বসুধা চৌধুরী ★ সাশ্রয় নিউজ : সাশ্রয় আজকের প্রজন্মের কাছে প্রেম খোঁজার মানে আগের চেনা ছক থেকে অনেকটাই আলাদা। এখন আর কেউ প্রথম দেখাতেই একে অপরের প্রেমে পড়ে যায় না। বা নিছক ছবি দেখে প্রেমে পড়ে যাওয়ার কাল অনেকটাই শেষ। বিশেষ করে জেনারেশন জেড (Gen Z) যারা ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মেছেন, তাদের মধ্যে প্রেমের ব্যাকরণ পাল্টে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। সোশ্যাল মিডিয়া ও ডেটিং অ্যাপই যেখানে এখন প্রেমের প্রধান ঠিকানা, সেখানে আত্মপ্রকাশের কৌশলও হয়ে উঠেছে অভিনব। আর এই অভিনব পদ্ধতিরই নতুন নাম রিভার্স ক্যাটফিশিং (Reverse Catfishing)।
এই পদ্ধতির নেপথ্যে রয়েছে এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তা। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যেখানে অধিকাংশ সম্পর্ক শুরুই হয় বাইরের চাকচিক্য দিয়ে, সেখানে জেনারেশন জি-এর একাংশ স্পষ্টভাবে বলছে, ‘‘চেহারা নয়, আমি চাই আমার মনের মানুষটি আমাকে আমার অন্তরের জন্য ভালবাসুক।’’

আমরা ক্যাটফিশিং (Catfishing) শব্দটির সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত। সাধারণভাবে এর মানে হল, অনলাইনে নিজের পরিচয় গোপন রেখে বা মিথ্যা পরিচয় দিয়ে কাউকে ঠকানো বা প্রতারণা করা। কিন্তু রিভার্স ক্যাটফিশিং একদমই ভিন্ন। এখানে উদ্দেশ্য প্রতারণা নয়। বরং আত্মরক্ষার মতো কিছু। কেউ যদি তার আসল সৌন্দর্য বা ‘ভাল দিক’ গোপন রেখে ডেটিং অ্যাপে এমনভাবে নিজেকে তুলে ধরে, যেন সে সাধারণ বা কম আকর্ষণীয়, তাহলে তাকে বলা হচ্ছে রিভার্স ক্যাটফিশার। এই প্রবণতার মূল কারণ একটাই, প্রেম যদি সত্যি হয়, তবে সেটা যেন চেহারার মোহে না আটকে থাকে। জেনারেশন জেড-রা এখন চায় গভীর সম্পর্ক। এমন একজন সঙ্গী যিনি বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, কিন্তু মনের সৌন্দর্য খুঁজে নিতে পারেন। তাই অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের খুব ‘চকচকে’ বা ফিল্টারযুক্ত ছবি প্রোফাইলে দিচ্ছেন না। কেউ কেউ এমনকী তাদের পুরনো বা “আনফ্ল্যাটারিং” ছবি দিচ্ছেন। যেগুলো দেখে হয়ত প্রথম দেখায় কেউ মুগ্ধ হবেন না, কিন্তু যার ফলে প্রাথমিক টান নয়, চরিত্রের ভিত্তিতেই সম্পর্ক গড়ে উঠবে।

শুধু তা-ই নয়, এমনকী কিছু ব্যবহারকারী ডেটিং অ্যাপে নিজের পেশা, জীবনধারা বা সামাজিক স্ট্যাটাস নিয়ে অতিরিক্ত তথ্য দেন না। বরং নিজেকে সাধারণভাবে তুলে ধরেন। যাতে অপরপক্ষ যদি সংযোগ স্থাপন করে, তা হয় নিছক মানুষ হিসেবে পছন্দ হওয়ার ভিত্তিতে। এই পদ্ধতির নেপথ্যে রয়েছে এক ধরনের মানসিক নিরাপত্তা। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যেখানে অধিকাংশ সম্পর্ক শুরুই হয় বাইরের চাকচিক্য দিয়ে, সেখানে জেনারেশন জি-এর একাংশ স্পষ্টভাবে বলছে, ‘‘চেহারা নয়, আমি চাই আমার মনের মানুষটি আমাকে আমার অন্তরের জন্য ভালবাসুক।’’

এই ট্রেন্ডের পেছনে আছে আরও কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ। বারংবার ব্যর্থ সম্পর্ক, ভুয়ো প্রোফাইল, মিথ্যা আশ্বাস এবং শুধুই বাহ্যিক আকর্ষণের ভিত্তিতে তৈরি সম্পর্কের ভঙ্গুরতা আজকের তরুণ প্রজন্মকে ভাবাচ্ছে, কেন প্রেমের শুরুতেই এত অভিনয়? রিভার্স ক্যাটফিশিং যেন একরকম আত্মরক্ষামূলক চ্যালেঞ্জ, যা বলে, ‘‘আমাকে ভালোবাসতে হলে, আমার আসল রূপেই ভালবাসো।’’

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা একদিকে যেমন দায়িত্বশীল মানসিকতা গড়ে তুলছে। তেমনি অন্যদিকে তৈরি করছে একটা সত্যিকারের পরিচয়ের পরিসর। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘‘এটা এক ধরনের সোশ্যাল ফিল্টারিং। ব্যবহারকারী চাইছেন না, তার প্রোফাইল দেখে কেউ শুধু বাহ্যিক মোহে মুগ্ধ হয়ে পড়ুক। বরং তারা সম্পর্ক গড়তে চাইছেন ধীরে, সময় নিয়ে, যেখানে মনের সংযোগই মুখ্য।’’ তবে এই পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনাও আছে। অনেকেই মনে করেন, নিজেকে ইচ্ছাকৃতভাবে কম আকর্ষণীয় করে তুলে ধরা মানেই একপ্রকার ‘আদ্যোপান্ত সত্য’ লুকিয়ে রাখা। কেউ কেউ এটাকে সম্পর্কের শুরুতেই ভুল বার্তা দেওয়া বলে মনে করেন। বিশেষ করে, যখন প্রথম দেখা হবে, তখন যদি প্রোফাইল ও বাস্তব চেহারার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট হয়, সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবু এসব বিতর্ক ছাপিয়ে রিভার্স ক্যাটফিশিং এখন নতুন প্রজন্মের ভালবাসার খোঁজে এক ব্যতিক্রমী অস্ত্র। এটি কোনও গোপন চক্রান্ত নয়, বরং নিজের আসল সত্তার দিকে ফিরে যাওয়ার এক চেষ্টার নাম। প্রেম যদি সত্যি হয়, তবে তা টিকবেই। এই বিশ্বাসেই নতুন প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়ার প্যাকেজিং ভেঙে খুঁজে নিচ্ছে অন্তরের সত্য। এই ট্রেন্ড প্রমাণ করে, প্রযুক্তির যুগেও, বাস্তব ভালবাসার খোঁজ থেমে নেই। শুধু পথটা একটু নতুন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Suchitra Sen : মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের জীবনের মোড় ঘোরানো গল্প : একটি ইতিহাস




