সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বাংলা চলচ্চিত্র এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ জয় বন্দ্যোপাধ্যায়-এর (Joy Banerjee) প্রয়াণে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে তাঁর পরিবার, সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীরা। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই অভিনেতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দীর্ঘ অসুস্থতার পর গত সোমবার (২৫ আগস্ট) চিরবিদায় নেন। তাঁর চলে যাওয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোটা বাংলায়। তবে সবচেয়ে আবেগঘন প্রতিক্রিয়া এসেছে তাঁর প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে, যিনি চোখের জলে ভেসে গিয়ে বলেন, “জয় আমার জীবনের প্রথম পুরুষ, প্রথম প্রেম! কী করে ভুলে যাই বলুন তো?”
তিনি জানিয়েছেন, গত ক’য়েক বছর ধরে তাঁর দুর্গাপুজো আর ভাল কাটছে না। বাবাকে হারিয়েছিলেন একবারের পুজোয়, আর এ বছর দুর্গোৎসবের আগেই হারালেন জয়কে। স্মৃতিচারণ করে বলেন, “হয়ত এবার প্যান্ডেলে জয়ের অভিনীত ছবির গান বাজবে। ১৫ আগস্ট থেকে ও হাসপাতালে ভর্তি ছিল। আমি কাজের ফাঁকে যতবার পারতাম হাসপাতালে যেতাম। ভেবেছিলাম, জয় ফিরে আসবে। অদম্য প্রাণশক্তি ছিল ওর।” জয়ের প্রথম স্ত্রীর মতে, জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনীশক্তি এবং বাঁচার আনন্দময় ভঙ্গিই তাঁকে আকর্ষণ করেছিল। সেই সময় জয় অভিনয় থেকে প্রায় সরে এসেছিলেন, জনপ্রিয়তাও অনেকটাই কমে গিয়েছিল। তবুও তাঁর ভেতরের উদ্দাম বাঁচার স্পৃহা মুগ্ধ করেছিল উত্তর কলকাতার এক সাধারণ মেয়েকে। তিনি আবেগ নিয়ে বলেন, “জয়ের হইহই করে বাঁচার ধরন আমাকে ভাসিয়ে নিয়েছিল। আমার কলেজবেলার ক্রাশ ছিল ও। মায়ের কাছ থেকেও জয়ের অভিনয় নিয়ে অনেক গল্প শুনেছি। তখন ও-বিনোদন দুনিয়ায় দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করত। তার পর যেন কর্পূরের মতো উবে গেল। কিন্তু কর্পূর যেমন উবে গেলেও সুগন্ধ রেখে যায়, জয়ও তেমনই স্মৃতি রেখে গেল।”

অভিনেতা জয় নয়, মানুষ জয়কেই তিনি পেয়েছিলেন জীবনে। তাঁর বর্ণনায়, জয় ছিলেন ভীষণ স্বাধীনচেতা, রঙিন ও প্রাণবন্ত। ধনী পরিবার থেকে উঠে এলেও ছিলেন ভীষণ মাটির মানুষ। নিজের শর্তে বাঁচতে পছন্দ করতেন। মা-বাবাকে ভীষণ ভালবাসতেন। প্রথম স্ত্রী বলেন, “অঙ্ক কষে বাঁচতে জানত না জয়। কিন্তু কথার জাদুতে সবাইকে মুগ্ধ করতে পারত। হয়ত আমাকেও সে ভাবেই বশ করেছিল।”
রাজনীতির ময়দানেও জয় বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন আলোচিত। ২০০৯ থেকে ২০১১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের সময়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) পাশে দাঁড়িয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়েছিলেন তিনি। পরে মতাদর্শ বদল করে ভিন্ন রাজনৈতিক দলে যোগ দিয়েছিলেন। স্পষ্টবক্তা স্বভাব এবং তীক্ষ্ণ মন্তব্যের কারণে জয় বারবার বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। তবে তাঁর প্রাক্তন স্ত্রীর মতে, “যদি শুধু অভিনয়ে মন দিত, বাংলা সিনেমা আরও অনেক ভাল ছবি পেত।”

চলচ্চিত্রজগতে জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাজ ছিল পরিচালক নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের (Nabyendu Chatterjee) ‘চপার’ ছবিতে অভিনয়, ওই ছবির জন্য তিনি জাতীয় সম্মান অর্জন করেছিলেন। আবার ‘অনন্যা’ ছবির ব্যর্থতা তাঁকে অভিনয় থেকে নিরুৎসাহিত করেছিল। সে সময় তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “অপর্ণা সেনের ছেলের ভূমিকায় অভিনয় করলাম, নিজেকে নিংড়ে দিয়েছিলাম, কিন্তু দর্শক দেখল না।” প্রথম স্ত্রী আরও জানান, কিশোর কুমারের (Kishore Kumar) মৃত্যু জয়ের মনে গভীর দাগ কেটেছিল। পুজোর গান বাজার সময় তিনি কষ্ট পেতেন। বলতেন, “দশটা কিশোরকুমারের হিট গানের মধ্যে দু’টো আমার ছবির গান থাকত। আজ আর কেউ আমার গান বাজায় না।”
তাঁর জীবনের শেষদিকে অনেকেই নাকি ফোন ধরতেন না, যা তাঁকে আরও একাকী করে তুলেছিল। বিচ্ছেদের পরেও জয় ও তাঁর প্রথম স্ত্রীর মধ্যে মাঝেমধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ হত, কথাও হত। একইসঙ্গে তিনি বলেন কেন আর দ্বিতীয় সংসার পাতেননি। তাঁর কথায়, “কাজের চাপ, প্রতিশ্রুতির দায়বদ্ধতা আর সম্পর্কের বাঁধনে জড়াতে চাইনি। তবে আজ মনে হচ্ছে জয়ও হয়ত কোথাও জড়িয়ে ছিল। কোনও মেয়ের জীবনের প্রথম পুরুষ, প্রথম প্রেম, সেই তো থেকে যায়, কর্পূরের সুগন্ধের মতো।” অবশেষে তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “জয়ের জন্মদিন ছিল ২৫ মে, চলে গেল ২৫ আগস্ট। তারিখগুলোয় কী অদ্ভুত মিল! আজ আমি থাকব ওর সঙ্গে, ওকে বিদায় জানাতে। কারণ এই শেষ বিদায়টুকুই ওর প্রাপ্য।”
বাংলা সিনেমা এবং রাজনীতির মঞ্চে জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য। তবে তাঁর চলে যাওয়া পূর্ণতা না পাওয়া এক অধ্যায়ের ইতি টেনে দিল। প্রথম স্ত্রী যেমন বললেন, জয় যেন কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেলেও রেখে গেল অমলিন গন্ধ।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Satabdi Roy on Joy Banerjee death | জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রয়াণে আবেগঘন মন্তব্য শতাব্দী রায়ের




