সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারতে জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আখচাষীদের আয় বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ইথানল (Ethanol) উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ায় সমবায় চিনি কলগুলির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় সরকার জানিয়েছে, ইথানল সরবরাহের ক্ষেত্রে সমবায় চিনি কলগুলিকে কোনও ধরনের বৈষম্যের মুখে পড়তে হচ্ছে না এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই তাদের অর্থ প্রদান করা হচ্ছে। এই তথ্য রাজ্যসভায় লিখিত উত্তরে তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সমবায় মন্ত্রী ‘অমিত শাহ (Amit Shah)’। তিনি জানান, ‘ইথানল ক্রয়ের শর্ত অনুযায়ী সরকারি তেল বিপণন সংস্থাগুলির কাছে ইথানল সরবরাহকারী সব সংস্থাকেই ২১ দিনের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই অর্থ প্রদান করা হয়।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সমবায় চিনি কল এবং বেসরকারি চিনি কলের মধ্যে কোনও ধরনের ভেদাভেদ বা বিলম্বিত অর্থপ্রদানের ঘটনা সরকারিভাবে রিপোর্ট করা হয়নি। ভারতের জ্বালানি নীতিতে ইথানল মিশ্রণ কর্মসূচী বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। পেট্রোলের সঙ্গে ইথানল মিশিয়ে জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে যেমন আমদানি করা জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষি ও চিনি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে আখচাষী এবং চিনি কলগুলির জন্য এই কর্মসূচি অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন সমবায় চিনি কল বর্তমানে ইথানল উৎপাদনের জন্য ডিস্টিলারি ইউনিট পরিচালনা করছে। এই ইউনিটগুলির মাধ্যমে উৎপাদিত ইথানল সরাসরি সরকারি তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে সরবরাহ করা হয়। যেমন ‘ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন (Indian Oil Corporation)’, ‘ভারত পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (Bharat Petroleum Corporation Limited)’ এবং ‘হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন লিমিটেড (Hindustan Petroleum Corporation Limited)’ এই ধরনের পাবলিক সেক্টর তেল সংস্থাগুলি নির্দিষ্ট চুক্তির ভিত্তিতে ইথানল সংগ্রহ করে থাকে। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই সরবরাহ ব্যবস্থায় সমবায় চিনি কলগুলিকে সম্পূর্ণ সমানভাবে বিবেচনা করা হয়। অর্থাৎ বেসরকারি চিনি কলগুলির মতোই সমবায় চিনি কলগুলিও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তাদের পাওনা অর্থ পেয়ে থাকে। ‘অমিত শাহ (Amit Shah)’ সংসদে জানান, ‘সরকারের কাছে এমন কোনও অভিযোগ আসেনি যেখানে সমবায় চিনি কলগুলিকে বেসরকারি চিনি কলের তুলনায় কম গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বা তাদের অর্থপ্রদানে বিলম্ব হয়েছে।’
সমবায় চিনি কলগুলির আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিষয়েও সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইথানল উৎপাদন এবং সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় ডিস্টিলারি ইউনিট পরিচালনা করতে গেলে বড় অঙ্কের কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন হয়। এই প্রয়োজন মেটাতে সমবায় চিনি কলগুলি ব্যাঙ্ক ঋণ এবং বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিতে পারে। এছাড়াও সমবায় খাতকে শক্তিশালী করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ‘ন্যাশনাল কোঅপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন (National Cooperative Development Corporation বা NCDC)’। এই সংস্থাটি সমবায় মন্ত্রকের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত সংস্থা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সমবায় চিনি কলগুলিকে সহজে কার্যকরী মূলধন পেতে সাহায্য করার জন্য এই সংস্থা তাদের ভাসমান সুদের হার বা ‘ফ্লোটিং ইন্টারেস্ট রেট’ কমিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদের হার কমানোর এই সিদ্ধান্ত সমবায় চিনি কলগুলির জন্য বড় স্বস্তির খবর। কারণ এর ফলে তারা কম সুদে ঋণ পেতে পারবে এবং ইথানল উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নত করতে পারবে। এতে একদিকে যেমন শিল্পের উন্নতি হবে, অন্যদিকে কৃষকদের আয়ও বাড়বে। উল্লেখ্য, ভারতের চিনি শিল্প মূলত কৃষিনির্ভর এবং লক্ষ লক্ষ আখচাষী এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। সমবায় চিনি কলগুলি অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের মালিকানাধীন বা কৃষকদের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়। ফলে এই শিল্পের উন্নতি হলে সরাসরি লাভবান হন আখচাষীরা। অর্থনীতিবিদদের মতে, ইথানল উৎপাদন বৃদ্ধি এবং সমবায় চিনি কলগুলিকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করার উদ্যোগ দেশের জ্বালানি নীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশীয় জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে কৃষিনির্ভর শিল্পের বিকাশও ত্বরান্বিত হবে।
সংসদে ‘অমিত শাহ (Amit Shah)’ আরও বলেন, ‘সমবায় খাতকে শক্তিশালী করা সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। ইথানল উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় সমবায় চিনি কলগুলির সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।’ বিশেষজ্ঞদের মত, ইথানল অর্থনীতির সম্প্রসারণের ফলে ভবিষ্যতে চিনি শিল্পের কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ ঐতিহ্যগতভাবে চিনি উৎপাদনের উপর নির্ভরশীল এই শিল্প এখন ধীরে ধীরে জ্বালানি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সংসদে প্রকাশিত এই তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, সমবায় চিনি কলগুলিকে ইথানল সরবরাহ ব্যবস্থায় সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর জন্যও সরকার একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ফলে আগামী দিনে ইথানল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সমবায় খাতের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Indian farmers benefit US trade deal | কৃষিতে ‘ট্রাম্প কার্ড’ খেলেই বাজিমাত নতুন দিল্লির, ভারত-আমেরিকা বাণিজ্য সমঝোতায় শুল্ক ছাড়ে লাভবান হবেন ভারতীয় কৃষকরাই




