সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ দক্ষিণ ২৪ পরগণা : দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা বিধানসভা কেন্দ্র ঘিরে পুনর্নির্বাচনের ঠিক আগে তৈরি হল এক চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি। ভোটের মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে হঠাৎ করেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী জাহাঙ্গির খান (Jahangir Khan)। মঙ্গলবার ভোটপ্রচারের শেষ দিনে তাঁর এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) ঘোষিত উন্নয়ন প্যাকেজকে ‘স্বাগত’ জানিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন জাহাঙ্গির, যা ফলতার ভোট রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
সাংবাদিক বৈঠকে জাহাঙ্গির বলেন, ‘আমি এই ভোটে লড়ছি না। ফলতার মানুষের ভালোর কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ যদিও তিনি স্পষ্ট করে জানাননি, এই সিদ্ধান্তের পেছনে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) বা দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কোনও ভূমিকা রয়েছে কি না। অন্য দিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সামাজিক মাধ্যমে জানানো হয়েছে, এটি সম্পূর্ণ জাহাঙ্গিরের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, দলের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। জাহাঙ্গির তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, ‘ফলতার উন্নয়নের জন্য যে বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, সেটাকে আমি স্বাগত জানাই। আমি চাই ফলতা শান্তিপূর্ণ থাকুক এবং আরও এগিয়ে যাক।’ তাঁর কণ্ঠে আবেগ ধরা পড়ে যখন তিনি নিজের ‘সোনার ফলতা’ গড়ার স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ‘এই পুনর্নির্বাচনের লড়াই থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছি, যাতে উন্নয়নের পথ সুগম হয়।’
উল্লেখ্য, মনোনয়ন প্রত্যাহারের সময়সীমা ইতিমধ্যেই পেরিয়ে গিয়েছে। ফলে তিনি ভোটে না লড়লেও ইভিএমে তাঁর নাম থেকেই যাবে। এই পরিস্থিতিতে ভোটের ফলাফল কোন দিকে গড়াবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তৈরি হয়েছে নানা সম্ভাবনা। এদিকে, জাহাঙ্গিরের এই ঘোষণার ঠিক পরেই ফলতায় বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। গেরুয়া আবিরে রাস্তায় নেমে পড়েন তাঁরা। বিজেপির প্রার্থী দেবাংশু পণ্ডা (Debangshu Panda) -এর সমর্থনে ওই দিনই ফলতায় রোড শো করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর প্রচারে জোরদার ভিড়ও চোখে পড়ে। শুভেন্দু আগেই সভা থেকে ঘোষণা করেছিলেন, ফলতার উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হবে, তবে তার জন্য বিজেপি প্রার্থীকে বিপুল ভোটে জয়ী করতে হবে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই ঘটনা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ, গত ২৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বিধানসভা নির্বাচনে ফলতা কেন্দ্রের একাধিক বুথে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ইভিএমে কারচুপি, কালি লাগানো, টেপ ব্যবহার—এই সব অভিযোগের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে পুনর্নির্বাচনের দাবি ওঠে। সেই সময় বিরোধী দলনেতা হিসাবে শুভেন্দু অধিকারী নিজেও বিষয়টি তুলে ধরেন এবং পুনরায় ভোটগ্রহণের দাবি জানান। পরে নির্বাচন কমিশন পুনর্নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়।
এর পর ৪ মে অন্যান্য আসনের ফল ঘোষণা হলে দেখা যায়, বিজেপি রাজ্যে প্রথম বার সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে। কিন্তু ফলতা কেন্দ্রটি পুনর্নির্বাচনের কারণে আলাদা করে রাজনৈতিক গুরুত্ব পায়। সেই পরিস্থিতিতে তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে জাহাঙ্গির খানকে সামনে এনে লড়াইয়ের ময়দান সাজানো হয়েছিল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও শেষ দফার আগে তাঁর হয়ে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তার পর আর তৃণমূলের বড় কোনও নেতাকে ফলতায় প্রচারে দেখা যায়নি। এই সময়ের মধ্যে জাহাঙ্গির নিজে একাধিকবার সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। নিজেকে ‘পুষ্পা’ বলে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘আমি মাথা নোয়াব না।’ এমনকি ডায়মন্ড হারবার পুলিশ জেলার পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মা (Ajaypal Sharma)-কে উদ্দেশ্য করে তিনি সরব হয়েছিলেন।
কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে শেষ মুহূর্তে। সোমবার কলকাতা হাই কোর্টে গিয়ে গ্রেফতারি এড়াতে আইনি সুরক্ষা নেন জাহাঙ্গির। এরপরই মঙ্গলবার তাঁর সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে দেয়। যদিও অনিয়ম সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, ‘আমি নিয়ম মেনে নির্বাচন করেছি। কোথাও কোনও কারচুপি আমার নির্দেশে হয়নি।’ এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফলতা বিধানসভায় ভোটের আগে উত্তেজনা তুঙ্গে। জাহাঙ্গিরের এই পদক্ষেপ ভোটারদের উপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখন দেখার বিষয়। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই সিদ্ধান্ত ভোটের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। একই সঙ্গে এটি রাজ্যের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে এক নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Abhishek Banerjee FIR High Court, TMC leader FIR case | FIR-কে চ্যালেঞ্জ, হাইকোর্টে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়! নির্বাচনী মন্তব্য ঘিরে আইনি লড়াই তীব্র




