বিনীত শর্মা, সাশ্রয় নিউজ ★ নতুন দিল্লি: “এই দেশে যাঁরা ইংরেজিতে কথা বলেন, তাঁদের খুব শীঘ্রই লজ্জিত হতে হবে” কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)-এর এই বক্তব্য ঘিরে উত্তাল হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। বৃহস্পতিবার দিল্লিতে একটি বই প্রকাশের অনুষ্ঠানে এসে তিনি এই মন্তব্য করেন বলে উল্লেখ। তাঁর দাবি, সময় এসেছে ভারতীয় ভাষার পুনরুজ্জীবনের। আর সেই অভিযাত্রায় ইংরেজির আধিপত্য ভাঙার লক্ষ্যে এগোচ্ছে সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমাদের ভাষাগুলি রত্নের মতো। আমরা যদি আমাদের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মূল্যবোধ বুঝতে চাই, তবে তা কোনও বিদেশি ভাষায় নয়। নিজস্ব ভাষাতেই সম্ভব। খুব তাড়াতাড়ি এক নতুন সমাজ গড়ে উঠবে, যেখানে ইংরেজিতে কথা বললে মানুষ লজ্জা পাবে।” তাঁর মতে, ভারতীয় সমাজ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে ভাষার মাধ্যমে আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন তুলছে দেশ। এই প্রসঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)-র ‘পঞ্চপ্রাণ’ বা পাঁচ সংকল্পের কথা। শাহ বলেন, “অমৃতকালে মোদীজি যে পঞ্চপ্রাণের ভিত্তি দিয়েছেন, তার মূল বক্তব্যই হল, দেশকে সমস্ত রকম দাসত্ব থেকে মুক্ত করা। নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করা। সমাজে ঐক্য ও সৌভ্রাতৃত্ব বজায় রাখা। আর নিজের কর্তব্য সম্পর্কে প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা।” ভাষার প্রশ্নে শাহের এই মন্তব্যকে অনেকেই হিন্দি আধিপত্যের বিরুদ্ধে দেশের একাংশের ক্ষোভের পটভূমিতে দেখছেন। বিশেষত দক্ষিণ ভারতের রাজনৈতিক দলগুলি ইতিমধ্যেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে হিন্দি চাপানোর অভিযোগে সরব হয়েছে। তামিলনাড়ুর (Tamil Nadu) মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন (M. K. Stalin) বারবার কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষানীতিকে আক্রমণ করে বলেছেন, “নয়া শিক্ষানীতির (NEP) মাধ্যমে দক্ষিণ ভারতের উপর হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে কেন্দ্র।” তবে এই অভিযোগের পাল্টা জবাবও যেন একপ্রকার আগেভাগেই দিয়ে রেখেছেন শাহ। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর মন্ত্রক ২০২৫ সালের মধ্যেই রাজ্যগুলির সঙ্গে সমস্ত সরকারি যোগাযোগ আঞ্চলিক ভাষাতেই করবে। চলতি বছরের শুরুতে তিনি জানান, “ডিসেম্বর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সমস্ত রাজ্যের সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষায় চিঠিপত্র আদানপ্রদান করবে। এটা একটা লড়াই। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি ভারতীয় সমাজ এই লড়াই জিতবেই। আমরা আমাদের ভাষাতেই দেশ চালাব।” ভাষার প্রশ্নে কেন্দ্রীয় সরকারের এই অবস্থান নতুন নয়। ইতিপূর্বেও একাধিকবার হিন্দিকে সরকারি কাজে ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রক থেকে। তবে এবারে বিষয়টি আরও সরাসরি জাতিগত ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে ফেললেন অমিত শাহ। তাঁর কথায়, “আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। ভাষার মাধ্যমেই গড়ে ওঠে জাতিসত্তা। আর সেই জাতিসত্তা কোনও বিদেশি ভাষার ওপর নির্ভরশীল হতে পারে না।” তবে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, কেবল ইংরেজি নয়, হিন্দিও তো ভারতের একাংশের জন্য ‘অপর’ ভাষা। তাহলে একাধিক ভাষার দেশ ভারতবর্ষে কেবল আঞ্চলিক ভাষা ও হিন্দির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা না করে ইংরেজিকে সরিয়ে দিলে তা কতটা যুক্তিসঙ্গত? সেই বিতর্কের জবাব অবশ্য স্পষ্টভাবে দেননি শাহ। বরং তাঁর বক্তব্যে একটা সুস্পষ্ট ছিল, “যাঁরা নিজেদের ভাষাকে ভালবাসেন না, তাঁরা নিজেদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, গৌরবও হারিয়ে ফেলেন।” শাহের বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্ট যে, ভাষা নিয়ে আগামী দিনে আরও কড়া অবস্থান নিতে চলেছে কেন্দ্র। তিনি বলেন, “২০৪৭ সালে যখন আমরা উন্নত ভারতের শতবর্ষ উদযাপন করব, তখন আমাদের ভাষাগুলিই হবে দেশের চালিকাশক্তি। ইংরেজির প্রয়োজন তখন থাকবে না। আমাদের সন্তানরা নিজেদের ভাষায় ভাববে, লেখবে, গর্ব করবে।” এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে দানা বাঁধছে বিতর্ক। ভারতের ভাষা কি শুধুই গর্বের বিষয়, না কি রাজনৈতিক হাতিয়ার? জাতীয় ঐক্য রক্ষায় কীভাবে ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব, যখন ভাষা নিজেই হয়ে উঠছে বিভাজনের রেখা? একটা বিষয় পরিষ্কার, কেন্দ্রের দৃষ্টিতে ভাষা শুধুই যোগাযোগের মাধ্যম নয়, আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। এখন দেখার, এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের বহুভাষিক বাস্তবতার সঙ্গে কীভাবে খাপ খায়। আর ইংরেজি যে ভাষা এতদিন উচ্চশিক্ষা, চাকরি ও আধুনিকতার প্রতীক ছিল, সে কি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলবে তার ‘গৌরব’? নাকি নতুন করে আত্মপ্রত্যয়ের ভাষা হয়ে উঠবে বাংলার মতো আঞ্চলিক রত্নেরা? প্রশ্নটা আপাতত ভবিষ্যতের গর্ভে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Amit Shah : নেতাজি ইন্ডোরে “বিজয় সংকল্প” : রাজ্যে পালাবদলের ডাক, রাজারহাটে ফরেনসিক সেন্টার উদ্বোধন করলেন অমিত শাহ




