Sasraya News, Sunday’s Literature Special | 10th August 2025, Issue 77, Sunday | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ১০ আগস্ট ২০২৫, সংখ্যা ৭৭। রবিবার

SHARE:

সম্পাদকীয়

মরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেখছি যে এই সময়ের সাহিত্য দ্রুত গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে, এবং তার মধ্যে কল্প বিজ্ঞান, সমাজ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, ও বিশ্ব রাজনীতির প্রভাব স্পষ্ট। আধুনিক সাহিত্য বিভিন্ন মাধ্যম এবং ধারায় বিকশিত হচ্ছে, যেমন উপন্যাস, কবিতা, গল্প, নাটক এবং এমনকি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা প্রতিটি উন্নত শীল দেশে বিশেষ ভূমিকা রাখছে বলে আমার মনে হয়।

বলা যেতেই পারে যে, এই সময়ের সাহিত্য বিশ্বব্যাপী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলোকে তুলে ধরছে, যেমন প্রযুক্তির প্রভাব, মানুষিক স্বাস্থ্য, লিঙ্গবৈচিত্র্য, এবং পরিবেশগত সংকট। প্রতিটি লেখক তাদের কাজের মাধ্যমে নানা ধরনের আধুনিক সমস্যা, অসন্তোষ, এবং মানবিক সম্পর্কের জটিলতাকে তুলে ধরছেন।

এছাড়া, আধুনিক প্রযুক্তি যেমন সোশ্যাল মিডিয়া, ব্লগ, ও ডিজিটাল পত্রিকাগুলি লেখকদেরকে আরও বেশি স্বাধীনতা ও সম্ভাবনা প্রদান করেছে, যা আরও তরুণ পাঠকদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করেছে।

বাংলাদেশে, সাহিত্যের বিভিন্ন ধারা, যেমন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্য, ঔপন্যাসিক সাহিত্য, এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়বস্তুর উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

ভারতীয় সাহিত্যের গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী একথা অস্বীকার করতে পারবে না কোনও দেশ। আর এর মূল কারণই বাংলা সাহিত্য। রবীন্দ্র যুগের পরবর্তী সময়ে সাহিত্যের প্রসার ঘটলেও সাহিত্যের প্রতি প্রেমের সম্পর্ক বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে। ফলে প্রতিভাশীল অনেক লেখকই তাঁর যোগ্য সম্মান এমনকি মর্যাদা পাইনি বা পাইওনা।আর আগামীতেও পাবে বলে আমার মনে হয়না। তার প্রধান কারণই হল রাজনীতি। এবং আমিত্মের ফলনে এতটাই আসক্ত যে প্রতিভার খোঁজ নয় বরং আসক্ত। কবিতা গল্প উপন্যাস প্রবন্ধ ভ্রমণ সমস্ত ধারার লেখায় সামাজিক রাজনৈতিক জনৈক নীতি এবং কল্প-বিজ্ঞান বিভিন্ন বিষয় আলোচনা সাহিত্যে উঠে আসছে বলেই ধারণা।

সর্বোপরি বলা যেতেই পারে যে, এই সময়ের সাহিত্য একটি সংবেদনশীল, বহুমুখী এবং প্রযুক্তিগতভাবে জটিল যুগের প্রতিফলন। 🍁

 

 

🍂মহামিলনের থা

 

আত্যন্তিক ভক্তিযোগ…

সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ 

যার দ্বারা ভক্ত ত্রিগুণকে অতিক্রম ক’রে মদ্ভাব প্রাপ্ত হয়। নিত্য হিংসাহীন ক্রিয়াযোগ- আমার বিগ্রহ দর্শন, স্পর্শন, পূজা, স্তুতি, অভিনন্দন, সকল ভূতে আমার ভাবনা। ধৈর্য্য সহকারে লোকসঙ্গ ত্যাগ, মহদ্ ব্যক্তিগণকে সম্মান, দীনব্যক্তিগণকে অনুকম্পা এবং আত্মতুল্যগনের সহিত মিত্রতা, যম-নিয়ম আধ্যাত্মিক শাস্ত্রসকল পুনঃ পুন শ্রবণ, আমার নাম সঙ্কীর্ত্তন, সরলতা, সাধুগণের সঙ্গ, অহঙ্কারশূন্যতা, আমার ধর্ম্ম অনুষ্ঠানকারী পুরুষের চিত্ত আমার গুণ শ্রবণ করবামাত্রই সত্বর যেমন বায়ু পুষ্পাদি হ’তে গন্ধকে নাসার কাছে নিয়ে যায়, তদ্রূপ যোগরত চিত্ত আমাতে সন্নিবিষ্ট হয়, সর্ব্বভূতে আমি অবস্থিত আপনার ও পরের অল্পমাত্র ভেদ করা কর্ত্তব্য নয়।

শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারাম দাস ওঙ্কারনাথ দেব

যে আপনার এবং অপরের ঈষদ্ ভেদ করে সেই ভিন্নদর্শীর মৃত্যুরূপী আমি ভীতি প্রদান করি। এইজন্য সর্ব্বভূতে অবস্থিত আমাকে দান, মান, মিত্রতা, সপ্রেম দৃষ্টির দ্বারা পূজা ক’রবে। মনের দ্বারা এই ভূতসমূহকে সম্মান করো তো অংশরূপে জীবরূপে ভগবান্ ইহাতে প্রবিষ্ট- এইভাবে মনের দ্বারা প্রণাম ক’রবে। আমি তোমায় ভক্তিযোগ এবং যোগ ব’ললাম।
পুরুষ এ দু’টির যেকোনটির দ্বারা পরম পুরুষকে লাভ করে। আমি এইভাবে মাতা দেবাহুতিকে আমার ধর্ম্ম উপদেশ ক’রেছিলাম।
ধর্ম্ম সংস্থাপনের জন্যই আমি দেহ ধারণ করি ।

🍁ঋণ : শ্রীওঙ্কারনাথ-রচনাবলী | ব্রজনাথ-গাথা ★ শ্রীশ্রীঠাকুর সীতারামদাস ওঙ্কারনাথ দেব।

 

 

 

🍂প্রচ্ছথা | দু

 

দ্বীপ জ্বেলে যাইসুচিত্রা সেন

উদ্বোধনের দিন, সুচিত্রা সেন একদম ঠিক সময়ে পৌঁছান ক্লিনিকে। মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান রায় নিজে পাশে থেকে ফিতে কাটান মহানায়িকার হাত দিয়ে। সেদিন ক্লিনিক চত্বরে বহু অনুরাগী মহানায়িকাকে এক ঝলক দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর এই ‘রিয়েল লাইফ অ্যাপিয়ারেন্স’ ছিল আপামর জনতার কাছে ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

রাখী নাথ কর্মকার

ক্ষ পরিচালক অসিত সেনের পরিচালনায় ১৯৫৯ সালে নির্মিত হয়েছিল “দ্বীপ জ্বেলে যাই”। কিংবদন্তি নায়িকা, বাঙালির মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের কালোত্তীর্ণ চলচ্চিত্রগুলির কথা ভাবলেই যে কয়েকটি চলচ্চিত্রের কথা আমার মনে পড়ে… যেগুলি আজও মনের মণিকোটরে অক্ষয় হয়ে রয়ে গিয়েছে, সেগুলির মধ্যে অন্যতম “দ্বীপ জ্বেলে যাই”। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক মাইলফলক এই ছবিটি আজও তার অদম্য আবেদন নিয়ে বাঙালির মন ও মননজুড়ে ছেয়ে রয়েছে। মনস্তত্ত্ব, আবেগ ও মানবিক সম্পর্কের এক সূক্ষ্ম, গভীর এবং হৃদয়স্পর্শী চিত্র তুলে ধরে এই ছবিটি। ছবির মূল কাহিনী আবর্তিত হয় এক মানসিক হাসপাতালে কর্মরত নার্স রাধার (সুচিত্রা সেন) জীবন ও মানসিক দ্বন্দ্বকে ঘিরে।

দ্বীপ জ্বেলে যাই” বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি, আর সুচিত্রা সেন এখানে এক অভিনয়-সম্রাজ্ঞী। তাঁর আবেগ-মিশ্রিত, সংযত এবং যন্ত্রণাপূর্ণ অভিনয় দর্শকের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে; এখানেই তাঁর সত্যিকারের সাফল্য। তাঁকে ছাড়া রাধার চরিত্রে বোধহয় আর কাউকে ভাবা যেত না, ভাবা সম্ভবও নয়।

সুচিত্রা সেনের অভিনীত চরিত্র ‘রাধা’ একজন সাইকিয়াট্রিক নার্স, যার কাজ মানসিকভাবে ভেঙে পড়া রোগীদের সুস্থ করার পথে সহানুভূতির সঙ্গে পাশে থাকা। চিকিৎসার এক বিশেষ পদ্ধতি অনুযায়ী, রাধাকে প্রায়ই রোগীদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়, যাতে তারা তাঁর ভালবাসা ও সহানুভূতির স্পর্শে বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় স্থাপন করতে পারে, সুস্থ হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু এই পদ্ধতিটি যতটা কার্যকর, ততটাই মানসিকভাবে বিধ্বংসী নার্স রাধার জন্য। তিনি প্রতিটি রোগীর জীবনে এক ‘আলো’র প্রতীক হয়ে ওঠেন, অথচ তার নিজের জীবনে তিলে তিলে গভীর এক নিঃসঙ্গতা ও মানসিক ক্ষয় জমতে থাকে।

সুচিত্রা সেন। ছবি : সংগৃহীত

সুচিত্রা সেন এই জটিল চরিত্রটিকে যেভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন, তা সত্যিই বিস্ময়কর। তার মুখের অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা, স্বরগত ওঠানামা এবং সংযত অভিনয় চরিত্রটিকে এক অনন্য মাত্রা দিয়েছে। বিশেষ করে সেই দৃশ্যগুলো, যেখানে রাধা নিজের আবেগকে চেপে রেখে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালন করেন— সেখানে সুচিত্রার অভিনয় এতটাই গভীর ও বাস্তব, যে দর্শককে স্তব্ধ করে দেয়।

ছবিটি মূলত আধুনিক সমাজে আবেগ, ভালোবাসা, দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের দ্বন্দ্বকে উপস্থাপন করে। মানসিক রোগীদের পাশে থেকে তাদের মনোজগতে প্রবেশ করতে গিয়ে রাধা নিজেই নিজের গভীরে এক আত্মদহন ভোগ করেন। তিনি রোগীদের সঙ্গে অভিনয় করতে করতে…তাদের সুস্থ করার কাজে নিজেকে বিলিয়ে দিতে দিতে একসময় নিজেও ভেঙে পড়েন।

এই দ্বৈত বাস্তবতা— একজন নার্সের পেশাগত সাফল্যের পেছনে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও কষ্ট— ছবিটিকে এক গভীর দার্শনিক রূপ দিয়েছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সুচিত্রা সেনের রাধা চরিত্রটি শুধুমাত্র একটি নার্স হিসেবেই নয়, বরং এক আত্মত্যাগী মানবিক চরিত্র হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। বাংলা চলচ্চিত্রে সুচিত্রা সেন বরাবরই এক কিংবদন্তি। তবে “দ্বীপ জ্বেলে যাই” ছবিতে তিনি তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে প্রভাবশালী পারফরম্যান্সগুলোর একটি দিয়েছেন। তাঁর অভিনয়ে ছিল সংযম, গভীরতা, আর একধরনের মর্মস্প র্শী ক্লান্তি যা চরিত্রটিকে বাস্তব করে তোলে। রাধার চরিত্রে তিনি কেবল অভিনয় করেননি, তিনি যেন চরিত্রটিকে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।

উদ্বোধনের দিন, সুচিত্রা সেন একদম ঠিক সময়ে পৌঁছান ক্লিনিকে। মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান রায় নিজে পাশে থেকে ফিতে কাটান মহানায়িকার হাত দিয়ে। সেদিন ক্লিনিক চত্বরে বহু অনুরাগী মহানায়িকাকে এক ঝলক দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর এই ‘রিয়েল লাইফ অ্যাপিয়ারেন্স’ ছিল আপামর জনতার কাছে ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

“দ্বীপ জ্বেলে যাই” এক অনন্য শৈল্পিক কীর্তি, যা কিন্তু আজও সমান প্রাসঙ্গিক ও হৃদয়গ্রাহী। সুচিত্রা সেনের অনবদ্য অভিনয় এই ছবিকে কালজয়ী করে তুলেছে। রাধার নিঃশব্দ আত্মত্যাগ ও সুচিত্রার সংবেদনশীল অভিনয় আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কেমন অকাতরে একজন শিল্পী একটি চরিত্রকে অমর করে তুলতে পারেন। এটি একটি নারীকেন্দ্রিক ছবি, যা প্রেম, দুঃখ, চিকিৎসা, পেশা ও আবেগের সঙ্কটে বন্দী— এই প্রেক্ষাপট ছবিটিকে চিরকালীন করে তুলেছে। “দ্বীপ জ্বেলে যাই” বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি, আর সুচিত্রা সেন এখানে এক অভিনয়-সম্রাজ্ঞী। তাঁর আবেগ-মিশ্রিত, সংযত এবং যন্ত্রণাপূর্ণ অভিনয় দর্শকের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক গড়ে তোলে; এখানেই তাঁর সত্যিকারের সাফল্য। তাঁকে ছাড়া রাধার চরিত্রে বোধহয় আর কাউকে ভাবা যেত না, ভাবা সম্ভবও নয়।

তিনি যেন সত্যিই— এক দীপ্তিশীল প্রদীপ, যা আজও আলো জ্বালিয়ে চলেছেন।🍁

 

 

🍁প্রচ্ছদ কথা | দুই 

 

রুপালি পর্দার চিরকুমারী: সুচিত্রা সেনের জীবন, রহস্য আর অন্তরাল

উদ্বোধনের দিন, সুচিত্রা সেন একদম ঠিক সময়ে পৌঁছান ক্লিনিকে। মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান রায় নিজে পাশে থেকে ফিতে কাটান মহানায়িকার হাত দিয়ে। সেদিন ক্লিনিক চত্বরে বহু অনুরাগী মহানায়িকাকে এক ঝলক দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর এই ‘রিয়েল লাইফ অ্যাপিয়ারেন্স’ ছিল আপামর জনতার কাছে ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

ধ্রুবনীল চন্দ্র

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যাদের চারপাশে এক অনন্য আভা ছড়িয়ে আছে। যেন সেগুলি এক রহস্যময় আলো। সুচিত্রা সেন সেই আলোয় মোড়া এক কিংবদন্তী। তিনি শুধু নায়িকা ছিলেন না, ছিলেন সময়ের একজন মুগ্ধতা, যার কাছে দর্শকেরা নিজেদের স্বপ্ন জমা রাখত। জীবনের শুরু, তারকা হয়ে ওঠা, হঠাৎ অন্তরাল, এবং মৃত্যুর পরও অনন্ত আলো ছড়িয়ে থাকার গল্প সবটাই যেন  চলচ্চিত্রেরই চিত্রনাট্য। পাবনার মেয়ে রমা দাশগুপ্ত, জন্ম ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল। স্কুলের বেঞ্চ থেকে বিয়ের মণ্ডপ, তারপর একেবারে সিনেমার সেট যাত্রাপথটা ছিল দ্রুত আর রঙিন।

কাছের মানুষদের মতে, স্বামীর মৃত্যু, কন্যা মুনমুন সেনের অভিনয়জীবনের সূচনা, ও ক্রমশ বদলে যাওয়া চলচ্চিত্রের ধারা তাঁকে আড়ালে যেতে বাধ্য করেছিল। একজন চলচ্চিত্র সমালোচক বলেছিলেন, “তিনি কখনও চাননি, দর্শক তাঁকে বয়সের ছাপ নিয়ে মনে রাখুক। তাঁর জন্য নায়িকা মানে চিরযৌবনা।”

মাত্র ষোলো বছর বয়সে বিয়ে হল কলকাতার ব্যবসায়ী দীবানাথ সেনের সঙ্গে। কলকাতায় আসার পরই শুরু হল ভাগ্যের অন্য অধ্যায়। সিনেমায় তাঁর প্রথম সুযোগ আসে ১৯৫২ সালে, ‘শেষ কল্পনা’ ছবিতে। যদিও ছবিটি মুক্তি পায়নি, তবে সেটিই ছিল দরজা খোলার চাবি। ১৯৫৩ সালের ‘সাত সংখ্যা’ ও বিশেষ করে উত্তম কুমারের সঙ্গে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৪) ছিল সেই যুগলবন্দী, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে উত্তম-সুচিত্রা জুটি নামে অমর হয়ে আছে। এরপর একের পর এক ছবি ‘শাপমোচন’ (১৯৫৫), ‘হারানো সুর’ (১৯৫৭), ‘সপ্তপদী’ (১৯৬১), ‘সাগরিকা’ (১৯৫৬), ‘গভীর প্রেম’ যেন সিনেমা হলের প্রতিটি ফ্রেমে তিনি হয়ে উঠলেন বাংলা রোম্যান্সের প্রতীক।
কিন্তু তিনি শুধু রোম্যান্টিক নায়িকাই ছিলেন না, ছিলেন শক্তিশালী অভিনেত্রীও। ‘দেবদাস’ (১৯৫৫)-এ পার্বতীর চরিত্রে তাঁর অভিনয় কিংবা ‘আন্দোলন’-এ (১৯৫৪) তাঁর রাজনৈতিক সুরের উপস্থিতি প্রমাণ করেছিল, সুচিত্রা সেন শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নন, তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারিণীও। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ‘সাত পাকে বাঁধা’ (১৯৬৩) তাঁকে সিলভার অ্যাওয়ার্ড এনে দেয় মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী হিসেবে এই সম্মান।

কিন্তু যত উজ্জ্বল হচ্ছিল তাঁর কেরিয়ার, ততই তিনি হয়ে উঠছিলেন একজন রহস্যময় চরিত্র। মিডিয়ার সামনে খুব কমই ধরা দিতেন, সাক্ষাৎকার প্রায় দিতেন না। তাঁর সম্পর্কে পরিচালক অজয় কর একবার বলেছিলেন, “তিনি জানতেন, দর্শকের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখলে তাঁরা আরও বেশি আকর্ষিত হবে।” এই পরিকল্পিত রহস্যই সুচিত্রা সেনকে বাকি সব অভিনেত্রীদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
১৯৭৮ সালে ‘প্রণয় পাস’ মুক্তির পর হঠাৎ করেই সিনেমা থেকে সরে দাঁড়ালেন সুচিত্রা সেন। কেন তিনি এমন করলেন? এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর মুখে কখনও মেলেনি। তবে কাছের মানুষদের মতে, স্বামীর মৃত্যু, কন্যা মুনমুন সেনের অভিনয়জীবনের সূচনা, ও ক্রমশ বদলে যাওয়া চলচ্চিত্রের ধারা তাঁকে আড়ালে যেতে বাধ্য করেছিল। একজন চলচ্চিত্র সমালোচক বলেছিলেন, “তিনি কখনও চাননি, দর্শক তাঁকে বয়সের ছাপ নিয়ে মনে রাখুক। তাঁর জন্য নায়িকা মানে চিরযৌবনা।”

চলচ্চিত্র জগৎ থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নেওয়ার পর সুচিত্রা সেন হয়ে গেলেন একান্ত গৃহবন্দী। কলকাতার বালিগঞ্জ প্লেসের বাসভবনেই কাটিয়ে দেন জীবনের শেষ বছরগুলি। কোনও সাংবাদিক, কোনও ফটোগ্রাফার তাঁর সেই বাড়ির ভিতর পা রাখতে পারেননি। মাঝে মধ্যে কেবল খবরের শিরোনামে এসেছেন রামকৃষ্ণ মিশনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কারণে। আধ্যাত্মিক চর্চা, ভোরবেলার প্রার্থনা, গীতা পাঠ এই ছিল তাঁর অন্তরালের জীবন।

উদ্বোধনের দিন, সুচিত্রা সেন একদম ঠিক সময়ে পৌঁছান ক্লিনিকে। মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান রায় নিজে পাশে থেকে ফিতে কাটান মহানায়িকার হাত দিয়ে। সেদিন ক্লিনিক চত্বরে বহু অনুরাগী মহানায়িকাকে এক ঝলক দেখার জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর এই ‘রিয়েল লাইফ অ্যাপিয়ারেন্স’ ছিল আপামর জনতার কাছে ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

২০১৪ সালের জানুয়ারিতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ভর্তি হন বেলভিউ হাসপাতালে। ১৭ জানুয়ারি ৮২ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শহরজুড়ে শোক, কিন্তু তাঁর দেহ দর্শনের সুযোগ পাননি কেউ কারণ তিনি জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজের ব্যক্তিগত পরিসরকে অটুট রেখেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরও যেন সেই রহস্য আরও গভীর হয়ে রইল।
সুচিত্রা সেনকে নিয়ে এক সাংবাদিক লিখেছিলেন, “তিনি ছিলেন এক জীবন্ত মিথ। তাঁর হাসি যেমন পর্দা ভরিয়ে রাখত, তেমনি তাঁর অনুপস্থিতি ভরিয়ে রাখত কল্পনাকে।” তাঁর জীবন যেন শিক্ষা দেয় তারকা মানে শুধু আলো নয়, কখনও কখনও ছায়াও।
আজও ইউটিউবের পুরনো গান, টিভির রি-টেলিকাস্ট, কিংবা সিনেমাপ্রেমীদের স্মৃতিচারণে সুচিত্রা সেন ফিরে আসেন সেই চিরন্তন আভায়। হয়ত সত্যিই, তিনি সিনেমা ছাড়েননি শুধু পর্দার ওপারে চলে গিয়েছেন, যেখানে গল্প শেষ হয় না।🍁

 

 

🍂চিনতুন কবিতা 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়-এর কবিতা কবিতাগুচ্ছ 

দেখি মৃত্যু

আমি তাে মৃত্যুর কাছে যাইনি একবারও
তবুও সে কেন ছদ্মবেশে
মাঝে মাঝে দেখা দেয়।
এ কেমন অভদ্রতা তার?
যেমন নদীর পাশে দেখি এক চাঁদ খসা নারী
তার চুল মেলে আছে
অমনি বাতাসে ওড়ে নশ্বরতা
ভয় হয়, বুক কাঁপে, সব কিছু ছেড়ে যেতে হবে!
যখনই সুন্দর কিছু দেখি,
যেমন ভােরের বৃষ্টি
অথবা অলিন্দে লঘু পাপ
অথবা স্নেহের মতাে শব্দহীন ফুল ফুটে থাকে
দেখি মৃত্যু, দেখি সেই গােপন প্রণয়ী।
ভয় হয়, বুক কাঁপে সব কিছু দিয়ে যেতে হবে!

 

কাকে যে বলি

দিনের বেলায় ছিল আঁকিবুকি জীবন, একটা কবিতা পড়ে
মন ভালাে হয়ে গেল

এ কথা কাকে যে বলি, কেই বা বুঝবে!
বৃষ্টি এল কি এল না, আকাশ মেঘলা
লুপ্ত চাঁদ

আমার একটা হারানাে বােতামের জন্য কষ্ট হল
এ কথা কাকে যে বলি, কেই বা বুঝবে

বুঝবে না, আসলে বােঝানাে যাবে না, আত্ম পাগলামির
এ এক নিভৃত জগৎ

তােমাকে মুখােশ পরতেই হবে, ভড়ং দেখাতেই হবে,
তােমার নকল কণ্ঠস্বর
নাটকের মতন উঠবে নামবে, তুমি হাসবে

আসলে আমি যে ফুঁপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছি
কেউ বুঝবে না, বােঝানাে যাবে না।


চিনতে পারোনি?

যে-কোনো রাস্তায় যে-কোনো লোককে ডেকে বলো,
তুমি আমার বাল্যকালের খেলার সঙ্গী,
মনে পড়ে না?
কেন তোমার ব্যস্ত ভঙ্গি?
কেন আমায় এড়িয়ে যাবার চঞ্চলতা!

আমার অনেক কথা ছিল, তোমার জামার বোতাম ঘিরে অনেক কথা
এই মুখ, এই ভূরুর পাশে চোরা চাহনি,
চিনতে পারেনি?
যে-কোনো রাস্তায় যে-কোনো লোককে ডেকে বলো,
আমি তোমার বল্যকালের খেলার সঙ্গী
মনে পড়ে না?

আমরা ছিলাম গাছের ছায়া, ঝড়ের হাওয়ায় ঝড়ের হাওয়া
আমরা ছিলাম দুপুরে রুক্ষ
ছুটি শেষের সমান দুঃখ-
এই দ্যাখো সেই গ্রীবার ক্ষত, এই
যে দ্যাখো চেনা আঙ্গুল
এখনো ভুল?
মনে হয় না তোমার সেই নিরুদ্দেশ সখার মতো?
কেন তোমার পাংশু চিবুক, কেন তোমার প্রতিরোধের কঠিন ভঙ্গি
চিনতি পারোনি?
যে-কোনো রাস্তায় যে-কোনো লোককে ডেকে বলো,
শত্রু নই তো, আমরা সেই ছেলেবেলার খেলার সঙ্গী
মনে পড়ে না?

আমরা ছিলাম নদীর বাঁকে ঘূর্ণিপাকে সন্ধেবেলা
নিষিদ্ধ দেশ, ভাঙা মন্দির, দু’চোখে ধোঁয়া
দেবী মানবীর প্রথম দ্বিধা, প্রথম ছোঁয়া, আমৃত্যু পণ
গোপন গ্রনে’ এক শিহরণ, কৈশোরময় তুমুল খেলা…
লুকোচুরির খেলার শেষে কারুকে খুঁজে পাইনি
দ্যাখো সে মুখ, চোরা চাহনি
একই আয়না
চিনতে পারো না?

 


তুমি জেনেছিলে 

তুমি জেনেছিলে মানুষে মানুষে
হাত ছুঁয়ে বলে বন্ধু
তুমি জেনেছিলে মানুষে মানুষে
মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়
হাসি বিনিময় করে চলে যায়
উত্তরে দক্ষিণে
তুমি যেই এসে দাঁড়ালে—
কেউ চিনলো না কেউ দেখলো না
সবাই সবার অচেনা!

 


ইচ্ছে হয় 

এমনভাবে হারিয়ে যাওয়া সহজ নাকি
ভিড়ের মধ্যে ভিখারী হয়ে মিশে যাওয়া?
এমনভাবে ঘুরতে ঘুরতে স্বর্গ থেকে ধুলোর মর্ত্যে
মানুষ সেজে এক জীবন মানুষ নামে বেঁচে থাকা?
রূপের মধ্যে মানুষ আছে, এই জেনে কি নারীর কাছে
রঙের ধাঁধা খুঁজতে খুঁজতে টনটনায় চক্ষু-স্নায়ু।
কপালে দুই ভুরুর সন্ধি, তার ভিতরে ইচ্ছে বন্দী
আমার আয়ু, আমার ফুল ছেঁড়ার নেশা
নদীর জল সাগরে যায়, সাগর জল আকাশে মেশে
আমার খুব ইচ্ছে হয় ভালোবাসার
মুঠোয় ফেরা!

 

 

শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়-এর একটি কবিতা

ডাকঘর

এক সময় ডাকটিকিট খাম আর পোস্টকার্ড বিক্রি হতো খুব,
রবীন্দ্রনাথের চিঠি হাজারে হাজারে গেছে চতুর্দিকে ডাকে,
নীল খামে প্রেমপত্র পাঠানোর প্রধান বাহন ছিল ডাক—
রাজার চিঠির জন্য দিন গুনেছে ডাকঘরের বিষণ্ণ অমল।

নীল ব্যাগে সারাদিন কুড়িয়ে বেড়াতো চিঠি সাইকেল আরোহী।
হেঁটে হেঁটে পাড়ায় বিলোতো চিঠি পরিচিত পিওন দুবেলা।
পথ চেয়ে বসে থাকা বুড়ো-বুড়ি হাত পেতে নিতো সেই চিঠি,
ছেলের পাঠানো টাকা মাসোহারা, স্বামীর পাঠানো অর্থাদেশ।

আজ সেই ডাকসেবা পরাস্ত হয়েছে টেলিযোগের নিকটে।
বেতার সে টেলিযোগ-মুঠোফোন এসেমেস ইমেলে তক্ষুনি,
হাতে-লেখা চিঠিপত্র, স্বাক্ষরিত প্রিয় নাম এখন অচল।
মুহুর্মুহু কথাবার্তা ডাকাডাকি মুহূর্তেই কর্ম সারা হয়।

সামনে ভি. আর. এস, ক্লান্ত ডাকসেবক একমুঠো তুচ্ছ চিঠি নিয়ে
গাছতলায় বসে আছে আর ভাবছে, এই চিঠি না দিলে কী হয়।

 

নাসের হোসেন-এর কবিতাগুচ্ছ

স্পৃহা

অন্ধকারের মধ্যে যে আলো
আমি তার অনুসন্ধানে আছি।
গাছের ভিতরে যে অনুভব, পাথরের ভিতরে
যে অনুভব আমি তার অনুসন্ধানে।

হঠাৎ দু হাত টুকরো হয়ে গেলে
কীভাবে মানুষ বেঁচে থাকে,
এ এক অনন্ত জিজ্ঞাসা।
প্রতিটি কোষের মধ্যে যে জীবন-স্পৃহা
তাকে আমি প্রণাম করেছি।

 

চির নতুন সুন্দর 

কাল রাতে খাওয়াদাওয়া ভালো হল কালীদার বাড়িতে
সল্টলেকের এই বাড়িতে প্রথমই এলাম, সল্টলেকে
রাতও কাটালাম এই প্রথম, প্রথম মানেই যে খুব
সুন্দর তা এখন বেশি করে মনে হচ্ছে, এই নতুন
বাড়িতে কালীদারা উঠে আসবেন আর কয়েকদিন পর,
তারও আগে আমাদের পৌঁছে যাওয়া, গৃহপ্রবেশের আগে
আর এক গৃহপ্রবেশ, চমৎকার অনুভব নয়, কালরাতে
রান্না করেছিলেন প্রভাতদা, সঙ্গে সহযোগিতা অবশ্যই
কালীদা কেননা তিনিই হোস্ট এবং বন্ধু, সত্যি বলছি
ইলিশঝোল ও আলুভাতে চমৎকার হয়েছিল, ভাবি
এইসব মুহূর্তগুলি কী করে চিরন্তন হয়ে যায়, পুরানো সোনা কিভাবে চিরনতুন থেকে যায়,কিভাবে রোমাঞ্চ-অনুভব দিতে পারে…

 

আকাশের নীলাভ পেট 

আকাশের নীলাভ পেট চিরে নেমে আসছে পা, শিশুদের,
এইসব শিশু কোথায় ছিল এতদিন
নেমে আসছে, কিন্তু তারপর আর কিছু দেখা যাচ্ছে না
সব ধোঁয়াশা, কিন্তু কেন ধোঁয়াশা
কোথায় মন, কোথায় গমন, সে কে বলবে, আসলে
জীবন তো এর থেকে বড় কিছু নয়
সবুজ গাছের পাতায় বয়ে যায় হাওয়া,যাওয়া, কেন শুধু
যাওয়া, কিছু কি বলার ছিল
নীচে সমুদ্রতটে হুল্লোড়, নীচে জলস্রোত, কোথা থেকে কোথা
উঠে আসে জল, ছলছল
দুটি চোখ চয়ন করেছে শিল্প চারপাশে, চারপাশে
রঙিন অনুরাগ, ঝুম ঝুম কুয়াশা
সকালের গূঢ় অভ্যন্তরে নেমে এল পা,শিশুদের, নেমে এল
একে একে, এ বলে আমাকে দ্যাখ
ও বলে আমাকে, এইভাবে ছুটোছুটি করতে থাকল, এইভাবে
পৃথিবীর সমস্ত জীবন একজায়গায় জড়ো হয়
জয় ভালোবাসার জয়– বলতে বলতে ফের তারা উঠে যেতে থাকে
আকাশের পেট চিরে

 


শিল্পীদের বাড়ি 

কালীদার এই সল্টলেকের বাড়িতে এসে হঠাৎই ঠিক হল রবীনদার সঙ্গে দেখা করতে যাবো, অবশ্য ঠিক হঠাৎ বলা যাবে কি, গাড়িতে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করেছিলাম
শিল্পীদের বাড়িটি কতটা কাছে, ‘কাছেই, দশ মিনিটের হাঁটা পথ’ বলেছিলেন কালীদা, বললাম ‘একবার গেলে হত, অবশ্য যদি সম্ভব হয় বা সময় হয়, কেননা আজকের রাতটা তো অন্যভাবেই কাটাবো মনস্থির করেছি, এর মধ্যে
অন্য কোনো ব্যঞ্জনা হয়তো সুর ভেঙে দিতে পারে’ যাই হোক প্রভাতদা ও কালীদা সোৎসাহে বললেন রাত আটটায় যে আমরা সাড়ে আটটায় রওনা দেব শিল্পীদের বাড়ি, সবার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হবে না, পরে আরো একদিন বা বহুবার সেটা হতে পারে, আপাতত রবীনদার সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসব, যথারীতি সেই মতো যাওয়া, এবং দেখা করা ফেরার সময় রবীনদার ডায়েরি নিয়ে করা একটি বই যার সম্পাদনা আমাদের কৃষ্ণনগরের শান্তিনাথ করেছে, রবীনদা দিলেন

 

বাইসন

ছবি ছিঁড়ে বাইসন ছুটে যাচ্ছে, ঊর্ধ্বশ্বাস
বাঁকানো শিং, চকচকে শরীর,উত্তাল পেশীর তীব্র
বাইসন ছুটে যাচ্ছে
বড়ো দীর্ঘ এরিনা, উঁচুতে সার সার গ্যালারি
ও লোকজন, কিছু মহামান্য ব্যক্তিও
আমার হাতে লাল কাপড়
হাততালি উল্লাস অথবা চকিত
আমি ছুটে যাচ্ছি,ছুটে,এগিয়ে,কোনো না কোনো ভাবে
মেলে ধরছি লাল জামা
ক্রুদ্ধ চোখ,বাঁকানো শিং, মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে
যে করেই হোক ওর পিঠে চড়তে হবে

বাইসনের পিঠে যে চড়েনি সে বুঝবে না
ব্যাপারটা কতটা দালির কতটা পিকাসোর কতটা আমার

এখন আমার বুক থেকে পিঠ থেকে কাঁধ থেকে ছুটে বেরোচ্ছে অজস্র বাইসন

 

🍂ধারাবাহিক উন্যাস 
শুরু হয়েছে আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। কবি তৈমুর খানের জীবন। বাল্য-কৈশোরের দিনগুলি কেমন ভাবে কেটেছিল। মননে চেতনায় কিভাবে বয়ে গেছিল উপলব্ধির স্রোত। কেমন করে প্রকৃতি ও জীবনকে দেখতে শিখেছিলেন। কেমন করে জীবনে এলো ব্যর্থতা। সেসব নিয়েই নানা পর্ব।

 

একটি বিষণ্ণরাতের তারা

Nagpur School Teacher Marries 8 Men, Scams Lakhs, Caught Before 9th Wedding | ৮ স্বামীকে কাঁদিয়ে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতানো, নবম বিয়ের আসরে গ্রেফতার ‘ঠগিনী’ শিক্ষিকা!

তৈমুর খান

 

উনচল্লিশ.

মানুষটি হঠাৎ একদিন হারিয়ে গেলেন 

বিয়ে করা ব্যাপারটিই আমার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছিল। মানুষকে আর বিশ্বাস করা যায় না, ভরসাও করা যায় না। যে মেয়েটিকে আমি একবার দেখেই পছন্দ করেছি, সেই মেয়েটির পরিবার আত্মীয়স্বজনেরা আমাকে সন্দেহের নজরে দেখেছে। তাই আমার চাকরি প্রকৃত চাকরি কিনা তার জন্য তদন্ত করেছে বহু জায়গায়। শুধু আমার স্কুল এবং ভাড়াবাড়ি নয়, আমার গ্রামের এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির বহু মানুষকে জিজ্ঞেস করেছে। তাই আমি তাদের জবাব দিয়ে ভালোই করেছি এ ব্যাপারে নিজের কাছেই একশো ভাগ সমর্থন পেয়েছি। যারা এভাবে সন্দেহের চোখে দেখে তাদের বাড়িতে আত্মীয়তা করার ইচ্ছা আমার নেই। তাছাড়া একটি উচ্চবিত্ত পরিবারে বিয়ে করা মানেই নিজেকে তাদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া। পরোক্ষভাবে ক্রীতদাসে পরিণত হওয়া এটা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু বিয়ের জবাব দিলে কী হবে? তারা লোকজন নিয়ে এসে আমার বাড়িতে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। এই বিয়ে আমাকে করতেই হবে, না করলে আমার জীবনও শেষ হয়ে যেতে পারে এরকম হুমকিও দিয়ে গেছে। চারিদিক থেকে ওরা যে সার্টিফিকেট পেয়েছে আমার ব্যাপারে তাতে নেগেটিভ কিছুই ছিল না। তাই চাপের মাত্রাও অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং পণের পরিমাণও দ্বিগুণ করেছে। কিন্তু আমি অনড়, এক কথার মানুষ। যেখানে না করেছি, সেখানে আর হ্যাঁ হবে না। তাই প্রবল হুমকি সত্ত্বেও আমি বেপরোয়া হয়েই সত্যের পথে দাঁড়িয়েছি। এই ব্যাপারটি চারিদিকে জানাজানি হতেই আমার স্কুল জীবনের সহপাঠী সহীদও বুঝতে পারলো আমি বিয়ের জন্য মেয়ে খুঁজছি। সহীদ আমার মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক এমনকী বি-এ পর্যন্ত পড়ার সময়ের সঙ্গী। সহীদদের পাশের গ্রামেই থাকে ইসলাম বলে আরও একজন যার সঙ্গে আমার খুবই আন্তরিক একটা সম্পর্ক আগে থেকেই ছিল। তারাই একদিন বিকেলবেলা আমার বাড়ি এসে উপস্থিত।
—তোমার জন্য একটি মেয়ের খোঁজ নিয়ে এলাম।
—কোথায়?
—এই তো নলহাটির কাছে একটি গ্রামে।
—কিন্তু আমি আর কোনো মেয়ে দেখতে যাব না। যদি কোনো মেয়ে বিয়ে করতে চায় আমাকে, তাহলে আসতে বলো, আমাকেই দেখে যাক।
—এরকম হলে সমাজে কী বলবে? এরকম কোথাও শুনেছ কোনো মেয়ে বরকে দেখতে এসেছে?
—না, তা শুনিনি, কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে আমি খুব অপমানিত বোধ করছি। চাকরির আগেও করেছি, পরেও করছি। অপমানের ধরন আলাদা হলেও আঘাতটা আমাকেই ভোগ করতে হচ্ছে।
—সে তো সবকিছু শুনতে পেলাম, ওরকম ধনী ঘরের মেয়েকে বিয়ে না করাই ভালো। ওদের মধ্যে মনুষ্যত্ব নেই, শুধু অহংকার আছে।
—কিন্তু একটা ব্যাপার বোঝো সহীদ, মনুষ্যত্ব কিনতে পাওয়া যায় না, তা অর্জন করতে হয়। আমি ভেবেছিলাম যে বর্তমানে মানুষের অনেক পরিবর্তন হয়েছে যখন তারা শিক্ষা লাভ করেছে। কিন্তু কোনো পরিবর্তনই হয়নি।
—এরকম মানুষ থেকে দূরে থাকাই ভালো। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যে বিয়ে করবে তারাই আগে সিদ্ধান্ত নিক, আমাকে এসে দেখে যাক।
—তাহলে এক কাজ করো, বরং ইসলামের ঘরেই ডেকে নিচ্ছি তাদেরকে, অর্থাৎ মেয়ে সহ, তুমি সেখানে এসে উপস্থিত হও।
—সেটা অবশ্য করতে পারো, মেয়েরও বাড়ি নয় ছেলেরও বাড়ি নয় একজন মধ্যস্থ ব্যক্তির বাড়ি সেখানেই বরং মোলাকাত হোক।

সেদিনের এই কথাতেই কাজ হয়েছিল। হ্যাঁ মেয়েটি তার দিদিকে সঙ্গে নিয়েই এসেছিল ইসলামের বাড়ি। ইসলাম একজন গরিব মানুষ এলআইসির এজেন্ট হিসেবেই কাজ করে। মাটির একটি ছোট্ট একতলা বাড়ি। সেখানেই এক বিকেলে অস্ত সূর্যের আলোয় চা খেতে খেতে দেখেছিলাম মেয়েটিকে। আসলে আমার দেখার কিছুই ছিল না। রূপ যৌবনের উর্ধ্বে ছিল একটি মন, যে মন সকল পরিস্থিতিতে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে। যেমন ক্ষমা করতে পারে, ভালবাসতে পারে, সহ্য করতে পারে, আবার আনন্দে হেসে উঠতেও পারে। সেই মনই সেদিন আমি পেয়েছিলাম ওই মেয়েটির মধ্যে। তাই আর কোনো মেয়ে দেখার, বা বিয়ে করবো কিনা এরকম ভেবে দেখার দোলাচল ছিল না। জোর দিয়েই বলেছিলাম এক সপ্তাহের মধ্যেই বিয়ে করে নেব এবং সেই বিয়ে হবে রেজিস্ট্রি ম্যারেজ।

ব্যক্তিজীবনে ছিলেন নির্মোহ ধর্মভীরু মানুষ। কিন্তু সমাজের কথা সর্বদা ভাবতেন। তাঁর লেখার মধ্যেও সেই আলো দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই মানুষটি হঠাৎ একদিন হারিয়ে গেলেন। কোথায় গেলেন? কেউই বলতে পারেন না। খুব মন খারাপ নিয়েই তাকে স্মরণ করি। একদিন হঠাৎ মোরগ্রাম স্টেশনে ট্রেনে উঠতে গিয়েই দেখি তিনি কম্পার্টমেন্টে বসে আছেন। আমাকে দেখে হাত জোড় করে ডাকলেন।

বিয়ের সব কিছুই যখন পাকা হয়ে গেছে এবং স্কুল ছুটি নিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই এপ্রিল মাসের বারো তারিখ শুভ বিবাহ সম্পন্ন করে ফেলেছি, তখন অনেকটাই স্বস্তি বোধ করেছি। অত ভেবেচিন্তে হিসাব করে আমি কখনো জীবনকে মাপতে চাইনি। অনেক ক্ষেত্রেই অন্ধের মতো আমার পথ চলা। বিবাহ রেজিস্ট্রির দিন কয়েকজন বন্ধুকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা ছিল। শ্যামচাঁদ এসেছিল তার ক্যামেরা নিয়ে আর সঙ্গে এক প্যাকেট মিষ্টি এবং দু’টি ফুলের স্তবক। আমাদের দু’জনের হাতে দিয়ে একটি ছবিও তুলেছিল। বিয়ের পর যা যা সামাজিক রীতিনীতি থাকে সেসব ও আমাকে পালন করতে হয়েছিল। তারপর শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরেই বউকে নিয়ে গেছিলাম ভাড়ার বাড়িতে। কিন্তু সেখানকার অভিজ্ঞতাও খুব সুখকর ছিল না। যে ঘটক দীর্ঘদিন বিয়ের জন্য আমার কাছে এসে ফিরে যেত, সে সেদিন দাবি করে বসলো “আমার ফি দিতে হবে।”
—কেন তোমার ফি দেবো? আমি তো তোমার যোগাযোগে বিয়ে করিনি। কোন মুখে তুমি বলতে পারলে এরকম কথা?
—আমার যোগাযোগে করো না করো সেটা বড় কথা নয়, বহু খরচ করে আমি রোজ আসতাম বিভিন্ন মেয়ের ছবি নিয়ে। আমার উদ্দেশ্য ছিল বিয়ে দেওয়ার। কিন্তু বিয়ে যখন হয়ে গেছে তখন আমার যা ফি তা আমাকে দিতে হবে।
—এক পয়সাও আমি দিতে পারবো না! যা ইচ্ছা করে লও! না হলে পুলিশে খবর দেবো!
এই কথা শুনেই সে এমন মুখ খিস্তি শুরু করলো যে তা যে-কোনো বিবেকবান লোক উচ্চারণ করতেও পারবেন না। খিস্তি দিয়ে যখন তিনি ক্লান্ত হলেন তখন অভিশাপ দিতে দিতে বললেন, “এই বিয়ে কিছুতেই টিকবে না, টিকলেও নিশ্চয়ই একজন মারা যাবে এই আমি বলে দিলাম!”
চেঁচামেচি করতে করতেই ঘটক বেরিয়ে গেল।

নতুন বিয়ে করে বউ নিয়ে সংসার করতে বেশ ঝামেলা পোহাতে হল। সংসারে এত জিনিসপত্রের প্রয়োজন হয় তা আগে আমার জানা ছিল না। তাই দু’জনে বাজারে গিয়ে একে একে সব কিনতে হল। চাটু থেকে বেলনা, সাঁড়াশি থেকে হাতা, কাপ-ডিস থেকে শিল-নোড়া পর্যন্ত। তারপর প্রতিদিন সকালবেলায় সবজিপাতি কেনারও একটা রুটিন হয়ে দাঁড়ালো।
ভাড়ার বাড়িতে মাঝে মাঝেই আসতে থাকেন আব্দুল্লাহ মোল্লা। কোনো কিছুর সমস্যা হলে তৎক্ষণাৎ তিনি সমাধান করে দেন। সরকারি অফিস থেকে এজেন্টের কাছে গ্যাস বুকিং এর বিষয়টিও তিনি ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, যার ফলে রান্নার খুব সুরাহা হয়।
কোনো কোনো দিন সময় পেলে বিকেলবেলা গঙ্গার ধার থেকে ফিরে আসি। গঙ্গার ওপারে বরোজে থাকেন এসএম নিজামুদ্দিন। সদ্য তার সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তিনি ছোটগল্প লেখেন। অসাধারণ তাঁর লেখনী শক্তি।
—এতদিন এগুলো প্রকাশ করেননি কেন?
—এগুলো আদৌ গল্প কিনা আমার নিজেরই সংশয় ছিল। আপনি বললেন তাই সাহস পাচ্ছি।
—হ্যাঁ এগুলো যথার্থই গল্প। সমাজের অনাচার শোষণ পীড়ন থেকে কিংবদন্তির পর্যায়ে উন্নীত হওয়া কুসংস্কারকেও আপনি আক্রমণ করেছেন। ধর্মের নামে অন্ধকারে মানুষকে নিয়ে যাওয়া এবং মধ্যযুগীয় আচরণের মধ্যে নিষ্পেষিত করার বিষয়েও আপনি যুক্তির উত্থাপন করেছেন। এ কি কম কথা?
—আসলে জনবহুল এই ঘিঞ্জি এলাকায় আমি বসবাস করি। মানুষ কিভাবে জীবন জীবিকা নিয়ে ব্যস্ত থাকে তা বলে বোঝাতে পারবো না। তাই তারা এসব নিয়ে ভাববারও সময় পায় না। নীরবে সবকিছু মেনে নেয়। আর সমাজে শিক্ষারও অভাব। ফলে ওদের প্রতিবাদী কণ্ঠ প্রায় নিস্তব্ধ হয়েই থাকে।
—কী করে আপনার এলাকার মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে?
—এলাকার মানুষ সবাই জোলা। প্রত্যেকেই কাপড় বোনে আর সেই কাপড় কোনো কোম্পানিকে চালান করে দেয়। আমিও দীর্ঘদিন কাপড় ফেরি করি। তবে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য গুলবাগ একাডেমী নামে একটি বাচ্চাদের স্কুল নিজ পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠা করেছি। বহু গরিব মানুষের ছেলে-মেয়েরা এখানে নার্সারি পর্যায়ে পড়তে আসে। ক’য়েকজন ম্যাডাম রেখেছি পড়ানোর জন্য।
—আপনার যখন এই দশা তখন তাদের বেতন কিভাবে দেন? নিশ্চয়ই যেসব ছাত্র-ছাত্রী পড়তে আসে তারা মাসে মাসে বেতন দিতে পারে না!
—সবাইতো গরিব মানুষের ছেলে-মেয়ে কী করে বেতন দেবে?
—যারা পড়ান তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে আমি কিছু দেওয়ার চেষ্টা করি। স্থানীয় ধনী ব্যক্তি ও পঞ্চায়েত প্রধান, এমপি, এমএলএ যাঁরা আছেন তাঁদের কাছে সাহায্য চাই। নিজেও পরিশ্রম করে যা উপার্জন করি তাঁদের দেওয়ার চেষ্টা করি।
—এতটা কষ্ট করে স্কুল চালান?
–আলো জ্বালাতে হলে তো নিজেকে পুড়তেই হবে। দধীচি অস্থি দান করেছিলেন বলেই তো অসুর বধ হয়েছিল। শুধু নিজের স্বার্থের কথা ভাবলে দুনিয়া চলে না।

এরকম কথোপকথনেই অনেকটা সময় গড়িয়ে যেত। সর্বদা একজন মহান মানুষ বলেই মনে হতো এস এম নিজামুদ্দিনকে।
ব্যক্তিজীবনে ছিলেন নির্মোহ ধর্মভীরু মানুষ। কিন্তু সমাজের কথা সর্বদা ভাবতেন। তাঁর লেখার মধ্যেও সেই আলো দেখতে পেয়েছিলাম। কিন্তু সেই মানুষটি হঠাৎ একদিন হারিয়ে গেলেন। কোথায় গেলেন? কেউই বলতে পারেন না। খুব মন খারাপ নিয়েই তাকে স্মরণ করি। একদিন হঠাৎ মোরগ্রাম স্টেশনে ট্রেনে উঠতে গিয়েই দেখি তিনি কম্পার্টমেন্টে বসে আছেন। আমাকে দেখে হাত জোড় করে ডাকলেন।
—আপনাদের আমি একটা খবরও দিতে পারিনি। দীর্ঘদিন আমি গ্রাম ছাড়া।
—কেন কী হয়েছিল আপনার?
বন্যার পর কাজের খুব মন্দা। ঘর-দুয়ার প্রায়ই ভেঙে পড়েছিল। খাবারের কোনো সংস্থান ছিল না। তাই বর্ধমানে গিয়েছিলাম কাজ করার জন্য। সেখানেই একটা খামারে দীর্ঘদিন কাজ করছি। সংসার চালিয়ে স্কুলটি মেরামত করারও লক্ষ্য আছে। তাই আপাতত সেখানেই আছি।
—আপনাকে না দেখতে পেয়ে খুব ফাঁকা ফাঁকা মনে হয় আমার সমস্ত জঙ্গিপুর শহরটিই।

তিনি আর কথা বলতে পারলেন না আমার হাত দু’টো ধরে হু হু করে কেঁদে ফেললেন। বুঝতে পারলাম কত অভাব আর লুকিয়ে রাখবেন? মজুর খাটার পেশা নিয়েই তিনি আজ নিজ জন্মভূমিকে ছেড়ে আছেন দীর্ঘদিন। মনের দুঃখ কাউকেই বলতে পারছেন না। ট্রেন চলতে চলতেই বললেন, “আবার যদি ঘুরে দাঁড়াতে পারি তো নিশ্চয়ই জঙ্গিপুরে দেখা হবে। আমার পুরনো পাণ্ডুলিপিগুলি আমি যত্নে রাখতে পারিনি সবই বন্যায় ভেসে গেছে। সময় পেলে আবার চেষ্টা করবো লেখার।”

বিকেলের শেষ সূর্যালোকে তার হাড় জিরজিরে রোগা শরীর এক রকমের অদ্ভুত আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম কিছু টাকা ওকে দেওয়া যায় কিনা। কিন্তু আজ আমার কাছে দেবার মতো কোনো টাকাই নেই। ট্রেন থেকে নামতে নামতে জানালায় চেয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ, তখনও তার চোখ দু’টোয় জল টলমল করছে।🍁 (চলবে)

 

 

 

🍂ফিরেপড়া | ল্প

 

বৈকালে ভিটার পূর্বপ্রান্তে যাইয়া সে ডাকিল, হা-রু-উ। বাতাসের বুকে সে শব্দ মিশিয়া গেল। বদন তারপর গেল দক্ষিণ দিকে, সেখানে গিয়ে কানে হাত দিয়ে আরও উঁচু গলায় ডাকিল হা-রু-উ। এবার জবাব আসিল। দূর হইতে একটা শকূনি চীৎকার করিয়া উঠিল কর্‌-র-র-র-। বদন তার উদ্দেশে কুৎসিত গালি পাড়িল।

 

ডোমের চিতা

রমেশ চন্দ্র সেন

 ধূ করে প্রকাণ্ড বিল। চারিদিকে জল আর জল। জলের বুকে কচুরিপানার গাদার মধ্যে মাঝে মাঝে রক্তশাপলা ও রক্ত-কমল। নানা রকম ঘাসের বুকে বিচিত্র রঙের ছোট ছোট ফুল ফুটিয়াছে। কোনোটা নীল কোনোটা বেগুনী, কোনোটা বা ধবধবে সাদা। উপরে পাখির দল উড়িতেছে – আকাশের গভীর নীলিমার বুকে একটা সুর জাগাইয়া। সমুদ্রের মধ্যে লাইটহাউসের মতো মাঝে মাঝে দুই একটা বাড়ি দেখা যায়।

এই জলরাশির মাঝখানটায় শুষ্ক প্রাণহীন মাদারের ভিটা যেন প্রকৃতির একটা অনিয়ম! ভিটার উপর পাতাহীন মৃতপ্রায় গাছগুলি বিকলাঙ্গ কুষ্ঠীর মতো দাঁড়াইয়া আছে। এখানে ওখানে ছড়ান রহিয়াছে কয়লা, অর্ধদদ্ধ অস্থি ও মানুষের মাথার খুলি।

হারুর চিতায় বদনের চাল চড়িল। বদন একদৃষ্টে হাঁড়ির দিকে চাহিয়া রইল। হাঁড়ির ভিতর চালের সঙ্গেই গোটা দুই মাছ সিদ্ধ হইতেছিল। ফুটন্ত ভাতের টগবগানি, চিতার চড়্‌,-চড়াৎ চড় শব্দ – তাছাড়া সবই নিস্তব্ধ।

এই ভিটায় দুটি ডোম থাকে হারু ও বদন। দুজনেই প্রৌঢ়, স্বাস্থ্যবান, কালো মিশমিশে তাদের গায়ের রং। হারুর মাথায় ছিল একটা বাবরি। বদনের চুল কদমফুলের মতো চারদিকে সমানভাবে ছাঁটা।

মাদারের ভিটা এই অঞ্চলের শ্মশান। দুধারে দশমাইল দূর হইতেও মড়া পোড়াইতে সকলে এখানে আসে। তাই হারু ও বদন সবারই পরিচিত। কোথায় তাদের বাড়ি ঘর কোথা হইতে তারা আসিয়াছে কেহ জানে না; যমদূতের মতো আকাশ হইতে তারা এই শ্মশানের বুকে আবিভূর্ত হইয়াছিল মড়ার–কাঠ জোগাইবার জন্যে। আজ বিশ বৎসর তাদের এই অধিকারে কেহ হস্তক্ষেপ করে নাই। তারাও বিলের মধ্যে পোড়ো ভিটা হইতে গাছ কাটিয়া আনিয়া মৃতদের সৎকারের ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে।

কাঠ বেচিয়া, মাছ ধরিয়া, মৃতের উদ্দেশে প্রদত্ত চাল, ডাল, ফল-ফলারি সিদ্ধ করিয়া তারা উদরান্নের সংস্থান করে। প্রায়ই উনান ধরাতে হয় না। চিতার উপর হাঁড়ি চড়াইয়া দেয় বা রুটি সেঁকিয়া লয়। তপ্ত অঙ্গার হাতে তুলিয়া কলিকায় তামাক সাজে।

মাদারের ভিটায় একটি কুঁড়ে বাঁধিয়া তারা থাকে। সমাজ সংসার সবই তাদের পরস্পরকে লইয়া। বাহিরের জগৎ এই ডোম দুটির কাছে অর্থহীন। জীবিত মানুষের কন্ঠস্বর অপেক্ষা মৃতদেহই যেন প্রাণবন্ত। তারাই তাদের জীবিকা। পরস্পরের সঙ্গেও তারা বড় একটা কথা বলে না, হাসে আরও কম। কোন্ মৃতদেহ কিরূপে পুড়িল, কোনটার হাড় কতখানি শক্ত এইই তাদের আলোচ্য বিষয়। মৃতদেহের অস্বাভাবিকতা মধ্যে মধ্যে তাদের হাসির উদ্রেক করে বটে কিন্তু সে হাসি হিংস্র জানোয়ারের ক্রুদ্ধ গর্জনের মত বিকট। তাই এই অঞ্চলে তাদের নামে নানা বিভৎস গল্প চলিয়া আসিতেছে।

হারু ও বদনের দুর্ভাগ্য ক্রমে আজ দুদিন পর্যন্ত কোনও মড়া আসে নাই। হাঁড়িতেও চাল ছিল না। চাল কিনিতে যাইতে হইবে প্রায় এক ক্রোশ দূরে। সমস্ত দিনটা মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছিল। তারা চাল কিনিতে যায় নাই। শুকনা ছোলা চিবাইয়া দিনটা কাটাইয়া দিয়াছে। সন্ধ্যার সময় বদন বলিল, যে কটা পয়সা আছে দু’সেরের বেশি চাল হবে না। তাতে একবেলা চলবে। তারপর ? হারু বলিল, জুটে যাবে’খন।

বদন শূকরের মতো অব্যক্ত শব্দ করিয়া বলিল, ছাই, এ রাজ্যে দুদিনের মধ্যে এক বেটাও মরল না। মানুষগুলো দিন দিন যেন অমর হয়ে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে মেঘ গর্জিয়া উঠিল, কড়…কড়াৎ…কড়। হারু বলিল, “কাল সকালে যা হয় করব। আজ এখন শোয়া যাক”। ঘুম তাদের হইল না। কিন্তু বিধাতা প্রার্থনা শুনিলেন। মধ্য রাত্রে একজন যুবক আসিয়া ডাকিল, “হারু, বদন”। কোলে তার একটি মৃত শিশু। নিজের স্নেহ পুত্তলি পুত্রকে সে একাই পোড়াতে আসিয়াছিল। লোকটি জাতিতে পদ্মরাজ। পাঁচ মাইলের মধ্যে আর পদ্মরাজ নাই। কাছে, জেলে, কোচ, ভুঁইমালী আছে বটে কিন্তু তারা পদ্মরাজের মরা ছুইবে না। তাই সে একাই নৌকো বাহিয়া আসিয়াছিল পুত্রের প্রতি শেষ কর্তব্য সম্পাদন করিতে।

তার ডাক শুনিয়া বদন বলিল, এত রাত্তিরে মড়া পুড়াতে বেশি দাম লাগিবে। যুবকের কাছে একটি মাত্র টাকা ছিল। সে বলিল, বড়ো গরীব আমি, এই একটি টাকা আছে।

বদন বলিল, এক টাকায় আর মড়া পোড়ে না।

যুবকটি অনেক কাকুতি মিনতি করিয়াও তাকে রাজী করাইতে পারিল না। বদন বলিল, একটি মড়া পোড়াবার মতো কাঠ আছে বটে। কিন্তু এক টাকায় তোমায় সেই কাঠ বেচলে তারপর যদি কেউ আসে, তখন যে ভিটের গাছ কাটতে হবে।

নিরুপায়ে দীর্ঘ-নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া যুবকটি বলিল,তবে ছেলেটাকে জলেই ফেলে দিতে হবে দেখছি। শকুন কাছিমে ঠুকরে খাবে। এমন অদৃষ্ট করেছিলাম বলিয়াই সে হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। হারু বদন কে বলিল, দে ভাই, অমন করে কাঁদছে।

বদন তাকে কষিয়া ধমক দিল, বলিল, আরে না মরলে আমাদের কাছে কেউ আসে না। মড়ার দুখ্‌খু দেখে গললে চলবে কেন? হারু আরও দু’একবার বলিল। বদন কিছুতেই সম্মত হইল না। কিন্তু যখন দেখিল যে যুবকটি সত্যই শব লইয়া যাইতেছে তখন ভাবিল, লোকটিকে হাত ছাড়া করা উচিত নয়। এক টাকায় যাহাই হোক অন্তত আর কয়েক বেলা চালের সংস্থান হইবে। সে শেষটায় বলিল, আচ্ছা-কাঠ দিচ্ছি, দুদিন পরে দামটা দিয়ে যেও কিন্তু।

যুবকটি বলিল,- দুদিনের মধ্যে পারব না। সাতদিন সময় দাও। ছেলের ঋণ আমি রাখব না।

বদন বলিল,-আচ্ছা, পাঁচদিনের মধ্যে দিয়ে যেও।

যুবকটি পুত্রের দেহ ছুঁইয়া বসিয়া রহিল। তখন বৃষ্টি পড়িতেছে। চিতা যে জ্বলিবে না। পরদিন সকালে, শিশুটির চিতা তখন নিবিয়া আসিতেছে। বদন হারু কে একটা টাকা ও কয়েক আনা পয়সা দিয়া বলিল,-“ জলদি গিয়ে চাল নিয়ে আয়। চিতা নিবে যাওয়ার আগে ফিরবি। তা না হলে আবার জ্বালানি কাঠ লাগবে”। মৃতের পিতা ইহা শুনিয়া বদনের দিকে চাহিয়া রহিল।

চিতা নিবিয়া গেল, হারু আর ফিরিল না। বেলা বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে বদনের ক্ষুধা বাড়িতে লাগিল। সে হারুর উদ্দেশে গালি পাড়িতে আরম্ভ করিল।

চারিদিকে অসীম জলরাশির মধ্যে বদন একা বসিয়া আছে। ডিঙিখানা হারু লইয়া গিয়াছিল। সে না ফিরিলে বদনের এক পা নড়িবার সামর্থ্য নাই। আগের দিনে সে উপবাসী ছিল। তার আগেও কদিন পেট ভরিয়া খাইতে পায় নাই। হারু না ফিরিলে আরও কতকাল যে না খাইয়া থাকতে হইবে, একমাত্র বিধাতাই জানেন। সকাল হইতে বৃষ্টি পড়িতেছে। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, দু একটা কাকের ক্ক-ক্ক ভিন্ন আর কিছু শোনা যায় না। পিঞ্জরাবদ্ধ ক্ষুধিত হিংস্র পশুর মতো বদন মধ্যে মধ্যে নিস্ফলা গর্জন করিতে থাকে।

দুপুরের পর বৃষ্টি একটু কমিলে সে একটা ন্যাড়া গাছের উপর উঠিয়া চারিদিকে চাহিল। একটি জেলে বিলের মধ্যে নৌকোয় বসিয়া মাছ ধরিতেছে। আরও দূরে দেখা যায় কয়েকখানা বেদের নৌকো। বদন এদিক ওদিক চাহিয়া তাদের ডিঙিখানা দেখতে পায় না। তখন সে গলা ছাড়িয়া ডাকে, হা-রু।

সেই স্বরে ভীত হইয়া পাশের গাছ হইতে একটি কাক উড়িয়া যায়, ছানাগুলি চীৎকার করিতে থাকে, চিঁ-চিঁ।

বৈকালের দিকে বদন খুব দর্বল বোধ করিল। প্রত্যহ দু’সের ভাত খাওয়া তার অভ্যাস। দুদিন পেটে কিছু না পড়ায় সে একেবারেই ভাঙিয়া পড়িল। হারুর উপর তার রাগও কমিয়া গেল। ভয় হল হারুর কিছু হইয়াছে। কিন্তু নিজে সে নিরুপায়, খোঁজ করিবার সাধ্য তার নাই।

বৈকালে ভিটার পূর্বপ্রান্তে যাইয়া সে ডাকিল, হা-রু-উ। বাতাসের বুকে সে শব্দ মিশিয়া গেল। বদন তারপর গেল দক্ষিণ দিকে, সেখানে গিয়ে কানে হাত দিয়ে আরও উঁচু গলায় ডাকিল হা-রু-উ। এবার জবাব আসিল। দূর হইতে একটা শকূনি চীৎকার করিয়া উঠিল কর্‌-র-র-র-। বদন তার উদ্দেশে কুৎসিত গালি পাড়িল।

পরদিন প্রাতে একদল ভদ্রলোক আসিলেন একটি স্ত্রীলোকের শব লইয়া। বদনের তখন একখানাও কাঠ নাই। সে বলিল, তোমার নৌকাখানা একবার দাও তো কাঠ আনতে হবে।

সে তাঁদের কাছে হারুর কথা জিজ্ঞাসা করিল। তাঁহারা কোন জবাব দিতে পারিলেন না।

ঘন্টাখানেক পরে শবযাত্রীরা দেখিলেন, তাঁদের নৌকার সঙ্গে একটি ডিঙি বাঁধিয়া বদন ফিরিতেছে। কাঠ সে আনে নাই কিন্তু সে ফিরিয়াছে ডিঙির উপর একটি শব লইয়া।

বদন হারুর নীল বর্ণ ফুলা মৃতদেহটি ভিটার উপর তুলিল। একটি ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করিলেন, কোথায় পেলে?

বদন বলিল, পাতিয়ার বিলে। সাপে ওর হাত কামড়ে দিয়েছে। ডিঙির মধ্যে সের দশেক লাল মোটা চাল এবং কয়েকটা কই মাছ ছিল। কই মাছগুলি হারুর দেহের দুচার জায়গা খাইয়া ফেলিয়াছে, পাখিতে ঠোকরাইয়া শবটিকে ক্ষত বিক্ষত করিয়াছে।

বদন চাল ও মাছগুলি তুলিয়া কুড়াল লইয়া অগত্যা ভিটার একটি মরা গাছ কাটিয়া ফেলিল। কাটিতে সময় বেশী লাগিল না। ভদ্রলোকের প্রশ্নে সে হাঁ হাঁ করিয়া সংক্ষেপে জবাব দিল। স্ত্রীলোকটির শব সৎকার করিয়া ভদ্রলোকেরা চলে গেলেন। যাবার সময় একজন বলিলেন, থানায় খবর দাও, বদন বলিল, কাকে চিলেই যথেষ্ট ঠুকরেছে। আর দরকার কি?

তারা চলিয়া গেলে বদন ভালো করিয়া একটা চিতা সাজাইল। তারপর যত্নের সহিত হারুর শবটি চিতার উপর তুলিয়া দিল। চিতার ধোঁয়া সাপের মতো কুণ্ডলী পাকাইয়া আকাশে উঠিতে লাগিল। বর্ণে তার একটি নীল আভা। দীর্ঘ বিশ বৎসর ধরিয়া বদন মানুষ পোড়াইয়া আসিয়াছে, কিন্তু এ ধোঁয়া জীবনে আর কখনও দেখে নাই। এই ধোঁয়ার দৃষ্টি যেন ঝাপসা হইয়া আসে। সেদিন আকাশ ছিল পরিস্কার, গ্রীষ্মের প্রখর সূর্য আগুনের হল্কা ঢালিয়া দিতেছিল। হারুর চিতার ধোঁয়া সূর্যের জ্যোতিকে স্লান করিল। তারপর চিতার বুক হইতে উঠিতে লাগিল লোলজিহ্ব অগ্নিশিখা। যেন কতগুলি লাল সাপের ফণা; ক্রুদ্ধ তার গর্জন, অফুরন্ত তার হিংসাবৃত্ত।

চিতার দিকে চাহিয়া চাহিয়া বদন আপনা আপনি বলিয়া উঠিল, দূর ছাই, কিছু ভাল লাগে না। আগুনটা আবার নিবে যাবে। এর উপরই চাল চড়িয়ে দি।

হারুর চিতায় বদনের চাল চড়িল। বদন একদৃষ্টে হাঁড়ির দিকে চাহিয়া রইল। হাঁড়ির ভিতর চালের সঙ্গেই গোটা দুই মাছ সিদ্ধ হইতেছিল। ফুটন্ত ভাতের টগবগানি, চিতার চড়্‌,-চড়াৎ চড় শব্দ – তাছাড়া সবই নিস্তব্ধ।

ঊর্ধ্বে অনন্ত নীল আকাশ, – চারধারে সীমাহীন জলরাশি – তার মধ্যে বাতাসের তালে তালে ঘাসের পাগল নৃত্য, উচ্ছল জলের সাবলীল ভঙ্গী।

দূরে আকাশের বুকে বকের পাতি উড়িতেছে। বৈকালী সূর্য চিতার উপর ফাগের গোলা ঢালিয়া দিয়াছে। চিতার আগুন ও সূর্যের আলোয় মাদারের ভিটা একটা লাল আভা ধারণ করিল। চিতার দিকে চাহিয়া বদনের চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।🍁

 

 

🍂ধারাবাহিক রহস্য উপন্যাস

সাহিত্যিক তাপস রায়। সাম্প্রতিককালের একজন বিশিষ্ট কথাশিল্পী ও কবি। লেখকের প্রকাশিত ভিন্নধর্মী পুস্তকগুলি পাঠকদের মনে জাগরণ তৈরি করে। রহস্য কাহিনিতে লেখক প্রাণের ছোঁয়া পান। তেমনি একটি রহস্য উপন্যাস সাশ্রয় নিউজ-এর রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর পাঠকদের জন্য।

 

কিশাণগঞ্জের ফেলুদা

তাপস রায় 

১৩.
দিলীপ বলল, “চিপচিপাহট হ্যায়, হ্যায় না?”
দিলীপ উল্টো কথা বলবেই। তাতে খুব দ্রুত বোঁদেদার মনের কথা বেরিয়ে পড়বে। সে বোঁদেদার পয়সাতেই এখন চা-বিস্কুট খাচ্ছে। বোঁদে দা ভালো হিন্দি বলতে পারে না। কিন্তু দিলীপের কাছে এলে হিন্দী বলবেই বলবে। শেখার ইচ্ছে। দিলীপও চালায়। চায়ের গ্লাস দোকানীর চায়ের শানের টেবলের উপর ঠন করে নামিয়ে রেখে বোঁদেদার মুখের উপর দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বলে, “তুমহেঁ মওসম ক্যায়সা লগ্‌ রহা হ্যায়, বোঁদে দাদা?”
“শায়দ জলদী হী বাদল ছঁট জাঁয়।”
“ নেহি। হোগা, শায়দ জলদী হী আকাশ সাফ হো জায়।” দিলীপ স্বরে তেমন ঝাঁজ না দিয়ে আরও বলল,
“বোঁদেদা, তোমার টুটাফাটা হিন্দি ছোড়ো। তুমি জানো আমি ভালো বাংলা বুঝি, বলিও। কিশানগঞ্জে আমার কম দিন হয়নি। দু’টো ভাষাই এখানে চালাতে হয়। এখন বাংলায় বলো, অনেক হিন্দি প্রাক্‌টিস করেছ।”
বোঁদে খানিকটা অপ্রতিভ হয়। সে হ্য্যঁ না হ্যাঁ না করে কাজের কথা পাড়ে। “তোকে একটা কাজ করে দিতে হবে। আর হ্যাঁ শোন, লাইনপাড়ায় ঘোষ বাড়িতে বিয়ে লেগেছে। তুই প্যাণ্ডেলের দায়িত্বটা নিয়ে নে।”
দিলীপ বিহারী। কোনও কাজে তার না নেই। সে দাঁড়াতে চায় জীবনে। গ্রাজুয়েট হয়েও সে চাকরী পায়নি। তার দাদা ম্যাট্রিক পাশ না করেও বড় ছেলে বলে বাবা মারা যাওয়ায় কম্প্যাশনেট গ্রাউন্ডে টেলিফোনের সরকারি চাকরিটা পেয়ে গেছে। মনের ভেতর তার নিত্য ঝড় ওঠে যখন দেখে অফিসের বাইরে দাদার চার চাকার বিজনেসও ফুলে-ফেঁপে উঠছে। অফিসের প্রতিপত্তি কাজে লাগিয়ে সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ি কেনে সে বিএস এফ-এর কাছ থেকে, তারপর সেগুলো অফিসের সাহেবদের জন্য ভাড়া খাটায়। ড্রাইভার সহ মাসে পঁচিশ হাজার এর কন্ট্রাক্ট। খরচ বাদ দিয়ে বারো হাজার হেসে খেলে থাকে।
দিলীপ কাজের কথায় বোঁদেদার গায়ের কাছে গেঁষে আসে। মনে মনে বলে, দাও কাজ দাও,কাজ দাও। একটু ভাল করে বাঁচি। দু-দু’টো বাচ্চা। স্কুলে ভর্তি করার সময় হয়েছে। এখন টাকা না দিলে কোথাও চান্স নেই। মানে ফ্রিতে কোনো শিক্ষা নেই। কিন্তু মাসে ছয় হাজার টেলিফোন অফিস থেকে আর এই দোকান থেকে চার-পাঁচ হাজার। এতে চলে! এদিক ওদিক যা কাজ তা এই বোঁদে দা-ই দেয়। এমাসে কোনও কাজ হয়নি।

তোমার পারফর্ম্যান্সে কর্তৃপক্ষ খুব খুশি ওহে ছোকরা। ওরা বলেছে তোমাকে শেষ রাউন্ডের আগেই একদিন হেভেনে ডেকে নেবে। স্বর্গের পরীদের সাক্ষাৎ পাবে। মুখোমুখি। চাইলে একরাত তোমার পছন্দ মতো যে কোনও পরীর সাথে সময় কাটাতে পারবে। ”হেলমেট পরা মুখ থেকে কথা পড়তে থাকে। রাত তিনটে। বৃহস্পতিবার।

মুখে বলল, “সে প্যাণ্ডেল ফ্যান্ডেল হয়ে যাবে। এখন তুমি তোমার কাজ বলো।” দিলীপ জানে প্যাণ্ডেলের কাজটাই আসল। তাতে হাজার খানেক টাকা আসবে। কিন্তু বোঁদে দার ব্যাগার খাটতে তাকে হবেই। না হলে তো প্রতিমাসে খুচখাচ কাজ পাবে না।
বোঁদে নীল রঙের ডায়েরিটা বের করে। গত বছর ফেলুদা দিয়েছিল। ফেলুদা শ’খানেক পেয়েছিল উসমানি সাহেবের কাছ থেকে। তার পঞ্চায়েতের ভেতর যারা পড়া-লেখা জানে, তাদের ভেতর বিলি করতে। বোঁদে স্কুল-ফাইন্যাল পাশ। বোঁদের হক আছে। একটা ডায়েরি পেয়েছিল বোঁদে।

 

ডায়েরির পাতায় একটা ফোন নং দেখায় দিলীপকে। তারপর বলে, “তোকে ভাই এই নম্বরটা দেখতে হবে।”
“হ্যাঁ দেখছি তো! এই তো লাল মোটা অক্ষরে লিখে এনেছ ০৬৪৫৬২২৩১০ আর ৯৪৩১৯৯৫৫৪৮।”
“হ্যাঁ, এই নাম্বার দুটো একটু ট্যাপ করতে হবে। পারবি?”
“ না না , ওরকম হয় না। ট্যাপ করার আগে পুলিশে কমপ্লেন করতে হয়। লিখিত অনুমতি আনতে হয়, তারপর।” দিলীপ তার জানা সবটুকু উগড়ে দেয়।
“পুলিশের অনুমতি আনলে তোর কাছে আসব কেন রে! তুই জানিস না তোর টেলিফোনের অফিসের মাথার সাথে আমার ফেলুদার কি দহরম মহরম আছে! পুলিশ দেখালে সেখানে যাব। তোর মতো দু’পয়সার লোকের সাথে কথা বলতাম!”
এই রাগটা না দেখালে যে হবে না তা বোঁদে জানে। নরমে গরমে সে কাজ হাসিল করে। এটা তার বহুদিনের শিক্ষা। ওই দু-পয়সার লোক বলে দিলীপকে মরমে মেরে দিয়ে পরে ওকে আবার তোল্লাই দেবে বোঁদে। সে লক্ষ্য করে, দিলীপের মুখ থেকে নিমেষে সব রং মুছে গিয়েছে। তার মুখ থেকে কথা সরছে না। রাস্তার জানবাহনের দিকে চোখ রেখেছে। মানে হেরে যাওয়াটা লুকোতে চাইছে। বোঁদে দিলীপের কাঁধে হাত রেখে দিলীপের নজর ডায়েরির দিকে নিয়ে এসে দেখায়। “এই নম্বরের মালিক, তুই দেখ প্রতি বৃহস্পতিবার অত রাতে নেট ব্যবহার করে, একদম নিয়ম করে। ব্যাপারটা কি! আমার একটা প্রশ্নের মীমাংসা হচ্ছে না। কিন্তু মনে হচ্ছে, এখানে সূত্র মিলতে পারে। তুই আমাকে একটু সাহায্য কর দিলীপ। শোন, তোকে আমি এই পাঁচশ টাকা দিচ্ছি।” বলতে বলতে বোঁদে পকেট থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিলীপের দিকে এগিয়ে দেয়। এগুলো তার শোনা কথা। অনেক বাঘা বাঘা লোক টাকার সামনে কুঁই কুঁই করে মাথা নুইয়ে ফেলেছে।
আর দিলীপ তো হাড় হাভাতের একজন। ওকে তো টেলিফোনের কোনো ক্ষতি করতে হবে না, শুধু নিয়ম ভেঙে একটু ইনফরমেশন দেয়া। তা পারবে না! পারবে পারবে।

দিলীপ এতক্ষণ খুব হতাশ হয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল প্যান্ডেলের কাজটা না হাতছাড়া হয়ে যায়। বোঁদেদা হাত গুটিয়ে নিতে পারে তার মাথার উপর থেকে। খুব ক্ষতি হয়ে যাবে তার। কিন্তু হঠাৎ করে দেখল হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া তির যেন আবার ফিরে এসেছে। বোঁদেদার হাত লক্ষ্য করে তার ডান হাত ঝাঁপাল। আর পাঁচশ টাকার নোটটি খুব ক্ষীপ্রতায় টেনে নিয়ে বলল, “আজই তো বৃহস্পতিবার বোঁদে দা!”
“আরে তাই তো! তুই পারবি ভাই দিলীপ! আরে শোন, শোন, শোন। আমরা আজ রাতে একটা ছোটোখাটো স্কিম করি। শুয়োরের মাংসের কাবাব আর বিএসএফ ক্যানটিন থেকে দু’টো জনি ওয়াকার নিয়ে বসে যাব।” বোঁদের স্বরে উৎকণ্ঠা আর আগ্রহের ককটেল। আজই জানা ভাল। রহস্য বেশি দূর গড়াতে দিতে নেই। দীপক চ্যাটার্জীও দিতেন না। মনে পড়ল ড্রাগনের আবির্ভাব গল্পে নাইট ক্লাবে সারমাদ খাঁ নামে এক গুন্ডা সর্দারকে মদ খাইয়ে আর দু’খানা দশ টাকার নোট দিয়ে ড্রাগনের আড্ডার খোঁজ পেয়েছিল। পরের দিনই ছিল দীপক চ্যাটার্জীর নৈশ অভিজান।
“হয়ে যাবে বোঁদে দা। এক্সচেঞ্জে রাতের ডিউটি আমার উপর ছেড়ে দিয়ে সব বাড়ি গিয়ে ঘুমোয়। আমিও ঘুমোই, জাগি। কম্প্যুটরে গেম খেলি। কখনও সিনেমা ডাউনলোড করে সিনেমা দেখি। আজ না হয় তুমি আমি দু’জনে মিলে রাত জাগব। তবে হ্যাঁ, মদের বোতল-টোতল নিয়ে এক্সচেঞ্জে ঢোকা যাবে না। কেউ দেখে ফেললে আমার এই ভাড়া খাটা চাকরিটুকুও চলে যাবে।”
বোঁদে আকাশের চাঁদ হাতে পেল। “আরে না না। তুই চিন্তা করিস না। আমি ওসব চায়ের ফ্লাস্কের ভেতর কোল্ড ড্রিঙ্কস মিশিয়ে নিয়ে আসব। আর চায়ের কাপ থাকবে কাগজের। টিফিন বাক্সের ভেতর নিয়ে আসব কাবাব। তুই ভাবিস না। এখন আমি চললাম। রাত এগারোটায় তোর অফিসের গেটে পৌঁছে যাব।”

***

“তোমার পারফর্ম্যান্সে কর্তৃপক্ষ খুব খুশি ওহে ছোকরা। ওরা বলেছে তোমাকে শেষ রাউন্ডের আগেই একদিন হেভেনে ডেকে নেবে। স্বর্গের পরীদের সাক্ষাৎ পাবে। মুখোমুখি। চাইলে একরাত তোমার পছন্দ মতো যে কোনও পরীর সাথে সময় কাটাতে পারবে। ”হেলমেট পরা মুখ থেকে কথা পড়তে থাকে। রাত তিনটে। বৃহস্পতিবার।
ঋতব্রত নিজের ভেতরে এখন বেশ শক্তপোক্ত হয়ে গেছে। ক্লাসের ১২০টা ছেলেই ঋতব্রতর ভক্ত। গত পনেরো দিন আট-দশ জন করে সবাইকেই হেরোইনের নেশা ধরিয়ে দিয়েছে। ওই তিন লাখ টাকা এভাবে খরচ করার নির্দেশ ছিল। ঋতব্রতর হাতে এখনও কিছুটা বেঁচে আছে।
“সব কটা স্টেপ-ই তুমি ভালো করছ। কিন্তু কাল থেকে আর তোমার ছেলে বন্ধুদের তুমি হেরোইন কিনে খাওয়াবে না। এবার চেষ্টা করবে, রেসিডেন্সিয়াল মেয়েদের ভেতর এটা দিতে। দেখতেই তো পাচ্ছ, তোমার ক্লাসের ছেলেরা তোমার কেমন ভক্ত হয়ে উঠেছে। এখন কিছু মেয়ে ভক্ত বানাও। তোমার হাতে এখনও হাজার পঞ্চাশেক আছে। ওটা দিয়েই শুরু করো।” 🍁(চলবে)

 

🍂গল্প

 

বড় হয়ে বিয়েথা করার পর যেহেতু নাজিমের ছাত্রবস্থা থেকেই বাবার হার্ডওয়ারসের মাল পাইকারি সাপ্লাই-এ সহযোগিতার অভিজ্ঞতা ছিল।তায় একটি হার্ডওয়ার দোকান খুলে বসেন। কিন্তু নিয়তির কি পরিহাস আট বছর দোকান চলার পর অনেক টাকা বাকি পড়ে যায়।যার কারণে দোকানটিও তুলতে বাধ্য হয় নাজিম। 

 

আমার ভিতরে যাঁরা আছেন


মোফাক হোসেন

নাজিম এখন একজন চল্লিশ উর্ধ মানুষ। সংসারের দায়িত্ব, পেশাগত জীবন, সমাজের নানা টানাপোড়েনের মাঝে দাঁড়িয়ে।মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করে, “আমি আসলে কে?” এই প্রশ্নের উত্তর তার জীবনের এক একটা স্মৃতি, অনুভব আর শিক্ষা দিয়ে উপলদ্ধি করেছে।
“আমি আমার বাবা-মায়ের উত্তরসূরি।”
নাজিম এর জন্ম এক সাধারণ পরিবারে। বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, মালদা থেকে হার্ডওয়্যার এর মাল এনে একাধিক লোকাল এলাকার দোকানগুলোতে বিক্রি করতেন। মা ছিলেন বিড়ি শিল্পের এক নীরব শ্রমিক। মা ও বাবা লিখতে-পড়তে জানতেন না,তবু তাদের চোখে ছিল এক অদ্ভুত দীপ্তি, যে দীপ্তি অক্ষরের চেয়েও গভীর ভাষা জানত সেটা—স্বপ্নের ভাষা, আদর্শের ভাষা।

সময়ের যান্ত্রিকতা কে হার মানিয়ে ভেতর থেকেও কিছু কণ্ঠস্বর থাকে যারা থেমে যেতে জানে না, কবিতার ভাষায় তারা সময়কে প্রতিফলিত করে, সমাজকে প্রশ্ন করে এবং হৃদয়ের সুক্ষ্ম ক্যানভাসে মানুষের মানবিক মুখচ্ছবি আঁকে। নাজিম ঠিক তেমন একজন কবি। বাংলা কবিতার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ নাম, যার কাব্যচর্চা রোমান্টিকতা, দ্রোহ, আত্মানুসন্ধান এবং সমাজ-রাজনীতি ও ধর্মবোধের অনিবার্য সংঘাতে গড়ে উঠা। নাজিম আজও চেষ্টা করে, নিজেকে ও নিজের চারপাশকে গড়তে।

শৈশবে বাবার হাত ধরে নাজিম যখন প্রথম বাজারে গিয়েছিল, তার চোখ আটকে গিয়েছিল একটি রঙিন খেলনায়। কিন্তু বাবা বলেছিলেন, “এই টাকাটা খরচ করলে আজ খেলতে পারবি, কিন্তু পড়াশোনার খাতা কিনতে পারবি না। মানুষ হবি কিন্তু মানুষের মতো মানুষ হতে পারবি না।” তখন বুঝতে না পারলেও, সেই কথাটা গেঁথে গিয়েছিল নাজিমের হৃদয়ে।

সন্ধ্যা হলে, প্রদীপ এর আলোয় মা বিড়ি বাঁধতে বসতেন। বিড়ি বাঁধতে বাঁধতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতেন, নাজিম পড়ছে কি না? মাঝে মাঝে ক্লান্ত চোখে শুধু বলতেন,পড়া শোনা করে “মানুষ হবি বাবা, যাতে কেউ না বলতে পারে “বাবা মার কাছ থেকে কিছু ভালো শিক্ষা দিক্ষা পাসনি।” সেই কথার ভারে নাজিম আজও মাথা নিচু করে। বাবার মুখে শোনা গল্পগুলো তখন শুধুই গল্প মনে হতো, পণ্ডিত চানক্য, আঞ্চলিক বিজ্ঞ ব্যক্তি ভবনডাঙা গ্রামের আব্দুল আজহার সাহেব, উঁচু গ্রামের কৃষি অফিসার আজহার উদ্দিন, কিংবা নজরুল মাস্টার। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পেরেছে, সেই মানুষগুলোর জীবনদর্শনই ছিল নাজিম-এর নীরব গাইডলাইন। তারা হয়তো প্রচারের আলোয় ছিলেন না, কিন্তু তারা ছিলেন মানবতার সত্যিকারের আদর্শের প্রতীক। নাজিম এখন মনে করে, তার বাবার চা খাওয়ার জায়গাটা, ডোবা নগরের পরম শ্রদ্ধেয় কুদ্দুস কাকুর দোকান, ছিল যেন এক নীরব বিদ্যালয়। বাবা সেখানে বসতেন, আলোচনা করতেন, শুনতেন, শিখতেন। আর সেই শোনা কথা প্রতিদিন রাতে সন্তানদের গল্পের আকারে বলতেন।

একদিন হঠাৎ স্কুল থেকে ফিরে নাজিম খুব কাঁদছিল,  এক বন্ধু বলেছিল, “তোমারা তো জাতে বেলদার,তাতে মা আবার বিড়ি শ্রমিক, তোমরা কিভাবে পড়া শোনা করে মানুষ হবে?” সে কথা শুনে নাজিম-এর ভেতর দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠেছিল। কিন্তু সেদিন রাতে মা বলেছিল, “আমার কাজ ও জাত দেখে যদি কেউ তোমাকে ছোট ভাবে, তাহলে তাকে নিজের কাজ দিয়ে জবাব দিও। জবাব দিও নিজের চরিত্র দিয়ে।” মা সেইদিন নাজিম কে বুঝিয়ে দিয়ে ছিল—পেশা নয়, মনুষ্যত্বই মানুষের পরিচয়।

সময়ের চাকা ঘুরেই চলেছে,জীবনের নানা পথ অতিক্রম করে, নাজিম আজ বড় হয়ে বিয়েথা করার পর যেহেতু নাজিমের ছাত্রবস্থা থেকেই বাবার হার্ডওয়ারসের মাল পাইকারি সাপ্লাই-এ সহযোগিতার অভিজ্ঞতা ছিল।তায় একটি হার্ডওয়ার দোকান খুলে বসেন। কিন্তু নিয়তির কি পরিহাস আট বছর দোকান চলার পর অনেক টাকা বাকি পড়ে যায়।যার কারণে দোকানটিও তুলতে বাধ্য হয় নাজিম। পুনরায় আবার ক্ষুদ্র ব্যবসা শুরু করে।নাজিমের আরেকটি নেশা ছিল সাংবাদিকতা,কাব্য চর্চা, পত্রিকা সম্পাদনা ও সাহিত্য সংগঠন পরিচালনা।

বসত ভিটে সংকীর্ণ হওয়ায় নাজিম অন্যত্রে বাড়ি করে। বাবা মা পুরনো ভিটের আবেগী মায়ায় ঐখানেই থেকে যাই।বাধ্য হয় নাজিম নতুন বাড়ি আসতে,সঙ্গে দুই ছেলে দুই মেয়ে ও পত্নী কে নিয়ে। সময়ের যান্ত্রিকতা কে হার মানিয়ে ভেতর থেকেও কিছু কণ্ঠস্বর থাকে যারা থেমে যেতে জানে না, কবিতার ভাষায় তারা সময়কে প্রতিফলিত করে, সমাজকে প্রশ্ন করে এবং হৃদয়ের সুক্ষ্ম ক্যানভাসে মানুষের মানবিক মুখচ্ছবি আঁকে। নাজিম ঠিক তেমন একজন কবি। বাংলা কবিতার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ নাম, যার কাব্যচর্চা রোমান্টিকতা, দ্রোহ, আত্মানুসন্ধান এবং সমাজ-রাজনীতি ও ধর্মবোধের অনিবার্য সংঘাতে গড়ে উঠা। নাজিম আজও চেষ্টা করে—নিজেকে ও নিজের চারপাশকে গড়তে। সে জানে, কিছু মানুষ সমাজে “বুদ্ধিজীবী” কিংবা “ধার্মিক” সেজে জাতপাতের বিষাক্ত নখ মাংসের মধ্যে লুকিয়ে রেখে,নিজের স্বার্থ সিদ্ধি করতে ব্যাস্ত। কিন্তু কিছু শিক্ষক ও গুণীজন নাজিমের জীবনে দেবতা হয়ে এসেছিল।তাছাড়া বাবা-মা শেখাতে চেয়েছিলেন—সত্য ও সততার শক্তিতে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়। আদর্শ কখনো একদিনের হতে পারে না,সেটা প্রতিদিনের হওয়া উচিত।
আজ,বাবা-মা কাছে নেই। কিন্তু তাদের অনুপস্থিতিতেও তারা এতটাই উপস্থিত থাকে, জীবনের বেছে নেওয়া পথে ও প্রতিটি সিদ্ধান্তে। তাঁরা আমার দূরে নেই,প্রতিটি মুহূর্ত,কথা বলেন আমার সঙ্গে। তাদের দেখানো পথেই পাথেয় করে চোখের জলে গর্বে বুক ভরে উঠে নাজিমের। হাজার ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন নাজিম একবার করে ছুটে যায় বাবা মা ভাই বোন কে দেখতে সেই পুরনো ভিটে।
অনেকেই যখন বলে, বাবা-মা’র জন্য একটা নির্দিষ্ট দিন রাখা উচিত, বাবা দিবস মা দিবস কিংবা মৃত্যু ও জন্মদিন। কিন্তু নাজিম ভাবে, “তোমাদের আমি প্রতিদিন স্মরণ করি। কারণ তোমরা আমার যাপিত জীবনে প্রতিটি মুহূর্ত জড়িয়ে আছো।”
“তোমাদের অনুগত ও শ্রদ্ধা জানাতে কোন ‘বিশেষ’ দিন লাগে না আমায়।” 🍁

 

 

 

🍂কণা দ্য 
তোমার ‘প্রাগৈহাসিক’ গল্পের কথা মনে পড়ে যেখানে ভিখু আদিম যৌন প্রবৃত্তির তাড়নায় পাঁচীর সঙ্গী বসির মিঞাকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করেনি৷ কিন্তু আমার কাছে তোমার সম্পর্ক তেমন নয়৷
তুমি কি বোঝ নাই তুমি আমার ভোগ্য বস্তু নও, কামনাও নও৷

 

পুনর্জন্ম 

আজ আপনার হৃদয়ে কিছু বিষণ্নতা বা বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি আসতে পারে। তবে আত্ম-উন্মুক্ত হয়ে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করলে বা কারও পাশে দাঁড়ালে এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সংসার: পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো আজ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কর্মক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনে লাভবান হবেন।

অমিত পাল

পাখিটিকে আমি দেখতে পাই প্রভাতে তন্ময়তায়৷ আমার মামার বাড়ির দোতলায় ঘরের জানালার কাঁচে ঠক ঠক করে ঠোকর মারত৷ সে আসত দুটি সময়- এক প্রভাত বেলায় আমার ঘুম ভাঙাতে আর বৈকালের ক্লান্তি কাটাতে৷ সেই একই ভাবে, একই নজরে৷
আমি ভাবতাম সে কি কিছু বলতে চাই আমাকে? পাখিটিকে দেখে আমি অনুমান করতে পারি এটি মহিলা পাখি৷ তবে তার কোনও সঙ্গী বা সাথী ছিল না৷
এই ছোট্ট পাখিটিকে দেখে আমার মনে মায়া জাগত৷ আমি মনে মনে ভাবতাম সবুজ পালকের আবেশ জড়ানো ঐ পাখিটির সঙ্গে আমার যেন যুগ যুগ আগেকার সম্পর্ক রয়েছে৷ সম্পর্কটি ভালবাসার সম্পর্ক৷
হাজার বছরের পুরোনো অতীত ইতিহাস ঘেঁটে সেদিন দেখেছিলাম কল্পনার আরব্য রজনী৷ সেখানে একটি পুরুষ পাখি আর একটি স্ত্রী পাখি ছিল৷ বাকিটা আপনাদের জানা…
আমি ভাবতেই পারিনি পুনর্জন্মটা কি এইভাবে ঘটতে পারে? হায়! বাস্তব বড় কঠিন জিনিস…

তোমার জানতে বাকি

আমি কতটা নোংরা, জীর্ণ, কদর্জ, ব্যর্থ কিংবা আমার মনে কতটা দোলাচল বৃত্তি বর্তমান তা তুমি বোঝ নাই হে৷ কিন্তু আমার দোদুল্যমানতার কথা পাশের বাড়ির লোভী শালিক পাখিটাও জানে৷
নিজেকে কোকিলের সঙ্গে তুলনা করি না, আবার কাকের সঙ্গে তুলনা ভাবনার অতীত৷ আমি আমাতে মাঝামাঝি রূপ বৈচিত্র্য– সে কথা আমি জেনে নিয়েছি৷ শুধু তোমার জানতে এখনও বাকি…

সিগারেটের ইতিহাস

একটা সিগারেট খাও৷ মুখ দিয়ে টানো৷ ধোঁয়া ছাড়ো৷ শুধুই ধোঁয়াটাকে প্রত্যক্ষ করো না৷ জ্বলন্ত এক ফুলকি অঙ্গাকেও পরোক্ষ করো৷ কতটা পুড়িয়ে খাক করে ছায়ে পরিণত করে সেটা দেখো৷ এবার তোমার অন্তরের বেদনার সঙ্গে তার সংমিশ্রণ ঘটাও৷ সামঞ্জস্য রাখো৷ শেষে তুলনা করতে ছেড়ো না…
বলো এবার তোমার অনুভূতিতে কি পেলে?

কালবৈশাখীর মায়া 

আমি আকাশের মেঘ দেখে বৃষ্টির প্রত্যাশা করি না৷ এটা তো শুধু চাতকের প্রত্যাশা৷ তবে জানি কৃষকের প্রত্যাশা অন্য কিছু৷
রঙিন ও গাঢ় ছন্দে কালবৈশাখী আসুক সেটা কিন্তু কেউই চাই না৷ জানিনা, আকস্মিক ভাবে আকাশ ভাঙা কীভাবে বৃষ্টি নামে!
কতটা ধংসাত্মক আবেগ জমে থাকে আকাশের বুকে৷ আমি নিজের হৃদয়ের আবেগের সঙ্গে এর তুলনা করি৷
শুধু মায়া জমে থাকে আমার হৃদয়ে৷ তবে কালবৈশাখীর প্রকট ভুঁইয়ের উপরই পড়ে…

আমি অপেক্ষায় থাকি 

কতকটা ছেলে ভোলানোর গান, মন ভোলানোর গান থাকে কিংবা হিন্দিতে আশিকদের গান আছে– থাক সবটা বলার দরকার নেই৷ কতটা স্মৃতি চাই বলতে কিংবা থাকনা শব্দ বিচারের জন্য ছেড়ে দেয়৷
জানালার পাশে মাথা চড়া দিয়ে বেড়ে ওঠা সজনে গাছটায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়া ওর ডাল গুলোই কত সাতরাঙা পাখী বসে৷ তারাই বা ক’টা মধুর গান শোনায়!
তবে একটা পাখি আসে আমার ঘরের লাগিয়ে রাখা জানালার অপর প্রান্তে৷ তার লোহা মেশানো ঠোঁট আরক্ত চুম্বন দিয়ে যায় কাচে৷ সকালে ঘুম ভাঙায়, তড়িঘড়ির আহ্বান জানায়৷
আমি অপেক্ষা করি তার আসার অপেক্ষায়…

তুমি প্রেমের বস্তু

প্রখর গ্রীষ্মে জমি গুলির বুক ফাটে৷ বেরিয়ে আসে যোনি থেকে অমৃত রস৷ আকাশ ভাঙা প্লাবন উৎকন্ঠায় ভরা৷ বিচলিত হই তুমি আর আমি কিংবা পশুপাখির বাসভূমি ঐ নিভৃতে থাকা বন-জঙ্গল৷
তোমার ‘প্রাগৈহাসিক’ গল্পের কথা মনে পড়ে যেখানে ভিখু আদিম যৌন প্রবৃত্তির তাড়নায় পাঁচীর সঙ্গী বসির মিঞাকে হত্যা করতেও দ্বিধাবোধ করেনি৷ কিন্তু আমার কাছে তোমার সম্পর্ক তেমন নয়৷
তুমি কি বোঝ নাই তুমি আমার ভোগ্য বস্তু নও, কামনাও নও৷ তুমি কেবলই আমার প্রেমের বস্তু, শুধু অলীক-কল্পনার স্মৃতি…🍁

 

 

 

সম্পাদক : দেবব্রত সরকার, কার্যনির্বাহী সম্পাদক : সানি সরকার, অঙ্কন : প্রীতি দেব ও আন্তর্জালিক 

এক নজরে 👉 সাশ্রয় নিউজ-এ আপনিও পাঠাতে পারেন স্থানীয় সংবাদ। এছাড়াও রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল-এর জন্য উপন্যাস, কবিতা (একধিক কবিতা পাঠালে ভালো হয়। সঙ্গে একটি লেখক পরিচিতি। গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য, পুস্তক আলোচনা (আলোচনার জন্য দুই কপি বই পাঠাতে হবে), ভ্রমণ কাহিনী। লেখার সঙ্গে সম্পূর্ণ ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর থাকতে হবে। অবশ্যই কোনও প্রিন্ট বা ডিজিটাল মাধ্যমে এমনকী কোনও সোশ্যাল মিডিয়াতে বা পোর্টালে পূর্ব প্রকাশিত লেখা পাঠাবেন না। ই-মেল করে লেখা পাঠান। ই-মেল আই ডি : editor.sasrayanews@gmail.com

বি: দ্র: সমস্ত লেখা লেখকের নিজস্ব। দায় লেখকের নিজস্ব। কোনও বিতর্কিত বিষয় হলে সংবাদ সংস্থা কোনওভাবেই দায়ী থাকবে না এবং সমর্থন করে না। কোনও আইনি জটিলতায় সাশ্রয় নিউজ চ্যানেল থাকে না। লেখক লেখিকা প্রত্যেকেই লেখার প্রতি দ্বায়িত্ববান হয়ে উঠুন। লেখা নির্বাচনে (মনোনয়ন ও অমনোনয়ন) সম্পাদকমণ্ডলীর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।

ঋণ: মহামিলনের কথা, ফিরেপড়া গল্প ও চির নতুন কবিতা আন্তর্জাল থেকে সঙ্কলিত। 

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন