মিলন দত্ত, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বর্তমানে অনেক কর্মজীবী মহিলা কেরিয়ারের নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছনোর পরেই মাতৃত্বের কথা ভাবছেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বয়স বাড়লে মা হওয়ার সম্ভাবনা আগের মতো সহজ থাকে না। শরীরের ভেতরে নানা পরিবর্তন ঘটে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে সন্তান ধারণের সক্ষমতার ওপর। ৩০ বছরের পর থেকেই মেয়েদের ডিম্বাণুর গুণমান কমতে শুরু করে, আর ৩৫ বছরের পর গর্ভধারণের সম্ভাবনা দ্রুত কমে যায়। শুধু তাই নয়, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে গর্ভপাতের আশঙ্কা বেড়ে যায়। আবার ডিম্বাণুর গুণমান খারাপ হলে শিশুর জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকিও থেকে যায়। গাইনোকলজিস্ট ডা. মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায় জানালেন, ‘বয়স বাড়লে মা হওয়ার পরিকল্পনা করলে আগে থেকে কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা করানো জরুরি। এতে ঝুঁকি কমে যায় ও গর্ভাবস্থাকে সুরক্ষিত রাখা যায়।’ তাঁর মতে, গর্ভধারণের আগে অন্তত পাঁচটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা অবশ্যই করা উচিত।

প্রথমত, আলট্রাসাউন্ড টেস্ট ও এএমএইচ (AMH) টেস্ট করানো জরুরি। আলট্রাসাউন্ডে জরায়ুর অবস্থা ও ডিম্বাণুর মান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এএমএইচ টেস্টে বোঝা যায় জরায়ুতে কত ডিম্বাণু অবশিষ্ট আছে। ডা. মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘এই পরীক্ষাগুলোই বলে দেয়, প্রাকৃতিকভাবে মা হওয়ার সম্ভাবনা কতটা।’ দ্বিতীয়ত, থ্যালাসেমিয়া টেস্ট করানো অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মা ও বাবা দু’জনেই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তবে শিশুরও থ্যালাসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ঝুঁকি প্রায় ২৫ শতাংশ। তাই সন্তানের সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য গর্ভধারণের আগে থ্যালাসেমিয়া টেস্ট অপরিহার্য।

তৃতীয়ত, রুবেলা টেস্ট। ডা. মুখোপাধ্যায় জানান, রুবেলা টিকা না থাকলে গর্ভাবস্থায় সংক্রমণের ভয় বেড়ে যায়, যা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, ‘গর্ভাবস্থায় রুবেলার সংক্রমণ হলে ভ্রূণের জন্মগত সমস্যার সম্ভাবনা প্রবল থাকে। তাই আগে থেকেই রুবেলা টেস্ট করে টিকা নিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।’ চতুর্থত, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (PCOS) বা এন্ডোমেট্রিয়োসিসের মতো সমস্যার চিকিৎসা আগে থেকেই করা উচিত। এই ধরনের হরমোনজনিত সমস্যা থাকলে গর্ভধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। বর্তমানে শহর থেকে গ্রাম, সব জায়গাতেই এই সমস্যা বেড়ে চলেছে। চিকিৎসকরা বলছেন, আগে থেকেই চিকিৎসা শুরু করলে সন্তানধারণ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। পঞ্চমত, বয়স যদি ৩৯ বছর পেরিয়ে যায়, তবে এনআইপিটি (NIPT) টেস্ট করানো হয়। এর মাধ্যমে বোঝা যায় শিশুর ডাউন সিন্ড্রোম বা জন্মগত ত্রুটি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কি না। এই টেস্ট প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য ফল দেয়। ফলে আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া যায়।

এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশি বয়সে মা হওয়ার পরিকল্পনা করলে ‘প্রি-কনসেপশনাল কাউন্সেলিং’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে শুধু আলট্রাসাউন্ড বা এএমএইচ নয়, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস, থাইরয়েড, হার্টের সমস্যা ইত্যাদির ঝুঁকিও পরীক্ষা করে দেখা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক ডায়েট, নিয়মিত ওষুধ ও শরীরচর্চার মাধ্যমে মায়ের শরীরকে এমনভাবে প্রস্তুত করা হয়, যাতে গর্ভাবস্থায় বড় কোনও জটিলতা না দেখা দেয়। ডা. মুখোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘হার্টের রোগ বা ডায়াবেটিস থাকলেও মা হওয়া সম্ভব। তবে আগে থেকেই শরীরকে সঠিকভাবে তৈরি করে নিতে হবে। মায়ের ও শিশুর সুস্থতা নির্ভর করে সচেতন প্রস্তুতির ওপর।’

চিকিৎসকরা বলছেন, বয়স বাড়লেও সচেতনতা ও আগে থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করালে মা হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব। চিকিৎসকদের মতে, কর্মক্ষেত্রের চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন ও মানসিক দুশ্চিন্তা গর্ভধারণে প্রভাব ফেলে। তাই দেরিতে মাতৃত্বের পরিকল্পনা করলে শরীর ও মনের যত্ন নেওয়া আরও বেশি জরুরি।
সব ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : Relationship Tips for Gen Z, Gen Z and sex interest | শরীরী খেলায় আগ্রহ হারাচ্ছে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষজ্ঞরা জানালেন ভয়ঙ্কর আশঙ্কার কথা




