সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারত চিরকালই সোনার দেশ। প্রাচীন যুগ থেকে আজ পর্যন্ত এই মূল্যবান ধাতু শুধু অলঙ্কার নয়, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও আবেগের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৫ সালেও বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলির মধ্যে ভারতের নাম রয়েছে সোনার মজুদের দিক থেকে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এই দেশের মাটিতে ঠিক কতটা সোনা আছে? আর বিশ্বে ভারতের অবস্থান কোথায়?

বিশ্বজুড়ে অর্থনীতির ওঠাপড়া, মুদ্রার মান ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মাঝে সোনা এখনও সবচেয়ে স্থিতিশীল সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই ২০২৫ সালেও বড় দেশগুলি নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য বিপুল সোনা ধরে রেখেছে। বিশ্ব অর্থনীতির প্রথম সারিতে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States) এখনও সোনার রাজা। ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান বলছে, আমেরিকার কাছে রয়েছে প্রায় ৮,১০০ টন সোনা। ফোর্ট নক্স (Fort Knox) -এর মতো সুরক্ষিত ভল্টে রাখা এই সোনার মজুদ মার্কিন ডলারের (US Dollar) বৈশ্বিক প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করে তুলেছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এই সোনার ভিত্তিতেই ডলারের প্রতি বিশ্বব্যাপী আস্থা টিকে আছে।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে জার্মানি (Germany), তাঁদের দখলে ৩,৩৫০ টন সোনা। অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ও সুরক্ষিত রিজার্ভ নীতি বজায় রেখে দেশটি বহু বছর ধরে তার সোনার মজুদ অপরিবর্তিত রেখেছে।ইউরোপের আরেক শক্তিধর দেশ ইতালি (Italy) রয়েছে তৃতীয় স্থানে। প্রায় ২,৪৫০ টন সোনা মজুদ রেখেছে দেশটি। যদিও অর্থনৈতিক ওঠানামা ও ঋণ সংকটের মতো পরিস্থিতি তারা দেখেছে, তবুও সোনা তাদের জন্য ‘বিশ্বাসের সম্পদ’। ইতালির কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল বিনিয়োগ হিসেবে সোনার উপর নির্ভর করে চলেছে।
এর পরেই রয়েছে ফ্রান্স (France)। প্রায় ২,৪৩৫ টন সোনা নিয়ে দেশটির অবস্থান চতুর্থ। ফরাসি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, “সোনা এমন এক সম্পদ, যা আর্থিক চাপের সময়ও তার মূল্য ধরে রাখে।” ফলে দেশের আর্থিক কাঠামো সোনার উপস্থিতিতে আরও স্থিতিশীল থাকে।রাশিয়া (Russia) দীর্ঘদিন ধরেই নিজের বৈদেশিক রিজার্ভকে সোনার দিকে সরিয়ে নিচ্ছে। ২০২৫ সালের হিসেবে রাশিয়ার কাছে রয়েছে ২,৩০০ টনের বেশি সোনা। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক চাপে থেকেও দেশটি সোনা কেনা অব্যাহত রেখেছে, যাতে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। চীন (China)-এর অবস্থানও খুব শক্তিশালী। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে তারা এখন ২,২০০ টনের বেশি সোনা মজুদ করে রেখেছে। চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশল স্পষ্ট, ইউয়ান (Yuan) মুদ্রার মূল্য ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বাড়াতে সোনাকে ব্যবহার করা। ব্যাংকিং শক্তির দেশ সুইজারল্যান্ড (Switzerland) -এর হাতে রয়েছে প্রায় ১,০৪০ টন সোনা। ছোট জনসংখ্যা সত্ত্বেও মাথাপিছু সোনার পরিমাণে সুইজারল্যান্ড বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলির একটি।
এবার দেখা যাক, ভারতের অবস্থান কোথায়। ভারত (India) বর্তমানে বিশ্বে অষ্টম স্থানে রয়েছে, প্রায় ৮০০ টন সোনা নিয়ে, যা ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের রিজার্ভে সংরক্ষিত। কিন্তু এর বাইরেও আরও বিশাল এক সোনার ভাণ্ডার রয়েছে, যা অফিসিয়াল পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না, তা হল ভারতীয় পরিবার ও মন্দিরগুলিতে থাকা সোনা। অনুমান অনুযায়ী, দেশের ঘরে-ঘরে ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে থাকা সোনার পরিমাণই বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক। অর্থনীতিবিদ রঞ্জন দত্ত (Ranjan Dutta) বলেন, “ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কৃতিতে সোনা শুধু বিনিয়োগ নয়, বিশ্বাসের প্রতীক। ধনতেরাস বা অক্ষয় তৃতীয়ার মতো উৎসবে সোনা কেনা মানে শুধু ঐতিহ্য নয়, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা।”
উল্লেখ্য, ভারতের মানুষ সোনাকে একপ্রকার সঞ্চয় ও ভবিষ্যতের আশ্বাস হিসেবে দেখে। বাজারে সোনার দাম ওঠানামা করলেও ভারতীয় ক্রেতাদের আগ্রহ কখনও কমে না। কারণ, সোনা এখানে অর্থনৈতিক স্থিতি ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীক।

অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডস (Netherlands) প্রায় ৬২০ টন সোনা নিয়ে নবম স্থানে রয়েছে। দেশটি কয়েক বছর আগে বিদেশি ব্যাংক থেকে নিজের সোনার বড় অংশ দেশে ফিরিয়ে এনেছিল, যা সোনার প্রতি তাদের আস্থার নিদর্শন। দশম স্থানে রয়েছে তুরস্ক (Turkey)। তাদের কাছে রয়েছে প্রায় ৫৫০ টন সোনা। মুদ্রাস্ফীতি ও আর্থিক অস্থিতিশীলতার সময়ে তুরস্ক সোনাকে ব্যবহার করেছে অর্থনৈতিক বাফার হিসেবে।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়, ডিজিটাল অর্থনীতি, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ইলেকট্রনিক লেনদেনের যুগে কেন এখনও দেশগুলি সোনা ধরে রাখছে? কারণ একটাই, সোনা কখনও তার মূল্য হারায় না। কাগজের মুদ্রা বা ডিজিটাল সম্পদের মতো নয়, সোনা বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্য ও স্থিতিশীল।বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক টানাপোড়েন বা রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলেই কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি সোনার দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটিই একমাত্র সম্পদ যা যুগের পর যুগ ধরে তার মূল্য ধরে রেখেছে। ফলে, যে দেশ যত বেশি সোনা ধরে রাখতে পারে, তাদের অর্থনীতি ততটাই সুরক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য থাকে। অর্থনীতির পরিভাষায় বলা হয়, সোনা হল ‘শেষ আশ্রয়’ (Last Resort Asset)। মুদ্রার অবমূল্যায়ন, রাজনৈতিক সংকট বা বৈদেশিক ঋণের চাপের সময়েও সোনা দেশের রিজার্ভকে নিরাপদ রাখে। আর সেই কারণেই বিশ্বের প্রতিটি শক্তিশালী অর্থনীতি আজও সোনাকে তাদের আর্থিক কৌশলের কেন্দ্রে রাখে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Vastu Shastra, evening incense ritual | শত্রুর কুনজর কীভাবে দূর করবেন? ধুনোর মধ্যে যোগ করুন এই ৫টি উপাদান




