জয়ী বিশ্বাস ★ সাশ্রয় নিউজ : বাংলার রান্নাঘরে গড়ে ওঠা প্রতিটি পদ যেন একটি করে জীবন্ত গল্প। কোনো রান্না শুধুই স্বাদের জন্য নয়, তার পেছনে রয়েছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। তেমনই এক বিস্ময়কর রান্না হল ‘চাপড়ঘণ্ট (Chaporgonto)’ যা বাঙালি বিধবা সমাজের নির্মম বাস্তবতার মধ্যে থেকে জন্ম নিয়ে আজ বাঙালির নিরামিষ রান্নার গৌরব।পেঁয়াজ (Onion), রসুন (Garlic), মাছ-মাংস ছাড়াই এমন একটি পদ, যা মুখে দিয়েই বোঝা যায়, স্বাদ কখনও উপকরণের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। ‘চাপড়ঘণ্ট’-এর মূল ইউএসপি হল এর আটপৌরে উপাদান, নামমাত্র মসলা ও বাঙালিয়ানার অসাধারণ রান্নাঘরের কল্পনা।
রান্না বলতে অধিকাংশের কল্পনায় ভেসে ওঠে ঘন ঝোল, তেলচিটচিটে বেস, কিংবা ঝাঁঝালো গন্ধ, সেখানে চাপড়ঘণ্ট নিজেকে আলাদা পরিচয় দেয় তার নিজের সৌন্দর্য, মৃদু সুবাস, আর খাঁটি স্বাদ দিয়ে। এই পদটি তৈরি হয় বিশেষ একটি বড়া দিয়ে, যার নাম ‘চাপড় (Chapor)’। মুগ (Moong Dal) আর মটর ডাল (Yellow Peas) বেটে তৈরি করা এই চাপড়ের সঙ্গে মিলেমিশে যায় নানা মরসুমি সবজি আর সরষে-পোস্তর ঘ্রাণমাখা মশলা। ফোড়নে থাকে শুকনো লঙ্কা (Dry Red Chili), পাঁচফোড়ন (Panchphoron) আর তেজপাতা (Bay Leaf)।এতটাই নিখুঁত এই রান্না, যা খেয়ে অনেক সময়েই বোঝা যায় না, এটা আদতে একেবারেই সাত্ত্বিক পদ। পেঁয়াজ-রসুন না থাকলেও, স্বাদে কোনও খামতি নেই। বরং এমনই অনন্য মেলবন্ধন এই পদে, যা একবার খেলে মন চাইবে, আবার কবে খাব!

যা যা লাগবে
মটর ডাল (Yellow Peas) : ১ কাপ, মুগ ডাল (Moong Dal) : ১ কাপ, আদা (Ginger) ৩ গাঁট, কাঁচালঙ্কা (Green Chili) ৬টি, চেরা। আলু (Potato) ২টি, পটল (Pointed Gourd) ৩টি, ঝিঙে (Ridge Gourd) ২টি, করোলা বা কাঁকরোল (Bitter Gourd or Spine Gourd) ২টি, কুমড়ো, (Pumpkin) ১০০ গ্রাম, বেগুন (Brinjal) ১টি ছোট, শুকনো লঙ্কা (Dry Red Chili) ২টি, পাঁচফোড়ন (Panchphoron) ১ চা চামচ, তেজপাতা (Bay Leaf) ২টি, সরষে (Mustard Seeds) ১ টেবিল চামচ, পোস্ত (Poppy Seeds) ২ টেবিল চামচ, ঘি (Ghee) ২ টেবিল চামচ, সরষের তেল (Mustard Oil), আধ কাপ, গরম জল (Hot Water) ২ কাপ, স্বাদ অনুযায়ী নুন (Salt) ও চিনি (Sugar)
কীভাবে বানাবেন
➤প্রথম ধাপ: মটর ও মুগ ডাল আলাদা আলাদা করে ভালোভাবে ধুয়ে অন্তত চার ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখুন।
➤চাপড় তৈরির জন্য: ভিজে ডাল একসঙ্গে নিয়ে তার সঙ্গে ১ গাঁট আদা, ২টি কাঁচালঙ্কা এবং সামান্য নুন দিয়ে অল্প মোটা করে বেটে নিন।
➤মনে রাখবেন, মিহি বাটা হলে কিন্তু চাপড়ের টেক্সচার ঠিক আসবে না। কড়াইয়ে সরষের তেল গরম করে ওই মিশ্রণ থেকে হাত দিয়ে ছোট ছোট চ্যাপ্টা বড়া বানিয়ে তেলে ছেড়ে দিন। লালচে রং ধরলে তুলে ছুরি দিয়ে মাঝ বরাবর কেটে এক পাশে রেখে দিন।
➤সবজি প্রস্তুতি : আলু, পটল, ঝিঙে, কাঁকরোল, কুমড়ো, বেগুন, সবজিগুলি ভালোভাবে ধুয়ে সমান আকারে কেটে নিন।
➤ফোড়ন ও মশলা: একই কড়াইয়ে থাকা তেলে তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা ও পাঁচফোড়ন ফোড়ন দিন।
➤ফোড়নের গন্ধ বের হলে চেরা কাঁচালঙ্কা ও বাকি আদা বাটা দিয়ে দিন।
➤ক’য়েক সেকেন্ড নাড়াচাড়া করে কেটে রাখা আলু দিয়ে দিন, ভালো করে ভাজুন।এরপর একে একে দিন কাঁকরোল/করোলা, পটল, কুমড়ো, ঝিঙে, বেগুন।সবজিগুলি সেদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত ভাজতে থাকুন।
➤ চাপড়ঘণ্টের জাদু: ২ কাপ গরম জল দিয়ে কড়াই ঢাকা দিয়ে তিন মিনিট রান্না করুন। এবার বেটে রাখা সরষে ও পোস্ত মিশ্রণ, সামান্য চিনি ও আগে বানানো চাপড় বড়াগুলি দিয়ে দিন। মশলা ভালভাবে মাখিয়ে নিন। শেষে উপরে ঘি ছড়িয়ে দিন। একেবারে মাখোমাখো হয়ে এলে নামিয়ে ফেলুন।
পরিবেশন
গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন চাপড়ঘণ্ট। পাশে আর কিছু লাগবে না, এতটাই সমৃদ্ধ, এতটাই বাঙালি!এই রান্নায় যেমন আছে সহজলভ্য উপকরণ, তেমনই আছে রান্নার মৌলিক সৌন্দর্য। কোনও কৃত্রিম ঘ্রাণ নয়, কোনও অতিরিক্ত তেল-মশলা নয়, শুধু আদা, পোস্ত, সরষে ও কাঁচালঙ্কার স্মার্ট ব্যবহারে পুরো রেসিপিটা হয়ে ওঠে ঐতিহ্য আর উদ্ভাবনের প্রতীক।‘ চাপড়ঘণ্ট’ এমনই একটি পদ, যা নিরামিষভোজীদের তো বটেই, আমিষপ্রেমীদেরও বারবার চমকে দিতে পারে। এমনকি পেঁয়াজ-রসুন না থাকলেও কীভাবে খাদ্যরসনার চূড়ান্ত তৃপ্তি পাওয়া যায়, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই পদটি।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Patoler Dolma Recipe | নতুন স্বাদে পটলের দোলমা, মাছের ডিমের জাদুতে জমে উঠুক বর্ষার খাওয়া




