অলোক নাথ, সাশ্রয় নিউজ ★ দেহরাদুন : তাঁরা চারধাম যাত্রার স্বপ্ন নিয়ে পাহাড়ের পথে পা রেখেছিলেন। কিন্তু প্রকৃতির রুদ্ররূপ যে এমনভাবে তাঁদের যাত্রাপথ রুদ্ধ করে দেবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি। রুদ্রপ্রয়াগের (Rudraprayag) কাছে অলকানন্দা (Alaknanda) নদীতে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় এখনও নিখোঁজ ১০ জন যাত্রী। এখনও পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৮ জন। ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২ জন।
দুর্ঘটনাটি ঘটে বৃহস্পতিবার , যখন যাত্রী বোঝাই বাসটি উত্তরাখণ্ডের (Uttarakhand) বদ্রীনাথ (Badrinath) অভিমুখে যাচ্ছিল। বাসটিতে প্রায় ১৮ থেকে ২০ জন যাত্রী ছিলেন বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকারীরা। অধিকাংশ যাত্রীরাই ছিলেন রাজস্থান (Rajasthan) ও গুজরাটের (Gujarat) বাসিন্দা, ওঁরা চারধাম যাত্রার উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকাল থেকেই পাহাড়ি এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছিল। রাস্তা পিচ্ছিল ছিল ও নদীর ধারে কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ। সেই অবস্থাতেই বাসটি এগোচ্ছিল। আচমকা এক মোড়ে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। তার পর মুহূর্তেই বাসটি খাদের কিনার ঘেঁষে থাকা রাস্তা থেকে গড়িয়ে পড়ে যায় অলকানন্দা নদীতে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রী রাজেশ তিওয়ারি (Rajesh Tiwari), নিজে ঝাঁপ দিয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছেন। জানিয়েছেন, “বাসটা হঠাৎ ডানদিকে হেলে পড়ে। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমরা দেখলাম, বাস খাদের দিকে গড়াতে শুরু করেছে। আমি ঝাঁপ দিই। পরে দেখি আরও ক’য়েকজন বাঁচার জন্য লাফিয়ে পড়েছে।”
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (State Disaster Response Force – SDRF), পুলিশ ও দমকল কর্মীরা। আটজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও, বাসের বেশ ক’য়েকজন যাত্রী নদীর ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গাছের ডালে বা পাথরের উপর আটকে পড়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। বহু যাত্রী নদীর জলে তলিয়ে গিয়েছেন বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।রুদ্রপ্রয়াগের পুলিশ সুপার আভিষেক ত্রিপাঠী (Abhishek Tripathi) জানান, “রাতভর বৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় রাস্তার অবস্থা খুব খারাপ। এখনও পর্যন্ত ২ জনের দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ ১০ জনকে খোঁজার কাজ চলছে। SDRF ও NDRF যৌথভাবে তল্লাশি চালাচ্ছে।” অন্যদিকে, স্থানীয় প্রশাসনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, “নদীর স্রোত অত্যন্ত তীব্র। এমন অবস্থায় উদ্ধার কাজ চালানো কঠিন হলেও, সমস্ত রকম সরঞ্জাম ব্যবহার করে আমরা চেষ্টা করছি। নিখোঁজদের পরিবারগুলিকে খবর দেওয়া হয়েছে। আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য নিকটবর্তী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।”
দুর্ঘটনার তীব্রতায় কেবল বাস নয়, তার আশপাশের অংশও ভেঙে পড়ে গেছে বলে জানান রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা আরও এক পর্যটক, গুজরাটের বাসিন্দা জয়েশ প্যাটেল (Jayesh Patel)। তিনি বলেন, “সকালে আমাদের বাস কিছুটা পেছনে ছিল। হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনে আমরা দৌড়ে এগিয়ে যাই। দেখি বাসটা একেবারে নিচে গড়িয়ে গেছে। তখন থেকেই উদ্ধার কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু ওই খাঁদটা এত গভীর আর নদীর স্রোত এত জোরালো যে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না।” প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, দুর্ঘটনায় যাঁরা নিখোঁজ, তাঁদের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এলাকায় পর্যাপ্ত রক্ত ও চিকিৎসাসামগ্রী মজুত রাখা হয়েছে। এ ছাড়া, বৃষ্টির পূর্বাভাস মাথায় রেখে আগামী ৪৮ ঘণ্টার জন্য রুদ্রপ্রয়াগ-বদ্রীনাথ সড়কে পর্যটক পরিবহণ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ক’য়েকদিন ধরেই উত্তরাখণ্ডে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়ি এলাকায় ধস, রাস্তা ভেঙে যাওয়া ও বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে প্রায় রোজই। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, আরও ৩-৪ দিন ভারী বৃষ্টিপাত চলবে এই অঞ্চলে। অন্যদিকে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে যারা পাহাড়ে আসেন, তাঁদের জন্য এই দুর্ঘটনা এক ভয়ঙ্কর বার্তা। এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, বর্ষাকালে পাহাড়ি সফরে কতটা সতর্ক থাকতে হয়, এক্ষেত্রে প্রশাসন ও পর্যটকদের সমন্বিত প্রস্তুতির কতটা প্রয়োজন! উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে আধা সেনা, পুলিশ ও হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে, যতক্ষণ না শেষ নিখোঁজ ব্যক্তিকেও খুঁজে পাওয়া যায়, ততক্ষণ পর্যন্ত থামবে না তল্লাশি।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : PM Narendra Modi | ভারত-মরিশাস সম্পর্কের বন্ধনে নতুন ছোঁয়া, ফোনে কী কথা বললেন মোদী ও রামগুলাম




