Homo heidelbergensis | জার্মানিতে ৩ লাখ বছরের পুরনো মানুষের পদচিহ্ন, নতুন করে লিখছে মানবজাতির ইতিহাস

SHARE:

আবিষ্কৃত মানবচিহ্নের সংখ্যা তিনটি। এর মধ্যে দুটি সম্ভবত শিশু বা কিশোর বয়সী মানুষের, আর একটি প্রাপ্তবয়স্কের। অর্থাৎ, এটি ছিল কোনও শিকারি দলের নয়, বরং একটি পরিবারের অবসর সময়ের পদচিহ্ন। গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, “পদচিহ্নগুলো দেখে মনে হচ্ছে এটি কোনও শিকারের প্রস্তুতি নয়। এগুলি শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি প্রমাণ করে এটি একটি পারিবারিক ভ্রমণও হতে পারে।”

তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : সায়েন্সের জগতে এক যুগান্তকারী আবিষ্কার সামনে এসেছে জার্মানির লোয়ার স্যাক্সনি (Lower Saxony) থেকে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা সেখানে আবিষ্কার করেছেন প্রায় ৩ লাখ বছরের পুরনো মানবজাতির পদচিহ্ন, যা আজ পর্যন্ত জার্মানিতে পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন মানবপদচিহ্ন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চিহ্ন কেবল পুরনো কালের নিদর্শন নয়, তা মানবসভ্যতার ইতিহাস নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

আবিষ্কৃত পদচিহ্নগুলি মূলত হোমো হাইডেলবারগেনসিস (Homo heidelbergensis) নামে এক বিলুপ্ত মানব প্রজাতির বলে দাবি করেছেন গবেষকরা। চিহ্নগুলি এমন এক হ্রদের ধারে পাওয়া গেছে, যেখানে একইসঙ্গে ঘুরে বেড়াত বিলুপ্ত প্রজাতির হাতি প্যালিওলোক্সোডন অ্যান্টিকোয়াস (Palaeoloxodon antiquus), গণ্ডার ও অন্যান্য বন্য প্রাণী। এই পদচিহ্নগুলো সেই সময়কার এক অমূল্য জানালা খুলে দিয়েছে, যা থেকে বোঝা যাচ্ছে প্রায় তিন লক্ষ বছর আগে কেমন ছিল জীবজগতের সহাবস্থান। উল্লেখ্য যে, প্রত্নতত্ত্ববিদদের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক জার্নাল Quaternary Science Reviews-এ। গবেষণার অন্যতম সদস্য ও টিউবিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Tübingen) সেনকেনবার্গ সেন্টার ফর হিউম্যান ইভোলিউশন অ্যান্ড প্যালিওএনভায়রনমেন্ট (Senckenberg Centre for Human Evolution and Palaeoenvironment)-এর ফেলো ফ্লাভিও আল্টামুরা (Flavio Altamura) এক সংবাদে প্রকাশ, “৩০০,০০০ বছর আগে শোনিঙ্গেন (Schöningen) অঞ্চলের জীবন এমনই ছিল। প্রথমবারের মতো আমরা দুটি ভিন্ন স্থানের জীবাশ্ম পদচিহ্ন নিয়ে এত বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছি।”

আবিষ্কৃত মানবচিহ্নের সংখ্যা তিনটি। এর মধ্যে দুটি সম্ভবত শিশু বা কিশোর বয়সী মানুষের, আর একটি প্রাপ্তবয়স্কের। অর্থাৎ, এটি ছিল কোনও শিকারি দলের নয়, বরং একটি পরিবারের অবসর সময়ের পদচিহ্ন। গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, “পদচিহ্নগুলো দেখে মনে হচ্ছে এটি কোনও শিকারের প্রস্তুতি নয়। এগুলি শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি প্রমাণ করে এটি একটি পারিবারিক ভ্রমণও হতে পারে।”
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত

গবেষক দলের মতে, আবিষ্কৃত মানবচিহ্নের সংখ্যা তিনটি। এর মধ্যে দুটি সম্ভবত শিশু বা কিশোর বয়সী মানুষের, আর একটি প্রাপ্তবয়স্কের। অর্থাৎ, এটি ছিল কোনও শিকারি দলের নয়, বরং একটি পরিবারের অবসর সময়ের পদচিহ্ন। গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, “পদচিহ্নগুলো দেখে মনে হচ্ছে এটি কোনও শিকারের প্রস্তুতি নয়। এগুলি শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি প্রমাণ করে এটি একটি পারিবারিক ভ্রমণও হতে পারে।” আল্টামুরা জানিয়েছেন, শোনিঙ্গেনের ওই হ্রদের ধারে মৌসুমভেদে নানা প্রকার উদ্ভিদ, ফল, কচি ডালপালা, এমনকি মাশরুমও সহজলভ্য ছিল। ফলে মানবগোষ্ঠীগুলি হ্রদ ও নদীর ধারে বসতি গড়ে তুলেছিল। তাঁর ভাষায়, “আমাদের অনুসন্ধান প্রমাণ করছে, এই বিলুপ্ত মানব প্রজাতি অগভীর জলের ধারে জীবিকা ও আশ্রয়ের সন্ধান করত।”

শুধু মানুষের নয়, সঙ্গে মিলেছে বিরল প্রাণীরও চিহ্ন। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ১৩ টন ওজনের এবং সোজা দাঁতের জন্য পরিচিত বিলুপ্ত হাতি প্রজাতি প্যালিওলোক্সোডন অ্যান্টিকোয়াস (Palaeoloxodon antiquus)-এর পদচিহ্নও মিলেছে সেই কাদামাটির স্তরে। এমনকি মিলেছে গণ্ডারেরও পদচিহ্ন। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো ইউরোপে পাওয়া প্রথম প্রমাণিত প্লাইস্টোসিন যুগের (Pleistocene) গণ্ডার স্টিফানোরাইনাস কির্শবারগেনসিস (Stephanorhinus kirchbergensis) অথবা স্টিফানোহাইনাস হেমিটোইকাস (Stephanorhinus hemitoechus) প্রজাতির হতে পারে।

এই যুগান্তকারী আবিষ্কার নিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদরা বেশ উচ্ছ্বসিত। তাঁদের দাবি, এই পদচিহ্নগুলি কেবলমাত্র মানুষের উপস্থিতির ইতিহাসই বদলে দিচ্ছে না, বরং মানব-প্রাণী সহাবস্থানেরও স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে। এক গবেষকের কথায়, “এই হ্রদের ধারে মানুষ ও প্রাণীরা পাশাপাশি বসবাস করত। পদচিহ্নগুলো প্রমাণ করছে, প্রকৃতিই ছিল তাদের প্রথম আশ্রয় ও খাদ্যভাণ্ডার।” উল্লেখ্য, শোনিঙ্গেনের এই হ্রদতীর যেন আজও জীবন্ত হয়ে উঠছে সেই কালের গল্প শুনিয়ে। ৩ লাখ বছরের পুরনো এই পদচিহ্ন প্রমাণ করছে, মানুষ তখনও শিকারি জীবনযাপন করলেও পরিবার ও প্রকৃতির সান্নিধ্যকে সমান গুরুত্ব দিত। এক অর্থে বলা যায়, এই আবিষ্কার আমাদের মানব ইতিহাসের এমন একটি অধ্যায় সামনে এনেছে, যা এতদিন কেবল কল্পনার ভেতরেই ছিল। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, এই ধরনের আবিষ্কার কেবল প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য নয়, বরং মানবসভ্যতার বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের কাছে অমূল্য তথ্য হিসেবে কাজ করবে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই আবিষ্কার আবারও প্রমাণ করল, প্রকৃতির বুকেই লুকিয়ে আছে মানবজাতির অজানা গল্প।

-প্রতীকী চিত্র। সংগৃহীত 
আরও পড়ুন : SpaceX Dragon, Bone Cell Study | মহাকাশে হাড়ের কোষ গবেষণায় নতুন দিগন্ত, ড্রাগনের কক্ষপথ সমন্বয়ে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন

Sasraya News
Author: Sasraya News

Leave a Comment

আরো পড়ুন