সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ : কলকাতার নিউ টাউনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ও পরিকাঠামোয় বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করল আদানি গোষ্ঠী (Adani Group)। বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর নিউ টাউনে ২০০০ শয্যার ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’ (Adani Arogya Mandir) -এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানি (Gautam Adani) জানান, ২০৩৫ সালের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। হাসপাতাল, মেডিক্যাল কলেজ ও গবেষণার পাশাপাশি বন্দর, লজিস্টিক্স, বিদ্যুৎ, রাস্তা, সেতু, গ্রিন সিমেন্ট এবং হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের মতো ক্ষেত্রেও তিনি বিনিয়োগের কথা জানিয়েছেন বলে উল্লেখ।
নিউ টাউনের বেঙ্গল সিলিকন ভ্যালি টেক হাব এলাকায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে গৌতম আদানি বলেন, পূর্ব ভারতে আদানি গোষ্ঠীর দীর্ঘস্থায়ী কাজের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ জায়গা নিতে চলেছে। গুজরাতের মুন্দ্রাকে নিজের শিল্পযাত্রার প্রথম বড় কর্মভূমি হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাকে পূর্বাঞ্চলে গোষ্ঠীর নতুন কর্মভূমি হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে কলকাতার ভৌগোলিক অবস্থান, বাংলার শিল্প-সংস্কৃতির ঐতিহ্য এবং উত্তর-পূর্ব ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের সম্ভাবনার কথা। এই অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’। ৫১.৭৫ একর জমির উপর গড়ে ওঠার কথা এই বৃহৎ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের। প্রকল্পটির জন্য চার হাজার কোটি টাকারও বেশি বিনিয়োগ করবে আদানি গোষ্ঠী। ২০০০ শয্যার এই প্রতিষ্ঠানকে অলাভজনক চিকিৎসা পরিকাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। মোট শয্যার অর্ধেক অর্থাৎ ১০০০টি শয্যা আর্থিক ভাবে দুর্বল পরিবারের রোগীদের জন্য নির্ধারিত থাকবে বলে জানিয়েছেন গৌতম আদানি। রাজ্য ও কেন্দ্রের স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের আওতায় থাকা যোগ্য রোগীরা এই সুবিধা পাবেন বলে জানানো হয়েছে।
শুধু হাসপাতাল তৈরি করেই প্রকল্পটি সীমাবদ্ধ থাকছে না। পরিকল্পিত মেডিক্যাল ক্যাম্পাসে মেডিক্যাল কলেজ, গবেষণাকেন্দ্র, নার্সিং শিক্ষা এবং প্যারামেডিক্যাল প্রশিক্ষণের পরিকাঠামোও থাকবে। আদানি গোষ্ঠীর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মেডিক্যাল কলেজে প্রতি বছর স্নাতক স্তরে ১৫০ জন, স্নাতকোত্তর স্তরে ১০০-র বেশি ও সুপার-স্পেশ্যালিটি পর্যায়ে ৪০-র বেশি শিক্ষার্থী নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে নিউ টাউনের এই প্রকল্পকে কেবল চিকিৎসা পরিষেবার কেন্দ্র নয়, চিকিৎসা শিক্ষা ও গবেষণার একটি বড় পরিসর হিসেবেও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসা-সহ উন্নত তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে আদানি গোষ্ঠী। পাশাপাশি রোগীদের আত্মীয়দের থাকার জন্য মেডিটেল ও বিশ্রামগৃহের ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
হাসপাতালকে ঘিরে তৈরি হতে চলা এই পরিকাঠামোয় চিকিৎসক, নার্স, প্রযুক্তিবিদ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও রাখার কথা বলা হয়েছে। এই স্বাস্থ্য প্রকল্পের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গে আরও বড় বিনিয়োগের রূপরেখা তুলে ধরেছেন গৌতম আদানি। ২০৩৫ সালের মধ্যে এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের যে পরিকল্পনার কথা তিনি জানিয়েছেন, তার আওতায় থাকছে বন্দর ও লজিস্টিক্স, নবীকরণযোগ্য শক্তি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বণ্টন, রাস্তা, সেতু, রোপওয়ে, গ্রিন সিমেন্ট এবং হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার। অর্থাৎ নিউ টাউনের হাসপাতাল প্রকল্পকে সামনে রেখে রাজ্যে আদানি গোষ্ঠীর শিল্প বিনিয়োগের পরিধি আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনাই প্রকাশ্যে এসেছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যানের স্ত্রী প্রীতি আদানি (Priti Adani) ও পুত্র করণ আদানিও (Karan Adani) অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের আগে গৌতম আদানি কলকাতার কালীঘাট মন্দিরে পুজো দেন। পরে নিউ টাউনের মঞ্চে বাংলায় বক্তব্য শুরু করেন তিনি। কলকাতা ও বাংলার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের বক্তব্যের সূচনা করেন আদানি। উল্লেখ্য, বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্প, স্থাপত্য ও উৎসবের প্রসঙ্গও তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। শিল্পায়নের সঙ্গে রাজ্যের ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টিকেও তিনি যুক্ত করেন। আদানি গোষ্ঠীর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রকল্পেও সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। একই অনুষ্ঠানে ঐতিহাসিক রাইটার্স বিল্ডিং পুনরুদ্ধারের জন্য আদানি গোষ্ঠীর সঙ্গে সমঝোতার কথাও জানানো হয়েছে।
আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যানের বক্তব্যে বাংলার ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গ এক দিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশপথ, অন্য দিকে বঙ্গোপসাগর হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যপথের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বন্দর, লজিস্টিক্স, বিদ্যুৎ ও সড়ক পরিকাঠামোয় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজ্যের অবস্থানকে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। হাসপাতাল প্রকল্পকে ঘিরে কর্মসংস্থানের দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। আদানি গোষ্ঠীর হিসাব অনুযায়ী, ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’ এবং সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য পরিকাঠামো মিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রযুক্তিবিদ থেকে শুরু করে হাসপাতাল পরিচালনা ও পরিষেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বহু ক্ষেত্রেই কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ার কথা। শুধু হাসপাতাল নয়, নিউ টাউনে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যনগরী গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও অনুষ্ঠানে উঠে এসেছে। রাজ্য সরকারের বক্তব্যে প্রকল্পটিকে বৃহত্তর ‘মেডিসিটি’ হিসেবে দেখার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে চিকিৎসা, মেডিক্যাল শিক্ষা, গবেষণা, রোগীর পরিচর্যা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ একই পরিসরের মধ্যে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখ্য, গৌতম আদানির ঘোষণার ফলে এখন লক্ষ্য থাকবে পরবর্তী বিনিয়োগ প্রকল্পগুলির বাস্তবায়নের দিকে। ২০৩৫ সালের মধ্যে এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের যে রূপরেখা প্রকাশ করা হয়েছে, তা বাস্তবে কত দ্রুত এবং কোন কোন ধাপে কার্যকর হয়, সেটিই পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপাতত নিউ টাউনের ২০০০ শয্যার ‘আদানি আরোগ্য মন্দির’ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আদানি গোষ্ঠীর নতুন বিনিয়োগ অধ্যায়ের আনুষ্ঠানিক সূচনা হল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Neelam Meena, West Bengal CEO | পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক নীলম মিনা, প্রশাসনে অভিজ্ঞতার নতুন অধ্যায়




