Sasraya News Sunday’s Literature Special | 13th July 2025, Issue 73 | সাশ্রয় নিউজ, রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ১৩ জুলাই ২০২৫, সংখ্যা ৭৩

SHARE:

🍂সম্পাদকীয় 

এখনও দেখিনি তাকে বুক ভরে থাকে
ভালোবাসা বিরহে জেগে প্রতিদিন ডাকে

আমাদের জীবনে তুমি গাছ তুমি বায়ু
সুখচাঁদ ভাসিয়ে ঘুরো ফেরো প্রিয় আয়ু

কতদিন পূর্ণতা পায় বলো প্রেম প্রীতি
আমাদের কিভাবে মনে খেলা করে স্মৃতি
সব যেন বিবেকে লেগে থাকে মায়া আর
ব্যথাগুলো হাঁকড়ে উঠে বুঝে যেও সার
মানুষেরা মুমূর্ষু হয় মেনে নিতে হবে
যাদেরই কাছের ভাবো দূরে সরে যাবে
সংসার করতে এসে বুঝে ফেরো মায়া
পাইনাতো নতুন কিছু পায় শুধু কায়া

ভালোবেসে আদর মেখে তুলে রেখো সুখ
শিব বলে ডাকবে যানি তোমাদের মুখ

 

 

🍂মহামিলনের কথা 

 

শ্রীশ্রীগুরবে নমঃ
যেরূপ শ্রীভগবান কৃষ্ণচন্দ্র লোক সংরক্ষণের জন্য ধরাধামে আবির্ভূত হইয়াছিলেন তদ্রূপ তাঁহার সুদর্শনচক্র অবতার ভক্তিসার যোগীশ্বরও পুণ্যভূমি মহীসার ক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন ৷ শ্রীভগবানের ভক্তিকেই একমাত্র সার পদার্থ বুঝিয়াছিলেন বলিয়া তাঁর নাম ‘ভক্তিসার’৷
যে সরোবর তটে বনমধ্যে ভক্তবর বাস করিতেন একদিন শ্রীভগবান শঙ্কর পার্ব্বতীর সহিত তথায় উপস্থিত হইলেন ৷ শ্রীপার্ব্বতীদেবী তাঁহাকে দেখিয়া বলিলেন ‘ইনি কে?’ শ্রীশঙ্কর বলিলেন ‘ইনি শ্রীভগবানের অনন্য বিশ্বাসী ভক্ত’ ৷ শ্রীপার্ব্বতীদেবী বলিলেন ‘চল ইঁহার অনন্যতা কেমন দেখি’ ৷ উভয়ে তাঁহার সমীপে উপস্থিত হইলেন ৷ যোগীবর তখন একখানি কাপড় সেলাই করিতেছিলেন ৷ শ্রীভগবান শঙ্কর বলিলেন ‘হে ভক্ত কিছু বর গ্রহণ কর—আমার দর্শন বৃথা হয় না’।

শ্রীশ্রী ঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

ভক্তিসার বলিলেন ‘হে দেবেশ্বর শঙ্কর,শ্রীভগবানের কৃপায় আমার তো কোন বস্তুর অপেক্ষা নাই ৷ কোন বরে প্রয়োজন নাই ‘৷ শ্রীশঙ্কর বলিলেন ‘দেখ আমাকে এরূপ অনাদর করা উচিত নহে—তোমার যাহা ইচ্ছা হয় প্রার্থনা কর’ ৷ ভক্তিসার বলিলেন,’কি প্রার্থনা করি,আমার চাহিবার কিছু নাই—আচ্ছা আমার সূচের সুতাটি খুলিয়া গিয়াছে আপনার বরে সুতা সূচীর মধ্যে প্রবেশ করুক’ ৷
শ্রীভগবান শঙ্কর ক্রুদ্ধ হইয়া ‘তুমি আমার প্রভাব জান না,তজ্জন্য এরূপ পরিহাস করিতেছ ; অধুনা আত্মরক্ষা কর’ বলিয়া তৃতীয় নেত্র বিস্ফারিত করিলেন ৷ তৎক্ষণাৎ রাশি রাশি অগ্নি নেত্র হইতে বহির্গত হইয়া তাঁহাকে ভস্মীভূত করিবার জন্য তন্নিকটস্থ হইল ৷ তখন শ্রীভক্তিসার পাদপ্রসারণপূর্ব্বক পাদস্থ নেত্র উন্মীলন করিলে তাহা হইতে ঘোর প্রলয় জ্বলিয়া উঠিল ৷ তিনলোক অত্যন্ত তাপিত হইয়া পড়িল। ইন্দ্রাদি দেবতাগণ বলিতে লাগিলেন ‘আজ প্রমথনাথ ত্রিলোক দগ্ধ করিবেন—জগৎ ধ্বংস হইয়া যায় রক্ষা করুন রক্ষা করুন’৷
ভক্তিসারের পাদজাত নয়ন অগ্নি শঙ্করের কোপাগ্নিকে শান্ত করিয়া স্বয়ং শান্ত হইয়া যাইল ৷ শ্রীভগবান শঙ্কর শ্রীপার্ব্বতীদেবীকে বলিলেন ‘প্রিয়ে,অনন্যভক্তের প্রভাব দেখিলে ?’ উভয়েই অন্তর্হিত হইলেন ৷ ভক্তের লীলা সাধারণ বুদ্ধির অগম্য ৷
এই দ্বাপরযুগেই রুদ্রাবতার মহাবীর সুদর্শন চক্রকেই কঙ্কনের ন্যায় হস্তে ধারণ করিয়াছিলেন ৷ কে বড়,কে ছোট বুঝিবার কোন উপায় নাই—ঠাকুরটির লীলার মত তাঁহার ভক্তগণের লীলা অনন্ত অপার অগম্য ৷ জয় ভক্তের জয় ৷
🍁শ্রীভক্তিসার | আলবার লীলামৃত | শ্রী ওঙ্কারনাথ রচনাবলী

 

 

🍁ধারাবাহিক উন্যাস 

 

শুরু হচ্ছে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। কবি তৈমুর খানের জীবন। বাল্য-কৈশোরের দিনগুলি কীভাবে বয়ে গেয়েছিল উপলব্ধির স্রোত। কেমন করে প্রকৃতি ও জীবনকে দেখতে শিখেছিলেন। কেমন করে জীবনে এলো ব্যর্থতা। সেসব নিয়েই নানা পর্ব

 

 

একটি বিষণ্ণরাতের তারা

তৈমুর খান

 

পঁয়ত্রিশ.

সেদিন হাজিরা খাতাতে সই পর্যন্ত করিনি

০০৪ সালের ২১ শে জানুয়ারি বিদ্যালয়ে জয়েন করে রঘুনাথগঞ্জের আইলের উপর নামে পাড়ায় ছোট্ট একটা ভাড়াবাড়িতে থাকি। এই এলাকায় তেমন কোনো পরিচিতি আমার ছিল না। চাকরি পাওয়ার আগে অবশ্য দু’একবার এসেছিলাম তখনও গঙ্গার ওপরে ব্রিজ তৈরি হয়নি। পায়ে হেঁটেই গঙ্গা পেরিয়ে ওপারে গেছিলাম। এত জমজমাট ঘরবাড়ি তখন ছিল না। রাস্তার দুপাশের চেয়ে দেখলাম শুধু বাগান আর বাগান। কয়েকটি ঘোড়ার গাড়ি ঘোরাঘুরি করছে।

শুধু সাহিত্যের টানে নয় অনেকটা আশ্রয় ও স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে তিনি আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যার ফলে অনেক চড়াই-উৎরাই আমার কাছে সহজ হয়ে গিয়েছিল। একদিন ইলেকশনের ডিউটি করে সকালবেলায় ফিরছি। তখন মোহাম্মদ আব্দুল্লাহু কেবল দোকান খোলার জন্য আসছেন। সারারাতের আমার ক্লান্তি ও বিষণ্ণতা তিনি বুঝতে পেরেই আমাকে তার বাড়ি থেকে আনা টিফিন সমস্ত খাইয়েছিলেন।

লোকজন তাতেই উঠে চলে যাচ্ছে তাদের গন্তব্যে। সেবার আমি গঙ্গা পেরিয়ে লালগোলায় গেছিলাম সাংবাদিক ও সম্পাদক জয়নূল আবেদীনের ডাকে।তারপর ওই পথেই ফিরেও এসেছিলাম। তখন নুরুল আমিন বিশ্বাস ‘অন্য শাব্দিক’ নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন। তাঁর পত্রিকাতেও বেশ ক’য়েকবার লেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তাঁকে একবার দেখা করে কয়েকটি কবিতাও জমা দিয়েছিলাম। জয়নূল আবেদীনের সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল ‘রঙধনু’। এই পত্রিকায় লিখতে লিখতে বিভিন্ন বিষয়ে মতান্তর ও পত্রাঘাত শুরু হয় মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামে একজনের সঙ্গে। চাকরির সুবাদে জঙ্গিপুরে এসে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় এবং প্রগাঢ় বন্ধুত্বের নিবিড় আহ্বান উপেক্ষা করতে পারি না। তার একটি ছোট্ট দোকান ‘টিফিন মিউজিয়াম’ ছিল বারোহাত কালীর মোড়েই। স্কুল থেকে ফিরে সকাল-সন্ধ্যা সেখানেই গিয়ে বসতাম। জঙ্গিপুরের অনেক অধ্যাপক, লেখক, সাংবাদিকও সেখানে আসতেন। একে একে পরিচয় হয় হরিলাল দাস, সুশোভন রফি, গোলাম মর্তুজা, অনন্ত রায়, অজয় সাহা, সুভাষ রবিদাস, কাজী আমিনুল ইসলাম, নাসির মির্জা, তৌহিদ মির্জা, এসএম নিজাম উদ্দিন, চন্দন পাণ্ডে, গফুর শেখ প্রমুখ আরো বহুজনের সঙ্গে। প্রত্যেকেই এক একজন ছিলেন শিক্ষক, অধ্যাপক, ডাক্তার, উকিল এবং প্রাইভেট টিউটর। মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বেশিরভাগ সময় নিজেই পয়সা খরচ করে চা পান করাতেন। সাহিত্য বিষয়েই তার দোকানে আড্ডা জমে উঠতো। নানা দিক দিয়ে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠতো। এবং সেইসব আড্ডাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে বিভিন্ন অনুষ্ঠান হতো যা পুরোপুরি সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক। মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ সব কিছুরই নেতৃত্ব দিতেন এবং সব আয়োজন করতেন। কিন্তু একটা বিষয় দারুণভাবে ভাবাতো, এদের মধ্যে বেশিরভাগই আধুনিক সাহিত্য বা সাম্প্রতিক সাহিত্যের সমঝদার ছিলেন না। সকলেই গতানুগতিক সাহিত্যকেই বেশি প্রাধান্য দিতেন। আর তখনই শুরু হতো বিতর্ক। একদিন সাগর নামে এক টিভি সাংবাদিকের সঙ্গে আমার প্রবল বিতর্ক শুরু হয়। তার বক্তব্য ছিল, “সাম্প্রতিক সাহিত্য কোনো সাহিত্যই নয়। রবীন্দ্রনাথের পর থেকে আর কোনো সাহিত্যিকই জন্মগ্রহণ করেননি। যারা আধুনিক সাহিত্য বলে চেঁচাই, তারা শুধু ভণ্ডামিই করে।”
তার এই বক্তব্য আমার একেবারেই পছন্দ হয়নি। রবীন্দ্র পরবর্তী সাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ তা তাকে বোঝাবার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলাম। অন্যান্য যারা উপস্থিত ছিলেন অনেকেই তার কথা সমর্থন করেছিলেন। এমনকি যারা কলেজে পড়ান তারাও সেদিন আমার পাশে দাঁড়াতে পারেননি। সেই থেকেই আমি অনেকটা ক্ষুণ্ণ হয়েছিলাম সেইসব আড্ডায় থাকতে। তবু যে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হতো না এমনটি নয়। কারণ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ-র সঙ্গে একটা গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। অনেকটা সুখ-দুঃখের কথা বলার মতোই তাকে সব বলতে পারতাম। তার সম্পাদিত ‘সাহিত্য চেতনা’ নামে একটি পত্রিকাও মাঝে মাঝে বের হতো। কয়েকটি সংখ্যা পড়ার সুযোগ হয়েছিল, কিন্তু প্রকাশিত লেখাগুলির মান খুব উন্নত ছিল না। যাইহোক শুধু সাহিত্যের টানে নয় অনেকটা আশ্রয় ও স্থানীয় অভিভাবক হিসেবে তিনি আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, যার ফলে অনেক চড়াই-উৎরাই আমার কাছে সহজ হয়ে গিয়েছিল। একদিন ইলেকশনের ডিউটি করে সকালবেলায় ফিরছি। তখন মোহাম্মদ আব্দুল্লাহু কেবল দোকান খোলার জন্য আসছেন। সারারাতের আমার ক্লান্তি ও বিষণ্ণতা তিনি বুঝতে পেরেই আমাকে তার বাড়ি থেকে আনা টিফিন সমস্ত খাইয়েছিলেন। তারপর সেদিন আমার বাসায় এসে দেশি মুরগির মাংস এনেও রান্না করেছিলেন। আমি যে বাড়িটিতে থাকতাম সেটি ছিল অস্বাস্থ্যকর স্যাঁতসেঁতে একটা বাড়ি। তিনি একদিন গিয়ে দেখলেন এবং বললেন: “এ বাড়িতে মানুষ থাকতে পারে? চলুন আজকে আমি একটা নতুন বাড়ি দেখে দিচ্ছি!”
“কোন পাড়ায় দেখবেন?”
“বারোহাত কালীতলার কাছেই।”
“এত মালপত্তর কী করে বয়ে নিয়ে যাব!”
“কিছু ভাববেন না, আমিই সব ঠিক করে দেবো।”
তারপর একটা নতুন বাড়ি দেখে তিনি সব মালপত্র একটা গাড়িতে করে বয়ে দিয়েছিলেন। আমার প্রথম সন্তান হলে একটা জামাপ্যান্ট কিনেও তাকে পরিয়েছিলেন। বাড়িতে যদি কিছু ভালো মন্দ রান্না হতো তাহলে তিনি সেদিন কিছুটা বেশি করে নিয়ে আসতেন আমার জন্য। স্কুল থেকে ফেরার পথে তার দোকানে বসলেই তা খেতে দিতেন। মুখে বলতেন, “আপনার ভাবি পাঠিয়েছে কেমন দেখুন।”
হঠাৎ হঠাৎ অনেক বইপত্রের দরকার হতো, সেসবই পেয়ে যেতাম তার কাছে। অসম্ভব বই পাগল ছিলেন বলেই ভারতে নিষিদ্ধ হওয়া সত্বেও সলমান রুশদির ‘স্যাটানিক ভার্সেস’ তিনি সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। বাংলাদেশের অধিকাংশ লেখকেরই বই তার কাছ থেকে পেয়ে যেতাম। তার একটা বই আল মাহমুদের ‘কবিতা সংগ্রহ’ এখনও আমার কাছে রয়ে গেছে। সেই লোকটিই একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলেন। তখন ২০০৮ সাল। জুলাই মাসের প্রথম দিকেই হবে। আমি স্কুল যাওয়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছি। তিনি দোকান থেকেই আমাকে ডাকলেন। বললেন, “বিকেলে আসুন, চা খাবার নেমন্তন্ন রইলো।”
আমি বললাম, “চা তো রোজই খাই, আজ স্পেশাল ভাবে কেন?”
তিনি বললেন, “কতগুলো নতুন ধারার অণুগল্প লিখেছি, সেগুলি পাঠ করবো, আপনি একটু বিচার করবেন।”
আমি বললাম, “আমি কিন্তু কঠোর সমালোচনা করবো। সহ্য করতে হবে।”
তিনি বললেন, “সেইটাই তো চাই।”
তারপর জানতে চাইলাম, “এখন কোথায় যাবেন?”
তিনি বললেন, “মোরগ্রামে দূর সম্পর্কের এক ভাগ্নের বিয়ে। আজকে তারই বৌভাত আছে। সেই নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে যাচ্ছি। এই গিয়েই ফিরে আসবো।”
“ঠিক আছে” বলেই আমি স্কুল যাওয়ার জন্য বাসে উঠে পড়ি। তারপর বাস থেকে নেমেই রওনা দিই অফিসের দিকে। তখনও স্বাক্ষর করিনি হাজিরা খাতায়। ইতিমধ্যেই বেজে ওঠে পকেটের ফোন। ফোনে যে কথা বলছেন তিনি একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনিরুদ্দীন। আমার পাশেই ভাড়া থাকেন।
ফোন ধরে বললাম, “কী খবর?”
তিনি কান্না জড়ানো গলায় বললেন, “আব্দুল্লাহ-দা আর নেই!”
“কী হয়েছে বলবেন?”
“এইমাত্র ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কে একটা দশ চাকার লরি তাকে ধাক্কা মেরেছে। সঙ্গে সঙ্গেই রক্তাক্ত অবস্থায় জঙ্গিপুর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়ছে। বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই।”
সেদিন হাজিরা খাতাতে সই পর্যন্ত করিনি। সঙ্গে সঙ্গেই হাসপাতালে ফিরে এসে দেখি কান ও নাক দিয়ে অনবরত রক্ত গড়ে যাচ্ছে। কয়েকবার মুখ হাঁ করে খাপি খেলেন তারপর স্তব্ধ হয়ে গেল তার সমস্ত স্পন্দন। ঘাড়ের ঝোলানো ব্যাগটি তেমনই আছে। রক্তে কিছুটা ভিজে গেছে। ব্যাগের ফাঁক দিয়ে দেখলাম এক গোছা কাগজে লেখা আছে সেইসব অণুগল্পগুলি। মনটা এতই বিষাদে ভরে গেল যে নিজেকে স্থির রাখতে পারলাম না। আব্দুল্লাহ-র বৃদ্ধ পিতা-মাতা এখনো বেঁচে আছেন। তিনি চলে গেলেন মাত্র ৪০-৪২ বছর বয়সেই। দুটি ছোট ছেলে মেয়ে তখনও স্কুলের গণ্ডি কেউ পেরোয়নি। একমাত্র তিনি রোজগার করতেন। যতোটুকু আয় হতো দোকানে তাই দিয়েই চলতো সংসার খরচ। এখন সবাই পথে বসলো।
চোখ মুছে ফিরে এসেছিলাম। সবই ভাগ্য। বাড়িতে এসে বেশ কয়েকদিন আর ওই দোকানের মুখোমুখি হতে পারিনি। মনে হতো আবদুল্লাহু-দা বসে আছেন। তিনি অণুগল্পগুলি পড়ে শোনাবেন তার জন্য ডাকছেন। আবার মাঝে মাঝে তাকে নিয়ে চলে যেতাম মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন জায়গায়। চারণ কবি গুমানি দেওয়ান মেলায়, কিংবা মারফতি ও ফকিরি কোনো গানের আসরে। সেখানেই কারো বাড়িতে আত্মীয়তা গ্রহণ করতাম। একবার লালগোলায় গেছিলাম ভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে। এবার আব্দুল্লাহ-দা-ই বাইক চালিয়ে নিয়ে গেছিলেন আমাকে। খুব ভালো যে বাইক চালাতে পারতেন তা নয়। তবে মাঝে মাঝেই অন্যমনস্ক হয়ে যেতেন। সাহিত্য নিয়ে কত কী ভাবতেন। আমি ওর বাইক চালানো দেখে সতর্ক করেছিলাম, সাবধানে চালাতে বলেছিলাম। কিন্তু তবু তিনি মানতেন না। এই কয়েক মিনিটের ব্যবধানে আমার যাওয়ার পর যে শেষ এক্সিডেন্টে তিনি চলে গেলেন সেই বাইকটিও তার ছিল না। পাশের এক জুতোর দোকানদারের বিবাহের যৌতুক হিসেবে পাওয়া নতুন বাইক। বাইকটাও দুমড়ে মুচড়ে গেছিল। আব্দুল্লাহ-দাকে আজও ভুলে উঠতে পারিনি। তার বইখানা আমার কাছে রয়েছে। সেখানে লেখা আছে তার নামও। কয়েকটি পত্রপত্রিকায়ও তিনি লিখেছিলেন কিছু কবিতা এবং গল্প। সেসব কোথায় চাপা পড়ে গেছে আজ আর তার কোনো খোঁজ নেই। 🍁 (চলবে)

 

 

🍁বিতা 

 

স্বপন কুমার দত্ত-এর একটি কবিতা

সুজাতা কার্ণিশে ধরে পৌঁছে ছিল কি?

আমি একটি মানুষ, নাকি মন? অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে উত্তর। কার সাথে? আমার সাথে না মনের সাথে? হু হু করে উঠি আমি নাকি মন? এক বুক মন নিয়ে বাজারে বসব। কিন্তু আমার মনটার রঙ পাশবিক? না নিজের মনকে পাশবিক…! ফিরি, ফের খুঁজি। মনটা ছোবল মারছে, আয় আয়…। মন বলছে, নাহ, কিছু না বলেই মনের মানুষ মনকে, নিজেকে দেখবে বলে…! ও-মন, মন কেমন করে মুষলধারে বাচ্চা বিয়োচ্ছে। না তো! হ্যাঁ তো। ওটা বৃষ্টি নয়। মন।

তোমরা অসম্পূর্ণ। তাই শুধু মনের সরু কার্ণিশ ধরে হাঁটছি আর ভালবাসা ভালবাসা কাশফুল ভালবাসা দুঃখ খাওয়াই। কতদিন দুঃখ ছাড়া পায়েস খাইনি। সুজাতা কই? সুজাতা কোথায় চলে গেছে। কোথায় গেছে মন…

 

রেহানা বীথি-এর একটি কবিতা 

তবুও শান্তি ফিরুক

যুদ্ধটা আর চালিয়ে যেতে চাইছি না
বরং আমরা বিচ্ছিন্ন হই

এসো,  আঙুল ছেড়ে দিই
ব্যাখ্যাহীন সম্পর্কগুলোর

ক্ষতি এবং ক্ষত
কাকে কতটা উন্মুক্ত করেছে
আর,  কে কে অস্ত্রের যোগান দিয়েছে
গোপন থাক সবই

আমরা শুধু বিচ্ছিন্ন হই
আঙুল ছেড়ে দিই
ব্যাখ্যাহীন সম্পর্কগুলোর

 

বৃন্দাবন দাস-এর তিনটি কবিতা 

 সম্পর্ক

রাজা মানে যুদ্ধ ব্যাপারী
প্রজা তার যোগানদার

বিদূষক আর ভাঁড়
তোলপাড় করছে পৃথিবীটা।

 

সখ্য 

‘সখ্য ‘কোন ভুল পাঠক্রম নয়

কী মান্ধাতা কী উত্তর-আধুনিক
কী গ্লোবাল কী ডিজিট্যাল
সবার চাই সবারই নিজস্ব

বেরাদারহীন জগত্-সংসার ভাবনাহীন

 

 

 

একটি টুকলি কবিতা 

আমি কমলা ভট্টাচার্যের নাম জানি
আমি জানি ইংরেজি বলে ‘ভদ্রলোক’
আমি বলতে পারি মধ্যবিত্ত নিশ্চিত সব ভাষাই বলবে
তাদের ‘রুটি’র জন্যে বড্ড প্রয়োজন
যারা রাজভাষা চাইছে — তাদের প্রীতিকে নিশ্চিত মান্য করি

আমার প্রীতি ছড়িয়ে কন্নড় তামিল তেলেগু ওড়িয়া সিন্ধি ডোগরী বোড়ো আরো আরো
আমি আরো বাড়িয়ে নিতে পারি

আমি আরো জানি যেটুকু ‘মাতৃভাষা’
সবটাই আমার পছন্দ পছন্দসই

নাহলেই বড়ো অপ্রীতিকর আমার প্রেম —
প্রেমের ভিতর তরঙ্গ, তরঙ্গের সঙ্গে গোধূলির রঙ
–কে শ্রেষ্ঠ হইচই পড়ে যায়

১২ বছরী সুনীল সরকার ১৬ বছরী কমলা ভট্টাচার্য
গৌণ
রাষ্ট্রীয় পতাকায়

আমার ‘ভাষাপ্রেম’ খাতায় পাতায় লাফাতেই থাকে—

 

বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর একটি কবিতা

পরিশ্রান্ত

বেঁচে থাকার জন্য শুধু রক্ত ঘাম টুকুই অর্জন করেছি
নিরাময় বলে তো কিছু নেই

অভিজাতদের ব্রেকফাস্টের সকালে খাবারের ছয়লাপ
অথচ শ্রমজীবী বাবা আমি, সন্তানের নিমিত্তে
খুঁজে চলি মিথ্যে , সেইসব রুমালি রুটির গন্ধ

বেলা বাড়তেই নেমে আসে, পোষ মানা ময়াল সাপ
প্রতিবেলা পিষতে পিষতে আমাকে করে তোলে
একদলা কমদামি মাংসের পিণ্ড

ঈশ্বরের বাগানে সারাটা দুপুর এঁকে চলি,অলীক ট্রাপিজ
আর কে মানে তত্ত্বকথা? শরীর জুড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে
ভুল শব্দের নামাবলী

অর্জন শিখিনি, দেহাতি পদ্যের জীবনে
কেবল অভাব মাখতে মাখতে, আজও প্রতিবেলা
জপ সাজাই,”আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে”

 

 

হারাধন পাল-এর একটি কবিতা

চুমু

তুমি জানো তো, এই শব্দের দেয়ালে আমি বন্দী
তবু… যদি সত্যি সত্যি চাও,
তাহলে চোখ বুজে অনুভব করো
এখানেই আছি
তোমার নীরব ঠোঁটের কাছে,
একটি নিঃশব্দ স্পর্শের মতো
হয়ত হাওয়ায়, হয়ত তোমার নিঃশ্বাসে…

চুমু দিলাম, তোমার সমস্ত ক্লান্তি মুছে যাক,
তোমার সমস্ত ভালবাসা জেগে উঠুক
নতুন দিনের আলোয়।

 

 

পার্বতী কাশ্যপ-এর একটি কবিতা

হে প্রেম, ফিরে এসো

হে প্রেম, ফিরে এসো
এই নিঃশব্দ রাতের তটিনী পেরিয়ে,
ফিরে এসো আমার চোখের তারায়
যেখানে জ্বলছে অপেক্ষার প্রদীপ।

ফিরে এসো ভোরের কুয়াশার মতো
নরম, স্নিগ্ধ, নির্ভীক,
যেন তোমার স্পর্শেই গলে যায়
আমার সমস্ত অহংকারের বরফ।

হে প্রেম, ফিরে এসো
ভেঙে যাওয়া স্বপ্নগুলির মাঝে,
তাদের জোড়া লাগাতে
তোমার হৃদয়ের আঠা নিয়ে।

ফিরে এসো,
আমি আর কোনও দিন তোমাকে
হারাতে চাই না,
এই শরীর, এই মন, এই নক্ষত্রজোড়া আকাশ
সবই তোমার জন্য খুলে রাখব
চিরকাল।

 

মমতা রায় চৌধুরী-এর একটি  কবিতা

কি লিখি তোমায়

 

আজ ক’দিন থেকেই ভাবছি তোমায় কিছু লিখি
কিন্তু কি লিখি তোমায় ভেবে পাই না
এলোমেলো ভাবনাগুলো খুবলে খুবলে খায়
সামনে আসে প্রথম শ্রেণীতে পড়ার ধারাপাত মুখস্ত করার মত আলপথে হেঁটে যাওয়া আর ফসলের
সবুজ পরশ হাতে মেখে তোমার দিকে চাওয়া।

মনে পড়ে আমাদের প্রথম দিনের প্রথম ঘ্রাণ
নেবার পড়ন্ত বিকেলের ঘাসের বিছানায়
মনে পড়ে সেই চিরকুট যাতে ছিল দোপাটি ফুলের
একগুচ্ছ শুভেচ্ছা আর ভালোবাসার পরশ
তখন তোমার বয়স ১৬ আর আমি ১৪
তখন কতটা ছেলেমানুষ ছিলাম
ভালবাসার গভীরতা বুঝতে পারিনি
তখন শুধু দুজনে হেঁটে যেতাম স্কুল যাওয়ার পথে
আড়চোখে তাকাতাম একটু তোমাকে দেখবো বলে
তুমিও ঠিক ততটাই উদগ্রীব ছিলে তেমনি ভীতুও ছিলে যেমনি ছিলাম আমি
তখন কেউ দেখে ফেলবে কিনা একটা ভয় জড়ানো অনুরাগ কেমন মনের গভীরে উচাটন তৈরি করত
এভাবেই তুমি আমি মিলে স্বপ্নগুলো এঁকেছিলাম দু’চোখে।
আজ হয়তো তুমি অন্য কারোর ,আর আমি –
না, আমার কথা ছেড়েই দিলাম।আজও সেই পড়ন্ত বিকেলের ঘাসের বিছানায় বসে আনমনে শুধু দেখে যাই সেই নীল আকাশ আর সবুজ ঘাসের গন্ধ হৃদিমনে মেখে নিয়ে কেমন শিহরণ বয়ে যায় শিরায় শিরায়।
লিখতে গিয়ে শুধু সেই ভাবনাগুলোই খুবলে খুবলে খায়।

 

শংকর দাশ-এর একটি কবিতা 


দ্রৌপদীর স্বপ্ন

দ্রৌপদী স্বপ্ন দেখে অশ্বত্থামা তার কেশে হাত রাখছে
সে যেন চেনে তাকে বহু জন্ম ধরে
কিন্তু এই জন্মে শিবের মত কৃষ্ণই তার বুকে লেখা

পাঁচজন পুরুষ তাকে ঘিরে রাখে
পাঁচটি আগুন জ্বলতে থাকে রাত্রির ভিতর
তাদের দাহ সে বোঝে না
তাদের বিজয়ের গান সে শোনে না,
শুধু কৃষ্ণের নীল মুখ মনে পড়ে
যখন রাত গভীর হয়
যখন রক্তে দাউ দাউ আগুন জ্বলে

কৃষ্ণ বলে, তুমি তো রাজ্য চেয়েছিলে না দ্রৌপদী,
তুমি চেয়েছিলে শুধু শান্তি। ও- চুপ থাকে।
তাকে কোনওদিন জিজ্ঞাসা করা হয়নি, সে কী চায়…
রাজ্য, প্রেম, প্রতিশোধ, নাকি নদীর ধারে অবিনাশী নীল শীতলতা।

 

 

মুন চক্রবর্তী-এর একটি কবিতা 

আগুন 

আগুণের চেয়েও বেশি পুড়িয়ে দিয়ে যায়
ধর্ষণ শব্দটি,
সম্ভ্রম যেন কাপুরুষের নিজস্ব সম্পদ
মেডিক্যাল থেকে ল কলেজ,
পুড়ছে প্রতিদিন প্রতিটি শহর গ্রাম যৌন নিগ্রহে
আগুণ তো পরিশুদ্ধ করে মৃত্যুর শরীর,
দলবদ্ধ লাঞ্চনা ছুটে আসে সুনামির মত
নারীর শরীর যেনো যৌন মঞ্চ,নাচছে পুং লিঙ্গ
এরচেয়ে বেশি খরচ করার মতো পুং লিঙ্গে কিছু কি আছে?
কিছু পুরুষের শরীরে আত্মা থাকে,আত্মজার চিন্তায়
বিবস্ত্র যখন কন্যা সন্তান, পিতার মৃত্যু ঘন্টা বেজে উঠে,
কেমন মায়ের গর্ভে জন্ম নেয় দূরাচারী পুত্র
অন্যায়ের আগুণে মায়েরাও পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে যায়,
শোক বিহ্বলে সরকারের নাটক মঞ্চ সেজে উঠে
উড়ন্ত ধ্বজায় দোষারোপের চিৎকারে বিদীর্ণ সমাজ
জানতে চায় অজস্র নারীরা, ধর্ষণ কি আনন্দ দেয়?
যুগ বদলছে বদলে গেছে কুসুম গন্ধ ছড়ানো বাগান
বদলায়নি পুং লিঙ্গের নষ্ট করে দেওয়ার নেশা
কিছু মাংস খাবলে খেয়ে পুরুষত্বের পতন সংবাদ
লজ্জায় তখন কোনো ভাই বাবারা পুরুষ হওয়ার
আগুণে পুড়ে ছাই হয়।
যে নারী ধর্ষিত শব্দে সংবাদে শিরোনামে আসে
সেই নারী যে কত পবিত্র হয়ে উঠে প্রতিবাদে
নারীর সর্বশেষ পরিচয় গর্ভধারিনী, চিরসুন্দর,চিরঅম্লান।

 

 

🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস

 

সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।

 

কিশানগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায়

১০.

গিয়াৎসো জানাল সে ডিজাইন করতে পারে না। সে শুধুই চামরায় অক্ষর শিল্পী। গোটা শিলিগুড়িতে অনেক ট্যাটু পার্লার আছে যারা নক্সা বা ডিজাইন ভালো করে করে দেয়। কিন্তু আর কোথাও তেমন অক্ষর ফোটানোর তেমন আর্টিস্ট নেই বলে করে খাচ্ছে। ফেলুদা সমুন্দরের কাছের লোক। ফলে ফেলুদাকে যথেষ্ঠ খাতির করে গিয়াৎসো। সে তার নিজের ঢাউস রেজিস্টার নিয়ে বসে। ফেলুদা পকেট থেকে দেশ্লাইয়ের বাক্সর ভেতরে লেখা সেই ওক্ষর কটি দেখিয়ে বলেছে, এরকম লেখা সে ট্যাটু করেছে কিনা।
এটা খুঁজে বের করা খুবই সহজ। কারন তাদের পার্লারে আফটার কেয়ারের জন্য লোশন, সোপ, হিলিং অয়েন্টমেন্ট দেবার ব্যবস্থা আছে। যারা যে ট্যাটু করায়, তার প্রতিলিপি আর খরিদ্দারের ঠিকানা তো থাকবেই। আজকাল ছবিও থাকে। কোনো খারাপ জায়গায় হয়ত কম দামে খারাপ রং, খারাপ নিডল ব্যবহার করে র‍্যাশট্যাশ বেরিয়ে শরীরের ক্ষত নিয়ে এসে হয়ত এসে বলল, এখান থেকেই করেছে। এরকম ঝুট ঝামেলার হাত থেকে বাঁচতে ফর্ম ফিলাপ করান হয়। সেখানে লেখা থাকে ট্যাটু থেকে ক্যানসারও হতে পারে। সম্মত হয়ে স্বাক্ষর করেই তবে ট্যাটু করাতে পারে।

সমুন্দরের ট্যাটুটা দেখা মাত্র ফেলুদার মনে হয়েছিল এই শব্দ কটি কারো উল্কিতে যেন দেখেছে। কিন্তু কার, কিছুতেই মনে করতে পারছিল না। তাই তো এখানে আসা। রেজিস্টার ঘেঁটে গিয়াৎসো বের করে ফেলেছে। এই তো লেখাটা, ‘তিন তিনে চাপা চু’। চু-র মানে গিয়াৎসো জানে, নদী। ওদের সিকিমে সব নদীই চু। ফলে গিয়াৎসো নদীর বহমানতার ছন্দেই অক্ষরক’টি এঁকেছিল। রেজিস্টার খুলে পেয়ে গিয়ে,সে বলল, “হ্যাঁ এই তো এখন মনে পড়েছে, খুবই বাচ্চা ছেলে । যখন করায় খুব কাঁদছিল। অনেকগুলও নিডল যায় তো । আর কচি চামড়া।”

মনের ভেতর তার নিত্য ঝড় ওঠে যখন দেখে অফিসের বাইরে দাদার চার চাকার বিজনেসও ফুলে-ফেঁপে উঠছে। অফিসের প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনে সে বিএস এফ-এর কাছ থেকে, তারপর সেগুলো অফিসের সাহেবদের জন্য ভাড়া খাটায়। ড্রাইভার সহ মাসে পঁচিশ হাজার এর কন্ট্রাক্ট। খরচ বাদ দিয়ে বারো হাজার হেসে খেলে থাকে। দিলীপ কাজের কথায় বোঁদেদার গায়ের কাছে গেঁষে আসে। মনে মনে বলে, দাও কাজ দাও,কাজ দাও।

বলতে বলতে গিয়াৎসো রেজিস্টার মেলে ধরে ফেলুদার সামনে। আরে ! এ তো মালবাবুর ছেলে !হ্যাঁ এর হাতেই তো আঁকা ছিল। এতক্ষন কিছুতেই মনে পড়েনি। আসলে পাহাড়ের গায়ের লেখার সঙ্গে স্কুলের ছেলের কী সম্পর্ক থাকতে পারে,তা ভাবনাতেও আসেনি। ফেলুদার মুখ চোখে তখন ইউরেকা ইউরেকা একটা ভাব হলেও চিন্তা হচ্ছে তার, কী করে পাহড়ের গায়ের লেখার সাথে উল্কির লেখার মিল থাকতে পারে। তাছাড়া বাংলায় লেখা। ফেলুদা জানে বাংলাকে ট্যাটুইস্ট-রা কেন, প্রায় কেউই ধর্তব্যের মধ্যে আনে না।
বোঁদে দেখেছে ডিটেক্টিভ দীপক চ্যাটার্জির প্রশংসায় পঞ্চমুখ সবাই। থানার ওসি, জমিদার, রাজা মায় সাধারণ পাঠকও। কিন্তু বিপদের ভেতর দিয়ে তো দু’জনকেই যেতে হয়েছে। মানে সঙ্গী রতনলালের সামনে কি মৃত্যুর মতো ভয়াবহ অবস্থা আসেনি! এসেছে। ‘রাতের ছায়া কালো’ তে মুখার্জি লজ-এর ভেতর আগুন দিয়ে মেরে ফেলতে চেয়েছিল ভিলেন ফিল্ম ডিরেক্টর সুশীল ওরফে গুনেন। তখন রতনলাল-এর হাত-পা বাঁধা। একেবারে জ্যান্ত দাহ হতে বসেছিল।
বোঁদে ঠিক করে নিল, যা হবার হবে। এই কেসটা ও নিজেই পঙ্কজ থাপাকে নিয়ে সেটল করে দেবে। ফেলুদা তাতে রেগে যাবে বলে তো মনে হয় না। আরে বাবা ফেলুদার হাত থেকে তো সে কাজটা কেড়ে নেয়নি! ফেলুদা সলভ করে ফেলতে পারছে না যখন, তখনই সে সমান্তরাল একটা অনুসন্ধান জারি রেখেছে। দেখাই যাক না। কিন্তু
বিপদের গন্ধ পেয়েছে বোঁদে। মানে বনবিহারীর ছবি কী করে কালিম্পং-এর রিসর্টে। কী করে বনবিহারী কর্মা ম্যাডামের স্বামী হয়ে যায় কিশানগঞ্জ ছেড়ে কালিম্পং-এ এসে তা একটু দেখতে হচ্ছে।
ধরমশালা রোডে সুশীল সিং এর ভাই এর মোবাইলের দোকানের সামনে চলে এসেছে বোঁদে। কিছু ভেবে আসে নি। আনমনে এসেছে।
সুশীল সিং কিশানগঞ্জে টেলিফোনের অফিসের ক্যাশিয়ার। তার হাতে টাকা থাকে, মানে অনেক প্রতিপত্তি। সে ভাই দিলীপকে পার্ট টাইম কাজে ঢুকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু পার্ট টাইম কাজে আর কত টাকা! সংসার চলে না। টেলিফোন দপ্তর থেকে সিম নিয়ে এই গুমটি ঘরের মত দোকানে বসে বেচে। কিছু চাইনিজ মোবাইল সেট-ও পাঁজিপাড়া থেকে এনে দোকানে রেখেছে। তাছাড়া আছে মোবাইলের নানা ডিজাইনের খাপ। বিক্রি খারাপ হয় না। ছোটোখাটো রিপেয়ারিং এর কাজও শিখে নিয়েছে বি এস এন এল-এর টেকনিশিয়ানদের সাথে কাজ করতে করতে। সরকারি অফিসের কর্মচারীরা বাইরের লোককে শিখিয়ে নিয়েছে, তাদের অনুপস্থিতিতে কাজ চালিয়ে দেবার জন্য। এই তো এক্সচেঞ্জে অধিকাংশ রাতের ডিউটি বিন্ধেশ্বর শর্মার হয়ে দিয়ে দেয় এই দিলীপ সিং। বিন্ধেশ্বর বি এস এন এল-এর ইউনিয়নের নেতা। সে আশ্বাস দিয়েছে, দিলীপকে রেগুলার মজদুর হিসেবে ঢুকিয়ে দেবার একটা ব্যাবস্থা করে দেবে। কিন্তু সেসব আগেকার দিনে হত। এখন টেলিকম সেক্টরে এই সরকারি ক্ষেত্রটির অবস্থা খুবই নাজুক। স্থানীয় অফিসার টফিসারদের কম্ম নয় অনিয়মিত কর্মীদের নিয়মিত করার। বিন্ধ্বেশ্বর রা মাঝে মাঝে গেট মিটিংএ অবশ্য এই স্থায়ীকরণের ইস্যু রেখে হাওয়া গরম রাখে। এদের সব হাতে রাখে।
বোঁদে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, “ শুন দিলীপ, অ্যায়সা লাগতা হ্যায় কি পানী বরসেগা ।”
দিলীপ বুঝতে পারে বোঁদেদার কোনো কাজের কথা আছে। সে বেশ অনেকদিন ধরে বোঁদেদাকে চেনে। বোঁদেদার হয়ে অনেক কাজে গায়ে খেটে দেয়। ছোটো মোটো কাজ দিয়ে দেয় দিলীপকে। যেমন কোনো স্কুলে হয়ত খাতা, পেন্সিল, অ্যাটেন্ডান্স রেজিটার, গ্লোব, ডাস্টার মানে সংবৎসরের মালপত্র সাপ্লাই করতে হবে। হাজার কুড়ির কাজ। তো সেটা দিলীপকে ছেড়ে দেয় বোঁদে। বিনিময়ে মাঝে মধ্যে ফ্রিতেও খেটে দেয় দিলীপ।

দিলীপ বলল, “চিপচিপাহট হ্যায়, হ্যায় না?”
দিলীপ উল্টো কথা বলবেই। তাতে খুব দ্রুত বোঁদেদার মনের কথা বেরিয়ে পড়বে। সে বোঁদেদার পয়সাতেই এখন চা-বিস্কুট খাচ্ছে। বোঁদে দা ভালো হিন্দি বলতে পারে না। কিন্তু দিলীপের কাছে এলে হিন্দী বলবেই বলবে। শেখার ইচ্ছে। দিলীপও চালায়। চায়ের গ্লাস দোকানীর চায়ের শানের টেবলের উপর ঠন করে নামিয়ে রেখে বোঁদেদার মুখের উপর দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বলে, “ তুমহেঁ মওসম ক্যায়সা লগ্‌ রহা হ্যায়, বোঁদে দাদা?”
“শায়দ জলদী হী বাদল ছঁট জাঁয়।”
“নেহি। হোগা, শায়দ জলদী হী আকাশ সাফ হো জায়।” দিলীপ স্বরে তেমন ঝাঁজ না দিয়ে আরো বলল,
“বোঁদেদা, তোমার টুটাফাটা হিন্দি ছোড়ো। তুমি জানো আমি ভালো বাংলা বুঝি, বলিও। কিশানগঞ্জে আমার কম দিন হয়নি। দুটো ভাষাই এখানে চালাতে হয়। এখন বাংলায় বলো,অনেক হিন্দি প্রাক্‌টিস করেছ।”
বোঁদে খানিকটা অপ্রতিভ হয়। সে হ্য্যঁ না হ্যাঁ না করে কাজের কথা পাড়ে। “তোকে একটা কাজ করে দিতে হবে। আর হ্যাঁ শোন, লাইনপাড়ায় ঘোষ বাড়িতে বিয়ে লেগেছে। তুই প্যাণ্ডেলের দায়িত্বটা নিয়েনে।”
দিলীপ বিহারী। কোনো কাজে তার না নেই। সে দাঁড়াতে চায় জীবনে। গ্রাজুয়েট হয়েও সে চাকরী পায়নি। তার দাদা ম্যাট্রিক পাশ না করেও বড় ছেলে বলে বাবা মারা যাওয়ায় কম্প্যাশনেট গ্রাউন্ডে টেলিফোনের সরকারি চাকরিটা পেয়ে গেছে। মনের ভেতর তার নিত্য ঝড় ওঠে যখন দেখে অফিসের বাইরে দাদার চার চাকার বিজনেসও ফুলে-ফেঁপে উঠছে। অফিসের প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনে সে বিএস এফ-এর কাছ থেকে, তারপর সেগুলো অফিসের সাহেবদের জন্য ভাড়া খাটায়। ড্রাইভার সহ মাসে পঁচিশ হাজার এর কন্ট্রাক্ট। খরচ বাদ দিয়ে বারো হাজার হেসে খেলে থাকে।
দিলীপ কাজের কথায় বোঁদেদার গায়ের কাছে গেঁষে আসে। মনে মনে বলে, দাও কাজ দাও, কাজ দাও। একটু ভালো করে বাঁচি। দু’দুটো বাচ্চা। স্কুলে ভর্তি করার সময় হয়েছে। এখন টাকা না দিলে কোথাও চান্স নেই। মানে ফ্রিতে কোনো শিক্ষা নেই। কিন্তু মাসে ছয় হাজার টেলিফোন অফিস থেকে আর এই দোকান থেকে চার-পাঁচ হাজার। এতে চলে! এদিক ওদিক যা কাজ তা এই বোঁদে দা-ই দেয়। এমাসে কোনো কাজ হয়নি। 🍁(চলবে) 

 

 

🍁গল্প

 

দিনশেষে তারা ফিরে আসে একে অপরের কাছে।
তারা প্রেমিক না, তবু একটা জায়গা আছে, যেখানে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না।
একজন বলে, আজ কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরেনি।
অন্যজন বলে, আজ কেউ আমাকে ছাড়তে চায়নি।

দ্বৈত দ

সানি সরকার

লকাতা। শহরটা যেন একটা অদৃশ্য ছুটে চলা ট্রেন। দিন নেই, রাত নেই, শুধু ছুটে চলা। এই শহরেরই কর্পোরেট অলিন্দে, বহুতল অফিস ভবনের কাচঘেরা কেবিনে নিজেদের মতো করে জীবন কাটায় অন্বেষা আর রুদ্র।
অন্বেষা ৩২, বিজ্ঞাপনী সংস্থার ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, অথচ তার ব্যক্তিগত জীবন যেন অদৃশ্য ধোঁয়ার মতো, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। দিনের আলোয় সে কঠোর, সংযত, দায়িত্বশীল। রাতের কলকাতায়, ফাইভ স্টার হোটেলের রেস্তরাঁয়, কিংবা কোনো পার্টির হালকা আলোয়, সে একেবারে আলাদা। তার সম্পর্কে একটানা থাকা যায় না। কারণ, সে একটানা কারও থাকতে চায় না। সম্পর্ক তার কাছে ‘অবসেশন’ নয়, একটা ‘চয়েস’। তপন, এক প্রোডাকশন হেড, এখন অন্বেষার সঙ্গে প্রায় তিন মাস ধরে ঘনিষ্ঠ। তার আগে ছিল রাহুল আইটি ম্যানেজার। তার আগে শুভ্র, একজন ব্যাঙ্কর। তাদের কেউই কোনও খারাপ স্মৃতি নয়, কেবল অতিক্রান্ত সময়ের নাম।

না কোনও প্রতিশ্রুতি, না কোনও অভিযোগ। শুধু বেঁচে থাকা, একটু একটু করে। আসলে ভালবাসা যেন অগোছালো কিন্তু অসীম। সীমাহীন শরীর আর সীমিত সময়ের মাঝখানে তারা গড়ে নেয় এক অদ্ভুত আত্মিক বোঝাপড়া, যার নাম হয়ত সম্পর্ক নয়, যা হয়ত একধরনের চরম সত্যি!

অন্যদিকে রুদ্র ৩৬, এক বড়ো কনসালটেন্সি ফার্মের বিজনেস হেড। অফিসে তার ডেস্কে সারাক্ষণ ফোন বেজে চলে। প্রেজেন্টেশন, ক্লায়েন্ট, ইনভেস্টর একটার পর একটা কাজ। কিন্তু তার রাতগুলো আলাদা, নিঃশব্দে লেখা হয় তার বহু সম্পর্কের গল্প। এখন একসঙ্গে ভিন্ন সময় অন্তত তিনজন নারীর সময় কাটায়।
প্রথমজন দ্যুতি, সদ্য জয়েন করা মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ। চোখে এখনও স্বপ্নের আলো।
দ্বিতীয়জন সুনায়না, এক বিবাহিত মহিলা, একা থাকে, নিঃসঙ্গতা ভাগ করে নেয় রুদ্রর সঙ্গে।
তৃতীয়জন, অন্বেষা।
হ্যাঁ, রুদ্র আর অন্বেষা একে অপরের প্রেমিক নয়, ভালোবাসার দাবিদার নয়, আবার একে অপরকে ছাড়াও বাঁচতেও শেখা নেই। কিন্তু তারা একে অপরকে চায়, কিন্তু সম্পর্কের সংজ্ঞা ছাড়াই।
–তুই জানিস, আমি সুনায়নাকে আজ সকালেও দেখলাম। ক্লান্ত, ঘুমহীন, তবু আমায় থ্যাঙ্ক ইউ বলল।
রুদ্র বলল এক সন্ধ্যায়, দক্ষিণ কলকাতার এক ছাদবাগানে ওয়াইন চুমুক দিতে দিতে।
অন্বেষা হেসে বলেছিল, তুই তো বড্ড বেশি কেয়ারিং! আমি সকালে তপনের সঙ্গে ছিলাম। সে আমাকে বলতে পারল না যে ভালবাসে, শুধু জড়িয়ে ধরল। তাতে আমার আর কিছু জানার ছিল না।
–তুই কী খুঁজিস, অন্বেষা?
–সেইটুকু মুহূর্ত যেখানে আমি নিজেকে খুঁজে পাই। কেউ যদি আমার শরীর চায়, আমি তাকে দিই, শর্তহীনভাবে। কিন্তু আমার মন? সে তো আমার নিজের, আর কারও নয়।
রুদ্র চুপ করে যায়। সে-ও জানে, তার এই জীবনের দৌড় থামানোর মানে ভেঙে পড়া। প্রতিটা সম্পর্কই তাকে একটু একটু করে জীবিত রাখে। এক-একটি টান। কিসের? ও-জানে না!
কিন্তু তারা দু’জনেই জানে, সমাজ তাদের বোঝে না। সহকর্মীরা ফিসফাস করে, কেউ বলে, স্লাট, কেউ বলে প্লেবয়। কিন্তু এদের কোনও শব্দই ছুঁতে পারে না ওদের মুঠোয় ধরা সেই অনুচ্চারিত স্বাধীনতাকে।

এই সেদিন অন্বেষা ঝাঁঝালভেবে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রুদ্রকে বলল,
–তুই জানিস? ভালবাসা আমার কাছে মুক্তি নয়। দায়িত্ব। আমি কাউকে ভালবেসে ফেললে ভয় পাই।
রুদ্র ধীরে বলল, আমি কাউকে ভাল না বেসে ফেললে শূন্যতা দেখতে পাই।

এই শহরের অজস্র গলি, অফিসের করিডোর, কফি শপের কোণায় তাদের শরীর জুড়ে কত সম্পর্ক, কত কথাবার্তা, কত ছুঁয়ে যাওয়া, কিন্তু তাদের মনে কি কেউ দাগ কাটে?
একদিন রুদ্র হঠাৎ সুনায়নার কাছে গিয়ে বলে, আমাদের এসব এবার বন্ধ করে দেওয়া উচিৎ। আমি আর পারছি না।
সুনায়না শুধু মাথা নেড়ে বলে,
–জানতাম, এটাই হবে। তুমি এক জায়গায় থাক না, রুদ্র।
একই দিনে, অন্বেষা তপনকে বলে, চল, একটা শেষ চুমু নিই, তারপরে আমি হারিয়ে যাব।
তপন জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবে?
–নিজের মধ্যে। যেখানে তুমি ঢুকতে পারবে না। বলে অন্বেষা।

দিনশেষে তারা ফিরে আসে একে অপরের কাছে।
তারা প্রেমিক না, তবু একটা জায়গা আছে, যেখানে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না।
একজন বলে, আজ কেউ আমাকে জড়িয়ে ধরেনি।
অন্যজন বলে, আজ কেউ আমাকে ছাড়তে চায়নি।

এই শহর, এই ছুটে চলা, এই বহুগামিতা, সবটাই যেন তাদের কাছে জীবনের আলাদা অভিব্যক্তি। না কোনও প্রতিশ্রুতি, না কোনও অভিযোগ। শুধু বেঁচে থাকা, একটু একটু করে। আসলে ভালবাসা যেন অগোছালো কিন্তু অসীম। সীমাহীন শরীর আর সীমিত সময়ের মাঝখানে তারা গড়ে নেয় এক অদ্ভুত আত্মিক বোঝাপড়া, যার নাম হয়ত সম্পর্ক নয়, যা হয়ত একধরনের চরম সত্যি!

এই শহরে, অন্বেষা আর রুদ্র একে অপরের রাত্রির ঠিকানা, দিনের ছায়া।
তারা একে অপরকে বাঁচায়, কিন্তু বেঁধে রাখে না।
কারণ, ভালবাসা এখানে অধিকার নয়, স্বাধীনতার অন্য নাম।🍁

 

 

অমিত পাল-এর গুচ্ছ কণাগদ্য

আকস্মিক বিবর্তন

সে আর বাংলার চোলাইমদ খাই না৷ একেবারেই বন্ধ৷ পূজা পার্বণে হয়তো একটু লুকাচুরি চলে৷ ব্যস এই পর্যন্তই৷

সে এখন বিদ্যুতের মিস্ত্রী৷ পোলের কাজ, ইলেকট্রিক অফিসের যন্ত্রপাতির খুঁটিনাটী কাজ সে করে থাকে৷

আগে অবশ্য একটা সাইকেল সারাই-এর দোকান খুলেছিল এবং টুকিটাকি ইলেকট্রিক কাজ করে থাকত৷ এখন সে কারুর সাহায্যে এই ইলেকট্রিক অফিসের কাজটি পেয়েছে৷

তার আগের কর্মজীবন ছিল রাত্রে বাংলা খেয়ে মাতলামি করা৷ সেই দৃশ্য দেখেই গ্রামবাসীরা হতবাক৷

দিনের বেলায় ভাত রাঁধা নিয়ে বউ-এর সাথে ঝামেলা, লোকসম্মুখে বউ-এর সাথে মারপিট, নানা দ্বন্দ্ব বাঁধাত সে৷

কিন্তু এখন কয়েক বছর হল বাইরে থেকে সে সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে গেছে, তবে জানিনা ভেতর থেকে কতটা…

 


আমার হৃদয়ের মতো

এখন গ্রীষ্মকাল৷ দুপুর রৌদ্রতাপের সাথে আমি ছলনা করি মাঝে মাঝে৷ দাঁড়িয়ে থাকি পাশের বাড়ির প্রাচীরে গায়ে বেড়ে ওঠা গন্ধরাজ ফুলের ঝোপের ছায়ায়৷ সে আদর করে ডাকে আমায়৷ আমি চোখ মেলে ধরি৷

প্রত্যক্ষ করি বিদ্যুতের তার গুলিকে৷ এক ল্যাম্পপোষ্ট থেকে অন্য ল্যাম্পপোষ্টে যাওয়ার জন্য তাদেরকে ডাল-পাতা গুলি আবেগী চাদর দিয়ে স্পর্শ করে রেখেছে৷

সে হেসে ওঠে আমায় দেখে৷ কিন্তু আমি ভাবি ঝড়ের কথা৷ কতকটা নিষ্ঠুরতার সামিল৷ হয়ত কোনোদিন ঝড় যাবে সব ফুল, ডালপালা!

এর কাণ্ড বড়ই কোমল৷ ঠিক আমার হৃদয়ের সামঞ্জস্যের সামিল৷ কোনোদিন হয়ত আমার হৃদয়ের মতো ভেঙে পড়বে সেটি…

 

অন্তরীক্ষের চাঞ্চল্যতা

আকাশের নীল আবরণে হঠাত’ই দেখা মেলে সাদা সাদা মেঘের ভেলা৷ যেন কুমীরের পেটের আকৃতি নিয়ে গগন সমুদ্র জয় করছে!

ল্যাজাটার পিছনে টিমটিমে তারাটি তার পায়ুপথ চেনায়৷ সামনের মুড়োটার খোঁজ করলাম পেলাম না৷

রাত তখনো গভীর নয়৷ দাপট ভরা দেহে সেই সর্বেসর্বা৷ আকস্মিক ভাবেই আমার দেহের শিরায় শিরায় শিহরণ খেলে গেল৷

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঐ একলা চাঁদটি মেকি পূর্ণিমায় খিল খিল করে হাসছে…

 

ব্রেকাপের পর

সেই কতক কাল দেখিনি তোমাই৷ আমাদের ব্রেকাপের পর তোমার বিয়ে হয়ে যাওয়ার কথা শুনেছি৷

তারপর একদিন কলেজ যাওয়ার পথে আকস্মিক ভাবে তোমার ডাক শুনি– অমিত৷ অমিত৷

সিঁথিতে সিন্দুর, লাল টুকটুকে শাড়িতে তোমায় বেশ মানিয়েছিল৷ মনে পড়ে তুমি আমার শুভাশুভের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলে তোমাদের ভাড়া করা মারুতী গাড়ীর ভিতর থেকে৷

আমি স্তব্ধ ছিলাম৷ কোনো উত্তর আমি খুঁজে পাইনি৷ ফিরে গেলাম আবার কলেজ পথে…

 

ফিরে যেতে চাই

আমার গ্রামের ডোমপাড়ার রক্তিম বিকেলের বিভীষিকা আমার ভালো লাগে না৷ তবে ভালো লাগে নিশ্চুপ রাত্রির উদভ্রান্ত নিশাচরের অপটু আর্তনাদ৷

তবে কিছু কিছু দৃশ্য আছে যা গ্রাম্য মাঠগুলির প্রান্তরে অপেক্ষা করে থাকে আমার জন্য৷

অস্তমিত সূর্য্যের রক্তিম আভা মেখে যখন দাঁড়িয়ে থাকে ঐ দূরের তেঁতুল গাছ কিংবা ঝুড়ি নামা বট গাছ, আমি তখন বক পাখিদের সাদা সফেন মাখা ডানার ঢেউ দেখি, দেখি শামকলের ঘরে ফেরার প্রস্তুতি৷ চোখ যেতেই জমির জলে দেখতে পাই সূর্য্যের উরু৷ নয়নজুলির জলে শীত চাদর মেলে আছে বেনা ও ঘাসের ঝোপ৷

আমি কিছুটা মূহূর্ত মাঠে মাঠে কাটাই৷ বীজ পোঁতা জমির ছবি তুলি৷ আমি আকস্মিক ভাবেই আপ্লুত হয়ে যাই৷ সন্ধ্যা নেমে আসে গাঢ় ভাবে৷ আবার চোখ যাই আকাশে৷ সকালের নীলাভরণ আকাশটা কোথায় হারিয়ে গেছে৷ একটি সন্ধ্যা তারা উঁকি দিচ্ছে ছেড়া মেঘের অন্তরালে৷

ভিন্ন ভিন্ন পাখিদের বাড়ি ফেরার পালা আর উদভ্রান্ত কলরব আমার মা-এর কথা মনে পড়াই৷ আমি ফিরে যাই আমার বাড়ির পানে, আমার স্নেহময়ী জননীর আদর লাভের আশায়…

 

তুই সেজেছিস আজ

সাদা চন্দ্রমল্লিকার গোলাপী আভায় মেখে নিয়েছিলি তুই চন্দন অঙ্গুরী৷ কড়ির মতো সাদা মুখ চেয়ে নেমে আসে আমার লজ্জার বাহার৷

আমি ধৈর্য্য হারায়৷ মেখে-নি রক্তজবার অমূল ব্যর্থতা৷ তুই সমাহত চাপ গাঁধায়৷ আমি প্রথম বোশেখের বিবর্ণ পলাশে চোখ রাখি৷

বেলা বইয়ে চলে৷ উত্তপ্তের অবেলা৷ হয়ত আজ কেউ পিদিম জ্বেলেছে আকাশে৷ নরম কমলা আভা বিচ্ছুরিত৷ আমি শুধুই হেসে উঠি আবেগ গত…

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার,  কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার, অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক 

 

 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী কোনও সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন