সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বারামতী, মহারাষ্ট্র : মহারাষ্ট্রের বারামতী (Baramati) এলাকায় স্বামীকে খুনের চেষ্টার অভিযোগে এক মহিলাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অভিযোগ, প্রথমে ফলের রসের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে স্বামীকে খাওয়ানো হয়। ওষুধের প্রভাবে প্রায় দু’দিন অচেতন থাকার পর জ্ঞান ফিরতে শুরু করতেই তাঁকে ব্যাট দিয়ে মারধর করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় স্বামীকে বাড়ির ব্যালকনিতে নিয়ে গিয়ে একটি সিমেন্টের গর্তের মধ্যে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্ত্রীর বিরুদ্ধে। তার উপর পাথর চাপা দিয়ে জায়গাটি সিমেন্ট দিয়ে বন্ধ করে দেওয়ারও চেষ্টা হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রে খবর। ঘটনাটি ঘিরে বারামতীতে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। অভিযুক্ত মহিলার নাম শর্মিলা জগতাপ (Sharmila Jagtap)। তাঁর স্বামী প্রবীণ জগতাপ (Pravin Jagtap) বর্তমানে চিকিৎসাধীন। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত বলে মনে করা হচ্ছে। কী কারণে এই হামলা, কেন স্বামীকে এ ভাবে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, তার উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, গত ৩০ জুলাই থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। অভিযোগ, ওই দিন ফলের রসের মধ্যে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে স্বামীকে খেতে দেন শর্মিলা। ওষুধের মাত্রা কতটা ছিল, তা এখনও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তবে প্রবীণের দাবি, ওই পানীয় খাওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে সংজ্ঞা হারান। প্রায় দু’দিন তিনি অচেতন অবস্থায় ছিলেন বলে তাঁর পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে। এর পর ১ আগস্ট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ। প্রবীণের সংজ্ঞা ফিরতে শুরু করেছিল। সেই সময় তিনি পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ছিলেন না। অভিযোগ, সেই অর্ধচেতন অবস্থাতেই তাঁকে ব্যাট দিয়ে মারতে শুরু করেন শর্মিলা। শরীরের বিভিন্ন অংশে এলোপাথাড়ি আঘাত করা হয় বলে অভিযোগ। গুরুতর ভাবে আহত হয়ে পড়েন প্রবীণ। এর পরেই তাঁকে বাড়ির ব্যালকনির দিকে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ। জগতাপ পরিবারের বাড়ির ব্যালকনিতে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো একটি চৌকো অংশ রয়েছে। সেই জায়গাতেই প্রবীণকে ফেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। পরে তাঁর উপর একটি পাথর চাপা দিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। শুধু পাথর চাপা দিয়েই থামেননি অভিযুক্ত মহিলা, জায়গাটি সিমেন্ট দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য এক মিস্ত্রিকেও ডাকা হয়েছিল বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। ঘটনার মোড় ঘুরে যায় সেই মিস্ত্রির সন্দেহে। সিমেন্টের কাজ করতে গিয়ে জায়গাটি নিয়ে তাঁর সন্দেহ হয়। কিছু একটা অস্বাভাবিক রয়েছে বলে মনে হওয়ায় তিনি বিষয়টি পুলিশকে জানান। এর পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। সিমেন্টের বাঁধানো অংশ পরীক্ষা করে সেখান থেকে প্রবীণকে উদ্ধার করা হয়। সেই সময় তিনি জীবিত ছিলেন। দ্রুত তাঁকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
প্রবীণের দাবী, তাঁকে ওই জায়গায় ফেলে দেওয়ার সময় সম্ভবত শরীরের কোনও অংশ বাইরে বেরিয়ে ছিল। সেই কারণেই মিস্ত্রির সন্দেহ হয়ে থাকতে পারে। যদি ওই কর্মী বিষয়টি পুলিশকে না জানাতেন, তা হলে কী ঘটত, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তদন্তে আরও একটি তথ্য সামনে এসেছে। প্রবীণের অভিযোগ, শুধু তাঁকেই নয়, তাঁর মাকেও ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল। বৃদ্ধারও সংজ্ঞা চলে গিয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। পরে তাঁর হুঁশ ফিরলে তিনি দেখেন, শর্মিলা স্বামীকে মারধর করছেন। সেই সময় শর্মিলার নজর অন্য দিকে থাকায় প্রবীণের মা কোনও রকমে তাঁর ভাইকে ফোন করেন বলে জানা গিয়েছে। ফোনে গোটা ঘটনা জানানো হয়। পুলিশের কাছে খবর পৌঁছনোর আগেই পরিবারের অন্য সদস্যদের কাছেও বিষয়টি পৌঁছে যায়। ফলে উদ্ধার অভিযান দ্রুত শুরু করা সম্ভব হয়। পুলিশের হাতে ধরা পড়েন শর্মিলা। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। স্বামীকে খুনের চেষ্টা কেন করা হয়েছিল, তার পিছনে কোনও নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল কি না, ঘটনার আগে দাম্পত্য সম্পর্কে কোনও সমস্যা চলছিল কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ঘটনার নেপথ্যে ‘দৃশ্যম’ (Drishyam) ছবির প্রভাব ছিল কি না, তা নিয়েও তদন্তকারীদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে বলে খবর। কারণ, ছবিতে অপরাধের প্রমাণ লোপাটের জন্য মাটির নিচে দেহ লুকিয়ে রাখার দৃশ্য রয়েছে। বারামতীর এই ঘটনায়ও আহত ব্যক্তিকে এমন একটি জায়গায় লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ। তবে অভিযুক্ত মহিলা সত্যিই কোনও সিনেমার দৃশ্য অনুসরণ করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনও নিশ্চিত তথ্য নেই। অন্য দিকে, প্রবীণের বক্তব্যে ‘কালোজাদু’ বা তন্ত্রমন্ত্রের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। তাঁর সন্দেহ, স্ত্রী হয়তো কোনও ধরনের তন্ত্রসাধনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যদিও এই দাবির সত্যতা এখনও যাচাই করেনি পুলিশ। তদন্তকারীরা প্রবীণের বক্তব্যের পাশাপাশি বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন সামগ্রী এবং নথিও খতিয়ে দেখছেন বলে জানা গিয়েছে।
প্রবীণের আরও দাবি, বাড়ির একটি ক্যালেন্ডারে গত ১৩ ও ১৪ জুলাইয়ের তারিখের পাশে শর্মিলা কিছু কথা লিখে রেখেছিলেন। সেখানে ‘কোনও ফল হল না’ ধরনের মন্তব্য ছিল বলে তাঁর দাবি। ওই লেখার সঙ্গে পরবর্তী ঘটনার কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয় হয়ে উঠেছে। কেন ওই তারিখগুলিতে এমন মন্তব্য করা হয়েছিল, কী উদ্দেশ্যে লেখা হয়েছিল, তা নিয়ে কোনও নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি। পুলিশ অবশ্য কেবল প্রবীণের অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে চাইছে না। ঘুমের ওষুধ কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, কতটা ওষুধ দেওয়া হয়েছিল, আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে তার কোনও প্রভাব রয়েছে কি না, মারধরের ফলে কী ধরনের আঘাত হয়েছে এবং ব্যালকনির গর্তটি আগে থেকেই ছিল, নাকি ঘটনার আগে সেটি ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হয়েছিল, সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মিস্ত্রির ভূমিকা নিয়েও পুলিশ তথ্য সংগ্রহ করছে। তিনি ঠিক কী দেখে সন্দেহ করেছিলেন, কখন পুলিশকে খবর দিয়েছিলেন এবং পুলিশ পৌঁছনোর আগে ওই জায়গায় কী কাজ হয়েছিল, তা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে বাড়ির আশপাশের লোকজনের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে। এই ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের বয়ানও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে প্রবীণের মায়ের বক্তব্য থেকে ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর কাছ থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি কখন ঘুমের ওষুধের প্রভাবে অচেতন হয়েছিলেন এবং পরে কী অবস্থায় ছেলের সঙ্গে ঘটনাটি দেখেছিলেন। উল্লেখ্য, স্বামীকে খুনের চেষ্টা কেন করা হয়েছিল, তার উত্তর এখনও মেলেনি। আর্থিক কারণ, দাম্পত্য অশান্তি, ব্যক্তিগত বিরোধ অথবা অন্য কোনও কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। একই সঙ্গে ‘কালোজাদু’ সংক্রান্ত দাবিও তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে। তবে এই মুহূর্তে কোনও একটি কারণকে ঘটনার নেপথ্য কারণ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়নি। অভিযুক্ত শর্মিলার বিরুদ্ধে কী কী ধারায় মামলা করা হয়েছে এবং আদালতে পুলিশ কী তথ্য পেশ করে, সেদিকেও নজর রয়েছে। অন্য দিকে, গুরুতর আহত প্রবীণের চিকিৎসা চলছে। তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে পুলিশের তদন্ত আরও এগোতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
বারামতীর এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তৈরি করেছে খুনের অভিযোগের ধরন। প্রথমে ঘুমের ওষুধ, তার পর মারধর এবং শেষে আহত স্বামীকে বাড়ির ব্যালকনির গর্তে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা, ঘটনার প্রতিটি ধাপ নিয়েই তদন্তকারীরা তথ্য সংগ্রহ করছেন। আপাতত মিস্ত্রির সন্দেহ ও পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপেই প্রবীণকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এখন তদন্তের লক্ষ্য, এই ভয়াবহ ঘটনার নেপথ্যে আসল পরিকল্পনা কী ছিল এবং অভিযুক্তের উদ্দেশ্য ঠিক কী ছিল, তা খুঁজে বের করা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Pune landslide | মহারাষ্ট্রে ভয়াবহ ধস, পুনের গ্রামে মাটির নিচে চাপা বাড়ি, মৃত ১, নিখোঁজ ২




