সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : আন্টার্কটিকার (Antarctica) বিস্তীর্ণ সাদা বরফের রাজ্যে হঠাৎই চোখে পড়ে রক্তের মতো লাল জলধারা, যা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে কৌতূহলের কেন্দ্র। ম্যাকমার্ডো ড্রাই ভ্যালি (McMurdo Dry Valleys) -এর টেলর হিমবাহ (Taylor Glacier) থেকে বেরিয়ে আসা এই অদ্ভুত প্রপাতকে ঘিরে বহুদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ছিল। কেন এই জল লাল? শুধুই কি আয়রনের রাসায়নিক বিক্রিয়া, নাকি এর পেছনে আরও জটিল প্রক্রিয়া কাজ করে? সাম্প্রতিক গবেষণায় সেই প্রশ্নের নতুন দিশা মিলেছে। শতাব্দীরও বেশি সময় আগে প্রথম নজরে আসে এই ‘রক্তপ্রপাত’। তখন থেকেই ধারণা করা হয়েছিল, আয়রনসমৃদ্ধ জল বাতাসের সংস্পর্শে এসে অক্সিডাইজড হয়ে লাল রং ধারণ করে। কিন্তু নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। বরফের নিচে থাকা জলের প্রবাহ, চাপের পরিবর্তন এবং হিমবাহের গঠনগত পরিবর্তন, সবমিলিয়েই এই লাল স্রোতের উৎপত্তি।
লুইসিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির (Louisiana State University) ভূবিজ্ঞানী পিটার টি ডোরান (Peter T Doran) এবং তাঁর গবেষক দল এই রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণে জানা যায়, টেলর হিমবাহের উচ্চতায় সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন ঘটছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে স্থাপিত বিশেষ যন্ত্রে ধরা পড়ে যে, হিমবাহের উচ্চতা কমে গিয়েছে। এর সঙ্গে লাল জলের প্রবাহের সম্পর্ক রয়েছে বলে অনুমান করেন গবেষকরা। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে হিমবাহের উপরিভাগ কখনও বসে যাচ্ছে, আবার কিছু সময় পরে আগের অবস্থায় ফিরে আসছে। এই ওঠানামার পেছনে রয়েছে বরফের নিচে থাকা নোনা জলের প্রবাহ, যাকে বলা হচ্ছে ‘ড্রেনেজ পালস’। এই প্রবাহের ফলে বরফের নিচে চাপের তারতম্য তৈরি হয় এবং সেই চাপই জলকে ফাটল দিয়ে বাইরে ঠেলে দেয়। এই জল সাধারণ জল নয়, এটি অত্যন্ত লবণাক্ত এবং আয়রনে সমৃদ্ধ। ফলে অ্যান্টার্কটিকার তীব্র শীতেও এটি বরফে পরিণত হয় না। বিজ্ঞানীদের মতে, নোনা জলের ঘনত্ব বেশি হওয়ায় এর হিমাঙ্ক অনেক নিচে নেমে যায়। তাই তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নিচে থাকলেও এই জল তরল অবস্থায় থাকতে পারে।
হিমবাহের গভীর থেকে বেরিয়ে আসা এই জল যখন বাইরের বাতাসের সংস্পর্শে আসে, তখন অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে আয়রন অক্সাইড তৈরি হয়। আর এই বিক্রিয়ার ফলেই জলের রং হয়ে ওঠে উজ্জ্বল লাল, যা দূর থেকে রক্তের মতো দেখায়। গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, টেলর হিমবাহের নিচে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ লবণাক্ত জলের একটি প্রবাহ রয়েছে। এই প্রবাহ বহু লক্ষ বছর ধরে বরফের নিচে আবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এই জলধারার বয়স প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ বছর। এত পুরনো জলধারা আজও সক্রিয়, যা নিজেই এক বিস্ময়কর ঘটনা। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এসেছে এই গবেষণায়, বরফের নিচে থাকা অণুজীবের উপস্থিতি। অক্সিজেনহীন পরিবেশেও এই অণুজীবগুলি টিকে রয়েছে। তারা লোহা এবং সালফারের রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তি উৎপাদন করে বেঁচে থাকে। সূর্যালোক বা অক্সিজেন ছাড়াই জীবন টিকে থাকতে পারে, এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে এই আবিষ্কার।
হিমবাহের গতিবিধিতেও এই প্রক্রিয়ার প্রভাব রয়েছে। সাধারণত বরফের নিচে থাকা জল হিমবাহকে সামনে এগোতে সাহায্য করে। কিন্তু টেলর হিমবাহের ক্ষেত্রে সেই জল ফাটল দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় হিমবাহটি নিচের পাথরের উপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করে। এর ফলে হিমবাহের গতি কমে যায় এবং গলন প্রক্রিয়াও ধীর হয়ে পড়ে। গবেষণার ফলাফল থেকে জানা যাচ্ছে, এই ‘রক্তপ্রপাত’ আসলে একটি চাপ নিঃসরণের পথ। বরফের নিচে জমে থাকা নোনা জল চাপের কারণে নির্দিষ্ট ফাটল দিয়ে বেরিয়ে আসে এবং বাইরের পরিবেশে এসে তার স্বতন্ত্র রং ধারণ করে। দীর্ঘদিনের রহস্য এখন অনেকটাই পরিষ্কার, যদিও এই অঞ্চলের ভূগঠন ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা এখনও চলছে। আন্টার্কটিকার এই অদ্ভুত প্রাকৃতিক ঘটনা শুধু ভূবিজ্ঞানীদের কাছেই নয়, মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ, এমন পরিবেশে জীবনের অস্তিত্বের ইঙ্গিত অন্য গ্রহ, বিশেষ করে মঙ্গল (Mars)-এর মতো জায়গায় প্রাণের সম্ভাবনা নিয়েও নতুন করে ভাবতে সাহায্য করছে। এই আবিষ্কার প্রমাণ করছে, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিকূল পরিবেশেও জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া এবং জীবন টিকে থাকতে পারে। বরফের নিচে লুকিয়ে থাকা এই লাল স্রোত তাই শুধুই একটি প্রাকৃতিক বিস্ময় নয়, তা পৃথিবীর গভীর রহস্যের এক গুরুত্বপূর্ণ জানালা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mohammad Salim on Election Commission | কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিস্ফোরক মহম্মদ সেলিম, আধা সেনা ও সাঁজোয়া গাড়ি ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক তর্ক



