শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পাকিস্তানের (Pakistan) উত্তরাঞ্চলের এক বিস্ময়কর ভূখণ্ডের নাম হুনজা ভ্যালি (Hunza Valley)। হিমালয়ের (Himalayas) উঁচু উপত্যকায় অবস্থিত এই অঞ্চল মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর।এখানকার মানুষের আশ্চর্যজনক দীর্ঘায়ুর জন্যও বিশ্বজুড়ে আলোচনায়। গবেষণা অনুযায়ী, হুনজার বাসিন্দাদের গড় আয়ু ১০০ থেকে ১২০ বছর পর্যন্ত হয়। শুধু তাই নয়, তারা বিশ্বের সবচেয়ে স্বাস্থ্যবান ও সুখী মানুষ হিসেবেও পরিচিত।

এই জনগোষ্ঠীকে বুরুশো (Burusho) নামেও ডাকা হয়। তারা মূলত পাকিস্তানের হুনজা (Hunza), চিত্রাল (Chitral), নগর (Nagar) ও গিলগিট-বালতিস্তান (Gilgit-Baltistan) এলাকায় বাস করে আসছে শত শত বছর ধরে। এদের জীবনধারা, খাদ্যাভ্যাস আর জলের গুণমান সবকিছুই যেন তাদের দীর্ঘ ও রোগমুক্ত জীবনের রহস্য উন্মোচন করে।

বিগত কয়েক দশক ধরে হুনজাদের দীর্ঘায়ু নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও চিকিৎসকরা। ডক্টর রবার্ট ম্যাক্রিসন (Dr. Robert McCarrison) ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি বেশ ক’য়েক বছর ধরে হুনজা উপজাতির সঙ্গে বসবাস করেছিলেন।
তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল চমকপ্রদ। তিনি জানান, “হুনজা ভ্যালিতে এত বছর কাটানোর পরও আমি ক্যানসার, আলসার, অ্যাপেনডিসাইটিস বা আধুনিক কালে প্রচলিত কোনও জটিল রোগ দেখতে পাইনি।”

চিকিৎসা বিজ্ঞানের চোখে এটি এক বিস্ময়।অন্যদিকে বিজ্ঞানী ডক্টর হেনরি কোয়ান্ডা (Dr. Henri Coanda) হুনজাদের দীর্ঘায়ুর রহস্য হিসেবে হিমবাহ থেকে আসা জলকে চিহ্নিত করেন। তিনি এই জল নিয়ে গভীর গবেষণা চালান।

তাঁর মতে, এই জলের অনন্য খনিজ উপাদান ও বিশুদ্ধতা হুনজাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মুখ্য ভূমিকা রাখে। কোয়ান্ডা এ বিষয়ে একটি বইও প্রকাশ করেছিলেন, ওই বইয়ে তিনি লিখেছেন, “হুনজাদের জীবনযাপন প্রমাণ করে, প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চললেই মানবজীবন কতটা রোগমুক্ত ও দীর্ঘ হতে পারে।”

হুনজা উপজাতিদের দীর্ঘায়ু কেবল বৈজ্ঞানিক গবেষণায় নয়, সাহিত্যের পাতাতেও স্থান করে নিয়েছে। ব্রিটিশ লেখক জেমস হিলটন (James Hilton) তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস লস্ট হরাইজন (Lost Horizon)-এ হুনজা ভ্যালিকে অনুপ্রেরণা হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। পরে ফ্র্যাঙ্ক ক্যাপ্রা (Frank Capra) উপন্যাসটির ওপর ভিত্তি করে চলচ্চিত্রও নির্মাণ করেন। সেখানেও উঠে আসে পর্বতের মাঝে একটি রহস্যময় ও সুস্থ-দীর্ঘায়ু জাতিগোষ্ঠীর চিত্র।
আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ভিড় করেন হুনজা ভ্যালিতে। একদিকে এর অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, অন্যদিকে সুস্থ-সুখী জীবনের এক অনন্য উদাহরণ যেন ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণ করে। এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়টিকে হুনজা ভ্রমণের সেরা মৌসুম ধরা হয়। এই সময় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠে, ফলে ভ্রমণও হয় আরামদায়ক।

হুনজা ভ্যালিতে ভ্রমণে গেলে যে স্থানগুলো না দেখলেই নয়, তার মধ্যে রয়েছে রাকাপোশি চূড়া (Rakaposhi Peak), করিমাবাদ (Karimabad), আলিতিত দুর্গ (Altit Fort), বাল্টিত দুর্গ (Baltit Fort), আত্তাবাদ লেক (Attabad Lake), রাশ লেক (Rush Lake), সোস্ট বর্ডার (Sost Border), গুলমিত জমা (Gulmit Jama), বোরিথ লেক (Borith Lake) ও ঈগল নেস্ট ডুইকার (Eagle Nest Duikar)।

প্রতিটি স্থানই ভ্রমণকারীদের মনে এক অনন্য স্মৃতি এঁকে যায়। হুনজা ভ্যালি মানব সভ্যতার কাছে অনুপ্রেরণা। সেখানে আধুনিক জীবনযাত্রার কোলাহল, দূষণ ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে রোগের ছড়াছড়ি, সেখানে হুনজারা আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জীবনযাপনই প্রকৃত স্বাস্থ্য ও সুখের চাবিকাঠি।
সব ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Muri Shinai De | মুরি শিনাই দে: কর্মব্যস্ত জীবনে জাপানি শান্তির মন্ত্র, কীভাবে বদলাবে আপনার দিন?




