সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : সকাল থেকে রাত ফোনে মেসেজ এলেই উত্তর, ভীষণ ব্যস্ত, পরিচিত কাউকে দেখলে মন্তব্য, একটুও সময়ই নেই, নিজের জন্য কিছু করতে বললে উত্তর, পরে দেখা যাবে। আধুনিক জীবনযাত্রায় এই কথাগুলো এখন প্রায় স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ব্যস্ত থাকাই যেন সাফল্যের মাপকাঠি। কিন্তু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সারাক্ষণ সুপার বিজি থাকার প্রবণতা নিছক লাইফস্টাইল নয়, তা ধীরে ধীরে গভীর মানসিক সমস্যার জন্ম দিচ্ছে এবং তার প্রভাব পড়ছে শরীর ও মনের উপর।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (American Psychological Association) -এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা নিজেকে সব সময় অত্যন্ত ব্যস্ত বলে মনে করেন, তাঁদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা ক্রনিক স্ট্রেসের ঝুঁকি অনেক বেশি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই ধরনের মানুষদের মস্তিষ্ক প্রায় সারাক্ষণই সতর্ক অবস্থায় থাকে। ফলে বিশ্রামের সময়েও তারা পুরোপুরি শান্ত হতে পারেন না। অন্য দিকে, জার্নাল অফ অকুপেশনাল হেলথ সাইকোলজি-এ (Journal of Occupational Health Psychology) প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, একটানা কাজের চাপ ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ কমে যাওয়া এবং স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়ার মতো সমস্যার কারণ হতে পারে।মনোবিদদের মতে, ব্যস্ততা তখনই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন তা এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়। কাজ না থাকলে অস্বস্তি তৈরি হয়, বিশ্রাম নিলে অপরাধবোধ গ্রাস করে, কাজের বাইরে নিজের কোনও পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায় না, এই লক্ষণগুলোই ইঙ্গিত দেয় সমস্যার গভীরে পৌঁছে যাওয়ার। অনেকেই বলেন, কাজ না করলে নিজেকে অকেজো মনে হয়। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটিই টক্সিক প্রোডাক্টিভিটি (Toxic Productivity)।
এই টক্সিক প্রোডাক্টিভিটি এমন এক মানসিক অবস্থা যেখানে মানুষ মনে করেন, যত বেশি কাজ করবেন, ততই তাঁর মূল্য। বিশ্রাম, আনন্দ বা অবসরকে তিনি দুর্বলতা হিসেবে দেখতে শুরু করেন। অথচ বাস্তবে এর ফল হয় ঠিক উল্টো। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকার ফলে শরীরে উচ্চ রক্তচাপ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, হজমের সমস্যা, মাথাব্যথা, অনিদ্রা এবং রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। মানসিক দিক থেকে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং বার্নআউটের ঝুঁকি বেড়ে যায়।চিকিৎসকদের মতে, এই সমস্যার সবচেয়ে বড় দিক হল যে অনেকেই বুঝতেই পারেন না তিনি সমস্যায় পড়ছেন। কারণ সমাজে ব্যস্ততাকে প্রশংসা করা হয়। কেউ যদি বলেন, আমি খুব ব্যস্ত, তার মানে ধরে নেওয়া হয় তিনি সফল, দায়িত্বশীল এবং পরিশ্রমী। কিন্তু এর আড়ালে যে শরীর ও মন ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছে, তা অনেক সময়ই নজরে আসে না।
এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের একাংশ বলছেন, অতিরিক্ত কাজের চাপ মস্তিষ্কের স্ট্রেস রেসপন্স সিস্টেমকে সবসময় সক্রিয় রাখে। ফলে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চললে শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। তার প্রভাব পড়ে হৃদ্যন্ত্র, পাচনতন্ত্র এবং স্নায়ুতন্ত্রের উপর। অনেকেই তখন সামান্য কাজেই ক্লান্ত হয়ে পড়েন, কিন্তু তবুও কাজ থামাতে পারেন না।
চিকিৎসক ও গবেষকদের মতে, ব্যস্ত থাকা প্রয়োজন, কিন্তু সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকা স্বাস্থ্যের পক্ষে বিপজ্জনক। তাই সচেতন না হলে এই অভ্যাস ভবিষ্যতে বড় মানসিক সমস্যার রূপ নিতে পারে। প্রশ্ন হল, এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচবেন কীভাবে?চিকিৎসক ও মনোবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিদিন কিছু সময় ইচ্ছাকৃতভাবে কাজ থেকে দূরে থাকা জরুরি। এই সময়টাকে ‘নিজের সময়’ হিসেবে গুরুত্ব দিতে হবে। বিশ্রাম নেওয়া অলস্য নয়, এই ধারণা নিজের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। পরিবার ও বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সময় কাটানো, মোবাইল ফোন থেকে কিছু সময়ের জন্য দূরে থাকা এবং নিজের পছন্দের কোনও কাজ করা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মনোবিদরা আরও বলছেন, কাজের সময় ও ব্যক্তিগত সময়ের মধ্যে সীমারেখা টানতে শিখতে হবে। অফিসের কাজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া বা সব সময় কাজের মেসেজে সাড়া দেওয়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে কমাতে হবে। সম্ভব হলে কিছুদিনের ছুটি নিয়ে পরিবেশ বদল করুন। ভ্রমণ, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো বা নিছক বিশ্রাম সবই মস্তিষ্ককে নতুন করে শক্তি জোগায়।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, নিজের মূল্য শুধুমাত্র কাজের পরিমাণ দিয়ে বিচার করবেন না। মানুষ হিসেবে আপনার অস্তিত্ব কাজের বাইরেও রয়েছে। ব্যস্ততা জীবনের প্রয়োজনীয় অংশ, কিন্তু সেটাই যদি জীবনের একমাত্র পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা ভয়ঙ্কর হতে পারে। তাই সময় থাকতে সচেতন হন। নইলে সুপার বিজি থাকার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই নীরব বিপদ একদিন বড় মানসিক সমস্যার দরজা খুলে দিতে পারে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Deepika Padukone Mental Health Ambassador | দীপিকা পাড়ুকোন মানসিক স্বাস্থ্যের দূত, ভারত সরকারের নতুন দায়িত্বে অভিনেত্রী




