নিজস্ব সংবাদদাতা, সাশ্রয় নিউজ ★ বারাসত : আধুনিকতার দৌড়ে যখন শহুরে জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সাহিত্যচর্চার ঘরোয়া পরিবেশ, তখন সেই ঐতিহ্যকেই নতুন রূপে ফিরিয়ে আনছে একদল সাহিত্যপ্রেমী মানুষ। বারাসতের অবাণিজ্যিক সাহিত্য সংগঠন ‘মায়াগাছ’ (Mayagachh) গত তিন বছর ধরে টানা মাসিক ‘চিরন্তনী বৈঠকী আড্ডা’ (Chirantani Boithoki Adda) আয়োজন করে আসছে, যেখানে সাহিত্য, সঙ্গীত, অণুগল্প ও কবিতার পাশাপাশি মিলেমিশে থাকে বাংলার রসনাতৃপ্ত আতিথেয়তা ও মননশীলতার ছোঁয়া। এ মাসের ৮ নভেম্বর, শনিবার সন্ধ্যায়।অনুষ্ঠিত হল, ‘মায়াগাছ’-এর ২৮তম বৈঠকী আড্ডা, যেখানে বারাসতের সাহিত্যপাড়া আবারও ভরে উঠল কবিতা, গল্প ও গানের মায়ায়। এই আড্ডার মূল উদ্দেশ্য, শহরজীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মননচর্চাকে ফিরিয়ে আনা, এবং নতুন ও প্রবীণ কবি-লেখকদের জন্য এক উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা।

এই সন্ধ্যার অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন বিশিষ্ট কবি অংশুমান কর (Anshuman Kar), যিনি তাঁর একক কবিতাপাঠে মুগ্ধ করেন উপস্থিত সকল সাহিত্যপ্রেমীকে। তাঁর আবৃত্তির ভঙ্গি ও কবিতার বিষয়বস্তুর গভীরতা শ্রোতাদের মন ছুঁয়ে যায়। আড্ডায় উপস্থিত সাহিত্যপ্রেমীরা জানান, “অংশুমান করের কবিতা কেবল শব্দের শিল্প নয়, তা অনুভবেরও এক পরম যাত্রা।” আড্ডার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল উত্তর বিশ্বাস (Uttar Biswas) -এর আলোচনা, যেখানে তিনি বাংলার বাউল ধারার গূঢ় তত্ত্ব ও দার্শনিক ভাবনা নিয়ে মনোজ্ঞ উপস্থাপনা করেন। তিনি বলেন, “বাউলরা শুধু গান করে না, তারা জীবনকে এক ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে।

সেই দর্শনই আজকের প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া দরকার।” তাঁর এই বক্তব্যে উপস্থিত কবি ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে আলোচনার নতুন স্রোত বইয়ে দেয়।

এছাড়া অণুগল্প ও কবিতাপাঠে অংশ নেন চন্দন ঘোষ (Chandan Ghosh), সুবীর সেন (Subir Sen), সুব্রত ঘোষ (Subrata Ghosh), সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Subrata Bandyopadhyay), শুভশ্রী সাহা (Shubhshree Saha), সত্যবান বিশ্বাস (Satyaban Biswas), বিদ্যুৎ বিশ্বাস (Bidyut Biswas), সোমা পালিত ঘোষ (Soma Palit Ghosh), অমিতাভ মিত্র (Amitabh Mitra), ও সঞ্জয় গুহঠাকুরতা (Sanjay Guhathakurta)। প্রত্যেকের সৃষ্টিশীলতা ও ভিন্নধর্মী উপস্থাপনা সন্ধ্যাটিকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অংশে সুরের মূর্ছনা ছড়ান প্রতিভাবান বাউলশিল্পী অর্করাগ বন্দ্যোপাধ্যায় (Arkorag Bandyopadhyay)। তাঁর পরিবেশিত বাউল গান শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে দীর্ঘক্ষণ। অনুষ্ঠান শেষে এক অতিথি বলেন, “এই মায়াগাছের আড্ডা যেন সেই পুরনো বৈঠকখানার দিনগুলোকে ফিরিয়ে আনে, যেখানে কবিতা, গান, গল্প, সবই একসঙ্গে মিশে যায় মানবিকতার আলোয়।”

সম্পূর্ণ আড্ডাটির পরিকল্পনা ও সঞ্চালনায় ছিলেন সোমপ্রভা বন্দ্যোপাধ্যায় (Somaprabha Bandyopadhyay) ও প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় (Prasun Bandyopadhyay)। তাঁরা বলেন, “আমরা চাই সাহিত্য হোক মানুষের মধ্যে সংযোগের সেতু। এই আড্ডাগুলো শুধু পাঠ বা শোনার জন্য নয়, ভাবনার আদানপ্রদানের জায়গা। আজকের তরুণদেরও এখানে যুক্ত করতে চাই আমরা।” উল্লেখ্য যে, ‘মায়াগাছ’ (Mayagachh) -এর এই উদ্যোগ বাংলা সাহিত্যের জগতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যেখানে অনেক সংগঠন বাণিজ্যিকতার মোড়কে সাহিত্যচর্চাকে গণ্ডিবদ্ধ করে ফেলেছে, সেখানে এই সংস্থাটি সম্পূর্ণ অবাণিজ্যিক ভাবনায়, স্বেচ্ছাশ্রমে ও ভালোবাসায় সাহিত্যিকদের একত্রিত করছে। এক অর্থে, এটি হয়ে উঠেছে উত্তর কলকাতার আড্ডার নবজাগরণ।
এই ধারাবাহিকতার তৃতীয় বর্ষ পূর্তিতে ‘মায়াগাছ’ -এর সদস্যরা জানিয়েছেন, আগামী বছর আরও বৃহত্তর সাহিত্যোৎসবের পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁদের আশা, বারাসত ছাড়িয়ে একদিন এই সাহিত্যচর্চার ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে গোটা বাংলায়।আজকের দ্রুতগামী সময়েও এমন এক সাহিত্যিক সংলাপমঞ্চ যে কেবল টিকে আছে তাই নয়, ক্রমে মানুষের মনের ভিতর নতুন প্রাণসঞ্চার করছে, সেটাই বারাসতের ‘মায়াগাছ’-এর (Mayagachh) সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Sasraya News Sunday’s Literature Special | 9th November 2025, Sunday | Edition 86 | সাশ্রয় নিউজ রবিবারের সাহিত্য স্পেশাল | ৯ নভেম্বর ২০২৫, রবিবার | সংখ্যা ৮৬




