সাশ্রয় নিউজ ★ আহমেদাবাদ : স্বপ্ন ছিল একসঙ্গে থাকা। বিদেশ বিভুঁইয়ে সন্তানদের সঙ্গে নতুনভাবে গড়ে তোলা সংসার। সেই স্বপ্নই এক লহমায় গুঁড়িয়ে গেল আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায়। বৃহস্পতিবারের সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল পাঁচজনের। একটি গোটা পরিবারের। শিশুসহ সব সদস্যই মারা গেলেন। মুহূর্তেই নিভে গেল একটির পর একটি প্রাণ, হাসিমাখা মুখগুলো মিশে গেল বিমানের ধ্বংসস্তূপে। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক ডাঃ কোমি ব্যাস (Dr. Komi Vyas), তাঁর স্বামী ড. প্রতীক যোশী (Dr. Pratik Joshi), যমজ পুত্র প্রদ্যুৎ (Pradyut) ও নকুল (Nakul) এবং কন্যা মিরায়া (Miraya)। আট বছরের মিরায়া ছিল বড়, আর দুই ভাইয়ের বয়স মাত্র পাঁচ।

পরিবারের এই মর্মান্তিক পরিণতির পেছনে রয়েছে এক আবেগঘন প্রেক্ষাপট। দীর্ঘ দশ বছরের বিবাহিত জীবনে, পেশাগত কারণে কোমি ও প্রতীক একসঙ্গে থাকতে পারেননি। কোমি ব্যাস ছিলেন উদয়পুর (Udaipur)-এর একটি সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক। সন্তানদের নিয়ে তিনিই ভারতে সামলাচ্ছিলেন সংসার। আর স্বামী প্রতীক ছিলেন কর্মরত লন্ডনে (London)। এতদিনের দূরত্বের অবসান ঘটিয়ে, এবার কোমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন সব ছেড়ে, লন্ডনে স্বামীর কাছে চলে যাবেন। সন্তানদের নিয়ে নতুন এক জীবনের সূচনা করবেন বিদেশে।
বিমান ছাড়ার আগে পরিবারের শেষ মুহূর্তের স্মৃতিতে মোবাইলের ফ্রেমবন্দি হয়ে আছে একটি হাসিখুশি ছবি। সেলফিতে কোমি ও প্রতীক পাশাপাশি বসে, পাশে তাদের তিন সন্তান। ছোট ছোট মুখে ফুটে উঠেছিল উচ্ছ্বাস আর অপেক্ষার আনন্দ। কে জানত, সেটিই হবে তাঁদের শেষ ছবি!জানা গিয়েছে, দু’দিন আগেই স্ত্রীকে নিতে ভারত এসেছিলেন প্রতীক যোশী। আহমেদাবাদ বিমানবন্দর (Ahmedabad Airport) থেকে তাঁদের বিদায় জানাতে সেদিন উপস্থিত হয়েছিলেন পরিবারের অন্য আত্মীয়রাও। বিমানটি ওড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটে দুর্ঘটনা। ইঞ্জিনে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভেঙে পড়ে এয়ার ইন্ডিয়ার (Air India) এই ফ্লাইটটি। ককপিট থেকে শেষবারের মতো একটি SOS পাঠানো হলেও, সেটি আর রক্ষা করতে পারেনি কোমি-প্রতীকদের মতো অসংখ্য যাত্রীকে।
বিমানটির বিধ্বস্ত অংশ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে পোড়া ডায়েরি, ছেঁড়া খেলনা, একটি ছোট্ট জুতো। সব কিছুতেই জীবনের স্মৃতিচিহ্ন মিশে আছে, আবার মৃত্যুর ছায়াও। স্বাভাবিকভাবেই পুরো ঘটনায় শোকস্তব্ধ পরিবার, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধব তো বটেই, স্তম্ভিত গোটা দেশ। উদয়পুরের হাসপাতালের সহকর্মীরা বলছেন, কোমি ব্যাস ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী চিকিৎসক। রোগীদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহার ছিল অসাধারণ। হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তারের কথায়, “শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ডিউটি করে গিয়েছেন। কখনও ক্লান্তি ধরা পড়েনি মুখে। এইভাবে আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন, ভাবতেই পারছি না।”
প্রতীক যোশী লন্ডনে এক নামী গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। সহকর্মীরা জানিয়েছেন, “তিনি প্রায়শই বলতেন, পরিবারকে একত্রে নিতে চান। খুব কষ্ট পেতেন সন্তানদের থেকে দূরে থাকায়।” সেই আকাঙ্ক্ষা সত্যি করার পথেই যাত্রা শুরু হয়েছিল তাঁদের। কিন্তু নিয়তি ভিন্ন রাস্তায় নিয়ে গেল। ঘটনার পর থেকে ভেঙে পড়েছে মৃতদের পরিবারের সদস্যরা। আহমেদাবাদের এক নিকট আত্মীয় জানিয়েছেন, “ওরা সবাই একসঙ্গে যাওয়ার কথা ছিল। আমরা শেষবার ওদের হাসি মুখে বিদায় জানিয়ে এসেছিলাম। কিছুক্ষণ পরেই ফোন আসে, বিমান ভেঙে পড়েছে! বিশ্বাস করতে পারিনি।”
এয়ার ইন্ডিয়ার পক্ষ থেকে দুর্ঘটনার কারণ তদন্তে উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভারতীয় বিমান নিরাপত্তা দফতরের (DGCA) এক আধিকারিক জানিয়েছেন, ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে কারণ স্পষ্ট করা হবে। আপাতত ধারণা করা হচ্ছে, ওড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ইঞ্জিনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে ককপিটে, ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনা ফের একবার বিমান নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। যাত্রীদের পরিবার ক্ষোভে ফুঁসছে। অনেকেই বলছেন, “আমরা বিমান যাত্রাকে নিরাপদ ভাবি। অথচ সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটিতেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে! কার উপর ভরসা করব?” একটা গোটা পরিবার, তিনটি শিশুর জীবন, আর একটি ভালবাসার গল্প শেষ হয়ে গেল এক নিমেষে। কোমি-প্রতীকদের অনাগত ভবিষ্যত আজ শুধুই স্মৃতি। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়। জীবন ঠিক কতটা অনিশ্চিত, আর পরিবার ঠিক কতটা অমূল্য।
ছবি : সংগৃহীত
পড়ুন :




