বসুধা চৌধুরী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কৃষ্ণনগর : নদীয়ার যমশেরপুর বাগচী বাড়ি, এ শুধু একটি জমিদারবাড়ি নয়, এক বিশাল ঐতিহ্যের প্রতিনিধিত্ব করে বাড়িটি। সময়ের স্রোতে জমিদারির জৌলুস ফিকে হয়ে গিয়েছে, কিন্তু দুর্গাপুজো এখনও এখানে দাঁড়িয়ে আছে ৩৫৬ বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে। ভাঙা দেওয়াল, খসে পড়া ইট, জীর্ণ অট্টালিকা সব কিছুর মাঝেই যেন এখনও শোনা যায় অতীতের গৌরবের প্রতিধ্বনি।

কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচী (Jatindramohan Bagchi) -এর স্মৃতিবিজড়িত এই জমিদার বাড়ি আজও প্রতি বছর দুর্গোৎসবের জন্য প্রাণ ফিরে পায়। স্থানীয় মানুষ থেকে গবেষক সকলের কাছেই এটি এক ঐতিহাসিক কেন্দ্রবিন্দু। বাগচী বাড়ির দুর্গাপুজো শুরুর ইতিহাস আরও বেশি আকর্ষণীয়। জানা যায়, বাগচীদের আদি নিবাস ছিল অবিভক্ত বাংলার রাজশাহী জেলায়। পরে তাঁরা যমশেরপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন ও স্থানীয় গোয়ালা সম্প্রদায়ের সক্রিয় সহযোগিতায় জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৭১১ সালে সৃষ্টিধর বাগচী (Sristidhar Bagchi) -এর উদ্যোগে প্রথম দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। তারপর থেকে এত দীর্ঘ সময়ে একদিনের জন্যও পুজোয় বিরতি ঘটেনি। বাগচী পরিবারের অষ্টম বংশধর শেখরনাথ বাগচী জানান, “আমাদের যমশেরপুর জমিদার বাড়ির প্রতিমা একচালা। মায়ের গায়ের রং হালকা হলুদ, সিংহের রং সাদা, অসুর সবুজ, গণেশ গোলাপি, আর কার্তিক দেবীর মতোই হালকা হলুদ। ডাকের সাজে সজ্জিত এই প্রতিমা একেবারে অনন্য।” তিনি আরও বলেন, “সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো নাটমন্দিরেই প্রতিমা পূজিত হন। সেই নাটমন্দিরে এক সময় যাত্রা, নাটকের আসর বসত। কলকাতা থেকে নামিদামি শিল্পীরা এসে অনুষ্ঠান করতেন।”

শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এই জমিদারবাড়ির নাম। শেখরনাথ বাগচী বলেন, “বঙ্গদেশের প্রথম সারির বিপ্লবীরা এই বাড়িতে আসতেন। শুধু তা-ই নয়, কারাগার থেকে পলাতক স্বাধীনতা সংগ্রামীরাও মাঝরাতে চুপিসারে এসে অঞ্জলি দিতেন ও ভোর হওয়ার আগে চলে যেতেন।” আবার, গবেষক মোহিত রায়ের গ্রন্থ ‘রূপে রূপে দুর্গা’ থেকেও বাগচী বাড়ির পুজো সম্পর্কে বহু অজানা তথ্য জানা যায়। তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছে যে এখানে পূজিত হন দেবী দুর্গা সম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে। চারদিন ধরে দেবীর উদ্দেশে নিরামিষ ভোগ দেওয়া হয়। তবে বিশেষত্ব হল, বিজয়া দশমীর দিন কচুশাক-ইলিশ মাছের বিশেষ ভোগে সমাপ্তি ঘটে উৎসবের।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিমার বিসর্জন হয় কালীতলার বিলে। স্থানীয় ঘোষ সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজের হাতে প্রতিমা কাঁধে তুলে নিয়ে যান। তার আগে অবশ্য তাঁদের পাত পেড়ে ভোজের মাধ্যমে আপ্যায়ন করা হয়। এই রীতিই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে। এখন বাগচী পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম কর্মসূত্রে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকলেও দুর্গাপুজোর ক’টা দিন একত্রিত হওয়ার জন্য বাড়ি ফিরে আসেন। সেই ক’টা দিনে জমিদার বাড়ি ভরে ওঠে আনন্দ-হুল্লোড়ে। বড় মণ্ডপ বা ঝলমলে আলোর সাজসজ্জা নয়, এখানে এখনও টাঙানো হয় ঐতিহ্যবাহী চাঁদোয়া, আর স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে জমে ওঠে যাত্রার আসর।শেখরনাথ বাগচীর কথায়, “আমাদের পুজোয় আধুনিকতার ছোঁয়া এলেও সাবেকিয়ানা হারায়নি। প্রতিমার বোধন থেকে বিসর্জন, সবকিছুতেই স্থানীয় গোয়ালাদের ভূমিকা অপরিসীম।”
জানা যায়, নজরুল ইসলাম (Kazi Nazrul Islam), বাঘাযতীন (Bagha Jatin)-এর মতো বিশিষ্ট মানুষের পদচিহ্নও রয়েছে এই জমিদারবাড়িতে। তাই শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন ঘটায় যমশেরপুর বাগচী বাড়ির দুর্গাপুজো।উল্লেখ্য, ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ি যেন আজও স্মরণ করিয়ে দেয় অতীতের কাহিনি। বাঁশবাগানের মাথায় চাঁদ ওঠে, সেই আলোয় জেগে থাকে স্মৃতিবিজড়িত অট্টালিকা। দুর্গাপুজোর দিনগুলোয় এখানে আবার প্রাণ ফিরে পায় সবকিছু, মানুষ, ইতিহাস আর সংস্কৃতি। নদীয়ার এই ঐতিহ্য শুধু স্থানীয়দের নয়, সমগ্র বাংলার কাছে গর্বের বিষয় হয়ে রয়েছে।
-প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র
আরও পড়ুন : Community Spirit Shines at Matri-Peeth’s Grand Durga Puja in Greater Noida West




