সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ সান ফ্রান্সিসকো: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই -এর দ্রুত বিস্তার বিশ্ব প্রযুক্তি শিল্পে এক নতুন অধ্যায় লিখছে। এই পরিবর্তনের ঢেউ সবচেয়ে বেশি আছড়ে পড়ছে প্রযুক্তি সংস্থাগুলির কর্মসংস্থানের কাঠামোয়। এমনই এক তাৎপর্যপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানাল গুগল (Google)। সংস্থার মূল কোম্পানি অ্যালফাবেট (Alphabet) সম্প্রতি ২০২৫ সালে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলারের সর্বকালীন রেকর্ড আয় ঘোষণা করলেও, তার মধ্যেই কর্মীদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে, যারা কোম্পানির ভবিষ্যৎ এআই-কেন্দ্রিক রূপান্তরের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না, তাঁরা চাইলে আগেভাগেই চাকরি ছেড়ে দিতে পারেন। প্রযুক্তি জগতে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। বিজনেস ইনসাইডার-এ (Business Insider) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গুগলের চিফ বিজনেস অফিসার ফিলিপ সিন্ডলার (Philipp Schindler) কর্মীদের উদ্দেশ্যে একটু অভ্যন্তরীণ বার্তায় জানিয়েছেন, ‘কোম্পানির আগামী পথচলা স্পষ্টভাবে এআই-নির্ভর। যাঁরা এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে অসুবিধায় পড়ছেন, তাঁদের জন্য ভলান্টারি এক্সিটের সুযোগ রাখা হয়েছে।’

এই ‘ভলান্টারি এক্সিট’ বা স্বেচ্ছা প্রস্থান প্রকল্পের আওতায় গ্লোবাল বিজনেস অর্গানাইজেশন (Global Business Organization) -এর একাধিক কর্মী আবেদন করতে পারবেন। সেলস, সলিউশন টিম, কর্পোরেট ডেভেলপমেন্ট, বিভিন্ন শাখার কর্মীদের এই বিকল্প দেওয়া হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সংস্থার অন্দরে জারি হওয়া মেমোতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনা এআই-চালিত হওয়ায় দক্ষতার ক্ষেত্রেও বদল আনতে হবে।
ফিলিপ সিন্ডলার (Philipp Schindler) জানিয়েছেন, ‘এটি বাধ্যতামূলক ছাঁটাই নয়। বরং কর্মীদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।’ যারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন, তাঁদের নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে সেভারেন্স প্যাকেজ দেওয়া হবে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট আর্থিক সহায়তা এবং সুবিধা নিয়ে তাঁরা কোম্পানি ছাড়তে পারবেন।
কিন্তু, সব কর্মী এই সুবিধা পাবেন না। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কাস্টমার সেলস টিম এবং যেসব বিভাগ সরাসরি গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করে, তাঁদের ক্ষেত্রে এই প্যাকেজ প্রযোজ্য নয়। সংস্থার বক্তব্য, ওই বিভাগগুলির কার্যক্রম সরাসরি ব্যবসায়িক ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় সেখানে এই স্কিম কার্যকর করা হচ্ছে না। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, গুগলের এই পদক্ষেপ আসলে বৃহত্তর শিল্পপরিবর্তনেরই প্রতিফলন। গত কয়েক বছরে জেনারেটিভ এআই, মেশিন লার্নিং এবং অটোমেশন প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে বহু প্রথাগত কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। সংস্থাগুলি এখন এমন কর্মী চাইছে, যাঁরা এআই টুল ব্যবহার, ডেটা বিশ্লেষণ এবং স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারেন।
গুগলে এই ধরনের ‘স্বেচ্ছা প্রস্থান’ নতুন নয়। অতীতেও পুনর্গঠন পর্বে কর্মীদের এমন বিকল্প দেওয়া হয়েছিল। তবে এ বার বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সংস্থার আর্থিক ফলাফল অত্যন্ত ইতিবাচক হওয়া সত্ত্বেও এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, লাভের অঙ্ক যখন ৪০০ বিলিয়ন ডলার, তখন কেন এই পুনর্বিন্যাস? বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি খরচ কমানো নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি। এআই-কেন্দ্রিক ব্যবসায়িক মডেলে দক্ষ কর্মীবাহিনী গড়ে তুলতেই এই রদবদল। শুধু গুগল নয়, প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যান্য জায়ান্ট সংস্থাও একই পথে হাঁটছে। অ্যামাজন (Amazon), মেটা (Meta) এবং মাইক্রোসফ্ট (Microsoft) ইতিমধ্যেই কর্মীদের জন্য ইনসেনটিভ স্কিম চালু করেছে। যারা এআই-ভিত্তিক নতুন কাজের ধরনে মানিয়ে নিতে পারছেন না, তাঁদের স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে আর্থিক প্রণোদনা সহ।
গুগলের এই পদক্ষেপ প্রযুক্তি শিল্পে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। অনেকের মতে, আগামী দিনে নিয়োগের ক্ষেত্রে এআই-দক্ষতা বাধ্যতামূলক হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, দ্রুত প্রযুক্তিগত রূপান্তরের ফলে দক্ষতা-ঘাটতি তৈরি হতে পারে।সংস্থার একটি অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, ‘এআই শুধু একটি প্রযুক্তি নয়, এটি কাজের সংস্কৃতি বদলে দিচ্ছে।’ ফলে কর্মীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। তবে যাঁরা সেই পথে হাঁটতে রাজি নন, তাঁদের জন্যই খোলা রাখা হয়েছে স্বেচ্ছা প্রস্থানের দরজা। উল্লেখ্য যে, এআই যুগের এই পরিবর্তন কতটা কর্মসংস্থানের মানচিত্র বদলে দেবে, তা সময়ই বলবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার, গুগল (Google) ও অ্যালফাবেট (Alphabet) -এর মতো সংস্থাগুলি ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে এখন থেকেই নিজেদের কাঠামো বদলে নিচ্ছে। প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা যে বাস্তব, সেই বার্তাই যেন স্পষ্ট করে দিল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থা।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Amazon 16000 layoffs, AI replacing jobs | AI-এর ক্রমবর্ধমান দাপটে চাকরি হারাল Amazon-এর ১৬,০০০ কর্মী, কর্পোরেট জগতে চাঞ্চল্য




