সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক★ নতুন দিল্লি : দেশের শিল্পায়ন ও আত্মনির্ভরতার পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল কেন্দ্রীয় সরকার। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগকে আরও শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে উন্নত ইস্পাত উৎপাদনে ৮৫টি প্রকল্পের জন্য ৫৫টি সংস্থার সঙ্গে মউ (MoU) স্বাক্ষর করল ইস্পাত মন্ত্রক (Ministry of Steel)। উৎপাদন-সংযুক্ত প্রণোদনা প্রকল্প বা প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ স্কিম ১.২ (PLI Scheme 1.2) -এর তৃতীয় দফার আওতায় এই চুক্তিগুলি সম্পন্ন হয়েছে। মোট বিনিয়োগের অঙ্ক ১১,৮৮৭ কোটি, যা দেশের ডাউনস্ট্রিম ইস্পাত শিল্পে নতুন ইঙ্গিত দিচ্ছে। উল্লেখ্য, ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, নতুন দিল্লির বিজ্ঞান ভবন (Vigyan Bhawan)-এ আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মউ স্বাক্ষর হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় ইস্পাত ও ভারী শিল্পমন্ত্রী শ্রী এইচ.ডি. কুমারস্বামী (H.D. Kumaraswamy), ইস্পাত মন্ত্রকের সচিব শ্রী সন্দীপ পাউন্ড্রিক (Sandeep Poundrik) এবং মন্ত্রকের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে PLI স্কিম ১.২-এর কার্যকর সূচনা হল, যা সরকারের শিল্পনীতিতে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চুক্তিবদ্ধ ৫৫টি সংস্থা এই দফায় মোট ৮.৭ মিলিয়ন টন উৎপাদন ক্ষমতা তৈরির অঙ্গীকার করেছে। মূলত ডাউনস্ট্রিম স্টিল এবং অ্যালয় ইস্পাত উৎপাদনে এই বিনিয়োগ হবে, যা উচ্চমূল্যের বিশেষায়িত ইস্পাত উৎপাদনে ভারতের সক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়াবে। সরকারের মতে, এই উদ্যোগ আমদানির উপর নির্ভরতা কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের অবস্থান আরও মজবুত করবে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শ্রী এইচ.ডি. কুমারস্বামী বলেন, ‘প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ স্কিম ভারত সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক উদ্যোগ। এর মূল লক্ষ্য দেশীয় উৎপাদনকে শক্তিশালী করা এবং বিশ্ববাজারে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।’ তিনি আরও জানান, ভারত ইতিমধ্যেই বিশেষায়িত ও অ্যালয় ইস্পাত উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। তবে এই নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশ আরও গভীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করবে এবং উচ্চমানের ইস্পাত উৎপাদনে বিশ্বস্ত সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
ইস্পাত মন্ত্রকের সচিব শ্রী সন্দীপ পাউন্ড্রিক তাঁর বক্তব্যে প্রকল্পগুলির সময় মতো বাস্তবায়নের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ‘এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করছে বিনিয়োগের দ্রুত বাস্তবায়ন, সময়মতো উৎপাদন শুরু এবং দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক উৎপাদনের উপর।’ তিনি আশ্বাস দেন, ইস্পাত মন্ত্রক অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলিকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করবে, যাতে প্রকল্পগুলির অগ্রগতি কোনওভাবেই ব্যাহত না হয়। প্রসঙ্গত, উন্নত মানের ইস্পাতের জন্য প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ স্কিম প্রথম চালু হয় ২০২১ সালের জুলাই মাসে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, বৃহৎ পুঁজি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং ইস্পাত শিল্পের ডাউনস্ট্রিম সেক্টরে প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে উৎসাহ দেওয়া। PLI ১.০ -এর আওতায় ইতিমধ্যেই ২৭,১০৬ কোটি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়েছে, যার ফলে প্রায় ১৪,৭৬০টি প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং ৭.৯ মিলিয়ন টন উৎপাদন ক্ষমতা যুক্ত হয়েছে।এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে PLI ১.১ চালু হয় ৬ জানুয়ারি ২০২৫-এ। এই দফায় আনুমানিক ₹১৭,০০০ কোটি বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে বলে কেন্দ্রের অনুমান। এর মাধ্যমে প্রায় ১৬,০০০ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং উৎপাদন ক্ষমতা বাড়বে প্রায় ৬.৪ মিলিয়ন টন। এই ধারাবাহিক অগ্রগতির মধ্যেই PLI ১.২ চালু হওয়ায় ইস্পাত শিল্পে বিনিয়োগের গতি আরও ত্বরান্বিত হল।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যেই অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলিকে মোট ২৩৬ কোটি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এতে সংস্থাগুলির আস্থা যেমন বেড়েছে, তেমনই প্রকল্প বাস্তবায়নের গতিও অনেকখানি ত্বরান্বিত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যদিকে, PLI স্কিম ১.২ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় ৪ নভেম্বর ২০২৫-এ। এই পর্যায়ে মোট ২২টি পণ্যের উপ-শ্রেণি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা চারটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত। এর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত খাতের জন্য বিশেষ ইস্পাত গ্রেড, বাণিজ্যিক গ্রেড ক্যাটাগরি ১, বাণিজ্যিক গ্রেড ক্যাটাগরি ২ এবং কোটেড ও ওয়্যার পণ্য। এই প্রকল্পে অংশগ্রহণকারী সংস্থাগুলিকে উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে ৪ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা দেওয়া হবে। প্রণোদনার মেয়াদ পাঁচ বছর, যার গণনা শুরু হবে ২০২৫–২৬ অর্থবর্ষ থেকে এবং প্রণোদনা বিতরণ শুরু হবে ২০২৬–২৭ অর্থবর্ষে।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বিশেষায়িত ইস্পাত এমন এক খাত, যা প্রতিরক্ষা, পরিকাঠামো, অটোমোবাইল, শক্তি ও রেলওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এই খাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়লে শুধু আমদানি কমবে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের রপ্তানি সম্ভাবনাও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং শিল্পভিত্তিক গবেষণায় নতুন দিগন্ত খুলবে। উল্লেখ্য যে, PLI স্কিম ১.২-এর অধীনে ৮৫টি প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগ ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ অভিযানের বাস্তব রূপ বলেই মনে করছেন শিল্প মহল। কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগ আগামী দিনে ভারতকে উন্নত ও শ্রেষ্ঠ ইস্পাত উৎপাদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, এমনি আশা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদ ও শিল্প বিশেষজ্ঞরা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India steel industry protection | দেশীয় শিল্প রক্ষায় কড়া পদক্ষেপ! চিনের সস্তা ইস্পাত ঠেকাতে তিন বছরের জন্য আমদানিতে শুল্ক চাপাল ভারত




