সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ অভিরাজ চক্রবর্তী, গুয়াহাটি : ভারতের বস্ত্রশিল্পকে বিশ্ব মানচিত্রে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে গুয়াহাটিতে (Guwahati) শুরু হল দুই দিনের জাতীয় বস্ত্রমন্ত্রী সম্মেলন। অসমে আয়োজিত এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বস্ত্র মন্ত্রী এবং ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা একত্রিত হয়ে ভারতের বস্ত্রখাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করছেন। কেন্দ্রের বস্ত্র মন্ত্রক (Ministry of Textiles, Government of India) আয়োজিত এই সম্মেলনের মূল ভাবনা, ‘India’s Textiles: Weaving Growth, Heritage & Innovation’ যার মাধ্যমে বৃদ্ধি, ঐতিহ্য এবং উদ্ভাবনের সমন্বয়ে ভারতকে একটি বৈশ্বিক বস্ত্রকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিং (Giriraj Singh), মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ডা. মোহন যাদব (Dr. Mohan Yadav), কেন্দ্রীয় বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্ঘেরিটা (Pabitra Margherita) সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি। সম্মেলনে কেন্দ্র ও রাজ্যগুলির মধ্যে সহযোগিতামূলক ফেডারেল ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে নীতি নির্ধারণ থেকে বাস্তবায়ন, সমস্ত ক্ষেত্রেই সমন্বয় বজায় থাকে।
উদ্বোধনী ভাষণে কেন্দ্রীয় বস্ত্রমন্ত্রী গিরিরাজ সিং বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকার বস্ত্রখাতে উৎপাদন, রপ্তানি এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এগিয়ে চলেছে।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই জাতীয় বস্ত্রমন্ত্রী সম্মেলনের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র আলোচনা নয়, তবে নতুন ভাবনা, উদ্ভাবন এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী রোডম্যাপ তৈরি করা। তিনি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের বস্ত্রমন্ত্রীদের বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়নের আহ্বান জানান এবং রাজ্যস্তরে আরও বেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর আশা, এই দুই দিনের আলোচনা ভারতের বস্ত্রশিল্পের ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা নেবে। উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রসঙ্গ টেনে গিরিরাজ সিং বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন।’ তাঁর মতে, এই অঞ্চলে পরিকাঠামো উন্নয়ন, সংযোগ ব্যবস্থা এবং শিল্পায়নের মাধ্যমে সামগ্রিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে সরকার নিরলস কাজ করে চলেছে। গুয়াহাটিতে এই সম্মেলন আয়োজনের মধ্য দিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বস্ত্রসম্ভাবনাকেও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরা হচ্ছে।
সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ডা. মোহন যাদব বলেন, ‘ভারতের বস্ত্রশিল্প দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে এবং আমাদের কারিগরদের শিল্পদক্ষতা বিশ্ববাজারে আরও বড় সুযোগ পাওয়ার যোগ্য।’ তাঁর মতে, এই জাতীয় বস্ত্রমন্ত্রী সম্মেলন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরির ক্ষেত্রে একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ দেবে, যা শিল্পের বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে। তিনি রাজ্যগুলির মধ্যে সেরা অভ্যাস বিনিময়ের উপরও জোর দেন। কেন্দ্রীয় বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী পবিত্র মার্ঘেরিটা বলেন, ‘গুয়াহাটিতে জাতীয় বস্ত্রমন্ত্রী সম্মেলন আয়োজিত হওয়া আমাদের জন্য গর্বের বিষয়।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে এই সংলাপ ও সমন্বয় ভারতীয় বস্ত্রশিল্পকে আন্তর্জাতিক বাজারে আরও বিস্তৃত উপস্থিতি গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারত ৩৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বস্ত্র অর্থনীতি গড়ার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়েছে। ২০১৯-২০ সালের হ্যান্ডলুম সেনসাসের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারত দেশের সর্বাধিক হ্যান্ডলুম উৎপাদনকারী অঞ্চল, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৫২ শতাংশ অবদান রাখে।
বস্ত্র মন্ত্রকের সচিব নীলম শামী রাও (Neelam Shami Rao) বলেন, ‘বস্ত্রশিল্প ভারতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।’ তাঁর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৫০০টি জেলা এক বা একাধিক বস্ত্রপণ্য রপ্তানি করে আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিতি বজায় রেখেছে। অতিরিক্ত সচিব রোহিত কনসল (Rohit Kansal) বলেন, ‘ভারত বিশ্বের বৃহত্তম বস্ত্র উৎপাদনকারী দেশগুলির অন্যতম এবং এই খাত দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।’ তিনি জানান, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের মাধ্যমেই এই শিল্পের অগ্রগতি সম্ভব। সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে একটি প্রদর্শনী ও প্যাভিলিয়নের সূচনা করা হয়, যেখানে ভারতের বস্ত্রশক্তি, উদ্ভাবন এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন, ‘India’s Textile Atlas: State Compendium 2025’, যা রাজ্যভিত্তিক বস্ত্র সম্ভাবনার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে। উল্লেখ্য, দিনভর একাধিক অধিবেশনে পরিকাঠামো, বিনিয়োগ, কাঁচামাল ও তন্তু, যেমন তুলো, রেশম, পাট, উল সহ প্রযুক্তিগত বস্ত্র ও নতুন যুগের ফাইবার নিয়ে আলোচনা হয়। বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মন্ত্রী ও আধিকারিকরা সেরা অভ্যাস, বিনিয়োগের সুযোগ, চ্যালেঞ্জ এবং নীতিগত প্রস্তাব ভাগ করে নেন, যাতে ভারতের বস্ত্রখাত আরও শক্তিশালী হয়। আগামী দিন সম্মেলনে রপ্তানি, ব্র্যান্ডিং, হ্যান্ডলুম ও হস্তশিল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সম্মেলন ভারতের বস্ত্রশিল্পকে বিশ্ববাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : MeMeraki Presents ‘Kalam: Sacred Lines, Shared Stories’ – A Celebrated Exhibition of India’s Sacred Textile Traditions in Hyderabad




