সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বুধবার কলকাতার রাজপথে চোখ রাখলেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল এক অন্য ছবি। নীলের সঙ্গে মিশে যাওয়া লাল নয়, এদিন শহর ঢেকে গিয়েছিল বেগুনি রঙে। সেই বেগুনি শাড়ি শুধু একটি পোশাক নয়, তা যেন হয়ে উঠেছিল দীর্ঘ বঞ্চনা, ক্লান্তি আর ন্যায্য অধিকারের দাবির প্রতীক। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা আশাকর্মীদের (ASHA Workers) এই বিক্ষোভ বাংলার জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভিতরে লুকিয়ে থাকা কঠিন বাস্তবতার আয়না তুলে ধরল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আশাকর্মীরা সেই মানুষগুলি, যাঁরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, কখনও রোগীর ঘরের আবর্জনা নিজের হাতে পরিষ্কার করে, কখনও আবার কোভিডের মতো মারণরোগে ঝাঁপিয়ে পড়ে মানুষের পাশে থেকেছেন। বন্যার সময় ভেলায় চেপে প্রত্যন্ত গ্রামে টিকা দিতে যাওয়ার দৃশ্য আজও ভুলতে পারেনি বাংলা। সেই সমস্ত নিঃশব্দ সৈনিকরাই এদিন রাজপথে নেমে দেখালেন তাঁদের অসহায়তার ছবি।
তাঁরা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দফতরের সচিব নারায়ণ স্বরূপ নিগম (Narayan Swaroop Nigam) -এর সঙ্গে কথা বলার আশ্বাস পেয়েছিলেন। সেই আশাতেই শত শত মাইল পেরিয়ে কলকাতার পথে রওনা দেন আশাকর্মীরা। কিন্তু অভিযোগ, শহরে পৌঁছনোর আগেই একের পর এক জায়গায় তাঁদের আটকানো হয়। কেউ শিয়ালদহ স্টেশনে, কেউ কলেজ মোড়ে, কেউ আবার সল্টলেকের রাস্তায় পুলিশের ব্যারিকেডে আটকে যান। কথা বলা তো দূরের কথা, অনেকেই পৌঁছতেই পারলেন না স্বাস্থ্যভবনের (Health Bhavan) কাছে। এমনি চিত্র বুধবার সারাদিনের। উল্লেখ্য, এই আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে আশাকর্মীদের দৈনন্দিন জীবনের নির্মম হিসেব। সারা দিন-রাত এক করে কাজ করে মাস শেষে তাঁদের হাতে আসে মাত্র ৫ হাজার ২৫০ টাকা। এই টাকায় সংসারের চাল-নুন জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে হয়। সন্তানদের পড়াশোনা, অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসা কিংবা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ, সব কিছু মিলিয়ে জীবন চালানো কীভাবে সম্ভব, সে প্রশ্নের উত্তর হয়ত কেবল তাঁরাই জানেন। মূল্যবৃদ্ধির বাজারে প্রতিটি দিন তাঁদের কাছে এক একটি নতুন লড়াই।
বেতন ছাড়াও রয়েছে পোশাক সংক্রান্ত বঞ্চনার অভিযোগ। রাজ্য সরকারের নিয়ম অনুযায়ী বছরে দু’টি করে শাড়ি পাওয়ার কথা আশাকর্মীদের। কিন্তু বাস্তব ছবি সম্পূর্ণ আলাদা। বর্ধমান (Bardhaman) থেকে আসা এক আশাকর্মীর কথায়, ‘২০২৩ সালে কাজ শুরু করেছি। এখনও পর্যন্ত মাত্র দুটো শাড়ি পেয়েছি। বছরে দুটো করে পাওয়ার কথা থাকলেও সেটা দেওয়া হয় না। যে শাড়ি দেওয়া হয়েছে, তা ছাতার কাপড়ের থেকেও খারাপ। সেই শাড়ি পরেই আমাদের রোদ-জলে ঘুরে বেড়াতে হয়।’ তাঁর কণ্ঠে ছিল ক্ষোভের সঙ্গে ক্ষীণ আশাও , আন্দোলন হয়ত একদিন ফল দেবে!
আন্দোলনরত একজন আশাকর্মী বললেন, শাড়িগুলি এতটাই মোটা যে গরমকালে তা পরে কাজ করা প্রায় অসহনীয় হয়ে ওঠে। তাঁর কথায়, ‘আমরা ভাতা চাই না। আমরা চাই ন্যূনতম ১৫ হাজার টাকা বেতন, সরকারি ছুটি এবং মানবিক ছুটির ব্যবস্থা। আমরা মায়েদের বলি তিন মাস বিশ্রাম নিতে, অথচ নিজেরা অন্তঃসত্ত্বা হলে মাত্র ৪৫ দিনের ছুটি পাই।’ এই বৈপরীত্যই যেন তাঁদের যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে তোলে। প্রসঙ্গত ২০০৫ সালে জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশন (National Rural Health Mission) -এর আওতায় আশাকর্মী নিয়োগ শুরু হয়। পশ্চিমবঙ্গে তাঁদের জন্য বেগুনি রঙের শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজকে ইউনিফর্ম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। এই বেগুনি রঙ নারী মর্যাদা, সমতা এবং আন্দোলনের প্রতীক হিসেবেই তুলে ধরেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। নারী দিবস এবং নারীশক্তির বার্তা দিতেই এই রঙের নির্বাচন। কিন্তু বুধবার সেই বেগুনি রং-ই হয়ে উঠল প্রতিবাদের রং।
কলেজ মোড় থেকে শিয়ালদহ, স্বাস্থ্যভবনের চারপাশ, সর্বত্র থিকথিকে বেগুনি ভিড়। পুলিশ বেগুনি দেখলেই ব্যারিকেড তুলেছে, পথ আটকেছে। দিনভর ধস্তাধস্তি, ব্যারিকেড টপকানোর চেষ্টা, হুড়োহুড়ি, ক্লান্ত, অবসন্ন চেহারায় সন্ধ্যা নামল আন্দোলনকারীদের চোখে। তবু তাঁদের চোখে ছিল একটাই কথা, না-পাওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস। অন্যদিকে, এই আন্দোলন কোনও এক দিনের ক্ষোভ নয়। দীর্ঘদিনের জমে থাকা বঞ্চনা, অবহেলা আর প্রতিশ্রুতি ভাঙার ফল। যাঁরা রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁদের এই লড়াই তাই শুধু নিজেদের জন্য নয়, গোটা ব্যবস্থার প্রতিও এক তীব্র প্রশ্নচিহ্ন। বেগুনি শাড়ির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সেই ‘নিরাশা’ আজ রাজপথে উঠে এসে প্রশাসনের দরজায় কড়া নাড়ছে, উত্তর মিলবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Somnath Temple Stands Tall After 1000 Years, Tribute by PM Narendra Modi | হাজার বছরেও অটল সোমনাথ, প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধায় ইতিহাসের নতুন পাঠ




