সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতের প্রশাসনিক কাঠামোয় বদলের ইঙ্গিত আরও জোরালো হল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. টি. ভি. সোমনাথন (Dr. TV Somnathan) -এর বক্তব্যে। ‘কর্মযোগী সাধনা সপ্তাহ’ (Karmayogi Sadhana Saptah) -এর উদ্বোধনী পর্বে তিনি পরিষ্কার করে বলেন, ‘শুধু সিনিয়রিটি নয়, ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নির্ধারণ করবে দক্ষতা ও কাজের ক্ষমতা’। এই মন্তব্য প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভিতরে চলমান পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। নতুন দিল্লির ড. আম্বেদকর ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার (Dr. Ambedkar International Centre)-এ আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন মন্ত্রক ও সংস্থার উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্য রাখতে গিয়ে সোমনাথন বলেন, ‘কেরিয়ারের সিনিয়রিটি অনেক সময় উপরের দিকে এগিয়ে দেয়, কিন্তু আসল জায়গায় পৌঁছতে হলে দক্ষতা অপরিহার্য’। তাঁর এই মন্তব্য প্রশাসনের ভিতরে কর্মদক্ষতার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের ভিতরে একটি শক্তিশালী শেখার সংস্কৃতি গড়ে তোলা অত্যন্ত প্রয়োজন। ‘উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা যদি নিজেরা শেখার প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন, তবে তা গোটা সংগঠনের আচরণে প্রভাব ফেলে’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে নেতৃত্বের ভূমিকার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।

‘মিশন কর্মযোগী’ (Mission Karmayogi) প্রসঙ্গে সোমনাথন জানান, এটি কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রকল্প নয়, বরং একটি জাতীয় উদ্যোগ। তাঁর কথায়, ‘এই উদ্যোগের প্রকৃত প্রভাব তখনই বোঝা যাবে, যখন এটি জেলা ও তৃণমূল স্তরে পৌঁছবে’। প্রশাসনের শেষ ধাপে যারা কাজ করেন, তাঁদের দক্ষতা, প্রেরণা ও কাজের সামর্থ্য বাড়ানোই এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। তিনি আরও বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে জ্ঞান ও দক্ষতার মূল্য দ্রুত বদলাচ্ছে। ফলে প্রশাসনিক কর্মীদের নিয়মিত শেখার মধ্যে থাকতে হবে। ‘এক সময়ে সীমিত উৎস থেকে তথ্য নিয়ে কাজ চালানো যেত, কিন্তু এখন ধারাবাহিক শিক্ষাই একমাত্র পথ’ এই মন্তব্যে বর্তমান সময়ের প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত দেন তিনি। এই অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন ভারতের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. ভি. অনন্ত নাগেশ্বরন (Dr. V. Anantha Nageswaran)। তিনি প্রশাসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence)-এর ভূমিকার উপর জোর দেন। তাঁর মতে, ‘দ্রুত পরিবর্তনের যুগে সরকারকে শেখার ক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেদের মানিয়ে নিতে হবে’। তিনি আরও বলেন, নিখুঁত হওয়ার চেয়ে সময়মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই কর্মসূচীতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ থিম্যাটিক সেশনও অনুষ্ঠিত হয়। একটি ছিল সিভিল সার্ভিস প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলির জাতীয় সম্মেলন, যেখানে ৬০০ -এরও বেশি প্রতিনিধি অংশ নেন। কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ সংস্থা, পাবলিক সেক্টর ইউনিট এবং মন্ত্রকের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে প্রশিক্ষণ কাঠামো উন্নয়নের জন্য নানা প্রস্তাব আলোচনা করেন। আরেকটি সেশনে ‘কর্মযোগী কোয়ালিটি ফ্রেমওয়ার্ক’ (Karmayogi Quality Framework) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এই কাঠামোর মাধ্যমে শেখার প্রতিটি ধাপ, আবিষ্কার, পরিকল্পনা, উন্নয়ন, প্রয়োগ, মূল্যায়ন ও উন্নতি একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এর ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিষেবা প্রদানের মান উন্নত হবে বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ, সোমনাথন রাজ্য সরকারগুলিকেও এই উদ্যোগে সক্রিয় অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘রাজ্যগুলিকে এগিয়ে এসে নিজেদের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এই প্রকল্পকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে’। বিশেষ করে জেলা ও উপ-জেলা স্তরে দক্ষতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তিনি। এই প্রসঙ্গে ডিপার্টমেন্ট অব পার্সোনেল অ্যান্ড ট্রেনিং (DoPT বা Department of Personnel and Training), ক্যাপাসিটি বিল্ডিং কমিশন (Capacity Building Commission) এবং কর্মযোগী ভারত (Karmayogi Bharat)-এর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি। এই সংস্থাগুলি যৌথভাবে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও কাঠামোর মাধ্যমে এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে ‘কর্মযোগী সাধনা সপ্তাহ’। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হল প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ধারাবাহিক শিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত একটি নাগরিক-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা তৈরি করা। প্রযুক্তি, ঐতিহ্য এবং বাস্তব ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এই উদ্যোগ গড়ে উঠেছে। কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভারতের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এই ধরনের পরিবর্তন আগামী দিনে কাজের ধরন ও মূল্যায়নের পদ্ধতিকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। দক্ষতা, শেখার ইচ্ছা এবং বাস্তব ফলাফল এই তিনের উপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নির্ধারিত হবে, এমনই ইঙ্গিত মিলছে এই কর্মসূচি থেকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India Fertilizer Stock 163 LMT, Nirmala Sitharaman | ভারতে সারের ভাণ্ডার রেকর্ড উচ্চতায়: ১৬৩ লক্ষ মেট্রিক টন মজুত, আত্মনির্ভরতার পথে বড় পদক্ষেপ সরকারের



