সাশ্রয় নিউজ ★ নদীয়া : ছেলেধরা সন্দেহকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত রাজ্য। নদীয়ার তেহট্ট মহকুমার একটি গ্রামে গণপিটুনির ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। স্থানীয়দের সন্দেহের জেরে এক ব্যক্তিকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে পুলিশের উপরও হামলার ঘটনা ঘটে। শেষ পর্যন্ত পুলিশ ওই ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করে ইতিমধ্যেই ১১ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতদের আদালতে তোলা হলে পাঁচ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে কৃষ্ণনগর জেলা আদালত (Krishnanagar District Court)। পুলিশ সূত্রে খবর, ঘটনাটি ঘটেছে নদীয়া জেলার তেহট্টের নাকাশিপাড়া থানার হরনগর এলাকায়। স্থানীয়দের একাংশ ওই ব্যক্তিকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে ঘিরে ধরে মারধর শুরু করে। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় নাকাশিপাড়া থানার পুলিশ। কিন্তু অভিযুক্তকে উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশের উপরেও হামলার অভিযোগ ওঠে।
পুলিশ খবর, উদ্ধার অভিযানের সময় একজন পুলিশকর্মীও গুরুতরভাবে জখম হন। পরে তাঁকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আহত ব্যক্তিকেও প্রথমে স্থানীয় বেথুয়াডহরি গ্রামীণ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছে। ঘটনার পরে এলাকায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। গণপিটুনির ভিডিও ও ছবি সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। সেই সমস্ত ছবি ও ভিডিওর ভিত্তিতে অভিযুক্তদের শনাক্ত করার কাজ শুরু করেছে পুলিশ। ইতিমধ্যেই ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বাকিদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চলছে। এক পুলিশ আধিকারিক জানান, ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবির সূত্র ধরে আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত এগোলে আরও গ্রেফতার হতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘গুজবের ভিত্তিতে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সম্পূর্ণ অপরাধ। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এই ঘটনা নতুন নয়। গত কয়েক দিন ধরেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। আর সেই গুজবকে কেন্দ্র করেই ঘটছে গণপিটুনির মতো ভয়াবহ ঘটনা। পুলিশের পক্ষ থেকে বারবার সতর্ক করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে মানুষ গুজবে কান দিয়ে উত্তেজিত হয়ে উঠছেন। কিছুদিন আগেই পশ্চিম মেদিনীপুরে এক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারকে চোর সন্দেহে গণপিটুনি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়। সেই ঘটনায় আটজনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। মামলাটি এখনও বিচারাধীন রয়েছে। শুধু মেদিনীপুর নয়, সম্প্রতি মালদহ জেলাতেও ছেলেধরা সন্দেহে একজন মহিলাকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। একই ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল বীরভূম জেলার একটি গ্রামেও। এসব ঘটনায় প্রশাসনের উদ্বেগ আরও বাড়ছে। পুলিশ প্রশাসনের মতে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভুয়ো খবর এবং গুজবই এই ধরনের ঘটনার মূল কারণ। অনেক সময় কোনও যাচাই না করেই মানুষ সেই তথ্য বিশ্বাস করে ফেলছেন। ফলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে এবং আইনশৃঙ্খলার সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
এই বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার আবেদন জানানো হয়েছে। প্রত্যেকটি থানার তরফেই প্রচার চালানো হচ্ছে যাতে কেউ গুজবে কান না দেন। সন্দেহজনক কোনও ঘটনা ঘটলে তা সরাসরি পুলিশকে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, ‘সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সব তথ্য সত্যি নয়। কেউ যদি কোনও সন্দেহজনক ব্যক্তিকে দেখেন, তাহলে নিজেরা আইন হাতে না তুলে নিয়ে পুলিশকে খবর দিন। তবেই এ ধরনের ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব।’ স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও এই ঘটনার নিন্দা করেছেন। তাঁদের মতে, গুজবের ভিত্তিতে কাউকে মারধর করা মানবিকতার পরিপন্থী। একই সঙ্গে তাঁরা প্রশাসনের কাছে এলাকায় আরও সচেতনতা প্রচারের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, গণপিটুনি বা ‘মব লিঞ্চিং’-এর মতো ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একটি বড় সামাজিক সমস্যাও। গুজব, ভীতি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়ো তথ্যের বিস্তার এই ধরনের ঘটনার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তেহট্টের এই ঘটনার পর পুলিশ প্রশাসন আরও সতর্ক হয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। তদন্তকারীরা আশা করছেন, গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদে পুরো ঘটনার আরও তথ্য সামনে আসবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনায় দ্রুত বিচার এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে গণপিটুনির মতো ঘটনা কমতে পারে। তবে তার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। এই ঘটনার পর আবারও প্রশ্ন উঠছে, গুজবের ভিত্তিতে মানুষ কেন এত সহজে উত্তেজিত হয়ে উঠছেন? প্রশাসনের সতর্কতা সত্ত্বেও কেন বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটছে? তদন্ত এগোলে হয়ত সেই প্রশ্নের কিছু উত্তর সামনে আসবে। আপাতত তেহট্টের এই গণপিটুনির ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ চলছে এবং পুলিশ আরও কয়েকজনকে খুঁজছে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Temple corridor development India, Pilgrimage tourism PRASHAD scheme | মন্দির করিডোর থেকে তীর্থ পুনরুজ্জীবন, ভারতের আধ্যাত্মিক মানচিত্র বদলাতে বড় পদক্ষেপ কেন্দ্রের পর্যটন মন্ত্রকের



