সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক ★ কলকাতা : ভারতীয় ক্রিকেটে এখন থেকেই শুরু হয়ে গেল বড় পরিকল্পনার হিসেব। এক দিকে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজ, অন্য দিকে ২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপের প্রস্তুতি। দুই দিক সামলাতে গিয়ে ক্রিকেটারদের ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট নিয়ে বড় সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিলেন ভারতের প্রধান কোচ গৌতম গম্ভীর (Gautam Gambhir)। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিউজিল্যান্ড সফরে টেস্টের আগে সাদা বলের ক্রিকেট থেকে কয়েক জন প্রথম সারির ক্রিকেটারকে সাময়িক বিরতি দেওয়া হতে পারে। টেস্ট ক্রিকেটের প্রস্তুতিকে যথেষ্ট সময় দেওয়াই এই পরিকল্পনার মূল কারণ। নিউজিল্যান্ড সফরের সূচিই এই ভাবনার অন্যতম কারণ। ভারতের দীর্ঘ সফরে তিন ফরম্যাটের ক্রিকেট রয়েছে। পাঁচ ম্যাচের এক দিনের সিরিজের শেষ ম্যাচটি ১৬ নভেম্বর তৌরাঙ্গায় হওয়ার কথা। তার মাত্র তিন দিন পর, ১৯ নভেম্বর ওয়েলিংটনে শুরু হবে প্রথম টেস্ট। অর্থাৎ ওয়ানডে সিরিজ শেষ হওয়ার পর টেস্টের জন্য ক্রিকেটারদের হাতে প্রস্তুতির সময় অত্যন্ত কম। পাঁচ দিনের ক্রিকেটের জন্য মানসিক ও শারীরিকভাবে তৈরি হতে এই সময় যথেষ্ট কি না, তা নিয়েই ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট ভাবছে।
এই পরিস্থিতিতে গম্ভীরের বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে, টেস্ট দলের গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারদের কয়েকটি ওয়ানডে থেকে সরিয়ে রাখা হতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা তিন ফরম্যাটেই দলের পরিকল্পনার অংশ, তাঁদের ক্ষেত্রে বিশ্রামের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। শুভমন গিল (Shubman Gill), কেএল রাহুল (KL Rahul), যশস্বী জয়সওয়াল (Yashasvi Jaiswal), জসপ্রীত বুমরাহ (Jasprit Bumrah), মহম্মদ সিরাজ (Mohammed Siraj), রবীন্দ্র জাদেজা (Ravindra Jadeja) ও নীতীশ কুমার রেড্ডি (Nitish Kumar Reddy) -এর মতো ক্রিকেটারদের ওয়ার্কলোড নিয়ে ভাবনাচিন্তা হতে পারে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে চূড়ান্ত বিশ্রাম বা ম্যাচভিত্তিক সিদ্ধান্ত এখনও ঘোষণা করা হয়নি। গম্ভীরের যুক্তি, টি-টোয়েন্টি থেকে ওয়ানডেতে যাওয়ার তুলনায় ওয়ানডে থেকে সরাসরি টেস্ট ক্রিকেটে ঢোকা অনেক বেশি কঠিন। ৫০ ওভারের ক্রিকেটের পর মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে পাঁচ দিনের ম্যাচের জন্য প্রস্তুত হতে গেলে ব্যাটিংয়ের ধরন, মানসিক প্রস্তুতি, শরীরের কাজের ধরন প্রভৃতি সব ক্ষেত্রেই দ্রুত বদল আনতে হয়।
তা-ই টেস্টকে সামনে রেখে সাদা বলের ক্রিকেটে সাময়িক বিরতি দেওয়া হলে ক্রিকেটাররা লাল বলের ক্রিকেটে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পাবেন। জিয়োস্টারের সঙ্গে কথোপকথনে গম্ভীরও টেস্ট প্রস্তুতির জন্য ব্যাটারদের সাদা বলের ক্রিকেট থেকে বিরতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবে এই পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও বড় একটি বিষয় তিন ফরম্যাটে নিয়মিত খেলা ক্রিকেটারের সংখ্যা ভবিষ্যতে কমতে পারে। গম্ভীরের মতে, কোচ ও নির্বাচকেরা স্বাভাবিক ভাবেই চান যত বেশি ক্রিকেটার তিন ফরম্যাটে খেলুন। তাতে দলের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সহজ হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান সূচী, ম্যাচের চাপ এবং চোটের ঝুঁকির কারণে সব ফরম্যাটে একই ক্রিকেটারকে নিয়মিত খেলানো ক্রমশ কঠিন হচ্ছে। ফলে পেসার থেকে স্পিনার প্রায় সব ধরনের ক্রিকেটারকেই প্রয়োজন অনুযায়ী ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে খেলানোর প্রয়োজন হতে পারে। এখানেই গম্ভীরের টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে অবস্থানও সামনে এসেছে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, একটি দেশের ক্রিকেট কাঠামোর শক্তি বিচার করতে গেলে লাল বলের ক্রিকেটের গুরুত্ব উপেক্ষা করা যায় না। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সাফল্য থাকলেই একটি দেশকে দীর্ঘস্থায়ী ভাবে শক্তিশালী ক্রিকেটীয় দেশ বলা যায় না। নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদেরও টেস্ট ক্রিকেটের গুরুত্ব বোঝানো প্রয়োজন বলে মনে করেন ভারতের কোচ। ফলে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে আসন্ন টেস্ট সিরিজকে সামনে রেখে প্রথম সারির ক্রিকেটারদের প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময় দেওয়ার ভাবনাকে সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসাবেই দেখা হচ্ছে।
নিউজিল্যান্ড সফর ভারতের জন্য এখন আর একটি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ না। টেস্ট ম্যাচগুলির সঙ্গে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (World Test Championship) হিসাবও জড়িয়ে রয়েছে। ফলে সফরের লাল বলের অংশকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। একই সময়ে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতিও চালিয়ে যেতে হবে। এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন টিম ম্যানেজমেন্টের বড় কাজ। বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে গম্ভীর আরও একটি বিষয়ে জোর দিয়েছেন, ফিটনেস এবং ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বড় প্রতিযোগিতার আগে কোনও ক্রিকেটারকে অর্ধেক প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামানো যাবে না। বিশ্বকাপের মতো আসরে যাওয়ার আগে পর্যাপ্ত ম্যাচ খেলা, ছন্দে থাকা এবং শরীরকে পুরোপুরি প্রস্তুত রাখাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। অর্থাৎ শুধু চোট থেকে সেরে ওঠাই যথেষ্ট নয়, ম্যাচ পরিস্থিতিতে নিয়মিত পারফর্ম করার অভ্যাসও প্রয়োজন।
এই জায়গাতেই হার্দিক পাণ্ডিয়া (Hardik Pandya) ও জসপ্রীত বুমরাহর প্রসঙ্গ বিশেষ ভাবে এসেছে। দু’জনকেই ২০২৭ সালের বিশ্বকাপ পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটার হিসেবে দেখছেন গম্ভীর। বুমরাহ এশিয়ান গেমসের দায়িত্বের কারণে নিউজিল্যান্ডের নির্দিষ্ট সাদা বলের পর্বে থাকছেন না। অন্য দিকে হার্দিক এখনও ওয়ানডেতে পুরো ১০ ওভার বল করার মতো অবস্থায় পৌঁছননি। ফলে তাঁকে নিয়ে ম্যাচ খেলার সময় এবং ধীরে ধীরে ওয়ার্কলোড বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। হার্দিকের ক্ষেত্রে শুধু ফিট হয়ে ওঠাই যথেষ্ট নয়, নিয়মিত ক্রিকেটে ফিরে ম্যাচের ছন্দ পাওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন গম্ভীর। আইপিএলের (IPL) পর হার্দিকের ম্যাচ খেলার পরিমাণ কম হওয়ায় তাঁর পর্যাপ্ত গেম টাইম দরকার বলে জানিয়েছেন ভারতের কোচ। বিশেষ করে তিনি যদি শুধু ওয়ানডে ক্রিকেট খেলেন, তা হলে বিশ্বকাপের আগে ম্যাচের সংখ্যা পর্যাপ্ত নাও হতে পারে, এমনই উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন গম্ভীর।
হার্দিক ও বুমরাহর গুরুত্বের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন ভারতের কোচ। এক জন এমন অলরাউন্ডার, যিনি ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি ১০ ওভার বল করার সক্ষমতা রাখেন; অন্য জন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পেস বোলিং বিকল্প হিসেবে ভারতের পরিকল্পনায় রয়েছেন। ছয় বা সাত নম্বরে ব্যাট করে ১০ ওভার বল করতে পারেন, এমন ক্রিকেটার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সহজে পাওয়া যায় না। তাই তাঁদের সম্পূর্ণ ফিট অবস্থায় পাওয়া ভারতীয় দলের ভারসাম্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে গম্ভীরের বক্তব্যে উঠে এসেছে। অন্য দিকে, ভারতের অধিনায়ক শুভমন গিলকেও ঘিরে গম্ভীরের বক্তব্যে আস্থা ধরা পড়েছে। এক দিনের ক্রিকেটে গিলের সাম্প্রতিক সময় খুব মসৃণ না গেলেও দলের তরফে তাঁর উপর আস্থা রয়েছে। অধিনায়ক হিসাবে তাঁকে কঠিন নির্বাচনী সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে এবং সেই দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি রোহিত শর্মা (Rohit Sharma) ও বিরাট কোহলি (Virat Kohli) -এর মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার বিষয়টিও গম্ভীর উল্লেখ করেছেন।
ভারতীয় দলের সামনে তাই একই সময়ে দু’টি আলাদা সময়সীমা কাজ করছে। খুব কাছের লক্ষ্য নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজ, আর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবোয়ে ও নামিবিয়ায় আয়োজিত ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ। এক দিকে টেস্টের জন্য লাল বলের প্রস্তুতি, অন্য দিকে বিশ্বকাপের জন্য সাদা বলের ক্রিকেট, দুই ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেটারদের শারীরিক ভাবে প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, চোটের সংখ্যা এবং ক্রিকেটারদের বারবার মাঠের বাইরে চলে যাওয়া নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টকে ভাবতে হয়েছে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেই বিসিসিআই (BCCI) -এর বৈঠকের আলোচনায় বিশ্বকাপের পরিকল্পনার পাশাপাশি ইনজুরি ম্যানেজমেন্টও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল। ফলে গম্ভীরের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে শুধু একটি সিরিজের দল নির্বাচন হিসাবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। এর মধ্যে রয়েছে আগামী এক বছরের ক্রিকেট সূচি সামলানোর পরিকল্পনাও।
নিউজিল্যান্ড সফরে সাদা বলের কয়েকটি ম্যাচে যদি প্রথম সারির ক্রিকেটারদের বিশ্রাম দেওয়া হয়, তা হলে তার ফলে তরুণ বা দ্বিতীয় সারির ক্রিকেটারদের সামনে সুযোগ তৈরি হতে পারে। আবার টেস্ট দলের নিয়মিত সদস্যদের হাতে লাল বলের প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময়ও আসবে। তবে শেষ পর্যন্ত কোন ক্রিকেটার কোন ম্যাচে খেলবেন, তা নির্বাচকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে। এখন দেখার তাই, শুধু নিউজিল্যান্ড সিরিজের সূচীর দিকে নয়, ভারতীয় দলের স্কোয়াড ব্যবস্থাপনার দিকেও। গম্ভীরের বক্তব্যে যে ছবি উঠে এসেছে, তাতে প্রতিটি ম্যাচে একই একাদশ নামানোর বদলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্রিকেটারদের ব্যবহার করার ভাবনা গুরুত্ব পাচ্ছে। টেস্টের আগে বিশ্রাম, বিশ্বকাপের আগে পর্যাপ্ত ম্যাচ, আর চোট থেকে ফেরা ক্রিকেটারদের ধাপে ধাপে তৈরি করা, ভারতের আগামী ক্রিকেট ক্যালেন্ডারে এই তিনটি বিষয়ই বড় হয়ে উঠতে চলেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Priyanka Chopra brunch recipe | দেরিতে ঘুম ভাঙলে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার পছন্দ ‘ব্রাঞ্চ’! ঘরোয়া ওমলেট আর বাটার টোস্টে কী ভাবে রাখেন ফিটনেস ও স্বাদের ভারসাম্য




