সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ স্পোর্টস ডেস্ক : বিশ্বকাপের মঞ্চে উত্তেজনার পারদ চড়াল ইংল্যান্ড (England) বনাম নরওয়ে (Norway) ম্যাচ। ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইংল্যান্ড, তবে ম্যাচের ফলাফল ছাপিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি বিতর্কিত গোল। জুড বেলিংহ্যাম (Jude Bellingham) -এর করা প্রথম গোলকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছে নরওয়ে শিবির, যা নিয়ে ম্যাচ-পরবর্তী সময়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত ম্যাচের প্রথমার্ধে। ইংল্যান্ডের আক্রমণের সময় বলটি হঠাৎই অদ্ভুতভাবে দিক বদলে নিচে নামে বলে অভিযোগ। নরওয়ের ফুটবলারেরা দাবি করেন, বলটি নাকি মাঠের উপরে থাকা স্পাইডার ক্যামেরার তারে লেগেছিল। সেই কারণে বলের গতি ও দিক পরিবর্তিত হয় এবং তার সুযোগ নিয়ে বেলিংহ্যাম সহজেই গোলটি করে দেন।
গোল হতেই নরওয়ের ফুটবলারেরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং রেফারি ক্লেমঁ তুরপঁকে (Clément Turpin) ঘিরে ধরেন। তাঁরা গোলটি বাতিল করার দাবি তোলেন। কিন্তু রেফারি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন এবং গোল বৈধ বলে ঘোষণা করেন। ফলে ইংল্যান্ড এগিয়ে যায় ম্যাচে। ফুটবলের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, বল যদি খেলার সময় কোনও বাহ্যিক বস্তুর সংস্পর্শে আসে, যেমন ক্যামেরার তার, তাহলে খেলা থামিয়ে ড্রপ বলের মাধ্যমে পুনরায় শুরু করতে হয়। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই নরওয়ে শিবিরের আপত্তি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। তবে রেফারি তুরপঁ মনে করেন, এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি, তাই খেলা থামানোর প্রয়োজন হয়নি।
ম্যাচ শেষে এই বিতর্ক আরও তীব্র হয়। ফিফা (FIFA) কর্তৃপক্ষ প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দেয়। তারা জানায়, বর্তমান প্রতিযোগিতায় ব্যবহৃত ‘কানেক্টেড বল’ প্রযুক্তিতে বলের ভিতরে থাকা চিপের মাধ্যমে প্রতিটি স্পর্শ রেকর্ড করা হয়। সেই প্রযুক্তি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সময়ে বল কোনও কিছুর সঙ্গে সংস্পর্শে আসেনি। ফলে গোলটি বৈধ বলেই গণ্য করা হয়েছে। তবে এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি নরওয়ে শিবির। দলের সহকারী কোচ কেন্ট বার্গারসেন (Kent Bergersen) ম্যাচের পর বলেন, ‘গোলের ঠিক আগে বল ক্যামেরার তারে লেগেছিল বলেই আমাদের ধারণা। তার ফলে বলের গতিপথ বদলে যায়। রেফারির সেটা খেয়াল করা উচিত ছিল। এখন সিদ্ধান্ত বদলানোর আর সুযোগ নেই, মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই।’
নরওয়ের প্রধান কোচ স্টেল সলবাকেন (Ståle Solbakken) কিছুটা সংযত সুরে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, ‘রেফারি জানিয়েছেন তিনি ঘটনাটি দেখেননি। তিনিও কোনও সিগন্যাল পাননি যে বল কোথাও লেগেছে। ফিফার প্রযুক্তি যখন বলছে সংস্পর্শ হয়নি, তখন সেটাই মেনে নিতে হবে। তবে বলের গতিপথ দেখে মনে হয়েছে কিছু একটা ঘটেছিল। আমি নিজে দেখতে পাইনি, কিন্তু আমাদের সহকারী কোচ তা দেখেছেন। বল তো হঠাৎ করে আকাশ থেকে পড়ে না, কিছু না কিছু তো হয়েছিল।’ নরওয়ের তারকা ফুটবলার আর্লিং হালান্ড (Erling Haaland) ম্যাচের ফলাফল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় ছোট ছোট মুহূর্তই ম্যাচের ফল নির্ধারণ করে। আজকের ম্যাচে অনেক সিদ্ধান্ত আমাদের বিপক্ষে গিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে লড়াই করা কঠিন হয়ে পড়ে।’
এই বিতর্কের মধ্যেই ইংল্যান্ড তাদের জয় নিশ্চিত করে সেমিফাইনালে পৌঁছে গিয়েছে। তবে ম্যাচের এই মুহূর্তটি নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। ফুটবল মহলে প্রযুক্তি বনাম মানবিক সিদ্ধান্ত, এই দ্বন্দ্ব আবারও সামনে এসেছে। একদিকে রেফারির মাঠের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে প্রযুক্তির তথ্য, দু’টির মধ্যে পার্থক্য দেখা গেলে কোনটি শেষ কথা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে স্পাইডার ক্যামেরা বা অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির উপস্থিতিতে খেলার নিয়ম কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। মাঠে থাকা রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, এই নীতিই এখনো কার্যকর, তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমীকরণে পরিবর্তন আসছে।
ইংল্যান্ড শিবির অবশ্য এই বিতর্ক নিয়ে মুখ খুলতে খুব একটা আগ্রহী নয়। তাদের লক্ষ্য এখন সেমিফাইনাল। কিন্তু নরওয়ে শিবিরে এই ম্যাচের স্মৃতি সহজে মুছে যাওয়ার নয়। তারা মনে করছে, ম্যাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত তাদের বিপক্ষে গিয়েছে, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এমন বিতর্ক নতুন নয়। তবে প্রতিবারই তা নতুন করে প্রশ্ন তোলে, খেলার ন্যায়সংগততা, প্রযুক্তির ভূমিকা এবং রেফারির সিদ্ধান্ত, এই তিনের ভারসাম্য কতটা ঠিকভাবে বজায় রাখা যাচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : FIFA World Cup 2026 Messi | ৩-১ জয়ে সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা, টানা দ্বিতীয়বার শেষ চারে লিওনেল মেসি




