাসিয়ে তুলছে। নাকি আসমানে ভাসছে! ওর এই ডুব আর ভেসে ওঠা, এ কী ঘুম, না স্বপ্ন, নাকি শুধুই তলিয়ে যাওয়া!
কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখেছেন জানেন না বৃদ্ধ। শ্রাবণ শেষের বৃষ্টিভেজা পথে দাঁড়িয়ে অন্ধকার আকাশ দেখা শেষ হল কিনা, তা-ও যেন তাঁর অনুভবে নেই। চিন্তার ডালপালাগুলো আকাশেই আটকে রইল। তিনি হাঁটতে লাগলেন।
গান গাইতে গাইতে, পা টেনে টেনে হাঁটছেন লোকটি। নাকি মিহিসুরে কোরআনের কোনো সুরা পড়ে চলেছেন? তাঁর অস্তিত্ব থেকে যে সুরটি অনুরণন তুলছে, সেটি যে গান না সুরা, তা আলাদা করে চেনা যাচ্ছে না। সুরটি অদ্ভুত, বড় টানছে। কেমন এক ঘোর তৈরি করছে।
বাদ্যের আওয়াজ দূরগামী বাতাসের শব্দের মতো একসময় হারিয়ে গেল। বৃদ্ধ লোকটি দাঁড়ালেন এবং এদিক-ওদিক কিছু যেন খুঁজলেন। ভীষণ কাহিল লাগছে তাঁর। বসে পড়তে ইচ্ছে করছে, কিন্তু ভেজা পথের ওপর বসাটা ঠিক হবে কিনা তা তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না। তাঁর শরীরভরা ব্যাধী। তাঁর শরীরভরা বেদনা। এই ব্যাধী আর বেদনা নিয়ে কি ভেজা পথের ওপর বসে পড়া যায়! যদি ব্যাধী আর বেদনা ভিজে যায়?
জমাট বাঁধা অন্ধকার কিছুটা শুষে নিয়েছে প্রকৃতি। চলতে চলতে তাঁর চোখও একটা আবছা আলোর সুড়ঙ্গ তৈরি করে নিয়েছে। তাঁর কি আরও এগিয়ে যাওয়া উচিত? হয়তো আর কিছুটা এগোলেই পূর্ণ আলো পাবেন। পাবেন লোকালয়।
আচ্ছা, কতটা পথ হেঁটে এসেছেন তিনি? কেমন করে এলেন? একেবারে শক্তিহীন শরীর টেনে টেনে এতটা পথ ভাঙতে পারলেন কেমন করে?
কিন্তু না, আর এগোনোর শক্তি এই মুহূর্তে তাঁর নেই। তিনি বসে পড়লেন। কাঁধে যে একটা অপুষ্ট ঝোলা ছিল, সেটি পক্ষাঘাতগ্রস্তের মতো খুলে পড়ল তাঁর পাশেই। ঠিক এই সময়েই আকাশ কিছুটা হালকা হল, একটু হাওয়া বইল, কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি উড়ে উড়ে মাটির বুকে ঝরেও পড়ল। তবে তিনি তা দেখতে পেলেন না। অবসন্নতায় তখন তিনি ঢলে পড়েছেন। হয়তো ঘুমিয়েই পড়েছেন।
হয়ত নয়, তিনি সত্যি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছেন। তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন বৃক্ষের নিচে। বৃক্ষরা ঘন এবং তাদের কাণ্ড ও পাতার ঝাড় অদ্ভুতভাবে নেমে এসে মাটি স্পর্শ করে যেন একটি কুঁড়ের আকার ধারণ করেছে। তিনি জানেন না, সেই কুঁড়ের আবডাল তাঁকে ভিজতে দিচ্ছে না। এখন বৃষ্টি বেশ একটা সুরেলা ঝঙ্কার তুলে ঝরে চলেছে। এই ঝঙ্কার কি তাঁর মস্তিষ্ক টের পাচ্ছে? হয়তো। অথবা তাঁর শীত অনুভব হচ্ছে। বুড়ো শরীরে এমন বৃষ্টি তো শীতল অনুভব এনে দিতেই পারে!
এই তো, তিনি হঠাৎ কেমন গুটিয়ে যেতে লাগলেন। তাঁর বেঁকে যাওয়া কোমর আরও খানিকটা বেঁকে গিয়ে জড়ো হতে লাগল। দুই হাঁটু আর দুই হাত একে অপরকে বেঁধে ফেলল। তারপর পেটের গর্তে সেঁধিয়ে যেতে চাইল। সেই অদ্ভুত ঘোরলাগা সুরটি এখন আবারও অনুরণন তুলল। তবে, সুরটি এখন কম্পমান। ধীরে ধীরে যেন কম্পন আরও বেড়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে, ধীরে ধীরে একসময় থেমে গেল কম্পন আর সুর। গুটিসুটি বৃদ্ধ অনুভব করলেন উষ্ণতা। একটি কাঁথা কিংবা কম্বল কিংবা একটি হালকা আলোয়ান কেউ কি তাঁর গায়ে জড়িয়ে দিল?
উষ্ণতায় আরাম বোধ করলেন তিনি। পাশ ফিরলেন। তারপর বিড়বিড় করে কিছু বলতে লাগলেন। যেন নিচুস্বরে গল্প করছেন কারও সঙ্গে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে যেন প্রশ্নোত্তর পর্ব চলছে। বোধহয় স্বপ্নে আছেন তিনি।
২.
মৃদু ধমকে চমকে তাকাল সুলতান। ভ্রূ কুঁচকে কাকে ধমক দিচ্ছে কে জানে! বুড়োদের এই এক দোষ, সব্বাইকে ধমকাবে, ছোট ভাববে। সে বুদ্ধিতে হোক আর বয়সেই হোক – সবাই যেন তাদের থেকে ছোট। সকল বুঝ যেন তাদের একলারই। আর মেজাজ যেন শুধু তাদেরই আছে। পাতার কুঁড়েতে ঠেস দিয়ে রাখা পাটিটা বিছিয়ে বসে বসে সুলতান একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে বৃদ্ধের দিকে। বৃদ্ধ এখন হাস্যোজ্জ্বল। বেজায় আমুদে একটা হাসিতে তাঁর ঠোঁট প্রসারিত। সাধারণত কারো সঙ্গে খোশগল্প করলে এমন হাসি হাসে মানুষ। কিন্তু এই বুড়ো, এই কুঁকড়ে যাওয়া ক’খানা হাড়, এ-ও কী কোনো মানুষের! কেমন যেন সন্দেহ হল সুলতানের। ঘুমন্ত সচল বৃদ্ধের মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ভাল করে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল।
হাসি মুছে মুখে এখন গভীর চিন্তার ছাপ।
নাহ্, মানুষ ছাড়া চিন্তা আর কেই বা করতে যায়! কুকুর, বিড়ালেরও পেট আছে, তবে মানুষের মতো পাপী পেট কারোরই তো নেই। আর সেই পেটের জোগানের জন্যেই তো তার যত চিন্তা, যত হানাহানি, কাটাকাটি। এ বুড়ো নির্ঘাত মানুষ। যখন বয়স ছিল তখন নিশ্চয়ই বউ ছেলেপুলের পেটের যোগান দিতে গিয়ে নানান চিন্তার জালে জড়িয়ে পড়েছে। এখন বয়স নেই, কিন্তু সেই চিন্তাগুলো তাদের সুতো ছেড়ে দিয়ে ঠিকই বুড়োর পেছন পেছন এদ্দূর চলে এসেছে। তাই ঘুমেও বুড়োর নিস্তার নেই। কখনও হাসছে, কখনও কাঁদছে, কখনও চিন্তায় পাক খাচ্ছে।
তা খাক। সুলতানের বড় ভাল লাগছে দেখতে। কতদিন পর রাতের বেলা নিজের কাছে একজন মানুষ, মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ!
কুঁড়েগাছ, গাছ ঘিরে কয়েক বিঘে পতিত জমি, দূরে সরু গাঁ। পাশ দিয়ে রেললাইন। ওই গাঁয়ের তো বটেই কোনো গাঁয়েরই কেউ এদিকে কোনোদিন আসে না। এই শ্যাওড়া গাছের জঙ্গল আর কুঁড়েকে ওরা জ্বিন-ভূতের আস্তানা ভেবে ভয় পায়। শুধু দিনে রাতে দু’বার দুটো ট্রেন মাটি কাঁপিয়ে আসে আর যায়। আর সুলতান, সে-ও দিনে একবার যায় আর একবার ফিরে আসে। ভোরে যখন ট্রেনের হুইসেলের শব্দ কানে ঢুকে ওর ঘুমটাকে ধাক্কায়, তখন একলাফে তড়াক করে উঠে বসে ও। বসেই থাকে। তারপর ট্রেন যত এগিয়ে আসে, মাটির ভেতর দিয়ে কাঁপন যেন ওর বুকের মধ্যে ঘা মারতে থাকে। ঘা মারতে মারতে একসময় থরথর করে ট্রেনটা চলে যায়। তখন ও-বেরোয়। বেরিয়ে সোজা হাঁটা দেয় স্টেশনের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে গান গায়, হাঁটতে হাঁটতে গালাগাল দেয়, হাঁটতে হাঁটতে থেমে গিয়ে ঝোপের আড়ালে পেচ্ছাব-টেচ্ছাব করে।
সন্ধের আগ দিয়ে আবারও হাঁটতে হাঁটতে গান, গালগাল, পেচ্ছাব-টেচ্ছাব করতে করতে ফিরে আসে এই কুঁড়েতে। এসে কুপি জ্বালিয়ে ঝিম মেরে বসে থাকে। বসে থাকতে থাকতে যখন দুই চোখ ঘুমে আঠা-আঠা, তখনই ওর মাথার মধ্যে ঝুনঝুনি বাজতে থাকে—
ট্যাকা? আইজকা তো ট্যাকা গুনা হয় নাই!
কুপির ঘষটানো আলোয় পাটির ওপর তখন ও-ওর ঝোলাটার দেহ ধরে ঝাঁকি দেয়। ঝাঁকিতে ঝাঁকে ঝাঁকে না হলেও, ঝরঝর খসখস করে পাটিতে কিছু কাঁচা-পাকা মুদ্রা পড়ে। সুলতান গোনা শেষ করে হাসে। হাসতে হাসতে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুমাতে ঘুমাতে স্বপ্ন দেখে।
কিন্তু আজ ওর ঘুম আসছে না। টাকা গোনার কথাও একবারও মনে আসেনি। আজ শুধু দেখছে। দেখছে – এক বৃদ্ধের ঘুম আর স্বপ্ন। দেখতে দেখতে ওর মনে হল—
জন-মনিষহীন এই ঢ্যাঙা মাঠে এই বুইড়া আইল কোত্থাইকা?
ঘরে ঢুকে কুপি জ্বালানোর আগেই বুড়োর গায়ে বেধে পড়েই যাচ্ছিল ও। ভয়ও পেয়েছিল বেদম।
ভূত-টুত না তো? বিরান এই জায়গায় ভূত আছে বলে লোকজন যে এ-পথ মাড়ায় না, তা তো সুলতান জানেই।
অবশ্য রাতের পর রাত এখানে থাকতে থাকতে সুলতানও তো ভূতের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অন্তত ওর চলন-ফিরন, বেশ-ভুষা আর ক্ষণে ক্ষণে ঘোলাটে চোখে থম ধরে তাকিয়ে থাকা দেখলে তো কেমন যেন লাগে। কেমন যেন মানে, মনে হয় – এই দুনিয়ার মানুষ নয় ও।
কিন্তু কোন দুনিয়ার? তা কি আর কেউ জানে! না জানলেই কি কারও সাহস আছে, এই শ্যাওড়া গাছের কুঁড়ে অব্দি এসে ওই দুনিয়ার খোঁজ-খবর নেয়ার?
নেই।
নেই বলেই সুলতান নিশ্চিন্ত। ওই দূর গাঁয়ের যে দু-চারজন মানুষ ওকে দেখেছে, তারাই ওই গাঁয়ে সুলতানের বে-খবর দুনিয়ার খবরটা ছড়িয়ে দিয়ে ওকে এনে দিয়েছে এই নিশ্চিন্তি। বছর তিনেক আগের ভূমিহীন সুলতান এখন এই ভূমি এবং ভূতের অলিখিত মালিক। ওর আবার কীসের ভয়! তবুও অন্ধকারে গা শিউরে উঠেছিল কেন? চোরা চোখে ও চারপাশে এমনভাবে তাকাল, যেন ওর বে-খবর দুনিয়ার খবর চুপিচুপি কেউ জেনে ফেলছে।
পাশ ফিরল বুড়ো। তারপর আরও যেন কুঁকড়ে গেল। এখনও ঠান্ডা লাগছে নাকি? লাগবে না-ই বা কেন? একেবারে মাটির ওপরেই গতর ফেলে দিয়েছে যে! কুপি জ্বালিয়ে সুলতান তো তাজ্জব বনে গেছিল। একে বুড়ো মানুষ, তারওপর গায়ে শুধু একটা পাতলা ফতুয়া আর পাজামা। পেটের মধ্যে হাত-পা সেঁধিয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল। আর সেই কাঁপুনির মধ্যেই বুড়োর স্বপ্ন দেখার সে কী সাধ!
মনটা কেমন যেন মায়ায় টনটন করে উঠেছিল সুলতানের। নিজের মরা বাপের মুখটা বোধহয় বহুদিন পর ওর চোখের পর্দায় কেঁপে উঠেছিল।
টিনের ঢপের ভেতর রাখা নিজের ছেঁড়া কাঁথাটা বের করে জড়িয়ে দিয়েছিল বুড়োর গায়ে। তারপরই তো আবেশে গা মোড়াতে মোড়াতে বুড়োর সে কী গল্প আর হাসি! এই বুড়োর গা হেলিয়ে কীভাবে এখন পাটি পর্যন্ত আনবে সুলতান? ভাবতে ভাবতে একটু ঝিমুনি এসে গেল। রাত তো কম হল না। বৃষ্টি বোধহয় থেমে গেছে। চারিদিকে ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। আর কুঁড়ের ভেতর কুপির আলো মাঝে মাঝে মৃদু ফরফর করে উঠছে।
এভাবে কতক্ষণ গেছে কে জানে, হঠাৎ ধড়মড় আওয়াজ। দেহের সবক’টা হাড় কাঁপিয়ে বুড়ো উঠে বসেছে। বোধহয় ঘুমের ঘোরেই। কুপির ঘোর ঘোর আলোতেই পষ্ট বোঝা যাচ্ছে – এখনও তাঁর চোখ থেকে স্বপ্ন সরেনি। তিল মাত্র দেরি না করে পাটিটা তুলে বুড়োর পিঠের নিচটায় পেতে দিল সুলতান। তারপর শুইয়ে দিল তাঁকে। বুড়ো শূন্যে হাত বাড়িয়ে কাকে যেন ডাকছে। ডাকতে ডাকতে একসময় নিস্তেজ হয়ে খসে পড়ল সেই হাত। এবার কোনো গল্প-গুজব না করেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল বুড়ো। সুলতানও তার পাশ ঘেঁষে শুয়ে কাঁথার ভাগ নিল। ওর নিঃশ্বাসেও ধীর তরঙ্গ। তবে ঘুম নয়, কেমন যেন ফাটা ফাটা ঘুমবোধ ওকে আধা জাগিয়ে রেখে চোখের সামনে একটা ধবধবে সাদা কাপড়ের টুকরো দোলাতে লাগল।
হঠাৎ গা ঘেমে উঠল সুলতানের। একটু হাওয়া দরকার। একটু পানি!
উঠে পড়ল ও। উঠে বোতলে রাখা পানি ঢকঢক করে কিছুটা খেয়ে বাকিটা মাথায় ঢেলে দিল। তবুও যেন গা জুড়াল না। কেমন অদ্ভুত এক অস্বস্তি ওর গা জুড়াতে দিচ্ছে না।
৩.
দিনের হিসেবে চারদিন। টানা বৃষ্টি। বৃষ্টি এবং বৃদ্ধ – এই দুইয়ের কারণে সুলতান বেরোয়নি। বেরোতে পারেনি। কুঁড়েতে গুড়-মুড়ি, চিড়া আছে। সকাল-সন্ধ্যা খেয়েছে। খেতে খেতে বৃদ্ধকে এগিয়ে দিয়ে বলেছে –
ইট্টু খান বাবাজি। খাইলে শরীলে বল পাইবেন।
ঠোঁটে ত্যারছা হাসি আর চোখে আঁশটে চাহনি হেনে চুপ মেরে থেকেছেন তিনি। এই চারদিন ধরে ক্লান্তিহীন জেগেও আছেন। বৃষ্টি শুনছেন, বৃষ্টি শুঁকছেন আর গুনছেন। কী গুনছেন, কে জানে!
এক, দুই, তিন…
একটা পাখি, দুইটা পাখি, তিনটা পাখি …
একটা বাড়ি, দুইটা বাড়ি, তিনটা বাড়ি…
গুনেই চলেছেন। গুনতে গুনতে মাঝে মাঝে ডাকছেন, আয় আয় আয়…।
মাঝে মাঝে বলছেন – এই দাঁড়া, আসছি!
কখনও বসে, কখনও শুয়ে, কখনও দাঁড়িয়ে চলছে তাঁর গোনাগুনতি। ঘুম তো নেই-ই, ক্ষুধা-তৃষ্ণাও যেন কিছুই নেই। সুলতান কেমন তব্দা খেয়ে গেছে। এই লাচার বুড়োকে কায়দা করার নানা ফন্দি আঁটছে, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। কোনোভাবে ভুলিয়ে-ভালিয়ে একটু যদি ঘুম পাড়ান যেত! ঘুমে ওর নিজেরও চোখ করকর করছে , মাঝে মাঝে শরীর অবশ হয়ে ঢলে পড়ছে, কিন্তু ঘুমানোর কি উপায় আছে! যখনই ও-মনে করছে – যা হয় হোক, বুড়ো যা করছে করুক, একটু ঘুমিয়ে নিই। তখনই হয়তো বুড়োর মিনমিনে গলা খুলে যাচ্ছে—
আমি যাব, আমাকে রেখে কোথায় যাও, দাঁড়াও!
বলতে বলতে থড়বড় করে উঠে দাঁড়াচ্ছে। তারপর আবারও কাঁপতে কাঁপতে বসে ধাক্কাতে থাকছে সুলতানকে। সুলতান যেই জিজ্ঞেস করছে – কই যাইবেন, কন? আপনের বাড়ি কই, নাম কি আপনের?
অমনি তাঁর চোখে মাকড়সার জাল। ধীরে শুয়ে পড়ে তিনি তখন বিড়বিড়।
চতুর্থ দিনের মাঝরাত। সন্ধ্যা থেকেই বৃষ্টি থেমে যাব যাব ভাব ছিল। মাঝরাত হতে হতে একেবারে থেমেই গেল। কয়েকদিনের টানা শব্দটা নিঃশেষ হয়ে যেন মাঝরাতের বুকে একটা ভারি পাথরের মতো চেপে বসল। বুড়োও যেন আচমকা থমকে গেল।
থমকে পাটির ওপর টানটান হয়ে শুয়ে গেছেন তিনি। দৃষ্টি তাঁর কুঁড়ের চালে। ঘোলাটে, ঘোলাটে থেকে উজ্জ্বল, উজ্জ্বল থেকে আবারও ঘোলাটে। ঠোঁটে অবুঝ হাসি। কখনও বিস্ময়ে মুখ হা।
সুলতানের চোখজোড়া টকটকে লাল, ঢুলুঢুলু। হঠাৎ করে বুড়োর থমকে শুয়ে পড়ায় ও-কি স্বস্তি পেল?
বোধহয়। ও-নিজেও শরীর পেতে দিল বুড়োর পাশে। চোখ বুঁজল। ওর করকরে চোখজোড়ায় কেমন এক শান্ত- শীতল অনুভূতি। ওর মনে হল – ও-বুঝি কোনো টলটলে জলাশয়ে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছে। ডুবিয়ে আবারও ভাসিয়ে তুলছে। নাকি আসমানে ভাসছে! ওর এই ডুব আর ভেসে ওঠা, এ কী ঘুম, না স্বপ্ন, নাকি শুধুই তলিয়ে যাওয়া!
কিন্তু, আবার যে ওর ঘুম কেমন ফাটা-ফাটা? যেন চৈতের খরায় ফেটে-ফুটে যাওয়া খটখটে মাঠ। যে মাঠের শুরু তো আছে, তবে শেষ দেখা যায় না! খালি একখান সাদা কাপড়ের টুকরা ওড়ে। ফরফর করে ওড়ে। আর একটা সাদা বক উড়ে কোনদিকে যেন মিলিয়ে যায়! হদিস পায় না সুলতান। আতঙ্কে চোখ খুলে যায় ওর। কুপির আলো কি নিভে গেছে? কিছু দেখা যায় না কেন? কিছু শোনা যায় না কেন?
নিজের বাঁ-পাশটায় হাতড়াতে থাকে ও। হদিস নাই! শুধু খটখটে মাটি হাতে বাধে। হৃদপিণ্ডহীন, শ্বাসযন্ত্রহীন, প্রাণহীন খটখটে মাটি। 🍁
🍂কবিতা
অমিত কাশ্যপ -এর একটি কবিতা

বাজার শিল্প
বাজারে গিয়ে নির্মলা ম্যাডামকে মনে পড়ল
ফাস্ট প্যাসেঞ্জারে সকালকে ডেকে যারা নিয়ে আসে
তারা শহরের ফুটপাতে সবজির ঝাঁকা নামিয়ে
গায়ে জবজবে শ্রমের ঘাম মোছে গামছায়
নির্মলা ম্যামকে চেনে, বিড়ি খায়, সিগারেটের দাম বাড়া
সোনার দাম কমা, কি হবে জেনে
চায়ে একটা বিস্কুট ভিজিয়ে পাঁচ টাকা দেয়
বাজারে এসব চলে, ব্যবসাদার নীতাদিদি থেকে
পাড়ার রামু ফুচকাওয়ালা, কেমন নিদ আসে
গামছার বিছানা, বুকের ওপর জ্যোৎস্নার চাদর
শান্তি, নির্মলা ম্যাম মাথায় কলপ করতে পারেন
তাপস রায় -এর একটি কবিতা

ধরো আর কখনই তোমার মনখারাপ হল না
বৃক্ষ যেভাবে ফুল ফোটায়, একজন রাঁধুনিও-
কত পর্ব থেকে পর্বান্তরের ভেতর দিয়ে এদের যেতে হয়
আঁচলের হাওয়া তেমন করে টের না পেলেও
শহরের নদীটিকে বয়ে যেতে হয়
ওই তিরতির করে জলের উপরে রাখা কাঁপন ফুরিয়ে এসেছে
ক্রমে সাহস কমে আসে, এদিকে বর্ষা নেমেছে
একটা স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে পালিয়ে বেড়াচ্ছে সে, ট্রেন
নিজেকে হারিয়ে ফেলতে কতদূর যেতে পারে! ভয় পায়
কিশানগঞ্জ আসে, একটু গেলেই তরাইয়ের বন
অথচ সে জানে বনের গন্ধটুকু দিয়ে তাকে ফিরিয়ে দেবে
চতুর মানুষ, ফিরে যেতে হবে শহরের ছলনার কাছে
কিছু কিছু অক্ষরের বনিবনা হল না কোনোদিন
কোনো অক্ষরপ্রেমিক হয়ত জীবন ধরে চেষ্টা করেছে
শয়তানের সাহসের সাথে ঈশ্বরের বরাভয় মিশিয়ে
না-ঈশ্বর সৃষ্টি করে যেতে
ফরাসের কোণে একা বসে আছে ফাঁকা হুঁকোদান
কড়ি ঝোলানো হুঁকোটিকে নিয়ে
যে মানী অতিথি আয়েস উগড়ে দিয়েছে হুহু করে
সে কখনও নজর করেনি হুঁকাদানটির দীর্ঘ হাহাকার
সঞ্জয় আচার্য -এর একটি কবিতা

পলাশ জ্বরের ঘোর
মাঝখানে ওই যে পুরনো বাড়িটি জেগে আছে
সেখানে অনেক কথা বায়বীয়।
কোনও নৃতাত্ত্বিক খুঁজে পাবে না সেসব কোনওদিনও বা।
অনেক অনেক মেদুর বন থেকে আজ, এসো
আমরা পেড়ে আনি অজস্র রাঙা অনুভূতি।
দূরে ফেরিওয়ালা হাঁকতে হাঁকতে চলে যায়,
তিন ভূবনের পাড়ায় তার বাস
পরনে উদাসী ফুলের অচেনা সুবাস।
“ভাঙা চোরা বিক্রি করবে গো… ও… ও… ও”
বাড়ির দেয়াল, ভাঙা কুলুঙ্গি কান পাতে
ঝড় জল উপেক্ষা ক’রে এ হেন দূরের আহ্বানে।
সে বাড়িটি ফেলে এসেছি আমি উঁকিঝুঁকি আলোর কিনারে,
যেমন করে ফেলে আসে মানুষ ট্রেন জানলার দুপাশ
যেমন করে উপশম ফেলে আসে পুরোনো ব্যথা।
আজ এই পলাশ জ্বরের মুহূর্তে, এসো, তাদের কুড়িয়ে নিই
আমাদের যৌথ উঠোন থেকে।
জয়তী কাঞ্জিলাল -এর তিনটি কবিতা

বাবা, তোমাকে…
এই চলে যাওয়া কতটা সহজ বলো
এখনও কি সেই সহজিয়া গান গাও
স্নেহ লেগে থাকা বাসা জুড়ে কান্নার…
বিষাদ মাখানো ভায়োলিন বেজে যাও।
ছায়ারা যখন মুছে যায় চিরতরে
পুড়ে যেতে হয় নিদারুণ বেদনায়
অসহায়, বড়ো অসহায় এক মন
পুরনো দিনের স্মৃতি আজও বয়ে যায়।।

অনুচ্চারিত শব্দেরা…
তোমাকে বলা হয়নি
অনেক অনেক কথার মতো…
একথাও ভেসে গেছে কার্তিকের হিমেল হাওয়ায়
দুগ্ধবতী ধানের চুঁয়ে পড়া সোনালী বিভা দেখে
থমকে গেছে পথ
কুয়াশার পর্দা সরিয়ে কার্তিকের চাঁদ
রূপোলী নথের আলো বিছিয়ে দিয়েছে,
সেখানে তুমি , আমি হেঁটে গেছি কতবার…
কতযুগ ধরে।
মনে পড়ে?
তবুও বলা হয়নি সে কথা
কিছু কথা অনুচ্চারিত থেকে যায় আজীবন
অনুচ্চারিত শব্দের মাধুর্য ধরে রাখে দু’নয়ন।।

আগামী
এরপর তোমার সঙ্গে দেখা হলে
চার্চের বন্ধ দরজাকে দৃষ্টিতে নিয়ে চলে যাবো…
পুবের অশ্বত্থ গাছের বেদীটার কাছে।
খানিক দূরের জেলেপাড়ার শরীর ছুঁয়ে
ভালোবাসা নদী থেকে
যে বাতাস বয়ে আসে,
তার সাথে মিলেমিশে
মিথুনের মতো সুরেলা হয়ে ওঠে চার্চের বেল।
রিনরিন করে বেজে উঠে অশ্বত্থ পাতা
ঝরে পড়ে তোমার আঁচলের পথে
সে জানে,
ওখানে তার বুকে পদচিহ্ন আঁকবে না কেউ।
বকফুলের মতো নদীর পাখিরা উড়ে যাবে ঝাঁক বেঁধে
একটা শূন্য নৌকা লাজুক ছই নিয়ে হাতছানি দেবে
প্রকৃতি পুরুষকে।
আর আমি দেখব, তোমার ঠোঁটের নীচে
ছোট্ট তিলের পাশে আনত শেষ প্রহরের আলোর… জাফরির কারুকাজ।।
মৌসুমী চৌধুরী -এর একটি কবিতা
কবিতা মেয়ে
কবিতার পিঠে ভাবনার ভর রেখে
জাবেদা খাতায় লিখি আবেগ
গাগড়ি ভরে ওঠে নেহাতই কিছু শব্দে।
রক্ত-ঘাম নিঙড়ে, পুতিগন্ধময় যাপনে
চাঁদ-ফুল-পাখির খোলস ছাড়ে কবিতা।
চোখে আগুন ঝরিয়ে শব্দ সমুদ্র থেকে উঠে মোমবাতি মিছিলে আসে কবিতা মেয়ে
পিঠে তার দেশ বদলের স্বপ্ন-ফোস্কা।
মিঠুন চক্রবর্তী -এর একটি কবিতা

কসাই
একদিন কসাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘কষ্ট হয় না?
চোখে জল আসে না?
উত্তরে কসাই বলেছিল,
‘প্রথম দিন খুব কষ্ট হয়ে ছিল,
দ্বিতীয় দিনও কষ্ট ছিল,
তৃতীয় দিন অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল,
দিনে দিনে আমিও কেমন যেন কসাই হয়ে উঠছি
হাসতে হাসতে খাতা থেকে কেটে ফেলি
তোমাকে ছাড়াই এক একটা দিন
আকাশের গায়ে দিনের শেষে রক্ত ভরা দু’হাত মুছি,
ঝিকিমিকি তারায় তারায় সাজিয়ে রাখি মুক্তো হাসি
তুমি তারা দেখেছ,
দেখনি তারার হাসি আসলে দাউদাউ বুকের আগুন
দিন দিন পুড়তে পুড়তে ফুরিয়ে যাচ্ছে শরীর…
শোভন মণ্ডল -এর একটি কবিতা

শূন্য এ বুকে…
যত এগোই জীবনের দিকে
মৃত্যু ছায়া ফেলে পায়ের নিচে
যতই আলোর দিকে মুখ করে থাকি
অন্ধ করে দিতে চায় এই প্রিয় চোখ
আমাদের চলা আসলে হেঁটে যাওয়া হোঁচট খেতে খেতে
বিছানো লাল-নীল মার্বেল পাথরে ঘষে নেওয়া এ শরীর
ঝলমল করে, সারা জীবন ধরে
কোথাও কি আঁচল ভরে গেছে উপহারে?
কোথাও কি মুঠোর মধ্যে ধরা আছে স্নেহ আর ভালবাসাখানি?
এ প্রশ্ন করতেই হবে
যতই এগিয়ে যাই মৃত্যুর দিকে
জীবন আলিঙ্গন করে শূন্য এ বুকে
অমলেন্দু বিশ্বাস -এর একটি কবিতা

চোমরদহ বিল
ভোরের কুয়াশামাখা পথ ধরে হাঁটি
সোজাসুজি পুবদিকে হেঁটে গেলে দেখি
ডানে ঝুঁকে বেঁকে যাওয়া মেঠো-গেছো রাস্তা
চলে গেছে বাওড়ের চোমরদহ বিলে।
ছোট্ট ডিঙা দেখি মৃদু জলে ভাসমান
কারো কী অপেক্ষা মুখ রেখেছে উঁচিয়ে!
মাছধরা ছোটো নৌকো জলেতে উত্তাল
আড়ালে ময়ূখ মুখ অল্প ঝুঁকে দেখলে
যেমন উচ্ছল থাকে জলতলে মাছ
তেমনি প্রমিতা আসে, ধরে রাখে স্মৃতি
ফোন – ক্যামেরায় সুগোপন মাতামাতি!
কখনো কুয়াশা ভোর ঢাকে না সভয়ে
বেঁচে থাকে নির্ভরতা কবির কলমে।
🍂ধারাবাহিক উপন্যাস |২
সাশ্রয় নিউজ -এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ শুরু হয়েছে সাহিত্যিক মমতা রায় চৌধুরী -এর ধারাবাহিক উপন্যাস ‘হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা’। একটি বিশেষ কালকে কেন্দ্র করে নারীদের নিয়ে এই উপন্যাস এগিয়ে যায়। নারীদের লড়াইয়ের কাহিনী পড়তে চোখ রাখুন রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এ।
হারিয়ে যাওয়া নারীর ইতিকথা
মমতা রায় চৌধুরী
সুনয়নাদি
১৬.
তিথির রবিবারটা এভাবে কাজে কাজেই কেটে যায়। নিজেকে নিয়ে ভাবার সময়টুকু পর্যন্ত নেই কাজের লোক থেকেও কোন লাভ নেই। সারাটা সপ্তাহের ছটা দিন স্কুলে একটা দিন ছুটির দিন সেদিন যেন কাজের লোকেরাও ভাবে ওদেরও ছুটি। তিথি এখন আর এসব নিয়ে রেগে যায় না মাঝে মাঝে বিরক্তি আসে কাজের প্রতি। ওরও তো রক্তমাংসে গড়া শরীর ,ওরও তো ক্লান্তি লাগে বিশ্রাম পেতে ইচ্ছে করে ।না আবার ভেবে দেখেছে যারা কাজ করে ওরাও তো চায় একটা দিন ছুটিতে থাকতে।এটা যেন একটা সমঝোথায় পরিণত হয়েছে।
—তবে আমি তো সুনয়নাকে বলেছিলাম কি কি কাজ করতে হবে সব তুমি বলে রাখবে।
—হ্যাঁ বলেছে।
—এই নাও চা।
—আমাকে জল খাবার দেবে তো? এক প্রত্যাশা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
—জলখাবারের কথা তো নেই ঠিক আছে তুমি যদি খাও আমি দেব।
আসলে আমি যেসব বাড়িতে কাজ করি জলখাবার দেয়।
কথাটা শুনে মনে মনে চমকে উঠলো দিদি সুনয়না বলেছিল ওই প্রথম আমাদের বাড়িতেই কাজ করবে কথাটা কেমন হলো।
সুনয়নার ফোন ছেড়ে দিয়ে কাজেতে হাত লাগাল এমন সময় শাশুড়ি হাঁক দিল,
—বৌমা, বৌমা, বউ মা আ আ আ…
—হ্যাঁ ,যাই মা।
—আমাকে একটু বাথরুমে নিয়ে চলো।
—হ্যাঁ, চলুন আস্তে আস্তে। আহা, আমাকে ধরুন।
বেশ, এবার আস্তে আস্তে পা টা নামান মাটিতে দেখবেন পড়ে যান না যেন ।শরীরটা কি খুবই উইক লাগছে ?
—হ্যাঁ সে তো আছেই।
—কি খাবেন এখন?
—কি খাই বলো তো
—আপনি বলুন কোনটা খেতে ইচ্ছে করছে
—আমাকে একটু দালিয়ার খিচুড়ি করে দেবে?
—ঠিক আছে তাই হবে আপনার জন্য করব সঙ্গে আমাদেরও একটু করে নেব জলখাবারে আজকে এটাই খাব ।
-আচ্ছা, আচ্ছা, দাঁড়ান। বাথরুমের লাইটটা জ্বালিয়ে দিই। বেশ এবার বসুন। আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি।
—ঠিক আছে।
—হয়ে গেলে বলবেন
—আচ্ছা বৌমা।
দরজাটা খুললেন কল্যাণী দেবী
—দাঁড়ান আমি ধরছি, পা পিছলে যেতে পারে
—আজকে কেন যে সুইটি কামাই করল
—ওদিকে সু আসছে না কেন?
—ও কাজ করতে পারবে না মা।
—কে?
-আপনার সু।
—কেন?
—ওর তো বাচ্চা হবে?
—ওমা সে কথা তো আমি জানি না কাজে আসছে না।
—হ্যাঁ আপনাকে জানানো হয়নি। আপনার তো এমনি শরীর ভালো যাচ্ছে না।
—ও আচ্ছা।
পুচু দুষ্টু করে না বড় ঠাম্মি পড়ে যাবে।
—তোমার খুব অসুবিধা হবে।
তিথি চুপ করে থাকে।
—একটা কাজের লোক দেখে দিতে বললে না কেন।
—হ্যাঁ বলেছি। আজকে আসার কথা।
—ও তাহলে ঠিক আছে।
ইতিমধ্যে কলিংবেলের আওয়াজ হরি হরায়ে নম কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ…
—এ সময় আবার কে আসলো দেখো।
—আমার তো মনে হচ্ছে নতুন কাজের মেয়ে এসেছে ।
—যাও যাও তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজাটা খোলো।
—হ্যাঁ যাই।
—ওরাই আমাদের সম্বল।
—এখন তো কাজের লোক পাওয়া খুবই মুশকিল যেভাবে সরকার থেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে টাকা পাচ্ছে তাতে ওদের কাজ না করলেও হবে।
তিথি দরজাটা খুলল দেখল এক রোগা তাল পাতার সেপাই অপুষ্টি জনিত এক মহিলা বয়স ৩০-৩৫ হবে কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে ৪০-৪৫। এক গাল হেসে বলল —আমাকে নয়ন পাঠিয়েছে?
—কে পাঠিয়েছে?
—নয়ন।
—নয়ন আবার কে?
—আরে সুনয়না
—ও বাবা ওর নাম আবার নয়ন নাকি?
—হ্যাঁ ওর স্বামী ডাকে।
—আচ্ছা, আচ্ছা এসো। আমি তুমিই বলছি।
—না না ঠিক আছে তুইও বলতে পারো।ও তোমাদের দোতলা বাড়ি।
—হ্যাঁ গো। এসো বসো। তুমি কি চা খাও?
—লিকার দিলেই হবে।
—ঠিক আছে
—ওপরে কটা ঘর আছে বৌদি?
—কেন সুনয়না তোমাকে বলেনি?
—হ্যাঁ বলেছে ।
তিথি ভাবছে এ তো নিজেকে খুব চালাক মনে করছে, আচ্ছা চতুর তো।
—তবে আমি তো সুনয়নাকে বলেছিলাম কি কি কাজ করতে হবে সব তুমি বলে রাখবে।
—হ্যাঁ বলেছে।
—এই নাও চা।
—আমাকে জল খাবার দেবে তো? এক প্রত্যাশা পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।
—জলখাবারের কথা তো নেই ঠিক আছে তুমি যদি খাও আমি দেব।
—আসলে আমি যেসব বাড়িতে কাজ করি জলখাবার দেয়।
কথাটা শুনে মনে মনে চমকে উঠল দিদি সুনয়না বলেছিল ওই প্রথম আমাদের বাড়িতেই কাজ করবে কথাটা কেমন হল। তারপর এক গাল হেসে বলল
—তাহলে কবে থেকে কাজ করবে।
—আজ তো এপ্রিল মাসের তিন তারিখ।
—আজ থেকে করবে?
কিছুক্ষণ ভাবলো তারপর বলল- ঠিক আছে কাল থেকে তো বৌদি তোমার স্কুল আমি আজ থেকেই করি একটু বুঝে নিই।
—বেশ।
—তবে বৌদি আমাকে আরও ১০০ টাকা বাড়িয়ে দিতে হবে।
—কেন?
—সুনয়নাকে যা দিতাম তোমাকেও তাই দেব সেটাই তো বলেছি।
—না গো, উপরের ঘরে দেখে মনে হচ্ছে বড় বড় ঘর
—সপ্তাহে ক’দিন মুছতে হবে?
—সে কি কথা রোজই মুছতে হবে তবে যদি একান্তই কোনদিন খুব খারাপ লাগে তাহলে সেদিনটা বাদ দিয়ে করলেও হবে ।
—আচ্ছা
—তবে দেখো সেটা যেন আবার রোজ রোজ করতে যেও না।
—আচ্ছা বৌদি ঘর মোছার বালতি কোথায় আছে। নয়ন তো বলেছিল বাথরুমের পাশে আর একটা যে তোমাদের কল ঘর আছে সেখানে।
—ঠিকই বলেছে।
তিথি দেখছে সুনয়না অনেক কিছুই বলে রেখেছে বেচারা আসতে পারে নি তো কি হয়েছে। তিথির অনেক কাজ এগিয়ে দিয়েছে সুনয়না। মেয়েটা খারাপ নয়।
—ঠিক আছে তাহলে আমি প্রথমে নাতা বালতি নিয়ে উপরে যাচ্ছি, ঘর ঝাড় দিয়ে মুছে নেব।
—হ্যাঁ তাই যাও।
তারপরে সে কি নিঢের ঘরগুলো ঝাড় দিয়ে মুছবো নাকি বাসন মাজব। জিজ্ঞাসু মুখে তাকিয়ে নতুন কাজের লোক।
—না না আগে ঘরগুলো মুছে নেবে তারপর বাসন মাজবে, তারপর কাপড় কাচবে।
কাপড় কাচতে হবে ?কাপড় তো ওয়াশিং মেশিনের কাচা হয় শুনেছি।
হ্যাঁ ঠিকই শুনেছ তবে রেগুলার ওয়াশিং মেশিনের কাচবো না।
আর শুনেছি তোমাকে সবজি কেটে দিতে হবে
—হ্যাঁ ঠিকই শুনেছ তাহলে ওগুলো কখন কাটবো ।
ঘর মুছে এসে কেটে দেবে, তারপর অন্য কাজ করবে।
—আচ্ছা তাই হবে।
সুনয়না মেয়েটা কেমন গো? তিথি ইচ্ছে করে জানতে চাইল।
এসব মেয়েরা আবার ভাল হয় নাকি? ও তো গলির মেয়ে।
বাবা! তিথি মনে মনে ভাবছে একটা মেয়ে কিভাবে যে ওই জীবনে যায় কেউ খবর রাখে না কিন্তু সেই জীবন পার করে যদি সে বাঁচার মতো একটা সংসার পায়, সাথী পায় তাহলে তো ভালই।
—বৌদি কি তরকারি কাটতে হবে?
—আজকে তো সানডে মাংস হবে মাংসের আলু কেটে দাও পিয়াজ কেটে দাও রসুন ছাড়াও আরেকটু উচ্ছে ভাজা ও বেগুন ভাজা কেটে দাও।
—কাল থেকে ক’টায় ঢুকব?
—সাড়ে ছটা থেকে সাতটার মধ্যে ঢুকতেই হবে।
—আচ্ছা ঠিক আছে।
ঝপা ঝপ সোমা দি সব কাজ করে ঝড়ের গতিতে পথে পা বাড়াল। যখন চলে গেল ওকে দেখে মনে হল বিকেলের পড়ন্ত রোদে নিজের গা টিকে এলিয়ে দিয়েছে। এখন শুধু এই বিশ্রাম আর বিশ্রাম 🍁(ক্রমশঃ)
🍂গদ্য
কৃষ্টি-সংস্কৃতি এবং মানবিকতার ধারাকে ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি নিজের শিকড়কে ভুলে গেলে চলবে না। শিক্ষা, সচেতনতা এবং পারস্পরিক সম্মান এই তিনটি বিষয়ই পারে ভবিষ্যতের সমাজকে আরও সুস্থ ও মানবিক করে তুলতে।
দেশ সময় কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও মানবিকতার বিবর্তন: অতীত থেকে বর্তমানের যাত্রা

সংবেদন শীল
দেশ মানে শুধু মানচিত্রের একটি ভূখণ্ড নয়। দেশ মানে মানুষের জীবনযাপন, চিন্তা, বিশ্বাস, ভাষা, সঙ্গীত, রীতি-নীতি এবং সেই সঙ্গে মানবিকতার এক দীর্ঘ যাত্রাপথ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দেশ বদলেছে, তার কৃষ্টি-সংস্কৃতি নতুন রূপ নিয়েছে, আর মানবিকতার সংজ্ঞাও ক্রমাগত প্রসারিত হয়েছে। ‘দেশ সময় কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও মানবিকতার বিবর্তন’ এই ধারণা আমাদের সামনে তুলে ধরে এক চলমান ইতিহাস, যেখানে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এক অদ্ভুত সেতুবন্ধনে আবদ্ধ। ভারতের মতো বহুত্ববাদী দেশে কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিকাশ কখনও একরৈখিক হয়নি। প্রাচীন যুগে যখন সভ্যতার সূচনা, তখন মানুষের জীবন ছিল প্রকৃতিনির্ভর। নদী, অরণ্য, পাহাড় এই সবই মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। সেই সময়ের সংস্কৃতিতে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, সহাবস্থান এবং সহনশীলতার ছাপ ছিল প্রবল। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ এই সব গ্রন্থে সেই সময়ের চিন্তাভাবনার প্রতিফলন পাওয়া যায়। মানবিকতা তখন ধর্মীয় ও নৈতিক আদর্শের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।
ভারতের কৃষ্টি-সংস্কৃতি তার বৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, উৎসব প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে ভিন্নতা, অথচ সেই ভিন্নতার মধ্যেই রয়েছে ঐক্য। দুর্গাপুজো, ঈদ, দীপাবলি, বড়দিন, সব উৎসবই এখানে সমান আনন্দের সঙ্গে পালিত হয়। এই ঐতিহ্যই দেশের মানবিকতার ভিত্তিকে মজবুত করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে পরিবর্তন আসে। নগর সভ্যতার বিকাশ, বাণিজ্যের প্রসার, বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের আগমন ভারতীয় সংস্কৃতি নতুন মাত্রা পায়। মধ্যযুগে মুঘল শাসনকাল ভারতীয় সংস্কৃতিতে এক বিশেষ প্রভাব ফেলে। স্থাপত্য, সঙ্গীত, সাহিত্য সব ক্ষেত্রেই নতুন সংমিশ্রণ তৈরি হয়। হিন্দু ও মুসলিম সংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠে এক অনন্য ঐতিহ্য, যা আজও আমাদের সমাজে বিদ্যমান। এই সময়েই মানবিকতার ধারণাও বদলাতে শুরু করে। শুধু নিজের সম্প্রদায় নয়, অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের প্রতিও সহনশীলতা ও সহমর্মিতার বোধ তৈরি হয়। সুফি ও ভক্তি আন্দোলন মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ কমিয়ে আনার চেষ্টা করে। কবীর, নানক, চৈতন্যদেব তাঁদের ভাবধারা মানুষের মনে এক নতুন চেতনার সঞ্চার করে, যেখানে ভালোবাসা এবং সমতার মূল্য সবচেয়ে বেশি। ঔপনিবেশিক যুগে ভারতীয় সমাজ আরও বড় পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়। ব্রিটিশ শাসনের প্রভাবে একদিকে যেমন পশ্চিমী শিক্ষা ও আধুনিকতার ছোঁয়া আসে, অন্যদিকে তেমনি নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষার লড়াই শুরু হয়। এই সময়েই জন্ম নেয় নানা সামাজিক সংস্কার আন্দোলন। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, স্বামী বিবেকানন্দ এই সব মহান ব্যক্তিত্ব সমাজে মানবিক মূল্যবোধকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করেন।
নারীর অধিকার, শিক্ষার প্রসার, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই, এই সব বিষয় সামনে আসে। মানবিকতার ধারণা তখন শুধুমাত্র ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি, বরং তা সামাজিক ন্যায় ও সমতার সঙ্গে যুক্ত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই মানবিক চেতনা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন এবং নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আত্মত্যাগ মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম এবং মানবিকতার এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে। স্বাধীনতার পর ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সংবিধানে সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়। ধর্মনিরপেক্ষতা, বাকস্বাধীনতা, ন্যায় এই সব মূল্যবোধ দেশের ভিত্তি হয়ে ওঠে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা চ্যালেঞ্জও সামনে আসে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নগরায়ণ, প্রযুক্তির বিস্তার মানুষের জীবনযাত্রা দ্রুত বদলাতে থাকে।
আবার, বর্তমান যুগে প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে মানবিক সম্পর্কের উপরও প্রভাব ফেলেছে। সোশ্যাল মিডিয়া, ডিজিটাল যোগাযোগ, এই সবের মাধ্যমে মানুষ একদিকে যেমন কাছাকাছি এসেছে, অন্যদিকে তেমনি একাকীত্বও বেড়েছে। কৃষ্টি-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। লোকসংস্কৃতি ধীরে ধীরে আধুনিকতার চাপে জায়গা হারাচ্ছে, আবার নতুন প্রজন্ম সেই সংস্কৃতিকে নতুনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। মানবিকতার ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আজকের সমাজে প্রতিযোগিতা, ব্যস্ততা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা অনেক সময় মানুষের মধ্যে সহমর্মিতার অভাব তৈরি করে। তবুও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগ, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের প্রচেষ্টায় মানবিকতার দৃপ্তি এখনও জ্বলছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় বা সংকটের সময় মানুষ একে অপরের পাশে দাঁড়ায়, যা এই দেশের মূল শক্তি। ভারতের কৃষ্টি-সংস্কৃতি তার বৈচিত্র্যের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। ভাষা, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, উৎসব প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে ভিন্নতা, অথচ সেই ভিন্নতার মধ্যেই রয়েছে ঐক্য। দুর্গাপুজো, ঈদ, দীপাবলি, বড়দিন, সব উৎসবই এখানে সমান আনন্দের সঙ্গে পালিত হয়। এই ঐতিহ্যই দেশের মানবিকতার ভিত্তিকে মজবুত করে।
আগামী দিনে এই কৃষ্টি-সংস্কৃতি এবং মানবিকতার ধারাকে ধরে রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার পাশাপাশি নিজের শিকড়কে ভুলে গেলে চলবে না। শিক্ষা, সচেতনতা এবং পারস্পরিক সম্মান এই তিনটি বিষয়ই পারে ভবিষ্যতের সমাজকে আরও সুস্থ ও মানবিক করে তুলতে। দেশ, সময়, কৃষ্টি-সংস্কৃতি এবং মানবিকতা এই চারটি উপাদান একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সময়ের সঙ্গে দেশ বদলায়, সেই বদলের সঙ্গে বদলায় মানুষের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ। কিন্তু এই পরিবর্তনের মধ্যেও যদি মানবিকতার আলো জ্বেলে রাখা যায়, তবেই একটি সমাজ সত্যিকার অর্থে উন্নত হতে পারে।🍁

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার | কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার | অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক
এক নজরে সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com, sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
সম্পাদকীয় ঋণ : ‘মহামিলনের কথা’ ও ‘ফিরে পড়া’ বিভাগের লেখা আন্তর্জাল থেকে সংকলিত।







